ইতিহাস

শ্যাম্পুর ডাক্তার শেখ দ্বীন মোহামেদ!

শেখ দ্বীন মোহামেদ নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

এখানকার এত এত শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন আমাদের সামনে ভাসে। পথে ঘাটে সব জায়গাতেই দেখা যায়। চটকদার সেসব বিজ্ঞাপন গুলোর বেশিরভাগরই মূল বক্তব্য থাকে যে সেসকল শ্যাম্পু আমাদের চুলের উপকার করবে। চুলকে খুশকি মুক্ত করে ময়লা দূর করবে, চুলকে আরো সুন্দর করে তুলবে সহ আরো অনেক কিছু।

কিন্তু এই চুলে এই শ্যাম্পু করার ব্যাপারটি কে আবিষ্কার করেছে কখনো ভেবেছেন কি? বাজারে কিনতে পাওয়া অধিকাংশ শ্যাম্পু ব্র্যান্ডই ইউরোপিয়ান কিংবা আমেরিকান হওয়ায় এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে শ্যাম্পু সম্ভবত ইউরোপীয় কারো আবিষ্কার। কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তেমন না। একজন ভারতীয়ই প্রথম চুলে শ্যাম্পু করার বিষয়টি আবিষ্কার করেন এবং তাঁর হাত ধরেই চুলের আধুনিক শ্যাম্পুর কথা ইংল্যান্ডে পৌঁছায়।

হ্যাঁ, আমরা আজকে যে তরল শ্যাম্পু ব্যবহার করি, তার কৃতিত্ব জার্মান রসায়নবিদ হ্যান্স শোয়ার্জকফ-এর। তবে তার আগেই ইউরোপিয়ানদের চুলে শ্যাম্পু করার সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন যিনি, তার নাম শেখ দ্বীন মোহামেদ। দ্বীন মোহামেদ অবশ্য শ্যাম্পু আবিষ্কার করেন স্বাস্থ্যের উপকারের জন্য চিকিৎসা হিসেবে। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ইংল্যান্ডে প্রথম ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খুলেছিলেন। একই সাথে ভারতীয় হয়ে প্রথম ইংরেজী ভাষায় বইও তিনি লেখেন। আর সেইসাথে ইংলিশদের শ্যাম্পু ব্যবহার শেখানোর কথা তো বললামই! তিনি একাধারে একজন ভ্রমনকারী, সার্জন ও উদ্যোক্তা। তাঁর জন্মদিনে গুগল ডুডলও করা হয় গত বছর।

শেখ দ্বীন মোহামেদ নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

ভারতীয় এই কীর্তিমান পুরুষ ১৭৫৯ সালে পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন। দ্বীন মোহামেদের বাবা ঐতিহ্যবাহী Nai জাতের অন্তর্গত ছিলেন। Nai জাতের লোকেদের পেশা ছিল নাপিতের কাজ। দ্বীন মোহামেদের বাবা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে কাজ করতেন। ১০ বছর বয়সে দ্বীন মোহামেদ অ্যাংলো-আইরিশ প্রোটেস্ট্যান্ট ক্যাপ্টেন গডফ্রে ইভান বেকারের অধীনে চলে আসেন। দ্বীন মোহামেদ রসায়ন নিয়ে পড়ালেখা করেছিলেন এবং তিনি বিভিন্ন সাবান, শ্যাম্পু, ক্ষার তৈরীর উপায় শিখেছিলেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে একজন ট্রেনিং সার্জন হিসেবে কাজ করেছিলেন একই সাথে মারাঠাদের বিরুদ্ধেও কাজ করেছেন।

১৭৮২ সালে দ্বীন মোহামেদ সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দেন ও ক্যাপ্টেন গডফ্রের সাথে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। ইংল্যান্ডে এসে তিনি লোকাল স্কুলে ইংরেজি শেখেন। সেখানে তিনি আইরিশ মেয়ে জেন ডেলের প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু জেন এর পরিবার তাদের সম্পর্কের বিপক্ষে ছিল। তাই ১৭৮৬ সালে তাঁরা পালিয়ে বিয়ে করেন। জেনকে বিয়ে করার জন্য দ্বীন মোহামেদ ধর্মান্তরিত হন। বিয়ের পরে স্ত্রীসহ দ্বীন মোহামেদ ব্রাইটনে চলে আসেন। দ্বীন মোহামেদ ও জেন এর ঘর আলো করে আসে ৭টি সন্তান।

১৭৯৪ সালে দ্বীন মোহামেদ প্রথম ভারতীয় ইংরেজী ভাষায় প্রথম বই লেখেন। The Travels of Dean Mahomed নামের বইটিতে শুরুতে তিনি চেঙ্গিস খান, তৈমুর ও বাবরের প্রশংসা দিয়ে শুরু করেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে উঠে এসেছে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর কথা, স্থানীয় ভারতীয় শাসকদের সাথে সামরিক সংঘাতগুলো। এছাড়াও তিনি বইটিতে ভারতের সংস্কৃতি, সামরিক, খাদ্য, প্রাণী, বন্যপ্রাণী, ইত্যাদি সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সাথে বইটিতে আরো উঠে এসেছে ইউরোপ, আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেনের তার ভ্রমনবৃত্তান্ত।

শেখ দ্বীন মোহামেদ নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

১৮১০ সালে লন্ডনের জর্জ স্ট্রিটে  দ্বীন মোহামেদ প্রথম ভারতীয় রেস্টুরেন্ট খুলেন। Hindoostane Coffee House নামের রেস্টুরেন্টটিতে তিনি ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি চিলিমের তামাক ও পরিবেশন করতেন যাতে করে ব্রিটিশরা আসল ভারতের স্বাদ নিতে পারে কিন্তু ২ বছর পরে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করে দিতে হয়।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা খোলার আগে দ্বীন মোহামেদ বাষ্পীয় স্নানের (Steam Bath) একটি পাবলিক বাথরুমে কাজ করতেন। ১৮১৪ সালে দ্বীন মোহামেদ ব্রাইটনে তার প্রথম কমার্শিয়াল বাষ্পীয় ম্যাসাজের সূচনা করেন। সেখানে তিনি তুর্কিদের স্টাইলে বাষ্পীয় স্নানের ব্যবস্থা রেখেছিলেন যেখানে গোসলের পাশাপাশি মাথা ম্যাসাজ করার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। এই ম্যাসাজই Champing নামে পরিচিত ছিল। আর যে রাসায়নিক দিয়ে দ্বীন মোহামেদ ম্যাসাজ করতেন, তাকে বলা হতো Champo, এ থেকেই “শ্যাম্পু” শব্দটির উৎপত্তি।

দ্বীন মোহামেদ বাষ্পীয় স্নান ছাড়াও হারবাল স্নানেরও ব্যবস্থা করেন। লোকাল পত্রিকায় তিনি এই ব্যবসার বিজ্ঞাপনে লিখেন,

“ভারতীয় ঔষধযুক্ত এই বাষ্পীয় স্নান অনেক রোগের প্রতিকার করবে। বিশেষ করে  ধূমপায়ী এবং পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জন্য এই স্নান বিশেষ উপকারী। হাত-পায়ের জয়েন্টে ব্যথাসহ যেকোন ব্যথা সারাবে এই বাষ্পীয় স্নান।”

তাঁর এই ব্যবসাটি তাৎক্ষনিকভাবে সাফল্য লাভ করে ও তিনি ডাক্তার ব্রাইটন নামে পরিচিতি পান। হাসপাতাল থেকেও তাঁর কাছে রোগী পাঠানো হত। রাজা চতুর্থ জর্জ ও চতুর্থ উইলিয়াম জর্জ উভয়েরই শ্যাম্পুয়িং সার্জন হিসেবে তিনি নিযুক্ত ছিলেন।

১৮২২ সালে তিনি ‘Shampooing or Benefits Resulting from the Use of Indian Medical Vapour Bath’ নামে আরেকটি বই লেখেন যেখান তিনি শ্যাম্পু আর স্পা-এর ব্যাপারে লিখেন।

শেখ দ্বীন মোহামেদ নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

১৮৫১ সালের ২৪ ফেবুয়ারি শেখ দ্বীন মোহামেদ ব্রাইটনের গ্র্যান্ড পারাডে মারা যান। তাঁকে সেন্ট নিকোলাস চার্চে কবর দেওয়া হয়। দ্বীন মোহামেদের পরে তাঁর ছেলে ফ্রেডরিক তার ব্যবসার প্রোপাইটার হন। ব্যবসার পাশাপাশি ফ্রেডরিক ব্রাইটনে একটি ফেন্সিং ও বক্সিংয়ের একাডেমীও চালাতেন। তাঁর নাতি ফ্রেডেরিক হেনরি হোরাশিও আকবর মোহামেদ (Frederick Henry Horatio Akbar Mahomed) ছিলেন তখনকার সময়ের বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসক।

আরো পড়ুনঃ ভারতীয় উপমহাদেশের যত আবিষ্কার!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top