ইতিহাস

শহীদ হাজংমাতা রাসমনি এবং তার টঙ্ক আন্দোলন

হাজং নিয়ন আলোয় neon aloy

ময়মনসিংহের টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন একজন নারী। রাসমনি হাজং ছিলেন সেই প্রথম নারী বিপ্লবী। রাসমনি হাজং এর পূর্বপুরুষ আসামের অধিবাসী ছিলেন। সুসং রাজ্য স্থাপনের পর সুসং এর জমিদাররা আসাম থেকে তাদের নিয়ে আসেন। তাদেরকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পেছনে জমিদারদের কারণ ছিল। হাজংরা ছিলেন সৎ, সাহসী, বিশ্বস্ত। ফলে যে কোন আক্রমণ রোধে তাদের ব্যবহার করা যেত।

হাজংদের এই সাহসী নেত্রীর জন্ম হয় ১৮৯৭ সালের মে মাসে। ময়মনসিংহ জেলার সুমঙ্গ পরগনার ভেদিপুরা অঞ্চলের বগাবারী এক গরীব হাজং পরিবারে। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন সুযোগ হয়নি তার। ১২ বছর বয়সে রাসমনিকে এক নিঃস্ব যুবকের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের কিছুদিন পরেই বিধবা হন। পাড়ায় ডাইনী বলে ক্ষেপাতে থাকে লোকজন।

আমাদের দেশ হতদরিদ্র বিধবার জন্য কতটা প্রতিকূল সে কথায় আর না গেলাম। তবে রাসমনি তাতে হাল ছেড়ে দেননি। অন্যের জমিতে ধান বুনে, ধান কেটে যে ধান পেতেন তা নিয়েই চলতেন। চাল বিক্রি করেও খরচ চলত। কখন কখন কাঠ কুড়িয়ে কিংবা কাপড় সেলাই করে মেয়েদের কাছে বিক্রি করতেন। কিন্তু গ্রামের মানুষদের রোষানল থেকে তিনি বাঁচতে পারেননি।

সমাজেরই চাপে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। দুর্গাপুর থানার কুল্লাপাড়া ইউনিয়নের আরাপাড়া গ্রামের পাঞ্জি হাজংকে বিয়ে করেন। পাঞ্জি হাজং কবিরাজ ছিলেন। রাসমনিকে তিনি কিছু কিছু কবিরাজী বিদ্যা শেখান। রাসমনি নিজে আবার ধাত্রী জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। সেসময় আশেপাশের নারীদের রোগের চিকিৎসা কিংবা প্রসবে সহায়তা করতেন। নারী সমাজে তার জনপ্রিয়তাও ছিল সেজন্যে।

১৯৩৭ সাল

মনি সিং এর নেতৃত্বে রাসমনি টঙ্ক আন্দোলনে যোগ দেন। টঙ্ক আন্দোলন হচ্ছে ব্রিটিশ-ভারতে সর্বশেষ গণ আন্দোলন। সুসং দুর্গাপুরে এর ঘাঁটি। টঙ্ক মানে হল ধান কড়ারী খাজনা। এই ব্যবস্থায় জমিতে ধান হোক কিংবা না হোক, কৃষকের জমিদারকে ধান দিতেই হবে। টঙ্কের কারণে চাষীদেরকে প্রতি একরে বাড়তি খাজনা দিতে হত। শুধু যে বাড়তি খাজনা ছিল তা নয়। জোত স্বত্ত জমি নিতে হলে চাষীদেরকে বেশ বড় অংকের একটা টাকা নজরানা দিতে হত। প্রথম দিকে সবারই সামর্থ্য ছিল সেই নজরানা দেওয়ার। টঙ্কের হারও চাষীদের নাগালের বাইরে কখনই ছিল না। বেশি মুনাফার আশায় জমির মালিকরা নিলাম ডাকতো। নিলামে যে বেশি ধান কবুল করতে পারত তাকেই দেওয়া হত। এভাবে করে আস্তে আস্তে টঙ্কেও দাম বেড়ে চলছিল।

১৯৩৮ সাল

হাজং চাষীরা টঙ্ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করে। এই আন্দোলনের অগ্রভাগ থেকে নেতৃত্ব দেন মনি সিং। রাসমনি হাজং ও কুমুদিনী হাজং চাষীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেন এই আন্দোলনের জন্য। হাজংদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ছিলো টঙ্ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। ১৯৪০ সালে এই আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে। সেই বছরেই সার্ভে করে টঙ্ক ব্যবস্থার পরিমান কমানো হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার টঙ্ক ব্যবস্থার সংস্কার করলেও পুরোপুরি নির্মূল করেনি। টঙ্ক ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলন চলতে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাসমনি ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’র সদস্য হন। এই সমিতির হয়ে তিনি তেরোশো পঞ্চাশের মন্বন্তরে তিনটি গ্রামের মানুষদের জন্য লঙ্গরখানা খোলেন। শুধু তাই নয়, তার নেতৃত্বে একদল খাদ্য সংগ্রহকারী পরগনা জেলা ঘুরে ঘুরে টাকা, ধান, কাপড় ইত্যাদি সংগ্রহ করত। চাষীদের একটি দল ছিল রাসমনির অধীনে। চোরা মজুতদার ব্যবসায়ীদের গোপন খাদ্য গুদামের খোঁজ নিয়ে সেই গুদামের খাবার লঙ্গরখানার জন্য নিয়ে আসতেন তারা। নিজ গ্রামে ধর্মগোলা তৈরী করেন রাসমনি। ধর্মগোলায় সবাই নিজেদের বাড়তি ধান জমা দিত যাতে প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায়।

রাসমনি মেয়েদের জন্য কুটিরশিল্পের কেন্দ্রও স্থাপন করেন। গ্রামের অশিক্ষা দূর করার জন্য নৈশ বিদ্যালয় খোলার উদ্যোগ নেন। বিদ্যালয় খোলার পর তিনি সেখানকার প্রথম ছাত্রী হন। সেই স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক আলাপও হত। এভাবে তিনি ময়মনসিংহ সীমান্ত ও পার্বত্য এলাকার নারী নেত্রী হয়ে ওঠেন।

১৯৪৬ সাল

জানুয়ারি মাস থেকে দ্বিতীয় দফায় টঙ্ক আন্দোলন শুরু হয়। সুসং দুর্গাপুরের স্কুল মাঠে আয়োজন হয় বিশাল জনসভার। এই জনসভার উত্তরে বিরিশিরিতে পুলিশের সশস্ত্র ক্যাম্প বসে। ক্যাম্প থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে হাজংদের টঙ্ক আন্দোলন দমন করার চেষ্টা চলে। হাজং পরিবারগুলো সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের স্বীকার হয়।

হাজং নিয়ন আলোয় neon aloy

রাসমনি হাজং

মাঠ পর্যায়ের নেতা লংকেশ্বর হাজং ও তার ভাইদের গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পুলিশ বহেরাতলীর দিকে আসে। তাদের আসার খবর শুনে লংকেশ্বর হাজং ভাইদের নিয়ে মনি সিং এর আস্তানায় আত্মগোপন করে। লংকেশ্বর হাজং আর তার ভাইদের ধরতে না পেরে লংকেশ্বর হাজং এর স্ত্রীকে আটক করা হয়।

গ্রামের মানুষের মুখে কুমুদিনীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পান রাসমনি। ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে তাকে ছাড়াতে তৎপর হন। পুলিশ তাদের উপর গুলি ছোঁড়ে। সংঘাতে রাসমনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। রাসমনির হত্যাকান্ড দেখে সুরেন্দ্র হাজং রাসমনিকে ধরতে গেলে তাকেও নির্দয়ভাবে গুলি করা হয়। এই ঘটনায় অন্যান্য হাজংরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের উপর বল্লম ও রামদা দিয়ে হামলা চালায়। দু’জন পুলিশ নিহত হন। বাকিরা সেখান থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান।

হাজংদের কাছে রাসমনি “হাজংমাতা” নামে পরিচিত। তার সম্মানে ২০০৪ সালে বহেরাতলী গ্রামে ‘শহীদ হাজংমাতা রাসমণি স্মৃতিসৌধ‘ বানানো হয়। রাসমনি হাজং এর স্মৃতিটুকু অমর করে রাখতেই এই সৌধ।

হাজং নিয়ন আলোয় neon aloy

ইতিহাস নিয়ে আরও পড়ুনঃ কিভাবে মারা গিয়েছিল দায়াতলভ পাসের অভিযাত্রীরা?

Most Popular

To Top