ফ্লাডলাইট

হতদরিদ্র এক রমেলু লুকাকু’র রূপকথা…

রমেলু লুকাকু নিয়ন আলোয় neonaloy

আমার ঠিক ঐ মুহূর্তের কথা মনে পড়ে যখন আমরা সমস্যা জর্জরিত ছিলাম। আমার এখনও মনে পড়ে আমার মা, আমাদের ফ্রিজটা এবং তার সেই চেহারাটি।

আমার বয়স তখন ছয় এবং স্কুলের প্রত্যেক দুপুরের  বিরতির সময় আমি বাসায় আসতাম। মায়ের প্রতিদিনেরই খাবারের মেন্যু ছিল এক। রুটি আর দুধ। যখন আপনি শিশু, তখন আপনার এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবার কথা নয়। কিন্তু আমাদের সামর্থ ছিল অতটুকুই।

এ রকমই এক দিন আমি বাসায় এসেছিলাম, রান্নাঘরে গেলাম। প্রত্যেক দিনের মতই আমি দেখলাম আমার মা একটি দুধের বক্স নিয়ে ফ্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু সেই সময় আমার মা সেই দুধের সাথে কিছু একটা মেশাচ্ছিলেন। মেশানোর পর তিনি এটা ঝাঁকাচ্ছিলেন। আমি বুঝতে পারিনি সেখানে কি হচ্ছে। তারপর তিনি আমার খাবারটা আমাকে দিলেন এবং তিনি এমন ভাবে হাসছিলেন যেন সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। কিন্তু আমি এরপরই বুঝতে পারলাম আসলে তখন তিনি কি করছিলেন।

তিনি দুধের সাথে তখন পানি মেশাচ্ছিলেন। তখন আমাদের সপ্তাহ জুড়ে খাওয়ার মত যথেষ্ট টাকা ছিলো না। আমরা শুধু গরীবই ছিলাম না, সেই সাথে আমরা ছিলাম ভঙ্গুর এক পরিবার।

আমার বাবা একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন কিন্তু সে সময় তার ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ছিলেন তিনি। বুঝতেই পারছেন, আমাদের হাতে কোন টাকাই ছিলো না। তখন আমি প্রথম যেটা করতাম সেটা হচ্ছে নষ্ট হয়ে যাওয়া টিভির সামনে বসে থাকতাম; যেখানে কোন ফুটবল ম্যাচ নেই, কোন সিগনাল নেই।

তারপর আমি রাতে বাসায় ফিরে দেখতাম লাইট বন্ধ। কখনো কখনো দুই তিন সপ্তাহের জন্যও বিদ্যুৎ থাকতো না। তারপর আমি গোসল করতে যেতাম কিন্তু সেখানে কোন গরম পানি থাকতো না। আমার মা একটি কেটলি নিয়ে পানি গরম করে দিত এবং আমি সেখান পানি নিয়ে আমি মাথায় ঢালতাম। এমনকি এমনও সময় গিয়েছে যখন আমার মাকে বাসার পাশের বেকারি থেকে রুটি বাকিতে নিয়ে আসতে হয়েছে। বেকাররা আমাকে এবং আমার ছোট ভাইকে চিনতো তাই তারা আমার মাকে সোমবারে রুটি নিয়ে শুক্রবারে টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতো।

আমি জানতাম আমরা কষ্টে বেঁচে আছি কিন্তু যখন আমি আমার দেখেছিলাম মাকে দুধের সাথে পানি মেশাতে তখন আমি বুঝেছিলাম আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আপনি কি বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছি? এটাই ছিলো আমাদের জীবন।

আমি একটি কথাও বলিনি। আমি চাইনি আমার মা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তায় থাকুক। আমি শুধু আমার খাবারটা খেয়ে নিতাম। কিন্তু সেদিন আমি খোদার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। যেন কেউ আঙ্গুলের তুড়ি বাজিয়ে আমাকে জাগিয়ে তুলেছে। আমি জানতাম আমার ঠিক কি করতে হবে। আমি জানতাম আমি কি করতে যাচ্ছি। আমি আর আমার মাকে এভাবে বেঁচে থাকতে দেখতে পারব না না। না, না, না, আমি কোনভাবেই পারব না।

ফুটবলের মানুষরা মানসিক শক্তি নিয়ে কথা বলে। ভালো কথা, তাহলে আমিই সবচেয়ে শক্তিশালী মানসিকতার অধিকারী। কারণ আমার মনে পড়ে আমি অন্ধকারে আমার ভাই এবং আমার মায়ের সাথে বসে থাকতাম এবং খোদার কাছে প্রার্থনা করতাম। আর চিন্তা করতাম এবং বিশ্বাস করতাম। কিছু একটা হতে যাচ্ছে।

আমি আমার প্রতিজ্ঞা আমার কাছেই লুকিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু একদিন আমি স্কুল থেকে বাসায় এসে দেখলাম আমার মা কাঁদছেন। তাই শেষ পর্যন্ত আমি তাঁকে একদিন বললাম, ‘মা, সবকিছু একদিন বদলাবে। তুমি দেখো। আমি আন্ডারলেখটের হয়ে ফুটবল খেলবো এবং এটা তাড়াতাড়িই হতে যাচ্ছে। আমরা ভালো থাকবো মা। তোমাকে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না।‘

তখন আমার বয়স ছয় বছর। আমি একদিন আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কখন ফুটবল খেলা শুরু করেছিলে?‘
তিনি বলছিলেন, ‘ষোল বছর।‘
আমি বললাম, ‘আচ্ছা ষোলতেই তাহলে।‘

এখন আমাকে বলতে দিন। আমি আমার জীবনে যতোগুলো ম্যাচ খেলেছি সবগুলোই ছিলো এক একটি ফাইনাল। যখন আমি স্কুলের বিরতিতে বাগানে খেলতাম সেটি ছিলো একটি ফাইনাল। আমি চরম সিরিয়াস ছিলাম। যখনই আমি বলে শট করতাম তখনই আমি এর কাভার ছিঁড়ে ফেলতে চাইতাম। আমি কনসোল গেমের ফুটবলে কোন আর-ওয়ান শুট করছিলাম না যে আমি আস্তে মারবো। আমার ফিফা গেম ছিলো না। আমার কোন প্লেস্টেশন ছিলো না। আমি খেলতে পারতাম না। আমি শুধু মাঠে সবাইকে মেরে ফেলতে চাইতাম।

যখন আমি তাড়াতাড়ি বাড়তে শুরু করলাম তখন কিছু শিক্ষক এবং অভিভাবক আমাকে সন্দেহ করতো। আমি কখনোই এটি ভুলবো না যখন একজন বয়স্ক আমাকে প্রথমবারের মত জিজ্ঞেস করতেন, ‘এই তোমার বয়স কত? কত সালে তুমি জন্মেছিলে?‘

আমি বলতাম, ‘কি? আপনি সিরিয়াস?’

যখন আমার বয়স ১১ বছর আমি তখন লিয়ের্সের যুবদলে খেলতাম। একদিন আমার বিপক্ষ দলের একজন অভিভাবক এসে আমাকে মাঠে যাওয়া থেকে থামিয়ে দিয়য়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘এই ছেলের বয়স কত? তোমার আইডি কোথায়? সে কোথা থেকে এসেছে?‘

আমার বাবা সেখানে ছিলেন না কারণ আমার অ্যাওয়ে ম্যাচগুলোতে থাকার জন্য তার কোন গাড়ি ছিলো না। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ একা এবং আমাকেই আমার জন্য দাঁড়াতে হতো। তাই আমি আমার আইডি নিয়ে আসলাম আমার ব্যাগ থেকে এবং সব অভিভাবককে সেটি দেখালাম। আর তারা এটি একজন থেকে আরেকজনের কাছে দিচ্ছিলো এবং তদন্ত করছিলো। আমি তখন আমার ভেতরে গরম হওয়া রক্ত অনুভব করতে পারছিলাম। আর মনে মনে বলছিলাম, ‘আমি এখন তোমার ছেলেকে মেরে ফেলবো। আমি তাকে আগেই মেরে ফেলতাম কিন্তু এখন আমি তাকে ধ্বংস করে ফেলবো। তোমার ছেলে আজকে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় যাবে।‘

রমেলু লুকাকু নিয়ন আলোয় neonaloy

সমবয়সীদের তুলনায় বেশ জলদিই বেড়ে উঠেছিলেন লুকাকু

আমি বেলজিয়ামের ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম। সেটিই ছিলো আমার একমাত্র  লক্ষ্য। ভালো না। গ্রেট না। সবার সেরা । আমি খুবই রাগের সাথে ফুটবল খেলতাম কারণ আমাদের বাসায় ইঁদুর দৌড়াতো, কারণ আমি চ্যাম্পিয়নস লিগ দেখতে পারতাম না, কারণ অভিভাবকেরা ভিন্নভাবে আমার দিকে তাকাতো। আমি একটি মিশনে ছিলাম।

যখন আমার বয়স ১২, আমি ৩৪ ম্যাচে ৭৬টি গোল করেছিলাম। আমি সবগুলো গোল করেছিলাম আমার বাবা জুতা পরে। যখনই আমার বাবা এবং আমার পায়ের সাইজ সমান হয়ে গিয়েছিল। আমরা আমাদের জিনিসপত্র ভাগ করে নিতাম।

একদিন আমি আমার নানাকে ফোন করলাম। তিনি আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন ছিলেন। তিনি জন্মেছেন কঙ্গোতে, আমার বাবা ও মায়ের জন্মও যেখানে। তো একদিন আমি তার সাথে ফোনে কথা বলছিলাম এবং আমি বলাম, ‘আমি খুবই ভালো খেলছি। আমি ৭৬ টি গোল করেছি এবং আমরা লীগটিও জিতে নিয়েছি। বড় দলগুলো আমার ওপর নজর রাখছে।‘

সাধারণত সবসময় তিনি আমার ফুটবল নিয়ে জানতে চাইতেন কিন্তু এবার তিনি একটু অদ্ভূত কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘ হ্যাঁ রম। দারুণ। কিন্তু তুমি কি আমাকে একটা সাহায্য করতে পারবে? ‘
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কি?‘
তিনি বললেন, ‘তুমি কি দয়া করে আমার মেয়েকে দেখে রাখতে পারবে?’
আমি একটু বিব্রতবোধ করলাম। নানা এগুলো কি বলছে! আমি বললাম, ‘মা? হ্যাঁ, আমরা ভালো আছি। আমরা ঠিক আছি।‘
তিনি বললেন, ‘না, আমাকে কথা দাও। তুমি আমার মেয়েকে দেখে রাখবে। শুধু দেখে রাখো তাকে। ঠিক আছে?‘
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, নানা। আমি বুঝেছি। যাও আমি কথা দিলাম।‘

তার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।  তখন আমি বুঝতে পারলাম আসলে তিনি কি বলতে চেয়েছিলেন। এর ফলে আমি খুবই ভেঙে পড়লাম কারণ আমি চাইছিলাম তিনি অন্তত আরো চার বছর বেঁচে থাকুক যেন আমাকে তিনি আন্ডারলেখটের হয়ে খেলতে দেখে যেতে পারেন। এটি দেখেই আমি আমার প্রতিজ্ঞা রেখেছিলাম। আমি আমার মাকে বললাম আমি ১৬ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলে খেলবো। আমার ১১ দিন দেরী হয়েছিল।

২৪শে মে, ২০০৯।
প্লে অফ ফাইনাল, আন্ডারলেখট বনাম স্ট্যান্ডার্ড লীগ।

সে দিনটি ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে  পাগলাটে  দিন। কিন্তু আগে আমাদের কিছুক্ষণ থামতে হবে। কারণ সিজনের শুরুতে আন্ডারলেখটের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে আমি খেলার তেমন সুযোগ পাইনি। কোচ আমাকে বেঞ্চে রাখতেন। আমি ভাবতাম, ‘আমি পেশাদার ফুটবলে ১৬ বছর বয়সে কিভাবে ঢুকবো যদি আমি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বেঞ্চেই থাকি?‘

তাই আমি আমাদের কোচের সাথে একটি বাজি লাগালাম। আমি তাকে বললাম, ‘আমি আপনাকে কিছু করার গ্যারান্টি দেবো। যদি আপনি আমাকে খেলান তাহলে আমি ডিসেম্বরের মধ্যে ২৫ গোল করবো।‘
তিনি আমার কথায় হাসলেন। আমি বললাম, ‘চলুন তাহলে একটি বাজি লাগানো হোক।‘
তিনি বলেন, ‘ ঠিক আছে। কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝে তুমি যদি ২৫ গোল না করো তাহলে আমি তোমাকে বেঞ্চে পাঠাবো।‘
আমি বলাম, ‘ভালো। তবে আমি যদি জিতি তাহলে আপনাকে আমাদের সবার মিনিভ্যান পরিষ্কার করতে হবে এবং আমাদের জন্য আপনার প্রতিদিন প্যানকেক বানাতে হবে।‘
তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।‘

এটি তার জীবনের সবচেয়ে বাজে বাজি ছিল। জিতেছিলাম আমি। ক্রিসমাসের আগে আমরা প্যানকেক খাচ্ছিলাম । এটিকে একটি শিক্ষা হিসেবে নেওয়া যাক। আপনি কখনো একজন ক্ষুধার্ত ছেলের সাথে লাগবেন না।

আমি আন্ডারলেখটের সাথে আমার পেশাদার চুক্তি করি ১৩ই মে, সেদিন আমার জন্মদিন। আর সাথে সাথেই আমি বাইরে যাই এবং নতুন ফিফা গেমটি কিনি। ইতিমধ্যেই সিজন তখন শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই আমি বাসায় মজা করছিলাম। কিন্তু সে বছর বেলজিয়ান লীগ উত্তেজনার তুঙ্গে ছিলো। কারণ আন্ডারলেখট এবং স্ট্যান্ডার্ড লীগ সমান পয়েন্ট নিয়ে লিগ শেষ করেছিলো। তাই দুই লেগের একটি প্লে অফের আয়োজন করা হয় চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের জন্য।

প্রথম লেগে আমি বাসায় ছিলাম এবং টিভিতে একজন ফ্যানের মতোই খেলাটি দেখেছিলাম। দ্বিতীয় লেগের আগের দিন আমি রিজার্ভ কোচের কাছ থেকে একটি ফোনকল পেলাম।

– হ্যালো?
– হ্যালো রম। কি করছো?
– এইতো পার্কে ফুটবল খেলার জন্য তৈরি হচ্ছি।
– না  না না না না। এখনি তোমার ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো।
– কি? আমি কি করেছি?
– কিছু না। তোমার এখনি স্টেডিয়ামে আসতে হবে। মূল দল তোমাকে চায়।
– হ্যাঁ, কি? আমি?
– হ্যাঁ, তুমি। এখনি আসতে হবে।

আমি দৌড়ে আমার বাবার রুমে গেলাম এবং চিৎকার করে বলতে লাগলাম, ‘ইয়ো। এখনি ওঠো। আমাদের যেতে হবে ম্যান!‘ সে বললো, ‘হ্যাঁ, কি? কোথায় যাবো?‘ আমি বললাম, ‘ আন্ডারলেখট। ‘

আমি কখনো ভুলবো না। আমি স্টেডিয়ামে গেলাম এবং রীতিমত দৌড়ে ড্রেসিংরুমে গেলাম। তখন কিটম্যান আমাকে বললো, ‘তুমি কোন নাম্বারটি চাও?’ আমি বললাম, ‘আমাকে ১০ নাম্বার জার্সি দিন।‘ তিনি বললেন, ‘অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের ৩০ অথবা এর ওপর জার্সি নিতে হবে।‘ আমি বলাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। তিন আর ছয় যোগ করলে  যেহেতু নয় হয়। এটা একটা দারুণ নাম্বার। তাই আমাকে ৩৬ নাম্বার দিন।‘

সেই রাতে হোটেলে সিনিয়র খেলোয়াড়েরা ডিনারের সময় আমাকে দিয়ে তাদের জন্য গান গাইয়ে নিয়েছিল। আমার মনে নেই আমি কি গান করেছিলাম। আমার মাথা ঘুরছিলো। পরদিন সকালে  আমার বন্ধু আমার বাসায় এসে আমার খোঁজ করলো আমি বাইরে খেলতে যাবো কিনা। আমার মা বলে দিলেন আমি বাইরে খেলতে চলে গিয়েছি। আমার বন্ধু বললো, ‘ও কোথায় খেলতে গিয়েছে?‘ আমার মা বললেন, ‘ ফাইনালে। ‘

আমরা বাস থেকে নেমে স্টেডিয়ামের দিকে এগুচ্ছিলাম। প্রতিটি খেলোয়াড় দারুণ একেকটি স্যুট পরে যাচ্ছিলো শুধু আমি ছাড়া। আমি ভয়াবহ এক ট্র্যাকস্যুট পরে বাস থেকে নামেছিলাম। এবং আমার মুখের সামনে ক্যামেরা ধরা ছিলো। বাস থেকে লকার রুম পর্যন্ত দূরত্ব  প্রায় ৩০০ মিটারের মতো হবে। সম্ভবত তিন মিনিটেরই পথ। যখনই আমি লকার রুমে পৌঁছালাম আমার ফোন রীতিমত বিস্ফোরিত হওয়ার জোগাড়। সবাই আমাকে টিভিতে দেখেছিল। আমি প্রায় তিন মিনিটে ২৫টি মেসেজ পেয়েছিলাম। আমার বন্ধুরা পাগল যেন হয়ে গিয়েছিলো।

‘ভাই, তুই ম্যাচে কি করছিস?’

‘রম এগুলো কি হচ্ছে? তুই টিভিতে কেন?’

একমাত্র আমি আমার বেস্টফ্রেন্ডের মেসেজের উত্তরই দিয়েছিলাম। আমি লিখেছিলাম, ‘ভাই আমি জানি না আমি আজ খেলবো কিনা। আমি জানিনা কি হতে যাচ্ছে। শুধু টিভি দেখতে থাক।‘

ম্যাচের ৬৩ মিনিটে কোচ আমাকে মাঠে নামালেন। আমি দৌঁড়ে মাঠে গেলাম আন্ডারলেখটের হয়ে খেলতে, ১৬ বছর ১১ দিন বয়সে। আমরা সেদিন ম্যাচটি হেরেছিলাম। কিন্তু ইতিমধ্যেই আমি স্বর্গে চলে গিয়েছিলাম। আমি আমার মা ও নানাকে দেয়া কথা রেখেছিলাম। সেটি ছিলো সেই মূহুর্ত যখন আমি শুধু জানতাম  আমাদের সব ঠিক হয়ে যাবে।

পরের সিজনে আমি তখনো আমার হাইস্কুলের শেষ বছরে ছিলাম এবং একই সাথে ইউরোপা লিগও খেলছিলাম। আমাকে স্কুলে একটি বড় ব্যাগ নিয়ে যেতে হতো যেন বিকেলেই আমি আবার ফ্লাইট ধরতে পারি। সে বছর আমরা লিগ জিতলাম বিশাল ব্যাবধানে এবং আফ্রিকান সেরা প্লেয়ারের তালিকায় দ্বিতীয়তে ছিলাম। এটা দারুণ ছিলো।

কিন্তু মনে করিয়ে দেই আমারর বয়স কতইবা ছিল? ১৭? ১৮? ১৯??

রমেলু লুকাকু নিয়ন আলোয় neonaloy

আন্ডারলেখটের জার্সি গায়ে তরুণ রমেলু লুকাকু

আমি আসলে এ সবকিছুরই আশা করছিলাম, হয়তো এতো দ্রুত নয়। হঠাৎ করেই মিডিয়া আমার দিকে নজর দিলো এবং সব আশা আমার ওপর চাপিয়ে দিলো। বিশেষত জাতীয় দলের ক্ষেত্রে। সে কারণে আমি বেলজিয়ামের হয়ে ভালো খেলছিলাম না। এটা ঠিক কাজ করছিলো না।

যখন আমার সময় ভালো যাচ্ছিলো আমি সংবাদপত্রে দেখলাম। আমাকে বলেছিল বেলজিয়ান স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। যখন আমার সময় ভালো যাচ্ছিলো না তখন তারা আমাকে বলতো কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু।

যদি আপনি আমার খেলার ধরণ পছন্দ না করেন তবে ঠিক আছে। কিন্তু আমি জন্মেছি এখানে। আমি অ্যান্টর্প, লিগে এবং ব্রাসেলসে বড় হয়েছি। আমি আন্ডারলেখটের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। আমি ভিনসেন্ট কোম্পানি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। আমি একজন বেলজিয়ান। আমরা সবাই বেলজিয়ান। এ জিনিসটাই আমাদের দেশকে ভালো করে তোলে। ঠিক না?

কিন্তু আমি জানিনা কেন আমার দেশের কিছু মানুষ আমাকে ব্যর্থ হিসেবে দেখতে চায়। আমি আসলেই জানিনা। যখন আমি চেলসিতে গেলাম। আমি খেলছিলাম না। তখন তারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। যখন আমি ওয়েস্টব্রমে লোনে খেলতে গিয়েছিলাম তখনও তারা আমাকে নিয়ে হাসছিলো।

কিন্তু এটা ঠিক আছে। এই মানুষজন আমার সাথে ছিলো না যখন আমরা আমাদের শস্যদানায় পানি দিতাম। যদি আপনি আমার দুঃসময়ে না থাকেন তাহলে আপনি আমাকে বুঝতে পারবেন না।

আপনি মজার ব্যাপার কি জানেন? আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমি দশ বছর চ্যাম্পিয়নস লীগ ফুটবল দেখতে পারিনি। আমাদের দেখার সামর্থ্যই ছিলো না কখনো। আমি স্কুলে আসতাম এবং দেখতাম সব বাচ্চারা ফাইনাল নিয়ে কথা বলতো। আর আমার কোনো ধারণাই থাকতো না তারা কি নিয়ে কথা বলছে। ২০০২ সালের ফাইনালে যখন মাদ্রিদ লেভারকুসেনের সাথে খেললো তখন সবাই বলাবলি করছিলো, ‘ওহ সেই ভলি! ও মাই গড সেই ভলি!’

আমার তখন ভান করতে হয়েছিলো যেন আমি সব জানি তারা কি নিয়ে কথা বলছে।

দুই সপ্তাহ পরে, আমরা কম্পিউটার ক্লাসে বসে ছিলাম এবং আমার এক বন্ধু ইন্টারনেট থেকে সেই ভিডিওটি ডাউনলোড করে ক্লাসে দেখায়। এবং শেষ পর্যন্ত আমি দেখেছিলাম যে জিনেদিন জিদান তাঁর বাম পা দিয়ে টপ কর্ণারে ভলিটি কিভাবে করেছিলো।

সেই গ্রীষ্মে আমি আমার সেই বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম যেন আমি রোনালদো ফেনোমেনোনের ফাইনাল খেলা দেখতে পারি। ফাইনাল ছাড়া সেই টুর্ণামেন্টের বাকি সব কেবল আমার কাছে গল্প যা আমি স্কুলে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছিলাম।

আমার জুতা ছেঁড়া ছিল। বড় গর্ত ছিল সেখানে।

তার বারো বছর পর আমি আমার প্রথম বিশ্বকাপ খেলি। এখন আমি আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি এবং আপনি জানেন কি? আমি এবার মজা করতে যাচ্ছি। দুশ্চিন্তা ও নাটকের জন্য জীবনটা খুবই ছোট। মানুষ আমাদের দল এবং আমাকে নিয়ে যা খুশি বলতে পারে।

যখন আমরা শিশু ছিলাম আমাদের থিয়েরি অঁরির ম্যাচ টিভিতে দেখার সামর্থ্যও ছিলো না। আর এখন আমি জাতীয় দলের হয়ে প্রতিদিনই তাঁর কাছ থেকে শিখছি। আমি একজন কিংবদন্তির সাথে কাজ করছি এবং তিনি আমাকে শেখাচ্ছেন কিভাবে ফাঁকা জায়গায় দৌঁড়াতে হয় ঠিক তিনি যেমনভাবে দৌঁড়াতেন। থিয়েরিই সম্ভবত একমাত্র লোক যে আমার চেয়েও বেশি ফুটবল দেখে। আমরা সব কিছু নিয়েই তর্ক করি। আমরা একসাথে বসে জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল নিয়ে কথা বলি। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘থিয়েরি, আপনি কি ফরচুনা ডুসেলডর্ফের কাঠামোটা দেখেছেন?’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’

এটাই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দারুণ জিনিস। আমি শুধু এটিই কল্পনা করি যদি আমার নানা আমার পাশে থেকে এগুলো দেখতেন! আমি প্রিমিয়ার লিগের কথা বলছি না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথাও বলছি না। চ্যাম্পিয়নস লিগের কথাও বলছি না। বিশ্বকাপের কথাও না। আমি এ সব বোঝাতে চাইনি। আমি শুধু বলতে চেয়েছি তিনি যদি আমাদের পাশে এখন থাকতেন আর দেখতেন আমরা এখন কেমন জীবন কাটাই! আমি যদি তাঁর সাথে আরো একবার ফোনে কথা বলতে পারতাম!

‘দেখেছো? আমি তোমাকে বলেছিলাম! তোমার মেয়ে ভালো আছে। আমাদের বাসায় এখন আর কোন ইঁদুর দৌঁড়াদৌঁড়ি করে না। আমরা কেউই এখন আর মেঝেতে ঘুমাই না। আমাদের আর কোন দুশ্চিন্তা নেই। আমরা এখন  ভালো আছি। আমরা অনেক ভালো আছি…

..তাদের এখন আর আমার আইডি পরীক্ষা করতে হয় না। তারা আমাদের নাম জানে।’

রমেলু লুকাকু নিয়ন আলোয় neonaloy

হাস্যোজ্জ্বল লুকাকু পরিবার। নানাকে দেওয়া কথামত মা’কে এখন স্বাচ্ছন্দ্যেই রাখতে পারছেন রম

[প্লেয়ারস ট্রিবিউন থেকে অনূদিত]

আরো পড়ুন-

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!

আদ্রিয়ানোঃ ফুটবল সুপারস্টার থেকে গ্যাংস্টার!- নিয়ন আলোয়

Most Popular

To Top