ক্ষমতা

আবরার হত্যাকান্ড- বাংলাদেশীরা কি চায়?

আবরার বুয়েট নিয়ন আলোয় neonaloy

সৈয়দ মাহী আহমদ
আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মসূচীতে গিয়েছিলাম। এখানে অনেকেই বক্তৃতা দিয়েছেন এবং তাদের প্রায় সবার বক্তৃতাই আমার ভালো লেগেছে। যারা এই প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেছেন ও উপস্থিত থেকেছেন তারা বক্তৃতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে খুব ভালো জানেন — অন্ততপক্ষে আমি তা মনে করি — আর যারা জানেন না, আশাকরি মিডিয়া মারফত তারা জানতে পারবেন।

সবার বক্তৃতাকে যদি একটি ফ্রেমের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই, তাহলে দু’টি বিষয় পাওয়া যায়।
এক. আবরার হত্যাকাণ্ড ও তার বিচার;
দুই. বাংলাদেশ নিয়ে সচেতনতা।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির বলি একমাত্র আবরার না, তার মতো অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীর অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছিল ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-শিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। যা’হোক, উপস্থিত সবাই আবরার হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন এবং ছাত্রলীগ এই ঘটনায় শতভাগ দায়ী যা খুবই প্রমাণিত। অনেকেই ছাত্রলীগকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া, মিছিলের কিছু স্লোগান ছিল অনেকটটা এরকম : “শিক্ষা সন্ত্রাস একসাথে চলে না; শিক্ষা ছাত্রলীগ এক সাথে চলে না; যে হাত ছাত্র মারে সেই ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও”

এই স্লোগানগুলোকে আমি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি; কারণ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে এরকম সরাসরি কথা বলা, তার সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানানো এবং সেই কারণে তাকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” বলা, অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বড়ো সাহসিকতার পরিচায়ক! এর অন্য অর্থ হলো শিক্ষার্থীসমাজ আগেই বুঝেছিল যে ছাত্রলীগ আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিবিধিত্ব করে না, এই সংগঠনটি তার কার্যকারিতা হারিয়েছে; কিন্তু তারা অসচেতনতার কারণে, সুযোগের অভাবে, ভয়ে চুপ করে থেকেছিল; কোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়তে পারে নি বা গড়েনি।

কিন্তু, এখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধহীন বেঁচে থাকার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। ছাত্রলীগের এরকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আর কেউই (অন্তত সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউই) বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকবে না। আমি মনে করি, শুধু ছাত্রলীগ নয়, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবিরকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ করা হউক; কারণ এই প্রতিটি ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন তাদের নিজ নিজ সরকারের আমলে একেকটা ফ্র্যাংকেনসটাইন হয়ে উঠে; হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির উৎসবে মেতে ওঠে।

বাংলাদেশে এখনো অনেকে আছেন যারা মনে করেন পাকিস্তান আমলে তারা ভালো ছিলেন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান একসাথে থাকলে ভালো হতো, পাকিস্তানের প্রতি বিভিন্ন ইতিবাচক অনুভূতি এখনো কাজ করে যদিও পাকিস্তান বাংলাদেশের প্রতি বর্বরতম অপরাধ ও হত্যাযজ্ঞ সাধন করেছিল — আমরা তাদেরকে “পাকিপ্রেমী” বলি। আবার, বাংলাদেশে এরকম মানুষ আছেন যারা ভারতকে তাদের আশ্রয়স্থল ও তীর্থস্থল মনে করেন, বাংলাদেশের ওপর ভারতের অন্যায্য-অনৈতিক আধিপত্যের পরও তারা ভারতের প্রতি যথেষ্ট ইতিবাচক — আমরা তাদেরকে “ভারতপ্রেমী” বলি।

বর্তমানে তরুণসহ মানুষেরা ধীরে ধীরে আমাদের দেশ (বাংলাদেশ) এর প্রতি সচেতন হয় ওঠছে। তারা আর “পাকিপ্রেমীও” নয়, “ভারতপ্রেমীও” নয়; বরং তারা এই দু’দেশের প্রেমিককে অপছন্দ করে; তারা “বাংলাদেশপ্রেমিক”। বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে ঘিরে তাদের চিন্তাভবনা ও কার্যক্রম। অতীতে বাংলাদেশের সাথে কারা অপরাধ করেছিল, কারা বঞ্চিত করেছিল, কারা শোষণ করেছিল, বর্তমানে কারা আমাদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে চাচ্ছে, আমাদের পাওনা থেকে কারা অনৈতিক ও অন্যায্যভাবে আমাদেরকে বঞ্চিত করছে, আমাদের ভবিষ্যত কি হবে — এইসব চিন্তাভাবনা যারা “বাংলাদেশপ্রেমিক” তারা এখন করছে। আর এই বাংলাদেশপ্রেমিকরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মত, পথ ও পেশার মানুষ। আজকে যারা বক্তৃতা করেছিলেন, উপস্থিত থেকেছেন ও অংশগ্রহণ করেছেন তারা নিশ্চয়ই একই ধর্ম, মত ও পথের মানুষ না; কিন্তু, তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের কঠোর সমালোচনা করেছে; বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার আদায় নিয়ে কথা বলেছেন।

আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, আস্তিক, নাস্তিক, বামপন্থী, ডানপন্থী — যাই হই না কেন, আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক। এই রাষ্ট্র আমাদের। আমরা এই রাষ্ট্রের মালিক। আমাদের রাষ্ট্রের ওপর অন্যায়, অবিচার, নিপীড়ন ও আধিপত্য কায়েম করলে আমরাই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলব; অন্য কেউ না। তাই, “পাকিপ্রেমী”, “ভারতপ্রেমী” নিপাত যাক; “বাংলাদেশপ্রেমীরা” জেগে ওঠুক।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top