ক্ষমতা

যেভাবে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান নেতা হলেন পুতিন

ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ন আলোয় neonaloy

১৯৮৯ সাল। তখন বিভক্ত জার্মানীরর মানুষ উল্লাস করে দেয়াল পেরিয়ে নেমেছে বার্লিনের রাস্তায়। সমাজতান্ত্রিক শাসনে থাকা পশ্চিম জার্মানদের আলাদা একটা ক্ষোভ হয়তো ছিল রাশিয়ার প্রশাসনের প্রতি। ক্ষোভটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত কিনা সেটা ঠাওর করা মুশকিল হলেও, ৩ ডিসেম্বর রাতে সোভিয়েত রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র পশ্চিম জার্মান কার্যালয়ের সামনে জার্মান জনসমাগম দেখা যায়।

জার্মানীর উপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরমূহুর্ত থেকে মস্কো নিরব হয়ে গেছে। তখন কার্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সদ্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল হওয়া রাশিয়ান তরুণ। বেগতিক পরিস্থিতিতে কার্যালয় পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয় তার। সহস্রাধিক কেজিবি দলিল পুড়িয়ে ফেলা হয়। কার্যালয়ের ফার্নেস এক পর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ তাপে বিকল হয়ে পড়ে।

বাহিরে ক্রুদ্ধ জনসমাবেশ সামাল দেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় না পেয়ে শেষমেশ বাইরে বের হয়ে জনতার সম্মুখীন হতে হয় কেজিবি কর্মকর্তার। সেদিন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর দূর্ধর্ষ প্রয়োগ করে ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে জনসমাবেশ কাবু করেন সেই রাশিয়ান। জার্মানীর পূনর্মিলনের মূহুর্তে মস্কোর নিরবতা আর বেসামরিক আন্দোলনের মুখে জীবন বাজি রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দুটোই সে রাশিয়ান কেজিবি কর্মকর্তার জীবনের দিক পাল্টানোর জন্য দায়ী।

ঘটনার ৪ মাসের মাথায় এই কেজিবি কর্মকর্তা ফিরে আসেন লেনিনগ্রাডে (বর্তমান সেট. পিটার্সবার্গ)। এসেই সম্মুখীন হন অচেনা এক মাতৃভূমির। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর শুরু হয় গর্ভাচেভের মুক্তচিন্তার শাসনতন্ত্র। রাশিয়ার সংস্কৃতিতে ছাপ পড়ে পাশ্চাত্যের। সে শাসনতন্ত্রের ব্যর্থতা জন্ম দেয় রাশিয়ানদের গণতন্ত্র আন্দোলনের। যে গণজোয়ার কিছুদিন আগে তার জীবন বিপন্ন করেছিল নিজের দেশে সেটার রুপায়ন দেখে তিনি জড়িত হন রাশিয়ান প্রশাসনের সাথে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তার কাছে বিংশ শতাব্দীর সব চেয়ে দুঃখজনক ভূ-রাজনৈতিক দূর্ঘটনা মনে হতে থাকে। মাত্র ৩ বছরে লেনিনগ্রাডের ডেপুটি মেয়র হয়ে তিনি নিজ শহর থেকে শুরু করেন রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা। প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলতসিনের শাসনামলে ক্রেমলিনে প্রবেশ করেন এবং প্রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার আগেই তিনি রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইয়েলতসিন পদত্যাগ করেন এবং রাশিয়ান সংবিধানমতে প্রধানমন্ত্রী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। একযুগের কম সময়ে একজন অবসরপ্রাপ্ত কেজিবি কর্মকর্তা পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্রের একনায়কে পরিণত হন। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালীদের তালিকায় ভ্লাদিমির পুতিনের নাম না থাকা একরকম অসম্ভব।

ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ন আলোয় neon aloy

তারুণ্যের দিনগুলোতে ভ্লাদিমির পুতিন

অত্যধিক ক্ষিপ্রতার সাথে ক্ষমতার চূড়ায় উঠে আসা এই সাধারণ রাশিয়ানের শাসনের কদিন আগে দেড়যুগ পার হলো। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম একশ দিনের ভেতরে পুতিন নিজের ক্ষিপ্রতার উদাহরণ তৈরি করেন যার ফলশ্রুতিতে রাশিয়া শতাব্দী অবধি বিলম্বিত উন্নতির মুখ দেখতে পায়। প্রবৃদ্ধির এক অফুরন্ত জোয়ার আসে রাশিয়ার অর্থনীতিতে। বোরিস ইয়েলতসিনের মত আসক্ত, আবেগী ব্যক্তিত্বের পরিবর্তে পুতিনের মত দৃঢ়চিত্তের মানুষকে শাসক হিসেবে পেয়ে রাশিয়ার জনগন নিশ্চিন্ত বোধ করে। কিন্তু ২০০৮ সালে সকল প্রবৃদ্ধির মরিচিকা বিলীন হয়। রাশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ভাটা পড়ে।

পুতিনের শাসনে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ছিল ধীর। বিভিন্ন রাজনৈতিক কলকাঠির উপর ভিত্তি করে পুতিনের যে জনপ্রিয়তার পর্দা তৈরি হয়ে আছে, তার পেছনে লুকিয়ে আছে রাশিয়ার অন্ধকার এক চিত্র। একপাশ থেকে শুরু করা যাক।

ভ্লাদিমির পুতিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে রাশিয়ায় কোন বিলিয়নেয়ার ছিল না। সেখানে শাসনের ১৬ বছরের মাথায় রাশিয়ায় ১১১ জন বিলিয়নেয়ার আছেন। একটি দেশে ১১১ জন বিলিয়নেয়ার থাকা অবশ্যই দোষের কিছু না। কিন্তু তত্বটি চাঞ্চল্যকর দুটো কারণে। প্রথমত, রাশিয়ার গড় মাথা পিছু মাসিক আয় এক হাজার ডলারের নিচে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ায় বেসরকারি ব্যবসায় যথাযথ পরিমাণ অর্থ নেই যার মুনাফায় বিলিয়নেয়ার তৈরি হওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সম্পদের অসম বন্টন রাশিয়ায় প্রচলিত।

শুনে হয়তো অবাক লাগতে পারে, উক্ত ১১১ জন বিলিয়নেয়ার সম্পূর্ন রাশিয়ার ৩৫% সম্পদের অধিপতি। সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন আয়ের মধ্যকার তফাৎ রাশিয়ায় সব থেকে বেশি। ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার খনিজ তেল রপ্তানী করে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। হতাশাজনক বিষয় হল এই একই সময়ে মস্কো থেকে কোন নতুন মহাসড়ক তৈরি হয়নি। তুলনার খাতিরে বলা যায়, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র চীন একই সময়ে প্রতি বছর ৪,৩৬০ কি.মি. আধুনিক সড়ক নির্মাণ করেছে।

ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ন আলোয় neonaloy

একঝাঁক বিলিয়নেয়ারের মাঝে ভ্লাদিমির পুতিন

তবে উন্নয়নস্বল্পতার চেয়েও বীভৎস চিত্র হচ্ছে দুর্নীতির। রাশিয়া আর নরওয়ে এর মধ্যকার হাইওয়ে প্রকল্পের দুই রাষ্ট্রের নির্ধারিত প্রতি কি.মি. সড়ক নির্মাণ খরচ যথাক্রমে $৭.৬৮ মিলিয়ন এবং $৩.৬৩ মিলিয়ন। রাশিয়া এখনও পুরুষ মৃত্যু হার কমাতে পারেনি। ব্রিটেনে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা মতে রাশিয়ান ১৬ বছর বয়সী তরুণের প্রত্যাশিত আয়ু তাঞ্জানিয়া এবং সুমাত্রার মত দেশের চেয়ে ৩ বছর কম। কয়েক মিলিয়ন রাশিয়ান তরুনী হারিয়ে গিয়েছে আদম ব্যবসার জালে। তাদের পূনর্বাসন বা উদ্ধার বা পাচার প্রতিহতের লক্ষ্যে ক্রেমলিনের কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার চেষ্টা করেও পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

গবেষকদের মতে, পুতিন রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার অনেক আগেই এমন এক সিস্টেম চালু করেন যা তাকে অতর্কিত ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে আসে। পুতিনের বানানো এই সিস্টেমের প্রথম সারির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের প্রত্যেকে পুতিনের ব্যক্তিগত শুভাকাংক্ষী। কেজিবি এবং লেনিনগ্রাডের বিশ্বস্ত সহকর্মীদের নিয়ে তৈরি হয় পুতিনের প্রথম সরকার। এবং সেখান থেকে উর্ধতন সরকারী আমলাদের নিয়োগ দেওয়া হয় রাশিয়ার সরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অভ ডিরেক্টর হিসেবে। তিলে তিলে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পুতিনের ক্ষমতা নিশ্চিত হতে থাকে দিন দিন। সাধারণ রাশিয়ানদের অন্তত ৪০ শতাংশ বিশ্বাস করে পুতিনের ব্যক্তিগত সান্নিধ্য ছাড়া রাশিয়ায় অগ্রগতি সম্ভব না।

পুতিন শাসন বিগত শতকগুলোর তুলনায় কম বিধ্বংসী হলেও রাশিয়ান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে পশ্চাৎমুখী দিকগুলোর একটি তাতে এখনও বিরাজমান। আন্তর্জাতিক সমাজে রাশিয়ানদের সকল সমস্যার মুখে টাকা ছুঁড়ে ফেলার কথা বহুলাংশে স্বীকৃত। অনেক সময় রাষ্ট্রের সকল সমস্যা এই পন্থায় সমধান করতে চেষ্টা করা সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আরো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যে বিষয় সাধারণ প্রক্রিয়া বা নিয়মের সংশোধনে সমাধা করা যেত তার পেছনে বাজেট বাড়ানো ইতিবাচক হতে পারে না।

পুতিনের শাসনকালে রাশিয়ায় অপরাধ কিছুটা কমলেও আইন ব্যবস্থার চিত্র আর ১০টা উন্নয়নশীল দেশের মতই। সম্ভ্রান্তদের জন্য আর সাধারণ জনতার জন্য আইনের মানদন্ড আলাদা। ক্রেমলিন ও ডুমার রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের রাশিয়ান সরকার সকল আইনি মামলা থেকে নিরাপত্তা প্রদান করে। সর্বোপরি একটি পক্ষপাতী নিয়োগ ব্যবস্থা রাশিয়ার শিক্ষা, যোগাযোগ, খনিজ সম্পদ আর চিকিৎসার মানকে নামিয়ে এনেছে কয়েক ধাপে।

অযৌক্তিক বৈদেশিক ব্যবসার উপর লাবুকৃত আইন রাশিয়ায় বিনিয়োগের পরিবেশকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ রাশিয়ায় এখন নেই বললেই চলে। অনিবন্ধিত স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিয়া (IKEA) রাশিয়ায় ব্যবসা চালু করতে ৫ বছর সময় আর ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। ফলশ্রুতিতে চাকুরীর বাজার নিথর হয়ে পড়েছে। বেকারত্ব রাশিয়ান যুব সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা।

নিজের চৌকষ রাজনৈতিক চিন্তাধারার আদলে উলম্ব ক্ষমতার যে শিখর পুতিন তৈরি করেছেন তাকে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক জগতের অনেকে পুতিনের ক্লেপ্টোক্রেসি বলে আখ্যা দেন। অবৈধ অর্থ, অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা আর রাজনৈতিক প্রভাবের উপর ভিত্তি করেই এই ক্লেপ্টোক্র্যাটিক প্রশাসন।

এত কিছুর পরও কেন তবে পুতিনের পরিণতি সমসাময়িক স্বৈরাচারীদের মত হচ্ছে না? সেটা বোঝার জন্য প্রথমে রাশিয়ার গত শতাব্দীটা সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। ফেব্রুয়ারী ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জার (TSAR) রাজতন্ত্রের পতন হয়। ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন রাশিয়ার অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১০ লক্ষের বেশি রাশিয়ানের মৃত্যু ঘটে। রাশিয়ার ৪০ শতাংশ কর্মক্ষম পুরুষ জনতা বিলীন হয় যুদ্ধের ৪ বছরে।

রাশিয়ার সর্বশেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাস

যুদ্ধ শেষে দেশটির উপর নেমে আসে স্টালিনের স্বৈরাচার। একনায়কতন্ত্রের মূল উৎপাটনের প্রক্রিয়ায় পতন হয় কমিউনিজমের। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা পুঁজি করে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় ১৯৯০ সালে। এরপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি গর্ভাচেভ আর ইয়েলতসিনের শাসনে রাশিয়া ডুবে যায় অনিয়ম আর অরাজকতায়। দীর্ঘ অস্থিতিশীলতার পরে পুতিনের মত শাসক রাশিয়ানদের কাছে কতটাই বা কষ্টকর মনে হতে পারে?

পাশ্চাত্যের কয়েকটি স্বায়ত্বশাসিত সমীক্ষা অনুসারে রাশিয়ায় পুতিন ৮১ শতাংশ জনগণের মনোনয়নে ক্রেমলিনের আসনে টিকে আছেন। যেখানে তার সমমানের বিরোধীদলীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ০.৭% জনগণের মধ্যে। পুতিনের জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে এক বিকৃত রাষ্ট্রীয় চিন্তাধারা যার নাম পুতিনইজম। পুতিনইজমের অবকাঠামো টিকে আছে সামাজিক রক্ষণশীলতা, পাশ্চাত্য বিদ্বেষ আর স্বজাতিক আধিপত্যের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণের উপর।

পুতিনের জনপ্রিয়তার সূচনা হয় তার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্সির শুরুতেই। চেচনিয়ায় যুদ্ধরত সৈনিকদের প্রতি ব্যক্তিগত সহমর্মীতা জানানো পুতিনের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পরিগণিত হয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে রাশিয়ানদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। কনজিউমারিজমের বিপরীতে বুদ্ধিদীপ্ত কার্যকলাপে বৈচিত্র খোঁজার তাগিদ পুতিন সরসারি ব্যক্ত করেন। রাশিয়ার মূমুর্ষ রচনা সংষ্কৃতি পূনঃরজ্জীবিত করার জন্য ক্রেমলিনে বিশেষ বিল পাশ হয়।

পুতিনের সোভিয়েত রাশিয়ার অতীতের প্রতি মনোভাব ৬৫% রাশিয়ানের মতামত প্রতিফলন করে। পুতিন রাশিয়ান রুবেলের দাম হ্রাস হতে দিলেও স্বল্প ট্যাক্স, নিয়ন্ত্রিত ঋণ আর কঠোর নিয়মে রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচের মাধমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রন করেন। এক দশকের মত সময় রাশিয়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি হারে উন্নত হতে থাকে। রাশিয়ানদের পৃথিবীর ক্ষমতার মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ার শোধ হিসেবে পুতিন ইউক্রেনের একটি প্রদেশ দখল করেন। জাতিসংঘের শতাধিক নিয়ম অবমাননা স্বত্বেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুনরোদ্ধারের সুবাদে রাশিয়ানদের সুপারস্টারে পরিণত হন পুতিন। রাশিয়ার মিডিয়াও পুতিনের এই জনপ্রিয়তা বহাল রাখার জন্য প্রতি নিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। রাশিয়ান বেতার বা টিভি চ্যানেলের কোথাও শাসক বিরোধী বা বিদ্রোহী মনভাব প্রকাশে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আছে।

ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ন আলোয় neonaloy

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর রাশিয়ায় কিছু “নিয়ম” আছে। টিভি চ্যানেলগুলোর প্রত্যেকটির দৈনিক প্রদর্শিত অনুষ্ঠান ক্রেমলিনের তত্বাবধানে পরিমার্জিত করা হয়। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর যে কোন বিষয়ে অংশগ্রহন বিশেষ ভাবে দেখানো সকল টিভি চ্যানেলের জন্য বাধ্যতামূলক। ইউক্রেন দখলের পর থেকে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে পুতিনইজমের। আন্তর্জাতিক সংবাদও ক্রেমলিনের বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা সম্ভব না রাশিয়ায়। টেলিভিশনের উপর কড়া নজরদারী রেখে পুতিন দেশের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা অটুট রেখেছেন। রাশিয়ার মানবাধিকার সংস্থার কমিশনারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েও পুতিনবিরোধী সাংবাদিক আর গণমাধ্যমগুলো কোন সহায়তা পায়নি। ক্রেমলিনের প্রতি আনুগত্য ছাড়া টিকে থাকার আর কোন উপায় কার্যত নেই। রাশিয়া অন্যতম একটি দেশ যেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের স্মরণে একটি দিবস রয়েছে।

শাসকবিরোধী চিন্তাধারা দমনের যথাযথ উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উঠে আসে বোরিস নেমসভের কথা। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকালীন পুতিনবিরোধী আন্দোলনের মুখপাত্র ছিলেন নেমসভ। ২০১৫ সালে ক্রেমলিনের দৃষ্টি সীমানার ভেতর খোলা সড়কে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুতিন ব্যক্তিগতভাবে এর নিন্দা জানান এবং এর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে ৫ জন স্লাভিক নাগরিককে গ্রেফতার করা হলেও শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে অনীহা দেখা গেছে আইন ব্যবস্থায়। চেচনিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে রাশিয়াবিরোধী ছবি প্রকাশের জন্য খ্যাত ফটোগ্রাফার অ্যানা পলিকভস্কায়া আর ভ্লাদিমির লিটভেংকোর সন্দেহজনক অবস্থায় মৃত্যু হয়। তৃতীয় বারের মত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার দিন মস্কোর এক রেস্তরায় পুলিশ অযাচিত হামলা করে। সেখানে মূলত ভিড় জমিয়েছিলেন বিরোধী দলের প্রতি অনুগত ব্যক্তিবর্গ। রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের আয়োজনে শামিল না হওয়ায় তাদের অপরিসীম দূর্ভোগের শিকার হতে হয়। নিপীড়ন আর দমননীতির উপর টিকে আছে বলা যায় ভ্লাদিমিরের জনপ্রিয়তা।

বরিস নেমসভ, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের মতে পুতিন-বিরোধিতার কারণেই জীবন হারাতে হয়েছিল তাকে

২০১১ সালের আন্দোলনের জন্য অনেকের ধারণা পুতিনের হিলারী ক্লিনটনের প্রতি চাপা ক্ষোভ আছে। নির্বাচনের ফলাফল সম্বন্ধে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হিলারীর অসহনশীল মন্তব্যের কারণেই আন্দোলনের জন্ম হয়েছে বলে পুতিন ঘোষণা দেন। নির্ধারিত কৌশলে তা দমন করা হয়। পুতিনের ক্ষমতা অটুট থাকে। কিছুদিনের জন্য নামমাত্র রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান ডিমিত্রি মেদভেদেভ। ২০১৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব থাকার বিষয়টিকে অনেকেই ২০১১ এর ঘটনার পরিণতি হিসেবে দেখেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তমতে রাশিয়ায় অবস্থিত কিছু ইন্টারনেট অ্যাড্রেস থেকে হিলারী ও ডেমক্র্যাটিক পার্টির উপর সাইবার হামলা চালানো হয়। পুতিন এর দায়িত্ব সরাসরি অস্বীকার করেন এবং বলেন “পৃথিবীতে যত সংখ্যক হ্যাকার আছে এরকম কোন কিছু আমার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।” মার্কিন সাংবাদিকদের অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পুতিন অস্বীকৃতি জানান। তার পরিবর্তে ডিমিত্রি পেসকভ মার্কিন সাংবাদিকদের তাচ্ছিল্য করে বলেন “আপনাদের মত ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের নির্বাচনে জটিলতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাশিয়ার আছে দাবি করে নিজেদের অপমান করা বন্ধ করুন।”

এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় রাশিয়ায় ইতিবাচকভাবে প্রচারিত হয়। ট্রাম্প সমর্থনের বিষয়টি ফলাও ভাবে দেখানোর নির্দেশ জারি হয় রাশিয়ান মিডিয়ায়। নির্বাচনের ফলাফলে ডুমায় শ্যাম্পেনের বোতল খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে মার্কিন পন্থার তীব্র সমালোচক ও প্রতিদ্বন্দী হিসেবেই পুতিন আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত। সিরিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপ, অ্যান্টি-বলিস্টিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির মত সংবেদনশীল বিষয় গুলো নিয়ে শীতলতা আছে দুই দেশের মধ্যে। রাশিয়ান জনগণের চিকিৎসা আর শিক্ষাখাতের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে মার্কিন প্রযুক্তি টেক্কা দেওয়ার আধুনিকতর প্রচেষ্টা।

রাশিয়ায় ব্যবসা করার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো মার্কিন বিনিয়োগকারী এবং অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ বিল ব্রাউডারের মতে পুতিন ফোর্বসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটসের থেকেও আড়াই গুণ বেশি সম্পদের মালিক। একচ্ছত্র ক্লেপ্টক্র্যাটিক শাসন ব্যবস্থার সুবাদে তার ৫টি ইয়ট, ৪৩টি বিমান এবং ২০টি রাষ্ট্রীয় প্রাসাদ আছে বলে জানা গেছে। ডিমিত্রি পেসকভ তথ্যকে পাশ্চাত্যের প্রোপাগান্ডা আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সম্পত্তিগুলো পুতিনের নয়। রাশিয়ান রাষ্ট্রপতি হওয়ামাত্র এই সম্পত্তি যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে। কিছু তথ্যসূত্র মতে পুতিনের প্রাসাদ নামে খ্যাত বাসভবনটির মূল্য ধারণা করা হয় ১ বিলিয়ন ডলার। ২০০ বিলিয়ন ডলার আনুমানিক সম্পদের কেন্দ্রে রয়েছেন রাশিয়ান একনায়ক। তবে তার বার্ষিক উপার্জন রিপোর্টে তিনি নিজের বেতন লিখেছেন ১,১০,০০ ডলার।

নিয়মতান্ত্রিক স্বৈরাচারের চূড়ায় অবস্থানরত পুতিন মতান্তরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীল ব্যক্তি। পুতিনের ক্ষমতার দৌরাত্ম্য বোঝার জন্য আগে ক্ষমতার মাপকাঠি বোঝা জরুরী। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্ভর করে মূলত তার সামরিক ও অর্থনৈতিক দৃঢ়তার উপর। তবে এই খাতগুলোর উপর যদি কোন ব্যক্তি বা গোত্রের অযাচিত ক্ষমতা থাকে তবে উক্ত জনগোষ্ঠী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পরাশক্তিতে পরিণত হয় যার কার্যত কোন জবাদিহিতা থাকে না। এই সার্বজনীন নিয়ন্ত্রণ আর ক্ষমতার নির্বিবাদ চর্চায় পুতিন মতান্তরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাশীল ব্যক্তি।

পুতিনের উত্তরসূরী কিভাবে নির্ধারণ করা হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে। রাশিয়ায় দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি পুতিনের মত ক্ষিপ্রতা আর নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতার চর্চা করতে পারবে না বলে অনেকের ধারণা। তবে পুতিন সিএনএন-এর সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেন “আমি আশাবাদী, পশ্চিমের কামনা অনুসারে আমার ভয়াবহ কোন পরিণতি হবে না বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমার উত্তরসূরী এমন কেউ হবে না যে আমার তৈরি করা রাশিয়াকে ধংসের চেষ্টা করতে পারে।”

এতক্ষণ ধরে পুতিনের শাসনের এমন তীব্র পশ্চিম ঘেঁষা সমালোচনার পর পাঠকদের কাছে স্বীকারোক্তি দেওয়া জরুরী। উপরের সকল তথ্যের উৎস কোন না কোন পশ্চিমা মিডিয়া আউলেট বা পলাতক রাশিয়ানদের জবানবন্দী। এখানে যথেষ্ট পরিমাণ রাশিয়া আর পুতিন বিরোধী মতামত থাকাটাই স্বাভাবিক। তথ্যগুলো প্রোপাগান্ডা থেকে আলাদা করার জন্য একাধিক উৎস নিশ্চিত করে প্রকাশিত হচ্ছে। এখানে বেশ কিছু বিষয় পুঁজিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়ার সমালোচনা- তা স্পষ্ট। সত্যিকার রাশিয়ানদের মতামত ইন্টারনেটে যথেষ্ট ফলাওভাবে প্রকাশিত হয় না বিধায় দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ কম। তবে তথ্যের সত্যতার প্রমান হিসেবে কিছু রেফারেন্স দেওয়া আছে। প্রোপাগান্ডা আর ফ্যাক্ট আলাদা করে নেওয়ার জন্য সেগুলোর সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ থাকবে।

1) “Mapping Russian Media Network: Media’s Role in Russian Foreign Policy and Decision-making.” Report by Vera Zakem, Paul Saunders, Umida Hashimova, and P. Kathleen Hammerberg.
2) “The Propaganda Tools Used by Russians to Influence the 2016 Election.” The New York Times.
3) “Putins Kleptrocacy: Who Owns Russia?” Book by Karen Dawisha.
4) “Power of Putin.” Motion Documentary produced by CNN and broadcasted by the British Broadcasting Corp.
5) “Dictating the Narrative: State-Controlled Media in Russia.” By Anna Semler for The American Security Project.

আরো পড়ুন

মুখ থুবড়ে পড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের যত উদ্যোগ…

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top