নাগরিক কথা

MUN করে কি আসলেই কিছু শেখা যায়?

IMUN Neon_Aloy_নিয়ন_আলোয়

IMUN নামের কোন একটা MUN-এ খুব বিচ্ছিরি একটা ঘটনা ঘটে গেছে। এমন ঘটনা যে প্রথম, সেটা বললে আসলে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু এমন বিচ্ছিরি ঘটনার ভাইরাল ভিডিও মনে হয় এই প্রথম। MUN সার্কিট নিয়ে গোপনে অনেকেই অনেক কিছু বলতেন, তাঁরা এখন একেবারে প্রমাণসহ ছিঃ ছিঃ করছেন। বিষয়টা হতাশাজনক।

ওদিকে আবার এই অকার্যটি যে জ্ঞানপাপীরা করেছেন, তারা যুক্তি দিচ্ছেন, এমনটা নাকি লিবারেলিজম। MUN-জিনিসটায় একটুখানি ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ না থাকলে কী চলে?

MUN সার্কিট বলা হোক বা Model United Nations-নাম্নী এই কম্পিটিশন, এর নিন্দুকের অভাব কোনকালেই ছিলো না। নিন্দার কারণও আছে বটে, সোশ্যালস আর গালা ডিনারে এই ভিডিওটার মতো অনেক কিছুই হবার সম্ভাবনা থাকে, হয় যে না সেটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তাই বলে “MUN আবার মানুষ করে নাকি? ওখান থেকে কিছু শেখা যায় আবার? ডিবেট যারা পারে না তারা ওইসব মান-টান করে”
এই জাতীয় নিন্দের জবাবটা না দিলেও আসলে হয় না।

IMUN Neon_Aloy_নিয়ন_আলোয়

প্রথমে জানা যাক, এই MUN-টা কি জিনিস। এটি একটি সহশিক্ষা কার্যক্রম যার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পায়। সাধারণত জাতিসংঘ অধিবেশনের আদলে MUN কনফারেন্স গুলো হয়ে থাকে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা , যাদের ‘ডেলিগেট’ বলা হয়, তারা লিডারশিপ, ক্রিটিকাল থিংকিং, টীম ওয়ার্ক, বিতর্ক ইত্যাদি বিষয় চর্চার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের প্ল্যাটফর্ম পান। বাংলাদেশ এ United Nations Youth and Students Association of Bangladesh (UNYSAB) নামক সংগঠনটি বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের উইং বা অঙ্গসংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই কনফারেন্স গুলোর আয়োজন করে থাকে। ইউনিস্যাব ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের স্বনামধন্য বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব MUN-ক্লাব রয়েছে। তারাও বছর অন্তর অন্তর বিভিন্ন কনফারেন্স আয়োজন করে থাকে।

IMUN-এর ঘটনায় আসি। আমি যথেষ্ট লিবারেল মানুষ, প্রকাশ্যে স্টেজে পূর্ণবয়ষ্ক দুইজন মানুষ ল্যাপ ড্যান্স কি পোল ড্যান্স দিক তাতে আমার অনুভূতিতে আঘাত হানে না। কিন্তু যখন ভিডিওতে দেখি যে চোদ্দ-পনেরোর কিশোরী, যার কনসেন্ট দেয়ার মতো মানসিক পরিপক্কতাও এখনো আসেনি, তাকে দিয়ে মোটামুটি জোরপূর্বক প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে ল্যাপ ড্যান্স দেয়ানো হচ্ছে, তখন বিষয়টা আর লিবারেল থাকে না। সেটা হয় পেডোফিলিয়া। যে বিষয়টা অন্ধকার যুগে খুব উপভোগ্য বিষয় ছিলো সম্ভবত, উত্তরাধুনিক এই যুগে সেটা নিশ্চিত করেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই বিষয়টা মোটেও বিনোদন না। এইটা অপরাধ।

আমার নিজের ছোটবোন ক্লাস নাইনে পড়ে। বড়দা MUN করে, তারও ইচ্ছে কলেজে উঠে MUN করবে। প্রিয় ছোটবোনটা যদি দেখে যে তার বয়সী কিছু মেয়ে মিনিস্কার্ট পরে বয়স্ক ইবিকে ল্যাপ ড্যান্স দিচ্ছে, বিষয়টা তার জন্যে কতোটা ট্রমাটাইজিং হবে, ভাবা যায়? সে-ও নিশ্চয়ই ভাববে, “ভাইয়াও তো ইবি, ভাইয়া কি তাহলে মানে গিয়ে এইসব করে?”

MUN-এর নিন্দের বিষয়ে ফিরে যাই। সত্যি বলতে কি, ভালো কোন মানে একটা অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা মোটেও সহজ কোন বিষয় না। দেশ-বিদেশ নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞান রাখতে হয়, নিজের অ্যালোকেটেড কান্ট্রি নিয়ে ভালোমতো রিসার্চ করা লাগে। পজিশন পেপার বানানো, ওয়ার্কিং পেপার লিখে ড্র্যাফট রেজ্যোলুশন বানানো, ডিপ্লোম্যাসি আর গুটির চূড়ান্ত করে নিজের একটা ব্লক বানানো- চাট্টিখানি কথা না কিন্তু।

IMUN Neon_Aloy_নিয়ন_আলোয়

এটা সত্য, সবখানে একরকম কম্পিটিশন হয় না, কিন্তু ভালো মানার-ওয়ালা কমিটিতে অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা খুব সহজলভ্য নয়। কোন তুলনায় না যাই, কিন্তু ‘মান তো সোজা, ফটাফট দুই চারটা ইংরেজি বললেই বেস্ট ডেলিগেট’ বলা বড়ো সহজ, করা কঠিন। এই কারণেই, নিন্দের সময় যখন একেবারে জেনারালাইজ করে বলে দেয়া হয় “মান তো করে চিক্স পাওয়ার জন্যে, ওটা তো পুসি হান্টিং কম্পিটিশন”, তখন বেশ গায়ে লাগে বিষয়গুলো। ইচ্ছে হয় বলতে, “ভালো একটা MUN-এ বেস্ট ডেলিগেট পেয়ে দেখান দেখি আগে!”

মানলাম, সবাই সেখানে শিখতে, অ্যাওয়ার্ড জিততে যায় না। অনেকেই হয়তো ভালোবাসা খুঁজতেই যায়। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখে পুরো সার্কিটকে গালিগালাজটা কিন্তু আসলে ‘হিটলার লাখখানেক মানুষ মারসে, তাই জার্মানরা সব খুনী’-টাইপ অ্যানালজি হয়ে যায়।

IMUN এর এই বিশ্রী বিষয়টা ভাইরাল হয়ে সার্কিটের মানসম্মান তো ডুবিয়েছেই, এখন অন্তত এই সংগঠনটার শাস্তির ব্যাপারটা নিশ্চিত করতেই হবে। এই ধরণের MUN যাতে আর না নামে, সেটা নিশ্চিত করার কাজটা আমাদের বিজ্ঞ কর্তাব্যক্তিরা করবেন, আমরা একটা পরিষ্কার, সুশীল সার্কিট পাবো, সেই আশাতেই থাকা।

লেখক: অভীক রেহমান

আরো পড়ুন: ‘এ প্রজন্মকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না… সব নষ্ট হয়ে গেছে…’

Most Popular

To Top