লাইফস্টাইল

ইয়ামাহা মিউজিক: বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নতুন সঙ্গী

আচ্ছা, “ইয়ামাহা” এই শব্দটা শুনলে আমাদের মাথায় কি ভাসে? হয় নিচের এই লোগোটার চেহারা, বা কোন মোটরবাইকের ছবি।

ইয়ামাহা নিয়ন আলোয় neonaloy

 

অথবা আমরা যারা মিউজিক করি কিংবা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সাথে কোনভাবে জড়িত, তাদের মাথায় আসে ড্রামস, পিয়ানো, গিটারসহ বিভিন্ন মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টের ছবি। তাই না?

কিন্তু ইয়ামাহা’র সাথে গানবাজনার কি সম্পর্ক?

এই ইয়ামাহা আসলে কি- তা কজন জানি আমরা? ইয়ামাহা একটা জাপানিজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী যাদের অনেক ধরনের পণ্য বাজারে আছে। মোটরবাইক, স্পোর্টস গুডস, ইলেকট্রনিক্স সহ আরো অনেক কিছুই ইয়ামাহা কোম্পানী প্রস্তুত এবং বাজারজাত করে। তাদের মধ্য একটি হচ্ছে ইয়ামাহা মিউজিক। গিটার, ড্রামস, ভায়োলিন, কিবোর্ড এবং পিয়ানো সহ অনেক ধরনের মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট তারা বানিয়ে থাকে। প্রসঙ্গত যে, পৃথিবীতে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানী হচ্ছে ইয়ামাহা কর্পোরেশন। পৃথিবীতে পিয়ানোর সবচেয়ে বড় উৎপাদকও তারাই।

শুধু মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট উৎপাদন আর সেসব পণ্য তাদের নিজস্ব শোরুমে বাজারজাতকরন করে বিক্রি করাই নয়, পৃথিবীর মোট ৪৪টি দেশে ইয়ামাহা মিউজিক স্কুলও রয়েছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও রয়েছে ইয়ামাহা মিউজিক স্কুল। তবে এতদিন পর্যন্ত আমাদের বাংলাদেশের মানুষের নাগালের বাইরে ছিল স্কুলটি অন্য দেশে অবস্থান করায়।

সুসংবাদ হল, গত দু’বছর ধরে এ.সি.আই মোটরসের সুবাদে বাংলাদেশে ইয়ামাহা কোম্পানীর অফিসিয়ালি আমদানি করা বাইক যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনই প্রথমবারের মত ইয়ামাহা কোম্পানী এ.সি.আই মোটরসের মাধ্যমেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্ক মেগা শপিং কমপ্লেক্সে তাদের অফিসিয়াল শো-রুম খুলছে। এবং শুধুমাত্র একটি মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের দোকান নয়, বরং একটি প্রোপার মিউজিক্যাল সলুশন প্ল্যাটফর্ম বলা যায় শোরুমটিকে। এই বছরেরই জুলাইয়ের ৪ এবং ৫ তারিখ এই দুইদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে শো-রুমটির।

প্রথমদিন বিভিন্ন শিল্পীরা পারফর্মেন্স করবে এবং ইয়ামাহা কর্পোরেশন, জাপান এবং এসিআই মোটরস লিমিটেডের বক্তৃতা উপস্থাপনার মাধম্যে প্রি-লাঞ্চ অনুষ্ঠান হবে ও দ্বিতীয়দিন শো-রুম ওপেনিং এবং উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে।

এছাড়াও ইয়ামাহা মিউজিক বাংলাদেশের এই দেশের বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় সব শিল্পীদের সাথে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত তাহসান খান এবং রায়েফ আল হাসান রাফার সাথে কথাবার্তা চলছে।

এই শো-রুমে ইনচার্জ থাকছেন ট্রেইনরেকের গিটারিস্ট এবং পরাহো’র ড্রামার এ.কে.রাহুল এবং কর্পোরেট অফিসার হিসেবে থাকছেন আকিব নাওয়াজ শোভন, মোহাম্মদ ওয়াসিউ ওসমান, মুহিব ফয়সাল লিংকন এবং ইশমামুল ফরহাদ। অর্থাৎ, বাকি ইয়ামাহা মিউজিক টিমের সদস্যরা। প্রসঙ্গ, এদের মধ্য মুহিব ফয়সাল লিংকন এবং ইশমামুল ফরহাদ যথাক্রমে ‘অলিক’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট এবং ‘শুন্য’ ব্যান্ডের গিটারিস্ট।

নিয়ন আলোয় neon aloy ইয়ামাহা

ইয়ামাহা মিউজিক বাংলাদেশ টিম (একদম বাঁ-দিক থেকে মোহাম্মদ ওয়াসিউ ওসমান, এ.কে.রাহুল, ইশমামুল ফরহাদ, আকিব নাওয়াজ শোভন, মুহিব ফয়সাল লিংকন)

কি থাকছে ইয়ামাহা’র শোরুমে?

২৩৪৮ স্কোয়ার ফিটের এই এক্সক্লুসিভ শো-রুমটির ঠিকানা হচ্ছে যমুনা ফিউচার পার্কের ফোর্থ ফ্লোর, ইস্ট কোর্টের (East Court) একদম কেন্দ্রে। শপ নাম্বার ফোর-ডি-০১৪ (4D-014), অর্থাৎ এস্কেলেটরের একদম হাতের বাঁ-দিকে। দুইভাগে ভাগ করা থাকছে শোরুমটি- এক ভাগে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের সব ইন্সট্রুমেন্ট পাওয়া যাবে, আরেকভাগে থাকবে রক। এছাড়াও থাকছে বেশ কিছু চোখে পড়ার মত জিনিস।

প্রথমত এই শো-রুমে ডিসপ্লে’র জন্য একটি গ্র্যান্ড পিয়ানো থাকবে, যেটি সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলে সেখানে গিয়ে বাজাতে পারবে। শোরুমের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্ট থাকবে। গিটারের অংশে কেবল গিটার, পিয়ানোর অংশে কেবল পিয়ানো ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, এই শো-রুমের ভিতরেই একটি সাউন্ডপ্রুফ স্টুডিও থাকবে। যেখানে রেকর্ডিং, মিক্সিং এবং মাস্টারিং সংক্রান্ত সকল ধরনের যন্ত্র আপনি পাবেন।

তৃতীয়ত, থাকছে একটি ‘এক্সপেরিয়েন্স জোন’ যেখানে কোন ক্রেতা দোকানে তার পছন্দের গিটার বা অন্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গিয়ে বাজিয়ে ট্রায়াল দিতে পারবেন। সেখানে আছে এম্প, সাউন্ড সিস্টেম সহ সকল ধরনের সেটাপ। ক্রেতা চাইলে তার নিজের ইচ্ছে মত সেটিং করে নিতে পারবেন পুরো পরিবেশটি। শো-রুমের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থাকবে। দোকানের কন্টেন্ট, আপডেট এবং নিউজ নিয়মিত পোস্ট করা হবে সেখানে।

ইতোমধ্য যমুনা ফিউচার থেকে স্পেস নিয়ে শো-রুমের কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। এবং যেমনটা আগেই বলেছি, জুলাইয়ের ৪ এবং ৫ তারিখ দুইদিন ধরে চলবে ইয়ামাহা মিউজিক শোরুমের গ্র্যান্ড লঞ্চ

নিয়ন আলোয় neon aloy ইয়ামাহা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে চালু থাকা ইয়ামাহা মিউজিক শো-রুম

শুধুমাত্র ব্যবসাই কি উদ্দেশ্য?

বাংলাদেশে মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টগুলোর মধ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় গিটার। কিন্তু শতভাগ অথেনটিসিটি কোন দোকানই দেয় না। ইয়ামাহার এই শো-রুমের উদ্দেশ্য সেটাই। একদম শতভাগ ইয়ামাহা মিউজিক কোম্পানীর পণ্য, সাথে ‘আফটার সেলস সার্ভিস’, অর্থাৎ বিক্রয়-পরবর্তী সেবা। এর ফলে ইন্সট্রুমেন্ট কেনার পর থেকে যে কেউ দোকানের বিজনেস টাইমে যেকোন সময় সার্ভিসিং করাতে পারবে। ছয় ঘন্টার মধ্য ইয়ামাহা মিউজিক কোম্পানীর নিজস্ব ট্রেইন্ড প্রফেশনাল টেকনিশিয়ান এবং সার্ভিসম্যান সার্ভিস কম্পলিট করে বুঝিয়ে দেবে আপনার প্রিয় ইন্সট্রুমেন্টটি।

তবে শুধুমাত্র ইনস্ট্রুমেন্ট বেচাবিক্রি-ই ইয়ামাহা মিউজিক কোম্পানি’র একমাত্র উদ্দেশ্য না। ব্যবসার পাশাপাশি ইয়ামাহা মিউজিক কোম্পানী বাংলাদেশে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্যে কাজ করবে। এই দেশে কেউ মিউজিসিয়ান শুনলে সাধারণত মানুষজন একটু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। মাদকাসক্ত, বাউন্ডুলে সন্দেহ করে বা ভাবে। সঠিক সম্মান এবং সম্মানী দুটোই অধরা রয়ে যায় শিল্পীর। ইয়ামাহা মিউজিক কোম্পানীর লক্ষ মিউজিসিয়ানরা নিজেদের পরিচয়ে যেন মাথা উচুঁ করে চলতে পারেন- সেই সুযোগ এবং সম্মানটা তৈরি করা, শুধু মিউজিক করেই যেন শোভনীয় উপার্জন করে একজন মিউজিসিয়ান চলতে পারে সেটা নিশ্চিত করা।

আমরা বাইরের দেশগুলোতে যত ব্যান্ড বা সলো আর্টিস্ট দেখি, যেমন কুইন, ব্ল্যাক স্যাবাথ বা বব ডিল্যান– সবাই কিন্তু তাদের দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রীতে কোন না কোন রেকর্ড লেবেলের সাথে চুক্তি সই করে নিজের কাজের পরিচিতি অর্জন করে। অর্থাৎ, মাধ্যম হিসেবে রেকর্ডিং কোম্পানীগুলো কাজ করে। বাংলাদেশ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রীতে ঢোকার কোন সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেই। মোটামুটি যে কেউ নিজের জায়গা থেকে নিজের কাজের মাধ্যমে ঢুকতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, সুযোগের অভাবে অকালে ঝরে পড়ে অনেক প্রতিভাবান মিউজিসিয়ান। আর্টিস্টদের টিকে থাকার খোরাকটুকু জোগাড় করে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা ইয়ামাহার অন্যতম উদ্দেশ্য।

সর্বশেষ পরিকল্পনায় আছে মিউজিক স্কুল। নির্ধারিত কারিকুলামে মিউজিক শিখিয়ে দেওয়া হবে সার্টিফিকেট। ঠিক যেমন আসে ট্র্যাডিশনাল কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। অনুশীলনের অংশ হিসেবে থাকবে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অনবদ্য কিংবদন্তিদের গান।

নিয়ন আলোয় neon aloy ইয়ামাহা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়ামাহা মিউজিক স্কুলের কার্যক্রম

কমিউনিটিঃ

ইয়ামাহা মিউজিক সৃষ্টি করবে মিউজিসিয়ান এবং সঙ্গীতপ্রেমী ট্যালেন্ট গ্রুপের কমিউনিটি। কারণ আমাদের দেশে যে পরিমাণ ভালো মিউজিসিয়ান আছে, ঠিক তেমনই একটা ফ্যানবেজ এবং মিউজিক এন্থুজিয়াস্ট গ্রুপও আছে। এই কমিউনিটিটাকে ইয়ামাহা মিউজিকের ব্যানারের নিচে নিয়ে আসতে কাজ করবে ইয়ামাহা যেন শিল্পী এবং শ্রোতার সম্পর্কটা হয় আরো নিবিড়। আপাতত এই অপারেশনটা ঢাকা শহর ভিত্তিক হলেও আস্তে আস্তে ডিলারশিপের মাধ্যমে পুরো দেশজুড়ে শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইয়ামাহা মিউজিক আর যুবসমাজঃ

সাধারণত একজন মানুষের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়টা হচ্ছে যুবক বয়স। মানুষের বিপথে যাবার জন্যেও এটি সবচেয়ে মোক্ষম সময়। এজন্য এই সময়টাতে সৃজনশীল কোনকিছুর সাথে যুক্ত থাকলে সেটা নিয়ে সময় পার করে দেওয়া যায়। আমাদের বাংলাদেশে চিত্তবিনোদনের সবচেয়ে বড় উৎস ক্রিকেট। বাংলাদেশে ক্রিকেট ক্রেইজটা অনেক বেশি পরিমানে থাকলেও এই দেশে খেলার মাঠের খুব সংকট। এই জন্য যুবকদের অন্য পথ খুঁজতে হয় চিত্তবিনোদনের জন্য। এবং অনেকসময়ই এই শূন্যস্থানটার সুযোগ নেয় মাদক, সন্ত্রাস কিংবা অন্য কোন অধকার জগৎ।

কিন্তু এই বয়সটাতেই যদি মিউজিকের প্রতি কোনভাবে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে একজন যুবকের বিপথে যাবার সম্ভাবনা কিন্তু অনেক কমে যায়। একজন মিউজিশিয়ান যখন তার নিজের মানানসই পছন্দের একটি মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট পায়, তার দুনিয়াটাই বদলে যায়। অবসর সময়ে কেবল সেটা নিয়েই পড়ে থাকে।

ইয়ামাহা মিউজিকের এই সামান্য উদ্যোগ যদি একজন যুবক বা যুবতীকে নিজের ঘরের এক কোণে বসে নিজের মত করে একটা শিল্প চর্চা করার সুযোগ করে দেয় তবে তা অবশ্যই প্রশংসনীয় নয় কি?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top