বিশেষ

ডানা মুক্ত করা সভ্যতা’র গল্প…

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

“অ্যালার্ম এর ক্রিং ক্রিং অফ করে ক্লাস মিস,
কিন্তু মিস হয় না আমার ডেইট।
আইপডে গান শুনে, বসে বসে আনমনে,
ভাবি কেনো অলওয়েজ আমি লেইট?”

বাংলাদেশের যারা ব্যান্ড সঙ্গীতের বাইরেও অন্যান্য সব জনরা বা আর্টিস্টের গান শুনে, তারা ইতিমধ্য ধরে ফেলেছেন এটা কোন গান আর কার গান। গানটি ২০১৫ সালে প্রথমে এফএম রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সিতে ছড়িয়ে যাবার পর বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলো শ্রোতামহলে। হ্যাঁ, এটি সেই বিখ্যাত “ক্রিং ক্রিং” গানের লাইনগুলোই যার শিল্পী ছিলেন সভ্যতা।

সভ্যতার মিউজিক ক্যারিয়ার খুব একটা বেশীদিনের নয় কিন্তু এরই মধ্য তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে।

সভ্যতার পুরো নাম “কারিশমা সানু সভ্যতা”। তিন ভাইবোনের মাঝে সবচেয়ে ছোট। তার অগ্রজ খৈয়াম সানু সন্ধি এবং জিনাত সানু স্বাগতা। এখানে সন্ধি একজন মিউজিসিয়ান ছাড়াও একজন মিউজিক প্রোডিউসার এবং স্বাগতা অভিনেত্রী এবং মডেল। তাদের তিন ভাইবোনের মধ্য স্বাগতা সবচেয়ে বড়, সন্ধি মেঝো এবং তারপর সভ্যতা। স্বাগতা এবং সন্ধি দুইজনই মিউজিকের সাথে সম্পৃক্ত আছেন এবং দুইজনই ভালো জনপ্রিয় শ্রোতামহলে। অনেকেরই হয়তো জানা আছে সন্ধি এবং স্বাগতা দুইজনই মহাকাল ব্যান্ডে গান গাইতেন।

সভ্যতার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ঢাকার এক বাসাতে। তার বাবা ছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীতশিক্ষক “খোদা বক্স সানু”। বর্তমান সময়ের অনেক বিখ্যাত কিছু গায়ক তার কাছে গান শিখেছেন। তাদের মধ্য অন্যতন একজন হচ্ছে তাহসান। খোদা বক্স সানু রবীন্দ্রভারতী থেকে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পড়ালেখা করেছিলেন। তার বাবা ছিলেন “আনন্দগম মিউজিক স্কুল” এর ফাউন্ডার যার যাত্রা শুরু হয়েছিলো ঢাকার গুলবাগ থেকে। পরে সময়ের সাথে এই স্কুলের অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট হয় এবং এক এক ডিপার্টমেন্টে সঙ্গীত সম্পর্কিত এক একটা জিনিস শিখানো হয়। কোনটায় ক্লাসিকাল গান, কোনটায় ওয়েস্টার্ন গান, কোনটায় গিটার ইত্যাদি। গুলবাগের বাসায় থাকাকালীন সময়ে তখনো তখনো সভ্যতার জন্ম নেন নি, পরে উনার পরিবার উনাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় যাবার পর জন্ম নেন সভ্যতা।

ছোট থাকতে সভ্যতার গলা একটু ভাঙ্গা ছিলো যেহেতু তার ছোটবেলায় সারা বছরই ঠান্ডা লেগে থাকতো সারাক্ষন। সেই কারণে সভ্যতার বাবা ভেবেছিলেন সভ্যতার দ্বারা গান গাওয়া হবে না। কিন্তু ছোট থেকেই মিউজিকের প্রতি অনেক ঝোঁক ছিলো সভ্যতার। শৈশবে সভ্যতার একটা খেলনা ছোট কিবোর্ড ছিলো যেটায় তিনি খেলতে খেলতে আস্তে আস্তে নিজে একা একাই কর্ড তুলে ফেলেছিলেন এবং নিজের মতো করে যা ভালো লাগতো বাজাতেন, সেটা তার বাবার চোখে পড়লে তিনি খুবই ইম্প্রেসড হয়ে তাকে পিয়ানো শিখানোর জন্য বর্তমান সময়ের সঙ্গীতশিল্পী তাহসানের কাছে পাঠিয়ে দেন। তাহসান তখন ব্ল্যাকে ছিলেন, কিন্তু ততোদিনে ব্ল্যাকের প্রথম অ্যালবাম “আমার পৃথিবী” বের হয়েছিলো। সভ্যতা পরে আরো অনেক শিক্ষকের কাছে পিয়ানো শিখলেও তার পিয়ানোর বেশিরভাগ জিনিসই তাহসানের থেকে শিখা। সভ্যতার ভাষ্যমতে,

“আমি যা পারি, তার ৮০% তাহসান ভাইয়ের থেকে শিখেছি। আমার সবই মনে আছে সে কি শিখিয়েছে, এতো ভালো টিচার তিনি। আমি কিছু ভুলি নাই কিন্তু।”

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

কারিশমা সানু সভ্যতা

এদিকে ততোদিনে সন্ধি তখন গিটার শিখছিলেন এবং সেটা দেখে দেখে সভ্যতাও নিজের নিজে গিটার বাজানো শিখে গিটার বাজাতে পারতেন। যখন থেকে সভ্যতা কিবোর্ড একটু একটু শুরু করলেন বাজানো, তিনি গান লেখা এবং বানানো শুরু করলেন। ক্লাস ফোর-ফাইভে উঠতে উঠতে তিনি ততোদিনে ভালোই পিয়ানো বাজাতে পারতেন। সময়ের সাথে সভ্যতা আরো অনেক মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টের প্রতি আগ্রহ আসে যেহেতু তিনি গাইতে পারতেন না বা যেটা গাইতে পারতেন সেটা কারো পছন্দ হতো না। তিনি মাউথ-অর্গান, বাঁশি বাজানো শুরু করলেন। এক কথায়, হাতের কাছে যা পেতেন, সেটাই বাজাতে চেষ্টা করতেন সভ্যতা। এভাবে শুধু ২০০৬ সালের মধ্য তিনি সঙ্গীতের অনেক ব্যাকরণ এবং সেসবের ব্যবহার অনেককিছু শিখে ফেলেছিলেন। সেই এক বছরে তার অনেকগুলো গান বানানো হয়ে গিয়েছিলো।

সেই বয়সটাতে সভ্যতা খুব ইন্ট্রোভার্ট থাকায় তিনি মানুষের সাথে একটু অনেক কম মিশায় উনার খুব বেশী একটা বন্ধুবান্ধব ছিলো না। সেই জন্য তিনি সারাদিন তার রুমে বসে গান বানাতেন এবং সেসবে সুর দিতেন। সেসময়ের বানানো কিছু গানই বর্তমান সময়ের শ্রোতাপ্রিয় কিছু গান। যেমন “ছোট্ট চায়ের কাপ” , “ও আমি”, “যদি থাকতো ডানা”।

ততোদিনে শায়ান চৌধুরী অর্ণব এর “চাইনা ভাবিস” অ্যালবাম রিলিজ হয়েছিলো এবং অর্ণব তখনো বেঙ্গলে চাকরী করতেন। প্রসঙ্গত যে অর্ণব আর বর্তমান সময়ের নামকরা মডেল এবং অভিনেত্রী রাফিয়াথ রশীদ মিথিলা সম্পর্কে কাজিন। অর্ণবের আপন মামাতো বোন হচ্ছে মিথিলা। সেদিকে মিথিলা আর সভ্যতার বড়বোন স্বাগতা আবার দুইজন ভালো বান্ধবী ছিলেন। সে সূত্রে সভ্যতা অর্ণবের পরিচিত। মিথিলা আর অর্ণবরা ঢাকার একই বাসাতে থাকতেন। মিথিলার বিয়ের সময় সভ্যতা অর্ণবকে এমনিতেই ভক্ত হিসেবে তার নিজের কিছু গান শোনান।

অর্ণব চাইনা ভাবিস অ্যালবাম কভার নিয়ন আলোয় neonaloy

অর্ণবের “চাইনা ভাবিস” অ্যালবাম কভার

তাহসান-মিথিলার বিয়ের পর একদিন অর্ণব সভ্যতাকে ফোন করে জানান তিনি তার নতুন অ্যালবাম “ঝালমুড়ি ২” রিলিজ করবেন এবং তিনি গায়ক এবং গীতিকারদের গান নিচ্ছে যেখানে অর্ণব নিজে কিছু করবেন না বরং যার গান তিনি নিজে গাবেন, সুর করবেন এবং লিখবেন। অর্ণব শুধু কম্পোজ করে দিবেন অ্যালবামের জন্য।

অর্ণবের স্টুডিওতে গিয়ে সভ্যতা আবার তার গানগুলো অর্ণবকে শোনালেন। কয়েকটা শোনার পর অর্ণব “ও আমি” গানটা পছন্দ করলেন সভ্যতার। তারপর শুরু হলো গানের রেকর্ড এবং কম্পোজের কাজ। সভ্যতা গানের কম্পোজ শুনে এতো পছন্দ করলেন যে তার ভাষায়,

“তিনি জাস্টিস করেছেন আমার গানটায়। অন্য কেউ করলে হয়তো আমার মতো হতো না।”

তারপর সেই অ্যালবাম “ঝালমুড়ি ২” মুক্তি পেলো ২০০৭ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ওপেন স্পেস কনসার্ট গ্রাউন্ডে। প্রসঙ্গত, আজকে যেখানে “দেশী দশ” দোকানটি, সেখানে একসময় কনসার্ট হতো সেই খোলা জায়গাটিতে। অ্যালবাম মুক্তির পর সভ্যতা সেখানে প্রায় চার-পাঁচশো লোকের সামনে দাঁড়িয়ে গানটি গাইলেন। সেই প্রথমবারের মতো সভ্যতা মানুষের একসাথে এতো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গান গেয়েছিলেন।

গান গাওয়ার ব্যাপারটা এর আগে সভ্যতা এর কখনো সিরিয়াসভাবে নেননি। গান বানিয়েছে অনেক, কিন্তু কখনো সিরিয়াসভাবে নেননি। অর্ণবের এই অ্যালবামে কাজ করার আগে সভ্যতা কখনো বুঝতেই পারেননি যে তার গান গাইবার মতো গলা আছে, তিনিও গান গাইতে পারেন। সেখানের থেকে একটা অনুপ্রেরনা এবং কনফিডেন্স পাবার পর সভ্যতা এবার সঙ্গীত মনোনিবেশনে ভালোভাবে মনোযোগ দিলেন।

মগবাজার ইস্পাহানী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর তার বাবা তাকে ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারে গুরু “অর্ণব চ্যাটার্জি” এর কাছে নিয়ে যান যিনি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিখাতেন। সভ্যতা এরপর দুইবছর উনার কাছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিখলেন এবং কলেজে পড়াকালীন সময়ে ওয়ারফেইজের বর্তমান কিবোর্ডিস্ট “শামস মনসুর ঘানী” এর কাছে পিয়ানো শিখতেন। পিয়ানোতে অনুপ্রেরনা এবং হাতেখড়ি সভ্যতার তাহসানের কাছে হলেও শামসের কাছে তিনি পিয়ানোর নোটস এবং পিয়ানো বাজানোর পিছনে ব্যাকরণ বেশী শিখেছেন।

কলেজে পড়ার দুই বছরে সে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং পিয়ানো পাশাপাশি একইসাথে শেখা চালিয়ে গিয়েছেন। তিনি পিয়ানো বেশ আগ্রহ নিয়ে শিখলেও উচ্চাঙ্গসঙ্গীত তার কাছে অনেকটা একঘেঁয়ে লাগতো। কিন্তু যেহেতু তিনি সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন তাই তাকে রীতিমতো জোর করে হলেও শিখতে হয়েছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে শিখতে শিখতে তিনি উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রেমে পড়ে যান। সভ্যতার ভাষ্যমতে,

“এতো ট্রিকি, এতো কঠিন এটাকে উদ্ভাবন করতে অনেক মজা লাগা শুরু হলো আস্তে আস্তে।

পরে কলেজ শেষ করে এডমিশনের সময় পরিবার থেকে সভ্যতাকে বলা হলো চারুকলার ভর্তি কোচিং করার জন্য কিন্তু তিনি তখনো কোন ছবিই আঁকতে পারতেন না। যেখানে স্কুল-কলেজে বোরিং লেকচার ক্লাসে মানুষ খাতার পিছনে বা কোনায় ছবি আঁকে, অযথা দাগাদাগি করে, তিনি অনেক কবিতা, ছড়া লিখেছেন কিন্তু কখনো অযথা দাগাদাগি বা আঁকাআঁকি করেননি। এতোটাই আনাড়ি বা অপটু ছিলেন তিনি ছবি আঁকায়। তাও তিনি ভর্তি হলেন চারুকলা এডমিশন কোচিংয়ে।

কিন্তু কোচিং করতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলেন যখন দেখলেন তার আশেপাশের সবাই এতো ভালো আঁকে যে ভবিষ্যৎ পাবলো পিকাসো হবে, সেখানে তিনি উপর থেকে নিচে সোজা দাগও দিতে পারতেন না ঠিকভাবে। তিন মাস শুধু সোজা দাগ দেয়া প্র্যাকটিস করলেন তিনি যেখানে বাকিরা ফিগার ড্রয়িংয়ে চলে গিয়েছিলো। তিনি এসব দেখে এতো হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন যে হতাশা কাটাতে তিনি “জিম মরিসনের” ব্যান্ড “দ্যা ডোরস” শুনতেন অনেক সেই সময়ে। এই জন্যই সেই সময় তখন তিনি জিম মরিসনের মতো করে সামনের চুল কেটে ফেলেন। তিনি তারপর তার বাবার কাছে বলেন তিনি আর সেই চারুকলা কোচিংয়ে যেতে রাজী নন, তিনি মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করতে চান। সভ্যতার ভাষ্যমতে,

“ওরা বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে যদি ওরা চারুকলায় পড়তে পারে। আমি বড় হয়ে মিউজিসিয়ান হবো, আমি মিউজিক পড়তে চাই”

যেহেতু খোদা বক্স সানু একজন সঙ্গীতশিক্ষক ছিলেন এবং “রবীন্দ্রভারতী” থেকে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনাও করেছিলেন, তিনি তার নিজ অভিজ্ঞতার থেকে সভ্যতাকে বলেছিলেন যে মিউজিক নিয়ে পড়ালেখা করা এতো সহজ না যতোটা উৎসাহ নিয়ে সভ্যতা তখন পড়তে চাচ্ছিলেন, হয়তো সেটা তেমন না-ও হতে পারে যেমনটা সভ্যতা তখন মনে করছিলেন।

তারপরেও সভ্যতার জেদ তিনি মিউজিকই পড়বেন। তার বাবা তাকে বললেন তিনি ভেবে দেখতে কিছু সময় নিতে চাচ্ছেন।

সভ্যতা তখন থেকে চারুকলার কোচিং বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ডি-ইউনিটের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেন। ততোদিনে সভ্যতার হাতে একেবারেই কম সময়, মাত্র বত্রিশ-তেত্রিশ দিন সময় ছিলো এবং তিনি উঠেপড়ে লেগে গেলেন প্রস্তুতি নিতে।

এবং আরেকটা যেই কারণ সভ্যতাকে মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো তা হলো, তিনি হলিক্রস কলেজে পড়তেন এবং তার সময় হলিক্রস প্রথম হয়েছিলো ঢাকা বোর্ডে এবং তার সামনে, পিছনে, আশেপাশে ক্লাসের সবাই এ-প্লাস পেয়েছিলো এইচএসসিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোন কারণে তার এ-প্লাস মিস যাওয়ায় তিনি অনেক বেশী ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তার মন খারাপ অবস্থাটা হলিক্রস কলেজের বাংলার শিক্ষক সিস্টার শিখা খেয়াল করেছিলেন। প্রসঙ্গত যে, সিস্টার শিখা বর্তমানে হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তিনি সভ্যতাকে তার মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করার পর সভ্যতা তাকে উত্তর দেন যে তার এ-প্লাস মিস গিয়েছিলো। তখন তাকে সিস্টার শিখা বলেন,

“যে বড় হয়ে মিউজিসিয়ান হবে, তার এ-প্লাস পাওয়া লাগে না।”

সভ্যতা সিস্টার শিখার এই কথাটায় এতো অনুপ্রেরিত হয়েছিলেন যে তিনি আসলেও মিউজিক পড়ার কথা ভেবে উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিলেন।

অবশেষে তার পরিশ্রম সফল হলো এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-ইউনিটে চান্স পেয়ে, সাবজেক্ট চয়েজে মিউজিক দিয়ে সেই মিউজিক ডিপার্টমেন্টেই অবশেষে ভর্তি হলেন। তার বাবা তারপরেও বলেছিলেন তিনি ইংলিশ লিটারেচার পড়তে চান কিনা, তাহলে তিনি সভ্যতাকে কোন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিবেন। সভ্যতা তখন তাকে বললো  সেটা তো অনেক পড়া, তিনি কিভাবে দুইদিকে সামাল দিবেন?

যেহেতু সভ্যতা ইতিমধ্য উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিখছিলেন গুরু “অর্ণব চ্যাটার্জি” এর কাছে, তাই তার কাছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং স্নাতক লেভেলের অন্য যেকোন সাবজেক্ট পাশাপাশি পড়া কঠিন মনে হয়েছিলো। উনার বাবা এটা শুনে আর কিছু বললেন না তখন এবং সভ্যতা মিউজিক ডিপার্টমেন্টেই ভর্তি অবস্থায় থাকলো।

তার কিছুদিন তিনি সভ্যতাকে বলেন সভ্যতা যাতে আর কখনো উনার কাছে কোন সিদ্ধান্ত নিতে না যান কারণ তার বিশ্বাস সভ্যতা নিজের জন্য যেই সিদ্ধান্তই নিবেন না কেন, ঠিক সিদ্ধান্তটাই নিবেন এবং তার (সভ্যতার বাবার) চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিবেন। এতোটাই অগাধ বিশ্বাস ছিলো তার নিজের মেয়ের সিদ্ধান্তের প্রতি।

ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হবার পর সভ্যতার অনেক ঝামেলা হয়েছিলো প্রথমদিকে সবকিছুর সাথে। মিউজিক ডিপার্টমেন্টে ভর্তির পরে তিনি যেমনটা আশা করেছিলেন, প্রথমদিকে তার তেমনটা লাগে নাই। তার উপর উনার ডিপার্টমেন্টে সে এবং আর দুই-একজন ছাড়া আর বাকি সবাই ঢাকার বাইরের থেকে এসেছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, যেহেতু তিনি একটু ইন্ট্রোভার্ট ছিলেন তাই সবার সাথে মেলামেশায় অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। এছাড়া ক্লাসের কেউই মিউজিসিয়ান হতে চাচ্ছিলো না, সবাই বিসিএস পরীক্ষা দিবে অনার্স পাশ করে মানসিকভাবে এই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন বেশিরভাগই।

এসব মিলিয়ে প্রথম সপ্তাহেই অনেক বেশী হতাশ হয়ে পড়েছিলেন সভ্যতা যেহেতু অনেক কষ্ট করে প্রস্তুতি নিয়ে তিনি এই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলেন।

এভাবে আরো অনেক ঝামেলার মধ্য দিয়ে ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ কোনভাবে পার করেন সভ্যতা। ডিপার্টমেন্টে দ্বিতীয় বর্ষে মেজর নিতে হতো এবং তিনি পুরো ক্লাসে একা উচ্চাঙ্গসঙ্গীত মেজর হিসেবে নিয়েছিলেন। কেউ তখন উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিতে চাইতো না কারণ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়ে পাশ করা অনেক কঠিন ছিলো।

যেহেতু তার ক্লাসে তিনি একা উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়েছিলো তার মানে তিনি তার শিক্ষকদের একমাত্র শিক্ষার্থী ছিলেন। তার শিক্ষক অনেকেই ছিলেন, তার মধ্য একজন বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী “প্রিয়াংকা গোপ”।

প্রিয়াংকা গোপ

প্রিয়াংকা গোপ সভ্যতাকে অনেক যত্ন করে অনেক প্রচেষ্টা দিয়ে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিখাতেন এবং সভ্যতাও একজন ভালো শিক্ষার্থীর মতো তার শিক্ষিকার কাছ থেকে সব পাঠ আদায় করে নিতেন। ভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষ থেকে একদম মাস্টার্স পযন্ত এই কারণে সভ্যতার অনেক ভালো সময় গিয়েছিলো।

প্রিয়াংকা গোপের গলা ছিলো সভ্যতার শোনা বাংলাদেশের সবচেয়ে “সুরেলা” গলা। সভ্যতা সেই জীবনটাই যাপন করতে চায় যেটা প্রিয়াংকা গোপ যাপন করেন। এতোটা ভক্তির পাত্র এবং অনুপ্রেরনা ছিলো প্রিয়াংকা গোপ সভ্যতার কাছে।

প্রিয়াংকা গোপের অ্যালবাম “চাঁদ জানলা”

মাস্টার্স শেষ করার পর সভ্যতার মনে হলো একটা অ্যালবাম বের করার সেটাই সবচেয়ে উপযোগী সময়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তার কোন স্পন্সর ছিলো না, একটা অ্যালবাম বের করলে পুরোটা তার নিজের পকেটের টাকার থেকে বের করতে হবে। যেখানে তার নিজের কাছেও যথেষ্ট পরিমাণ টাকা ছিলো না একটা অ্যালবাম বের করার মতো।

ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে অনেক জিঙ্গেল গেয়েছিলেন তিনি কিন্তু সেখানের থেকে উপার্জিত টাকা দিয়েও হচ্ছে না একটা পুরো অ্যালবাম করার টাকা।

এছাড়াও মাস্টার্স শেষ করার সময় অ্যালবামের জন্য গান বানাতে বানাতে সভ্যতা “শাহরীন শাহরিয়ার” এর কাছে ভয়েস ট্রেনিং নিচ্ছিলেন কারণ তিনি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিয়ে পড়ালেখা করেছিলো এবং চর্চা করায় তার গলা ওয়েস্টার্ন গাওয়ার জন্য তখনো প্রস্তুত ছিলো না যেখানে তার লেখা এবং বানানো গানগুলো সব জ্যাজ, ইন্ডি-টাইপের ওয়েস্টার্ন ধাঁচের হচ্ছিলো।

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

বাঁদিক থেকে রাজ, সভ্যতা, সামিউল ওয়াহিদ শোভন (পিছনে) এবং শাহরীন শাহরিয়ার

অ্যালবামের কাজে ড্রামসের জন্য সভ্যতা তখনকার মেটালমেইজের ড্রামার সামিউল ওয়াহিদকে বলেন মিউজিক বিটস কম্পোজ করতে, বেইজের জন্য অলিস্টার সরকার রাজ কে বললেন তার বেইজে গ্রুভি কিছু দরকার এবং এভাবেই তারা সবাই মিলে “এখানে পথ আমার” এবং “যদি থাকতো ডানা” গান দুটো কম্পোজ করে গ্রামীনফোনের কাছে যান স্পন্সরশিপের জন্য।

যদিও একদম প্রথমদিকে “এখানে পথ আমার” গানটির কম্পোজিশন বর্তমান গানটির কম্পোজিশনের মতো ছিলো না, তখন সেটা তৎকালীন মেটালমেইজের গিটারিস্ট এবং অর্থহীন ও ট্রেইনরেক এর ড্রামার মার্ক ডন ডেমো টেপ হিসেবে কম্পোজ করে দিয়েছিলেন গ্রামীনফোনে সাবমিশনের জন্য এবং কম্পোজিশনটা অন্যরকম ছিলো তখন।

সাবমিশনের পর গ্রামীনফোন শুনে সভ্যতাদের জানালো তাদের তারা অ্যালবাম বানানোর জন্য স্পন্সরশীপ দিবে কিন্তু সভ্যতাদের একমাসের মধ্য অ্যালবামটা নামাতে হবে একটা মিউজিক ভিডিওসহ এবং মিউজিক ভিডিওটা “এখানে পথ আমার” এরই হতে হবে।

এটা শোনার পর সভ্যতারা সবাই একটু চিন্তায় পড়লেন কি করে তারা একমাসে এতো কাজ করবেন সেটা ভেবে। তারা একটা রুটিন করে সেই একমাস কাজ করেছিলেন অ্যালবামের জন্য। সেই একমাস তারা সবাই একসাথে ছিলেন শাহরীন শাহরিয়ারের মিরপুরের বাসায়। সেখানে তারা খাওয়া, ঘুম আর অ্যালবামের কম্পোজ ছাড়া আর কিছু করেননি। এভাবে প্রথম পনেরোদিনে তারা মিক্সিং-মাস্টারিং বাদে অ্যালবামের সব কাজ করে ফেলেছিলেন এবং বাকী পনেরোদিন গিয়েছিলো উনাদের অ্যালবামের মিক্সিং-মাস্টারিং এর কাজে।

প্রসঙ্গত যে অ্যালবামের প্রথম গান “কতোটা দিন” গানটি একদম প্রথমদিকে প্রথম গান অ্যালবামে প্রথম গান হিসেবে থাকার কথা ছিলো না কিন্তু সেই গানটি ছিলো সভ্যতার সবচেয়ে পছন্দের গান। এবং সেই অ্যালবামের সেটাই ছিলো সবচেয়ে নতুন গান এবং তাই সেটিই পরে অ্যালবামের প্রথম গান হিসেবে ঠিক হয়। কতোটা দিন-এর লিরিক্সের প্রথম প্যারাটা সভ্যতা অনেক আগেই বানিয়ে রেখে দিয়েছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় প্যারাটা আসছিলোই না তার মাথায়। প্রথম প্যারা লিখার পরের দুই এক বছর অনেক লিখেছেন, কাটাকাটি করেছেন কিন্তু কোনটাই পছন্দ হচ্ছিলো না যেখানে প্রথম প্যারাটা খুবই পছন্দ হয়েছিলো তার নিজেরই। সে গানটিকে অ্যালবামের থেকে বাদও দিতে চাচ্ছিলেন না গানটি খুবই প্রিয় হওয়ায়। আর এছাড়াও অ্যালবামে মাত্র ছয়টি গান হয় “কতোটা দিন” বাদ দিলে যা একটা অ্যালবামের জন্য খুবই কম।

এর মধ্যই শাহরীন শাহরিয়ারের বাসায় সভ্যতারা থাকাকালীন সময়ে রাত ৪.৩০টায় “মন খারাপের বাক্স” এর লাইভ টেক দিয়েছিলেন। সভ্যতা গেয়েছিলেন আর শাহরীন শাহরিয়ার পিয়ানো বাজিয়েছিলেন একই সাথে আর সেটা রেকর্ড হচ্ছিলো। স্টুডিওতে সভ্যতার গাওয়া অবস্থায় পায়ের কাছে সামিউল ওয়াহিদ ঘুমাচ্ছেন, আরেকদিকে বেজিস্ট রাজ ঘুমাচ্ছিলেন, আর শাহরীন শাহরিয়ার পিয়ানো বাজাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় মন খারাপের বাক্স গানটি রেকর্ড করা হয়েছিলো।

সেটা রেকর্ডের পর সবাই ঘুমাতে গেলে তন্দ্রা অবস্থায় সভ্যতার মাথায় কতোটা দিনের দ্বিতীয় প্যারাটি  এসেছিলো।

“তুলিতে আমার রঙ লেগেছে, অচেনা ক্যানভাসে গল্প লিখেছে,
ইচ্ছেমতো গল্প ভাঁজে, একে একে শব্দ বসেছে।“

তার তখন এটা কিভাবে পিয়ানোতে বসাবে সেই কথা মনে হওয়ায় সে তখনই গিয়ে শাহরীন শাহরিয়ারকে ডেকে তুললেন কারণ অনেকদিন পর সভ্যতার মাথায় নতুন কিছু এসেছে। শাহরীন শাহরিয়ার সেটা শুনে পছন্দ করায় তখনই সেকেন্ড প্যারা তারা কম্পোজ করে ডেমো রেকর্ড করে ফেললেন না হলে পরে ভুলে যেতে পারেন এই ভয়ে। সকালে উঠে বেজিস্ট রাজ আর পারকাশনিস্ট শোভন শোনার পর তাদেরও বেশ ভাল লাগলো। তারপর সবাই মিলে সবার কাজ করে পুরোটা রেকর্ড করে অ্যালবামে সংযুক্ত করলেন সেই ট্রাকটি এবং সেই সাথে অ্যালবামের কাজ শেষ হলো।

এর মধ্য রিলিজ পেলো “এখানে পথ আমার” এর মিউজিক ভিডিওটি।

এরপর গ্রামীনফোনে অ্যালবামটা বের হলো। ২০১৭ সালের মার্চে অ্যালবামটি বের হবার কথা থাকলেও সেই বছরের জানুয়ারীতে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন সভ্যতা।

দুর্ঘটনার সময় সভ্যতা কালারস এফএম-এ যাচ্ছিলেন, সেখানে একটা লাইভ শো ছিল তার। কালারস এফএম এর অফিস সেগুনবাগিচায়। আর মগবাজারের বাসা থেকে তার স্কুটি দিয়ে কাকরাইল হয়ে যাবার সময় কাকরাইল মসজিদের সামনে এক্সিডেন্টটা করেছিলেন সভ্যতা। একটা সিমেন্ট মিক্সিং ট্রাক জ্যামে পড়ে পার্ক করা ছিলো প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে। সভ্যতা ট্রাক পার্ক করা দেখে সেই ট্রাকের এবং আরেকটা গাড়ির মাঝে দিয়ে তার স্কুটি নিয়ে যাবার সময় হঠাৎ জ্যাম ছেড়ে দিলে তার সামনের গাড়িটি কোন কারণে স্টার্ট হচ্ছিলো না কিন্তু ট্রাক ড্রাইভার তার ডানদিকে কেউ আছে কিনা না দেখেই ট্রাকটির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ট্রাক চালু করে দেন এবং ট্রাকটি সভ্যতার বাম পায়ের উপর উঠে যায় এবং তখন সভ্যতা তাকে হ্যান্ডব্রেক চেপে ধরতে বললে সে হ্যান্ডব্রেক চেপে ধরে বলে, “মা, তোমাকে আমি নিচে দেখি নাই।”

সভ্যতার বাবা খোদা বক্স সানু স্যার মারা যান ২০১৪ সালে এবং এরপর থেকে সভ্যতাকে কেউ “মা” বলে সম্বোধন করলে সভ্যতার একটা মায়া জন্মাতো তার উপর। সভ্যতা যখন দেখলেন ট্রাক ড্রাইভারটি তাকে মা বলে ডাকছেন এবং ভালো ব্যবহার করছেন তার সাথে, তখন তিনি চেঁচামেচি না করে ট্রাক ড্রাইভারকে বললেন ট্রাকটি পিছনে নিতে। ট্রাক যখন পিছনে যায়, তখন সভ্যতার পায়ের আরেকটা হাড্ডি ভাঙল। তারপর সভ্যতাকে সেখান থেকে বের করা হলো এবং বের করে দেখা গেলো পা পুরো ফুলে গেছে এর মাঝেই।

সভ্যতা রমনা থানায় ফোন দিলেন তার এক ছাত্রের বাবাকে যিনি সেখানের একজন অফিসার ছিলো যাতে তিনি এসে তার স্কুটি এবং ট্রাক ড্রাইভারকে নিয়ে যায় এবং সভ্যতা কালারস এফএমে ফোন দিলেন যাতে তাকে সেখান থেকে নিয়ে যায় হাসপাতালে ভর্তির জন্য যেহেতু কালারস এফএমই সবচেয়ে কাছে ছিলো তার সেখান থেকে। এক্সিডেন্ট করার পর সেই মুহূর্তে সভ্যতার মাথায় একটা জিনিসই কাজ করছিলো এবং সেটি হচ্ছে, “আমি লাইভটা মিস করলাম।”

তারপর সভ্যতা ফুটপাথে বসে সন্ধি এবং তার কাজিনদের সবাইকে কল দিলো যে আগে এসে তাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেলো পায়ের টিবিয়া-ফিবুলা টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তার তার পা প্লাস্টার করে তাকে ছয় মাসের বেড রেস্ট দিয়েছিলেন।

সভ্যতা যেই মানুষ এক সেকেন্ড এক জায়গায় বসে থাকতে পারতেন না তাকে সেই জায়গায় পুরো ছয় মাস বেড রেস্ট দেয়ায় তিনি অনেক হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন। উনাকে যখন মাসে একবার চেকাপের জন্য হাসপাতালে নেয়া হতো, আকাশ দেখে তিনি খুশি হয়ে যেতেন যেহেতু এছাড়া সারাক্ষন বাসায় বেড রেস্টে থাকতে হতো। আবার তার অ্যালবাম মার্চে বের করার কথা ছিলো কিন্তু তিনি পারছিলেন না, তাই তিনি সেই পায়ের প্লাস্টার নিয়েই টিএসসি গিয়েছেন অ্যালবাম লঞ্চিং ডেট পিছানোর জন্য যেহেতু তার অ্যালবাম লঞ্চ এর ভেন্যু ঢাবি’র ইনডোর সুইমিং পুলে ছিলো। ডেট চেঞ্জ করার সময় তার ব্যান্ডের বেজিস্ট অলিস্টার রাজ তাকে কোলে নিয়ে যাওয়া আসা করেছিলেন। এমনকি এই ভাঙ্গা পা নিয়ে যোগ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনেও!

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমার্তনে হুইলচেয়ার নিয়েই চলে গিয়েছিলেন সভ্যতা (ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া ছবি)

পা ভাঙ্গার পরে সভ্যতা জীবনটাকে অন্যভাবে দেখা শুরু করলেন। তার মনে হলো যখন যেটা ইচ্ছে, করে ফেলা উচিৎ জীবনে কারণ কখন কী হয় জীবনের কেউ বলতে পারে না। সেই সময় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ায় তাকে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো কাউন্সিলিংয়ের জন্য এবং সাইক্রিয়াটিস্ট একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে তার এমন কি এমন কখনো করতে ইচ্ছে হয়েছে যা সে কখনো জীবনে করতে পারে নাই? সভ্যতা উত্তর দিলেন,

“আমি ছবি আঁকতে পারি নাই কখনো, আমার পক্ষে ছবি আকা সম্ভব হয় নাই কখনো।”

তাকে তখন সাইক্রিয়াটিস্ট বললো এই কয়দিন ছবি আঁকতে বাসায় বসে।

তখন সে অসুস্থ থাকার জন্য উনার বড় বোন স্বাগতার খুব ভালো একজন বন্ধু “লিটন কর” যিনি কিনা একজন সেট ডিজাইনার এবং অয়েল পেইন্টার ছিলো দেখতে এসে এই কথা জানতে পেরে তার জন্য দুটি ক্যানভাস, দুটি তুলী এবং এক বক্স রঙ সভ্যতার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেটা দিয়েই সভ্যতা আঁকাআঁকি করতেন সারাদিন বাসায় এবং সেভাবেই ছয় মাস তিনি কাটিয়েছিলো গান বানানো ছাড়া।

সভ্যতার পা ভাঙ্গা অবস্থায় তাকে সারপ্রাইজ দিয়ে একটা “এক ডিশ, দুই কুক” এর একটা এপিসোডও ছিলো।

অবশেষে উনার পায়ের প্লাস্টার খোলা হয় জুন মাসে এবং জুলাইয়ে তিনি তার অ্যালবাম “যদি থাকতো ডানা” বের করার সিদ্ধান্ত নেন। পায়ের প্লাস্টার খোলার পরেও তার লাঠি লাগতো চলাফেরা করায়, এমনকি অ্যালবাম লঞ্চিং এর সময়েও তাকে লাঠি হাতে দেখা গিয়েছিলো।

প্রসঙ্গত যে সভ্যতার অ্যালবাম “যদি থাকতো ডানা” এর প্রচ্ছদ সভ্যতার কলেজের জুনিওর মেলিনা দৃতি গোমেজ এর আঁকা যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ছিলেন।

সভ্যতা চেয়েছিলেন তার অ্যালবামের প্রচ্ছেদে তার ছবি থাকবে না কিন্তু এমন কিছু থাকবে যা তাকে তুলে ধরে এবং পুরো অ্যালবামের ভাবটাকে তুলে ধরে এবং সেভাবেই সে মেলেনাকে বলে দিয়েছিলো কিছু একটা এঁকে দিতে।

তখন মেলেনা বর্তমান অ্যালবামের প্রচ্ছদটা এঁকে দেন যা হচ্ছে একটা লাল কনভার্সের দুই পাশে দুটি পাখা বা ডানা।

যদি থাকতো ডানা সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

কারণ সভ্যতা অনেক কনভার্স পরতেন এবং পছন্দ করতেন এবং অ্যালবাম আর্টটি দেখার সাথে সাথে পছন্দ করে ফেলেন সেই ছবিটা নিজের অ্যালবামের প্রচ্ছদ হিসেবে।

অবশেষে যখন অ্যালবাম লঞ্চিং ডেট আসলো, সভ্যতা চেয়েছিলেন তার অ্যালবাম লঞ্চিংটা এমন হওয়া উচিৎ যাতে মানুষের একটু অন্যরকম লাগে।

সভ্যতাদের একটা ফাউন্ডেশন আছে “Treeism Foundation” নামে। সভ্যতার মনে হলো এই ট্রিইজম ফাউন্ডেশন মানুষের আরো চেনা উচিৎ। তাই তিনি তার অ্যালবাম বের করার সময় অ্যালবামের সাথে একটা করে গাছের চারা ফ্রি দিবেন ঠিক করেছিলেন এবং সেই অনুসারেই অ্যালবাম লঞ্চিং ভেন্যুতে অ্যালবাম এর সাথে সবাইকে একটা করে গাছ দিয়েছিলেন তিনি। সভ্যতা ভেবেছিলেন কেউ তার অ্যালবাম কিনবে না। যদি ১০টি অ্যালবামও বিক্রি হয়, তাহলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করবেন। প্রথমদিনেই লঞ্চিং পোগ্রামেই ২৫০ সিডি বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো।

)

এখান থেকে অ্যালবামের পিছনে খরচের টাকা এবং অ্যালবাম লঞ্চিং প্রোগ্রামের টাকা উঠে যায়। পরে ২০০ অ্যালবাম তিনি হোম ডিলিভারি দিয়েছিলেন। এবং তিনি ১০০ সিডি ভারতের কলকাতায়ও বের করেছিলেন।

সভ্যতার কলকাতায় অনেক ফ্যান-ফলোয়ার রয়েছে যারা তাকে বলেছিলো ইউটিউব বা ফেসবুক পেইজের পোষ্টে কমেন্ট করে অনুরোধ করে যাতে সে কলকাতায় যায়। তখন সভ্যতা ভাবছিলো কলকাতায় সে কিভাবে যাবে যেহেতু কোন স্পন্সর বা কিছু ছিলো না তার, বা কেমন পরিমান মানুষই বা চিনবে তাকে সেখানে সে গেলেও। পরে তারপরেও সভ্যতা নিজের থেকেই নিজ উদ্যোগে কলকাতায় একটা ছোটখাটো আয়োজন করলো তার অ্যালবাম সেখানে রিলিজ করার জন্য। সেখানে সে তার পুরো ব্যান্ডের ভিসা-পাসপোর্ট ঠিক করিয়ে, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে পুরো ব্যান্ড নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন।

তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন যে এতোগুলো মানুষ নিয়ে গিয়েছিকেন তিনি সেখানে, তাদের পুরো খরচ সে একা বহন করছিলো। তিনি বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বুঝেন যে কিভাবে কি হয় কিন্তু তিনি তখন সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক ভিনদেশে যেখানের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তার কোনপ্রকার ধারনা বা কিছুই ছিলো না।

সেখানে গিয়ে অ্যালবাম লাঞ্চিং ভেন্যুতে অ্যালবাম লাঞ্চিং এর সময় সবচেয়ে অবাক এবং খুশি যেটা দেখে হয়েছিলেন সভ্যতা, তা হচ্ছে তার সেখানে তার স্টেজের সামনে কয়েকজন বসে ছিলেন যারা পুরো অ্যালবামটা আগে আইটিউন বা স্পটিফাই থেকে শুনে লিরিক্স মুখস্ত করে তার সাথে গেয়েছিলো।

কলকাতায় সভ্যতার একটা বড় পাওয়া যেটা ছিলো তা হচ্ছে, বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী “অঞ্জন দত্ত” কোন একভাবে জানতে পেরেছিলো সে কলকাতা যাচ্ছে এবং তার অ্যালবাম লঞ্চিং এর সমস্য ভেন্যুতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। এবং সভ্যতা তার অ্যালবামের একটা কপি নিজে অঞ্জন দত্তের হাতে গিফট হিসেবে তুলে দিতে পেরেছিলেন।

এটা সভ্যতার জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া ছিলো কারণ সে ছোটবেলার থেকে অঞ্জন দত্তের গান শুনে বড় হয়েছে, গান গেয়ে গিটারে তুলেছে।

এবং কলকাতায় অ্যালবাম লঞ্চিং এর এই পুরো ব্যাপারটাই দেশে অ্যালবাম বিক্রির টাকা দিয়ে করেছিলেন তিনি, কোন টাকা নিজের পকেট থেকে নেননি।

সভ্যতার অ্যালবাম বের করার আগে অনেকেই ওকে বলেছিলো কেউ এখন আর অ্যালবাম কিনে না, অ্যালবাম এখন আর চলে না তার উপর সভ্যতা একা অ্যালবাম বের করেছে যেহেতু তার কোন লেবেল ছিলো না। তার অ্যালবামের উপর স্টিকারগুলো সব তার কাজিনরা তার বাসায় বসে বসে লাগিয়েছে অ্যালবামের উপর।

গায়ক “জয় শাহরিয়ার” এর একটা প্রোডাকশন হাউস আছে “আজব রেকর্ডস” নামে। তিনি সভ্যতাকে বলেছিলেন সে সেখান থেকে বের করতে চায় কিনা। তখন সভ্যতা তাকে বলেন না, সে নিজে একাই বের করবেন তার অ্যালবাম। তখন সে তাকে অনেক খোঁজ দিয়েছে কোথায় কি করে এবং কোথায় কি করানো যায়। তারপর জয় শাহরিয়ারের এসিসটেন্ট ফরহাদ সভ্যতার ৫০০ সিডি রাইট করে নিয়ে আসে বাকিটা সভ্যতা নিজে অন্য কোথাও থেকে রাইট করিয়ে নিয়েছিলেন।

এখান থেকে আমরা জিনিসটা বুঝতে পারি যে অ্যালবাম এখনো বিক্রি হয়, মানুষ এখনো অ্যালবাম কিনে। এই প্রসঙ্গে সভ্যতা বলেন,

“কথাটা ভুল যারা বলে অ্যালবাম কেউ কিনে না, যার কেনার সে অবশ্যই কিনে।”

ভারত থেকে দেশে ফেরত আসার পর থেকে বর্তমানে সভ্যতারা যেটা করছেন বা করতে চেষ্টা করছে, তা হচ্ছে তারা অনেক জ্যাজ এর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন আগের সেটাপ এবং জনরা পরিবর্তন করে। সেটা নিয়ে তারা কাজ করছেন এবং নিজেদের সাথে নিজেরা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। সেটার ফলাফল গত বছরের ২৭ই জুলাইয়ে যাত্রা বিরতির প্রথম শো-তে দেখা গিয়েছে। অনেক অন্যরকম কম্পোজিশন ছিল। আর পেইড-শো হবার পরও দেখতে যাত্রা বিরতি পুরো হাউসফুল হয়ে গিয়েছিলো।

আর এর ফাঁকে ফাঁকেই বেশ বড় একটি কাজ অবশ্য সেরে ফেলেছেন সভ্যতা। ২০১৭ সালের ২৮শে জুলাই গাঁটছড়া বাঁধেন পুরনো বন্ধু এবং তার ব্যান্ডের ড্রামার সামিউল ওয়াহিদ শোভনের সাথে।

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

সভ্যতার বিয়েতে একদম বাঁদিকে থেকে ভাই সন্ধি, সভ্যতা, সামিউল ওয়াহিদ শোভন, এবং বড় বোন স্বাগতা। (ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া)

সামিউল ওয়াহিদ শোভন সভ্যতার সাথে ড্রামস বাজানোর পাশাপাশি মেটালমেইজ এবং ব্ল্যাকেও ড্রামস বাজিয়েছেন। বর্তমানে “সি-স কোয়ার্টেট” জ্যাজ গ্রুপের সাথে ড্রামস বাজাচ্ছেন।

সন্ধি এবং সভ্যতারা এখনো তাদের বাবার প্রতিষ্ঠিত বাচ্চাদের গানের স্কুল আনন্দম সংগীতাঙ্গন পরিচালনা করেন।

আনন্দম সঙ্গীতাঙ্গন নিয়ে সভ্যতাদের একটি ছোট ডকুমেন্ট্রির ভিডিও দেখে নিতে পারেন এখানেই:

নতুন সব গান নিয়ে নতুন কম্পোজিশনের সাথে সভ্যতা কিছু সময় নিচ্ছেন নতুন অ্যালবামের কাজ শুরু করার জন্য। স্পন্সর না থাকায় একটু দেরী হচ্ছে।

সভ্যতা’র ডিস্কোগ্রাফী:-

সভ্যতার এই পযন্ত একটি অ্যালবামই বের হয়েছে, এবং বেশ কিছু সিংগেল কম্পাইলেশন অ্যালবাম বা কমার্শিয়াল ট্র্যাক আকারে বের হয়েছে।

স্টুডিও অ্যালবামটি হলো,

“যদি থাকতো ডানা” এর ট্র্যাকলিস্টঃ

১. কতটা দিন
২. এখানে পথ আমার
৩. জানিনা
৪. যদি থাকত ডানা
৫. আমাকে মুক্ত কর
৬. মন খারাপের বাক্স
৭. ত্রিরত্ন

সিঙ্গেলসঃ

১. কখনো মনে হয় (এক নির্ঝরের গান)
২. হায় হায় চাঁদমামা (এক নির্ঝরের গান)
৩. থেকে যায় ধুলোবালি (এক নির্ঝরের গান)
৪. মনে মনে অনুমানে (এক নির্ঝরের গান)
৫. আমি (এক নির্ঝরের গান)

সভ্যতার “যদি থাকতো ডানা” অ্যালবামের কপি কেনার জন্য সভ্যতার অফিসিয়াল পেইজে ইনবক্স করলেই হবে।

এছাড়াও বিভিন্ন আর্টিস্টের অনেক গানেরই অসাধারন সব কভার আছে সভ্যতার করা। সেসব তার ইউটিউব চ্যানেল বা সাউন্ডক্লাউড একাউন্টে গেলেই পাওয়া যাবে। তার অন্যান্য আর্টিস্টদের নিয়েও করা অনেক গানের কভাবে আছে, নিচে তাদের একটা গান “স্বাধীনতার গান” এর লিংক দেয়া হলো। সেটা চারটি ভিন্ন আর্টিস্টের চারটি দেশাত্মবোধক গানের কভার করা ম্যাশাপ।

লাইনআপঃ

মিউজিক সিনে আসার পর বিভিন্ন সময়ে অনেকেই ব্যান্ডের সাথে কাজ করে গিয়েছেন বা সংযুক্ত হয়েছিলেন সভ্যতা।

বর্তমান ব্যান্ড সদস্যঃ

ভোকালঃ- কারিশমা সানু সভ্যতা
ড্রামসঃ- সামিউল ওয়াহীদ শোভন
পিয়ানোঃ- প্রমিত রহমান
বেজঃ- অলিস্টার সরকার রাজ।
গিটারঃ- রাকিব মাহমুদ
স্যাক্সোফোনঃ- রাহীন হায়দার।

কারিশমা সানু সভ্যতা নিয়ন আলোয় neonaloy

সভ্যতা এন্ড দ্যা ব্যান্ড (সভ্যতার অফিসিয়াল পেজ থেকে নেওয়া ছবি)

————–

ফেসবুকের বিভিন্ন মিউজিক গ্রুপে ফ্যানদের কাছ থেকে আমরা অনেক প্রশ্ন যোগাড় করেছি, সেসব থেকে বাছাইকৃত কিছু প্রশ্ন আমরা সভ্যতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। নিচে সেগুলো দেয়া হলো।

কিছু মাস আগে দেশ টিভিতে লাইভ শো ছিলো একটা, এই অনুষ্ঠানটা ইউটিউবে কি পাবো?
সভ্যতাঃ এটা আমি বলতে পারি না, এটা দেশ টিভির ওরা জানে এটা আপলোড দিবে কি দিবে না।

আপনার এবং সন্ধি ভাইয়ের মিউজিকে আপনাদের বাবার প্রভাব কেমন?
সভ্যতাঃ আসলে বাবার মিউজিক্যালিটি কিন্তু অনেক ডিফারেন্ট। বাবা উচ্চাঙ্গসঙ্গীত টিচার ছিলো তাই বাবার মিউজিক্যালিটি অনেক অন্যরকম ছিলো। বাবা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলো, শিশু একাডেমীর টিচার ছিলো কিন্তু উনি উনার মিউজিক কখনোই আমাদের উপরে ওইভাবে জোর দেয় নাই। জোর দিলে হয়তো আমাদের উচ্চাঙ্গসঙ্গীতই শুধু করতে হতো। ওইটা ভিন্ন জিনিস যে আমি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পছন্দ করে ফেলেছিলাম কিন্তু শিখতে হয়েছে সবাইকে। বাপীর ব্যাপারটা হচ্ছে গিয়ে আমি যখন কোন মেটালিকার গান শুনি ক্লাস সিক্স-সেভেনে থাকতে তখন বাপী রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো এটা কার গান?
আমি বললাম এটা মেটালিকার গান।

তখন বাপী রুমে বসে পাঁচ মিনিট গানটা শুনলো এবং পরে বললো “ভালো গান”।

মানে, তার কিন্তু কোন আপত্তি ছিলো না এবং কারো মিউজিক্যালিটির উপর জাজ করেনি, জাজমেন্টাল ছিলোনা একদমই। তো, যেটার কারণে যেটা হয়েছে একে সে খুবই কঠোর ছিলো শেখার ব্যাপারে এবং শোনার ব্যাপারে বা মিউজিক্যালিটির ব্যাপারে সে একদম কঠোর ছিলোনা। তিনি শ্রেষ্ঠ পিতা ছিলেন। আমি জানি না আমি যদি কোনদিন মা হই, তার মতন প্যারেন্টিং করতে পারবো কিনা।

আমি এখন ভাবি আর অবাক হয়ে যাই যে কিভাবে এটা সে পারসে? এটা পারার জন্য অনেক ধৈর্য’র ব্যাপার আছে। আমাদের মতোন তিন বাচ্চাকে অনেক সহ্য করার জন্য অনেক ধৈর্যর দরকার।

তো প্রভাবটা এটাই যে সে কখনো আমাদেরকে বাধা দেয়নি জীবনে যে ঐরকম গান বাসায় কখনো শোনা যাবেনা বা ওইরকম গান বানানো যাবেনা এমন বাধা দেয় নাই কিন্তু জোর দিয়েছে যে না শিখে তুমি কোনকিছু করতে পারবে না। আকাশ থেকে পেয়ে গেলে এটা আকাশ থেকে চলে যায়। তাই তুমি যদি মিউজিসিয়ান হতে চাও, তোমাকে ঠিক করে মিউজিসিয়ান হতে হবে। ঠিক করে মিউজিসিয়ান হতে হলে তোমাকে ঠিক করে রেওয়াজ করতে হবে, শিখতে হবে। ওইটার উপর জোর দিয়েছিলো।

আপনার যখন এক্সিডেন্ট হয়েছিলো, যার কারণে আপনি ছয় মাস বেড রেস্টে ছিলেন, সেই সময় কোন গান লিখেছিলেন কি?
সভ্যতাঃ হ্যাঁ, লিখেছি। এর মধ্য কয়েকটা গানই বানিয়েছি। তাদের একটা গান বের হয়েছে, সেটা “এঙ্গেজড” নামের একটা নাটকের গান যার নাম “এই ভালোবাসা”। 

গানটা বানিয়ে আমি খুব খুশি ছিলাম। আমাকে বলা হয়েছে এরকম একটা কমার্শিয়াল গান বানাতে কিন্তু আমি কোনভাবে বানাতে পারছিলাম না। আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো যে কমার্শিয়াল এবং আমার নিজের মতোও হবে এমন কোন গান বানাতে পারবো কিনা কিন্তু পরে পারার পর ঐ গানটা নিয়ে আমি খুশি ছিলাম অনেক।

তারপরে আরো ২-৩টা গান আমি বানিয়েছিলাম পা ভাঙ্গার সময়ে যেগুলো আমার অনেক ভালো লেগেছিলো বানানোর পর। বেশিরভাগ গানের দ্বিতীয় প্যারা এখনো বানানো হয়নি, মাথায় আসছে না।

আপনার ইনফ্লুয়েন্স কারা ছিলো দেশী এবং বিদেশী উভয় আর্টিস্টের ক্ষেত্রে?’
সভ্যতাঃ ইনফ্লুয়েন্স আসলে অনেক, অনেক মানুষ ছিলো। এক এক বয়সে এক একজনের ইনফ্লুয়েন্স ছিলো। ডোরসের ইনফ্লুয়েন্স আছে, মেটালিকার ইনফ্লুয়েন্স আছে, পিংক ফ্লয়েডের ইনফ্লুয়েন্স আছে, ড্রিম থিয়েটারের ইনফ্লুয়েন্স আছে, অঞ্জন দত্তের ইনফ্লুয়েন্স আছে, নোরা জোনসের ইনফ্লুয়েন্স আছে।

বাংলাদেশের ব্ল্যাকের ইনফ্লুয়েন্স আছে, আর্টসেলের ইনফ্লুয়েন্স আছে, আর্কের অবশ্যই ইনফ্লুয়েন্স আছে।

আমি তো ছোটবেলায় পিয়ানো বাজাতাম এবং আর্কের অন্যতম বেস্ট পার্ট হচ্ছে পিয়ানো এবং এই জন্য অনেক ইনফ্লুয়েন্স আছে। দলছুটের সঞ্জীব চৌধুরীর ইনফ্লুয়েন্স আছে।

দলছুটের ইনফ্লুয়েন্স আমার চেয়ে বেশী অনেক বেশী ভাইয়ার (সন্ধি) উপর আছে। ওর যুগের মিউজিসিয়ান। অবশ্যই আমার উপর ইনফ্লুয়েন্স আছে কিন্তু সন্ধি ভাইয়া হচ্ছে অন্ধ ফ্যান দলছুটের।

আপনার ব্যান্ডের নাম কি?
সভ্যতাঃ সেটা তো আসলে কোন কমিটেড ব্যান্ড নাহ, আমরা বলি সভ্যতা অ্যান্ড দ্যা ব্যান্ড। ব্যান্ডে অনেক সময় অনেক আর্টিস্ট চেঞ্জও হয়। অনেকের অনেক সমস্যা থাকে অনেকসময় তাই আর্টিস্ট চেঞ্জ হয়। যে যেকোন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছুক এবং আমরাও যেকোন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছুক তাই এইদিক থেকে সব মিলে গেলে, সে অলোয়েজ ওয়েলকামড।

অ্যালবামের নাম “যদি থাকতো ডানা” কেন? মানে, এতো গান থাকতে এই গানটিই টাইটেল ট্র্যাক হিসেবে কেন পছন্দ হলো?
সভ্যতাঃ “যদি থাকতো ডানা” গানটি সবচেয়ে পুরান গান তাই সেটা টাইটেল ট্র্যাক ছিলো। এই গানটা আমি ২০০৬-এ লিখেছিলাম এবং কোরাসটা এসএসসি হলে লিখেছি। ২০০৮-এ পুরো গানটা বানানো। আর হয়না, তখন একটা ফেভারিট হয়ে যায়? তখন আমি “ছোট্ট একটা চায়ের কাপ” সহ তেমন আরো বিশটা গান বানিয়েছি কিন্তু এটা সবসময়ই প্রিয় ছিলো। নিজের কাছে এক্সপেক্টেশন থেকে আমি এটা আরো বেশী বানিয়েছিলাম। এ জন্য দশ বছর পরেও আমার কাছে এটা খারাপ লাগছে না শুনতে। এই জন্যই এটা টাইটেল ট্র্যাক এবং অ্যালবামের নাম “যদি থাকতো ডানা”।”। 

“কখনো মনে হয় ” এবং “আয় আয় চাঁদমামা” গান দুইটির পিছনে কি কোন গল্প আছে? শেয়ার করা যাবে থাকলে?
সভ্যতাঃ এটা হচ্ছে গিয়ে একশো একটা গান নিয়ে একটা অ্যালবাম আছে “এনামুল করিম নির্ঝর” এর। অ্যালবামের নাম হচ্ছে “এক নির্ঝরের গান”। এগুলো এনামুল করিম নির্ঝরের লেখা, সুর করা একশো একটা গান। সেখানে ২৫ জন মিউজিক ডিরেক্টর কাজ করেছে, ৪৬ জন সিঙ্গার গান গেয়েছে। ঐ অ্যালবামেরই গান হচ্ছে “কখনো মনে হয়” এবং “আয় আয় চাঁদমামা”। ওই অ্যালবামেরই আরেকটা গান আছে হচ্ছে “আমি”। সেটার একটা ফাটাফাটি মিউজিক ভিডিও আছে, না দেখে থাকলে দেখে নিও। এটা আমার কিছু না, নির্ঝর ভাই বলতে পারবেন তার লেখা এসব গানগুলোর পিছনের গল্প কি।

একটা গান কিভাবে সুর করেন আপনি? সুরের শুরুটা কিভাবে আসে আপনার কাছে?
সভ্যতাঃ এটা নির্ভর করে। কখনো সুরটাই মাথায় ঘুরে, নিজেই হুক-আপ হয়ে যাই সুরে। বাসায় গিয়ে এটাকে নিয়ে বসতে হবে এমন অবস্থা। অথবা কখনো গুঁতাগুঁতি করতে করতে, কর্ড নিয়ে গুঁতাগুঁতি করতে করতে কিছু একটার হামিং চলে আসে।

ফ্যানদের উদ্দেশ্য কিছু বলার আছে?
সভ্যতাঃ ফ্যানদের উদ্দেশ্য বলবো আমি খুব গ্ল্যাড যে উনারা আমার গান শুনে। আমি কোনদিন ভাবি নাই যে কেউ আমার গান শুনবে। আমি গান গাইবো আর মানুষ বসে বসে সেটা শুনবে আমি কোনদিন কল্পনা করি নাই। তাই মানুষ আমার গান শুনে এটা আমার এক্সপেকটেশনের চেয়ে অনেক বেশী। এবং আরো বলবো যে যিনি আমার গান শুনে তিনি আরো বেশী অনেক মানুষের গানই শুনে, আকাশ থেকে কেউ আমার গান শুনতে পারবে না। যেহেতু তারা গান শুনে, আমি চাইবো তারা যাতে পাইরেসী করে গান না শুনুক যেহেতু আমাদের অনেক অর্থের দরকার হয় সেসব বানাতে। যেমন এখন আমি অর্থ এবং স্পন্সরের জন্য অ্যালবাম বের করতে পারছি না। আমার পকেটে টাকা বা স্পন্সর থাকলে আমি অ্যালবাম বের করে ফেলতে পারতাম। তো কোন মিউজিসিয়ানের বা আর্টিস্টের পকেটে যদি টাকা না থাকে, সে আর্ট চর্চা করতে পারে না।

ভেবে দেখেন যে একটা বছরে কতোগুলো ডাক্তার বের হয়? কতোগুলো ইঞ্জিনিয়ার বের হয়? কতোগুলো বিজনেস স্টুডেন্ট বের হয়? আর কতোগুলো আর্টিস্ট হয় দেশে? যুগে একটা হয়। সেই আর্টিস্টের আসলে অনেক সাহায্যর দরকার হয়। কারণ সমাজের অনেক ট্যাবু থাকে, নিজের সাথে নিজের অনেক যুদ্ধ থাকে, অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে। এবং সে আর্টিস্ট হয়ে যাবার পরেও তার পকেটে পয়সা থাকেনা আরেকটা আর্ট বানানোর, পারফর্মিং আর্ট অনেক ব্যয়বহুল একটা জিনিস।

আমি চাইলেই নোরা জোনসের একটা অ্যালবাম কিনতে পারবো না আমেরিকা গিয়ে। কিন্তু যতোটুকু আমার সামর্থ্য আছে, যতোটুকু আমি পারি ততোটুকু আমার মনে হয় পাইরেসী না করে যার যেই সামর্থ্য আছে, ততোটুকু দিয়ে হলেও যাতে আমরা অ্যালবাম কিনি বা এমনভাবে গান শুনি যাতে করে আর্টিস্ট পয়সা পায়।

সেটা যেকোন ধরনের আর্ট হতে পারে। ছবি হতে পারে, কোন নৃত্যশিল্পীর নাচ দেখতে যেতে হতে পারে, গায়কের কনসার্ট দেখতে যেতে হতে পারে। সেটা যেকোন ধরনের আর্ট হতে পারে।

আমি সরকারের উদ্দেশ্যও বলবো আমাদের আর্টিস্টরা ইউটিউবে যে আমাদের গান দেই, সেটার যে টাকা আসবে সেই ব্যবস্থা নেই। যারা পায় তারা হয়তো বাংলাদেশ তাদের রেসিডেন্স দেয় না। দেয় অন্য কোন দেশ, এভাবে করে তারা টাকা পয়সা পাচ্ছে এখনো পর্যন্ত। কিন্তু আমি বাংলাদেশি, আমি কেন চাবো নিজেকে মালেশিয়ান বলতে বা নিজেকে আমেরিকান বলতে?

আমার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেয়া আমি বাংলাদেশি, আমার যেই ভিউয়ের টাকাগুলো আছে ইউটিউবের সেটা আমি এখনো পাই নাই কিন্তু পেয়ে যাওয়া তো উচিৎ ছিলো এতো বছরে। আমরা তো পৃথিবীর অন্যতম ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং কাউন্ট্রি, তো আমাদের পেয়ে যাওয়া উচিৎ, না?

এটা যদি আমি পেয়ে যাই তাহলে তো আর আমার দুঃখ থাকবে না যে কে আমার গান শুনলো, কে আমার গান শুনলো না।

————–

সবশেষে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, একজন মানুষের যদি সত্যি কোন শিল্প সাধনা করার ইচ্ছে থাকে মন থেকে, সে অবশ্যই সেখানে কিছু একটা করতে পারে কোন না কোনভাবে। স্পন্সর-সুযোগ-অবস্থা থাকুক আর না থাকুক, ইচ্ছে থাকলেই একটা না একটা উপায় হয়। বাংলা প্রবাদই তো আছে একদম এই কথাটা বোলে, না? আবার একজন শিল্পী হওয়া আসলেই কোন সহজ ব্যাপার না। শিল্পী হবার পর শিল্প সাধনার জন্য বাংলাদেশের মতো একটা দেশে অনেক সাহায্য সহযোগিতা লাগে। তাই পাইরেসী একজন শিল্পীর কাজের প্রতি যেমন একটা অপমান বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে, তেমনই একজন শিল্পীর প্রতিভা বিকাশ করার মানসিকতা ধংস করে দেয়। আসুন, আমরা পাইরেসী থেকে বিরত থাকি এবং পাইরেসী না করে যে যার যতোটুকু সামর্থ্য আছে, ততোটুকু দিয়ে হলেও একজন শিল্পীর কাজের এবং শিল্পীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা প্রকাশ করি।

নিচে সভ্যতার সব ধরনের সাইটের লিংক দেয়া হলো যেখানে তার এবং তার কাজের সব আপডেট পাওয়া যাবে এবং তার আজ পযন্ত করা সব কাজ পাওয়া যাবে।

সভ্যতার ফেসবুক পেইজের লিংক

সভ্যতার গানা একাউন্টের লিংক 

সভ্যতার ইউটিউব চ্যানেলের লিংক 

সভ্যতার সাউন্ডক্লাউড একাউন্টের লিংক

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top