বিশেষ

আজম খান- আমাদের শিল্পী, আমাদের পপসম্রাট, আমাদের যোদ্ধা!

আজম খান নিয়ন আলোয়_Neon Aloy

বাংলাদেশের “পপ সম্রাট” উপাধি একজনেরই আছে, তিনি হচ্ছেন আজম খান। পুরো নাম “মাহবুবুল হক খান”। একজন সাধারণ বাঙ্গালীর চেয়ে একটু লম্বা, হ্যাংলা পাতলা সাধাসিধে জামাকাপড় পরিহিত একজন মানুষ ছিলো এই পপ সম্রাট আজম খান। “গুরু”,  “রকসম্রাট”, “পপসম্রাট” সহ আরো অনেক উপাধি থাকলেও সবাই তাঁকে “আজম খান” নামেই বেশি চিনে।

আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার আজিমপুর কলোনির ১০নং সরকারি কোয়ার্টারে। তাঁর পিতা আফতাবউদ্দিন খান কলকাতার “ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি” এর বাংলায় স্বর্ণ পদক জয়ী ও একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর মাতা জোবেদা খাতুন ছিলেন একজন গায়িকা । তাঁর জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর কাটে আজিমপুরের সেই কলোনিতে। ৪ ভাই ও এক বোন মিলে ছিল তাঁদের বেড়ে ওঠা। ১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। তারপর ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানালে সেখানে চলে যান সপরিবারে এবং তিনি সেখানের কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে এসে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে তিনি সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলের বানিজ্য শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হন এখন ১৯৬৮ সালে সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন এবং তারপর তিনি ১৯৭০ সালে টিএন্ডটি কলেজ থেকে কমার্স বা বানিজ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

আজম খান নিয়ন আলোয়_Neon Aloy

আজম খান ছোটবেলার থেকেই একজন সঙ্গীতপ্রেমী ছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই দেশী-বিদেশী আর্টিস্টদের গান শুনতেন। নিজের আত্মবিশ্বাস এবং মায়ের গান গাওয়া দেখে এক সংমিশ্রিত অনুপ্রেরণা পান সঙ্গীতচর্চার জন্য। একটু বড় হবার পর থেকে “রোলিং স্টোন”, “স্যাডোস” “দ্যা বিটলস” সহ সেই সময়ের অনেক বিদেশী নামীদামী ব্যান্ডের গান শুনে গাইতে চেষ্টা করতেন। স্টাইল করে দিনে তিন-চারবার জামা-কাপড় বদলাতেন, সানগ্লাস পরতেন, লম্বা চুল রাখতেন। সদস্য ছিলেন “ক্রান্তি গ্রুপ অফ সিংগারস” এর। মতিঝিল কলোনী এলাকায় বন্ধুবান্ধব মিলে মজার মজার গান করতেন।

আজম খানের ভাষ্যমতে,

“ফকিরা গলায় গান করে পাবলিক চ্যাতাইতাম”

আজম খান ছোটবেলার থেকেই একটু বিপ্লবী মনোভাবের ছিলেন। অন্যায় মেনে নিতে পারতেন না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই তখন দেশে একটা আন্দোলনের ভাব বজায় ছিলো কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী তখন আঁচ করতে পারছিলো পশ্চিম পাকিস্তান অন্যায়ভাবে শাসনের নামে শোষন করে যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় দানা বাঁধছিল বিভিন্ন আন্দোলন ।

আজম খান তৎকালীন সময়ে জোরালো আন্দোলনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন, কিভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানে শোষণ করতো সে বিষয়ে জনসাধারণকে অবগত করার জন্য। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি তখন ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন।

তারপরের বছরেই ১৯৭১ সালের দেশে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। দেশের এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা টহল এর জন্য যাওয়া শুরু করে।

আজম খানরা তখন কমলাপুর এলাকাতেই থাকতেন। যেহেতু যুবকদের দেখলেই আর্মিরা জীপে তুলে নিয়ে যেতেন তাই তখনকার যুবকরা একটু লুকিয়ে লুকিয়েই থাকতো আর পারতপক্ষে ঘর বের হতেন না।

সেই সময়েও গুরু আজম খান তার বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে এলাকার রাস্তায় ব্যারিকেড দিতেন। আর্মি আসলে দেয়াল টপকিয়ে কমলাপুর কলোনিতে চলে যেতেন আবার কলোনিতে আর্মি আসলে দেয়াল টপকিয়ে এপাশে চলে আসতেন। এভাবে করতে করতেই বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে এভাবে গুটিয়ে-লুকিয়ে বাঁচা আর নয়, মৃত্যু যখন হবেই, যুদ্ধে গিয়েই তা মাথা পেতে বরণ করে নিবেন।

যুদ্ধে যাবার আগে আজম খান উনার মা জোবেদা খাতুনকে বলেন,

“আম্মা, এখানে তো আর থাকা যায় না। তো, যুদ্ধে করতে যাইতেসি।”

উনার মা একদম নির্ভয়ে উত্তর দিলেন, “যুদ্ধ করতে যাচ্ছিস ভালো কথা। তোর আব্বাকে বলে যা।”

আজম খানের পিতা আফতাবউদ্দিন খান অনেক গম্ভীর মানুষ ছিলেন। যুবক আজম খান বাবার সামনে মাথা কাচুমাচু করে বললেন, “আব্বা, যুদ্ধে যাচ্ছি।”

আজম খান ধরেই বসেছিলেন তার বাবা এতে রেগে গিয়ে উনাকে চড় মেরে বসবেন। কিন্তু, তা না করে পিতা তাঁকে অবাক করে দিয়ে বললেন,

“যুদ্ধে যাবি যা। কিন্তু, স্বাধীন না করে ঘরে ফিরবি না।”

পিতার অনুমতি পেয়ে পিতাকে মাথা নিচু করে সালাম করে চলে গেলেন যুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের জন্য মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য আজম খান তাঁর দুই বন্ধু শফি আর কচিকে নিয়ে একদিন সকালে ১০.৩০টায়  উনাদের কমলাপুর এলাকা থেকে মানুষজনকে রাস্তা জিজ্ঞেস করতে করতে প্রথমে নরসিংদী, তারপর নবীনগর হয়ে ভারতের ত্রিপুরার বর্ডার দিয়ে ঢুকে আগরতলা ট্রেনিং ক্যাম্পে চলে যান এবং ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন।

যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেবার কোন একসময় তাঁর সাথে দেখা হয় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বড় ছেলে রুমীর৷ রুমী স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন৷ তবে যুদ্ধকালীন সময়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আজম খানের কথা বলেছিলেন তিনি৷

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বই “একাত্তরের দিনগুলি” থেকে নেয়া নিচের অংশটুকু,

“সে রাতে টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কি, একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ……’

বুঝলাম আজম খান গাইছে৷ আজম খানের সুন্দর গানের গলা৷ আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা৷ সেদিন সেই রাতে চারদিক ভীষণ অন্ধকার, অন্যসব ব্যারাক আর তাঁবুর সবাই বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে গেছে৷ ন’টা-দশটাতেই মনে হচ্ছে নিশুতি রাত৷ ঐ একটা তাঁবুর ভেতর হারিকেনের আলো ছড়িয়ে সাদা রঙের পুরো তাঁবুটা যেন ফসফরাসের মতো জ্বলছে৷”

আজম খান কর্নেল খালেদ মোশাররফ এর অধীনে ২ নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ঢাকা এবং তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে। কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন। সেখানে সালদার যুদ্ধে জয়ী হবার পর আজম খানকে দুই নম্বর সেক্টরের একটি গেরিলা গ্রুপের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তাদের ঢাকায় পাঠানো হয় যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, সায়েদাবাদ সহ কিছু এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে। গেরিলা অপারেশন ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ এর অন্যতম একজন সদস্য হচ্ছেন আজম খান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের বিখ্যাত অপারেশন “অপারেশন তিতাস” এও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত যে, মুক্তিযুদ্ধে আজম খানের ছোট ভাই খোকাও অংশগ্রহন করেছিলেন এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোন একসময় খোকাকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করলে আজম খান কৌশলে নিজের ভাইকে পাক বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করে ফেরত নিয়ে এসেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, তরুণ সমাজের হতাশা এবং তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ব্যাক্তিগত আক্ষেপ, ক্ষোভ এবং আরো নানান ভাবনা তাঁর বিভিন্ন গানে প্রকাশ পেয়েছিলো।

আজম খান নিয়ন আলোয়_Neon Aloy

তাঁর গানের গলা ছিলো শক্তিশালী এবং অস্ফুট। তাঁর গাইবার ধরন এমন ছিলো যে সে যেকোন ধরনের লিরিক্সের ভাব বদলে দিতে পারতো তাঁর কণ্ঠের যাদু। একটি সাধারণ গান “জ্বালা জ্বালা” কে একটা প্রশংসাগীতিতে রূপ দিয়েছিলো। একটা প্রজন্মের নয়, পুরো একটা সময়ের প্রশংসাগিতী হয়ে গিয়েছিলো তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানটি ।

অথচ সেই সময়ের সাংস্কৃতিক মহল তাঁর গানকে “অপসংস্কৃতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলো।

যুদ্ধ শেষ হবার পরে নাসির আহমেদ, হ্যাপি আখন্দ, জর্জিনা হক, ফিরোজ সাই, ফেরদৌস ওয়াহিদ, হাবলুকে নিয়ে প্রথম ব্যান্ড “স্পন্দন” এর যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে তিনি ব্যান্ড “উচ্চারণ” গড়ে তোলেন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে। লাইন-আপে ছিলো তিনি নিজে ভোকালিস্ট, গিটারে ছিলো মনসুর আর নিলু আর ড্রামসে সাদেক। ১৯৭২ সালে নটরডেম কলেজের প্রাঙ্গণে নিজস্ব আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো দর্শকের সামনে গান করেন তিনি। তাঁদের গানে একটা পশ্চিমাবিশ্বের পপ সঙ্গীতের একটা সুরেলা মিশ্রণ ছিলো কিন্তু গানগুলো ছিলো দেশি থীমের উপর সব বানানো।

সেই বছরেই তাঁর গান ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ আর ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি বিটিভিতে প্রচার হয়ে ব্যাপক সাড়া পায় শ্রোতা সমাজে। পরবর্তীতে বিটিভিতে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ গান গেয়ে হইচই ফেলে দেন তিনি।

১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল এদেশে প্রথম কনসার্ট হয় ওয়াপদা মিলনায়তনে উচ্চারণ-এর অংশগ্রহণে। তারপর ইন্দিরা রোডের ঢাকা রেকর্ড থেকে ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের করেন আজম খান।

এভাবেই এই ব্যান্ডটি জন্ম দেয় “বাংলা পপ” এর। তাঁর গানগুলোতে আরো প্রকাশ পেতো এই দেশের যুবকদের চিন্তাভাবনা, সে রাগের এবং হতাশার গান গাইতেন যেটা যুবকরা তরুন অবস্থায় অনেক বেশী অনুভব করে এবং এই জন্যই তখনকার যুবকদের মন খুব তাড়াতাড়ি জয় করে ফেলতে পেরেছিলেন তিনি আর তাঁর ব্যান্ড। তিনি এই গানগুলোর লিরিক্সগুলোতে নিজের জীবনের বিভিন্ন সময়ে নিজের জীবনের বিভিন্ন কষ্ট এবং ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিফলন দেখিয়েছেন। যুদ্ধের পরের অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো তাঁকে ভীষণ বাজেভাবে নাড়া দেয় । যেমন, দেশ যুদ্ধের পরে তখনকার সময়ে অনেক মিথ্যা বা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দেখা দেয় এবং সে নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সেটা সহ্য করতে না পেরে একটি গান লিখেন “পাওয়া যায় নি” নামে। সেখানে একটা লাইন ছিলো-

“হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘোরে, কয়জনা আসল ফকির?”

গানটির পিছনে ঘটনাটি ছিলো এমন যে স্বাধীনতার পর থেকে সেখানে আস্তানা গেড়েছিলেন “নূরা পাগলা” নামের এক সাধু। সেখানে সেই সাধু দিন-রাত বিভিন্ন নেশায় মগ্ন থাকতো কিন্তু ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে মাজারের সুখ্যাতি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়লে এই জন্য যে সেখানে নূরা পাগলা নামক সেই ফকিরের বসার আসনটি অর্থাৎ পাটের তৈরী পুরাতন একটি ছালা, ভক্তদের মাঝে বিক্রি হয় সে সময়ে ১০০ টাকা মূল্যে যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা জিনিস।

পপ সম্রাট শিল্পী আজম খানের চোখে সেটা পড়ায় তিনি তাঁর গানে সেই ঘটনা থেকে নেয়া এই লাইনটুকু যোগ করে দিলেন। তিনি এখানে এই গানের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে অবগত করতে চাইলেন যে

“সব নায়কই নায়ক নয়, নায়কের ক্ষেত্রেও আসল এবং ভন্ড নায়ক আছে।”

তাঁর গানগুলো তার আশেপাশে বিভিন্ন ঘটে যাওয়া ঘটানার থেকেই আসতো। যেমন তাঁর খুবই জনপ্রিয় একটা গান “আলাল ও দুলাল”। গানটির লিরিক্স এমন ছিলো যে,

“আলাল ও দুলাল, আলাল ও দুলাল
তাদের বাবা হাজি চান চানখার পুলে প্যাডেল মেরে পৌছে বাড়ী।
আলাল ও দুলাল,

আলাল যদি ডাইনে যায়, দুলাল যায় বায়ে,
তাদের বাবা সারাদিন খুঁজে খুঁজে মরে।”

মজার ব্যাপার হচ্ছে ঢাকার চাংখারপুলে আসলেও একজন ছিলো হাজী চান্দ নামক যার কিনা এই “আলাল” ও “দুলাল” নামক দুজন উচ্ছৃঙ্খল ছেলে ছিলো!

এভাবেই তাঁর গানগুলো সব এই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার সাধারণ কিছু ঘটনার উপর ভিত্তি করে হতো। একই সাথে তাঁর বিভিন্ন গানে বিভিন্ন সময়ে নিজস্ব বিভিন্ন দর্শন, প্রতিবাদের কণ্ঠ বেজে উঠেছে।

আজম খান নিয়ন আলোয়_Neon Aloy

আজম খান এবং তাঁর ব্যান্ড “উচ্চারণ”

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে হাজার হাজার যুবকের সামনে যেকোন সময় দাঁড়িয়ে গান গাওয়া শুরু করতে পারতেন যেন সে সেসব যুবকের সামনে ব্যাক্তিগত কোন কথোপকথন করছেন তাদের প্রত্যকের সাথে। তখনও বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেল আসেনি তাই তিনি তার ব্যান্ড নিয়ে বিভিন্ন খোলা ময়দানে বা অডিটোরিয়ামে পারফর্ম করতেন। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি প্রায় যেকোন মানুষের মন জয় করে নিতে পারতেন তাঁর গানের মাধ্যমে। তারপর বাংলাদেশে টেলিভিশন এবং সর্বপ্রথম টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভি বিস্তৃতি লাভ করার পর তিনি এবং তাঁর ব্যান্ড “উচ্চারণ” এর প্রথম শো বিটিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছিলো। সেই এক সম্প্রচার দিয়েই তাঁর ব্যান্ড খ্যাতি অর্জন করে ফেলে এবং সে “পপসম্রাট” উপাধি অর্জন করে নেয়।

১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি সাহেদা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় আজম খানের। সহধর্মিণী মারা যাওয়ার পর থেকে একাকী জীবন কাটান এ কিংবদন্তী। ১৯৮২ সালে ‌‘এক যুগ’ নামে বাজারে তার প্রথম ক্যাসেট বের হয়। এরপর তার আরো অনেক গান ক্যাসেট ও সিডি আকারে বাজারে বের হয়। তার প্রথম সিডি বের হয় ১৯৯৯ সালের ৩ মে ডিস্কো রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে। তাঁর ব্যান্ডের জীবদ্দশায় তাঁরা শ্রোতাসমাজকে “ওরে সালেকা, ওরে মালেকা”, “আমি যারে চাইরে”, “আসি আসি বলে তুমি”, “অভিমানী”, “রেললাইনের বস্তিতে”, “আলাল ও দুলাল” সহ অসাধারণ বেশ কিছু গান উপহার দেন।

ব্যান্ড আর গানের বাইরেও মিডিয়ার সাথে তার আরো বেশ কিছু কাজ আছে। সে অনেক বাংলা চলচিত্রেও অভিনয় করেছেন। যেমন হীরামন (১৯৮৬) এবং গডফাদার (২০০৩)।

এছাড়াও তিনি অনেক বিজ্ঞাপন ও মডেলিং ও করেছেন। ২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম মডেল হন। পরবর্তীতে বেশ কিছু বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তাকে। সর্বশেষ ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনেও মডেল হন।

আজম খান খেলারধুলার প্রতি অনেক আগ্রহ দেখাতেন সবসময়। তিনি একজন সাঁতার শিক্ষক, একজন শারীরিক শিক্ষা নির্দেশক ছিলেন। ক্রিকেট খেলার প্রতিও তাঁর মারাত্মক আগ্রহ ছিলো। তিনি একটু দেরীতে ঢাকা সেকেন্ড ডিভিশনে খেলেছিলেন ১৯৯৮ সালে যখন তার বয়স ৪৮ ছিলো। খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন ক্রিকেট কোচও ছিলেন আজম খান। একজন তারকা হবার পরও তাকে একদম সাধাসিধে ভাবে তার এলাকা মতিঝিল বা আরামবাগের আশেপাশে যুবকদের সাথে ক্রিকেট খেলতে দেখা যেতো।

তিনি ২০১০ সালে “ওরাল ক্যান্সার” এ আক্রান্ত হন। তিনি এর জন্য সিঙ্গাপুরে “মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল” এ চিকিৎসা করালেও এই ক্যান্সার এতোই মহামারী আকারে তার দেশে বাসা বেঁধেছিলো যে তার ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিলো এই ক্যান্সার। ২০১১ সালের মে এর ২২ তারিখে ঢাকার “স্কয়ার হসপিটাল” এ তাঁকে ভর্তি করানো হয় হাতে এবং কাঁধে ভীষণ ব্যাথা দেখা দিলে। তার অবস্থা খারাপ হতে থাকলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় এবুং জুনের ১ তারিখে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে নেয়া হয় যেখানে তিনি জুনের ৫ তারিখ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিলো ৬১ বছর। আজম খানকে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। বড় মেয়ে ইমা খান, মেজো ছেলে হৃদয় খান ও ছোট মেয়ে অরণী খান। ২০১৩ সালে তার পরিবার তার গানের প্রসারে কাজ শুরুর জন্য এবং নিঃস্ব সব শিল্পীদের সাহায্য করার জন্য “শিল্পী আজম খান ফাউন্ডেশন” গড়ে তোলেন কিন্তু ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যপদ নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়ায় এবং আর্থিক সংকটের কারণে এর সব কার্যক্রম ২০১৭ তে বন্ধ করে দেয়া হয়। আজম খানের বড় মেয়ে ইমা খান ছিলেন সেই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান।

আজম খানের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে প্রায় আট বছর পর উনাকে একুশে পদক পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়।

বাংলাদেশের পপ মিউজিকের প্রতিষ্ঠা করার পিছনে ফকির আলমগির, ফেরদৌস ওয়াহীদ, ফিরোজ সাই, নাজমা জামান এবং পিলু মমতাজের যতোটা হাত আছে, ততোটাই আজম খানেরও আছে। খুব কম শিল্পীই পেরেছেন তাদের কাজের মাধ্যমে একটা প্রজন্ম নয়, একটা পুরো সময়ের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে এবং আজম খান সেসব শিল্পীদের অন্যতম এবং উল্লেখযোগ্য একজন।

আজম খানের ডিস্কোগ্রাফিঃ

এ পর্যন্ত তার ১৭টি গানের অ্যালবামসহ বেশ কিছু মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশ হয়।

  • অভিমানী
  • আলাল ও দুলাল
  • দিদি মা
  • বাংলাদেশ ১
  • বাংলাদেশ ২
  • কেউ নেই আমার
  • আর দেখা হবে না
  • ব্যস্ত ভবঘুরে
  • আর গাইবো না গান
  • থাকবো না যেদিন
  • রকস্টার
  • বর্ষাকাল
  • মাটির পৃথিবীতে
  • নতুন পুরাণ
  • নীল নয়নে
  • কিছু চাওয়া
  • অনামিকা
  • পুড়ে যাচ্ছে
  • দায়রা জজ
  • গুরু তোমায় সালাম (ফিচারিং মনি জামান)
  • সালেকা মালেকা

আজম খান নিয়ন আলোয়_Neon Aloy

পুরষ্কারঃ

  • সেরা পপ গায়ক পুরস্কার (১৯৯৩)
  • টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার (২০০২)
  • লাইফ টাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড ~ কোকা কোলা গোল্ড
  • ঢাকা ৭১ ~ গেরিলা কাউন্সিল
  • মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার ~ রেডিও টুডে
  • একুশে পদক

তিনি তাঁর জীবনে অনেক যুদ্ধ করে গিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন সমস্যার বিরুদ্ধে যেমনটা তিনি দেশের জন্য, দেশ স্বাধীনের জন্য ১৯৭১ সালে করেছিলেন কিন্তু সবকিছুরই ইতি আছে, জীবন প্রদীপেরও তাই। কিন্তু এই সম্রাটের জীবন প্রদীপ নেভার পর থেকে আজ পযন্ত তিনি ভক্তদের মাঝে ভক্তদের হৃদয়ে বেচে আছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে এবং তাঁর কাজ যতোদিন আছেন, তিনিও বেচে থাকবেন ভক্তদের হৃদয়ে।

তথ্যসূত্রঃ

১। আর-মিউজিক (আরটিভি)

২। বিডিনিউজ২৪

৩। “রক যাত্রা” (বই) ~ “মিলু আমান”

৪। এই আর্টিকেলের কভার ফটোতে ব্যবহৃত ছবিটি ফটোগ্রাফার ইমতিয়াজ আলম বেগ-এর তোলা

আরো পড়ুন

একজন সঙ্গীত জাদুকর লাকী আখান্দ

লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top