টাকা-কড়ি

হয়তো আপনার হাতের চকলেটটি তৈরি করতে গিয়ে মারা যাচ্ছে একটি শিশু!

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

চকলেট ভালবাসে না এমন কোন মানুষ এই দুনিয়াতে আছে? বয়স্ক, গুরুগম্ভীর মানুষরাও সুযোগ পেলে টুপ করে মুখে পুরে দেন পছন্দের চকলেটটি। আর শিশুদের বা বাচ্চাদের তো কথাই নেই, শান্ত করার সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ হচ্ছে এই চকলেট। চকলেট পেলেই সবাই ঠাণ্ডা, সবাই খুশি। প্রিয়জনকে উপহার দিতে চকলেটের জুড়ি মেলা ভার।

কিন্তু জানেন কি? যেই চকলেট কিনছি আমি বা আপনি, সেই চকলেটটায় ১.৮ মিলিয়ন আফ্রিকান শিশু তাদের শৈশবটা র‍্যাপিং পেপারে মুড়ে ঢেলে দিচ্ছে আমার আপনার সন্তানের বা প্রিয়জনের মুখে। বুঝতে পারলেন না? চকলেটে আবার কিভাবে শিশুরা তাদের শৈশব ঢেলে দিচ্ছে! চলুন, জেনে আসা যাক কি চলছে আপনার আমার পছন্দের এই চকলেটের পিছনে। কত অশ্রু, কান্না আর আর্তনাদ জড়িয়ে আছে এই চকলেটের সাথে!

পশ্চিম আফ্রিকার দুই দেশ; আইভরি কোস্ট আর ঘানায় পৃথিবীর মোট কোকোর শতকরা সত্তর ভাগ চাষ করা হয়। প্রতিদিন মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, বেনিন, টোগো, নাইজারের মতো প্রতিবেশী দেশ থেকে হাজার হাজার বাচ্চা পাচার হয়ে যায় ঘানা, আইভরির কোকো ফার্মগুলোতে। শিশু পাচারে খুব কষ্টও করতে হয় না পাচারকারীদের। যে দেশে খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই; যে দেশ মা-বাবা টাকা উপার্জনে ব্যর্থ হলে ১০-১২ বছরের শিশুদের প্রহার করতে পারে, বাসা থেকে বের করে দিতে পারে, সে দেশে মা-বাবার অনুমতি না নিয়ে স্কুল, কাজ, ডলারের লোভ দেখিয়ে বা রাস্তা থেকে খুব সহজেই তুলে আনা সম্ভব বাচ্চাদের।

মালি’র সীমান্তবর্তী শহর জেগুইয়াতেই মূলত চলে শিশু পাচারের কাজটি। ছোট বাস কিংবা লরিতে করে বাজারে আসে পাচারকারিরা। দালালরা আগে থেকেই রেডি থাকে। গাড়ি আসা মাত্রই ভরে যায় সাত বছর বয়সী শিশু থেকে চৌদ্দ-পনেরো বছরের কিশোর-কিশোরীতে। তারপর সেই গাড়ি সীমান্ত পার হয়ে সোজা চলে যায় আইভরি কোস্টের কোকো ফার্মগুলোতে। ফার্মের মালিকরা দুইশত ত্রিশ ইউরো দিয়ে পছন্দমতো শিশুশ্রমিক কিনে নেন। এই দুইশত ত্রিশ ইউরোর মাধ্যমে কিনে নেয়া বাচ্চাটির সবকিছুর মালিক হয়ে যান ক্রেতা। কিন্তু এই দুইশ তিরিশ টাকা পুরোটাই যায় দালাল এবং বাসচালকের কাছে, যাদের কেনাবেচা করা হল তারা কানাকড়িও পায় না।

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

পিকআপ বোঝাই করে শিশুদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিক্রির উদ্দেশ্যে

সকাল ছটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয় এই বাচ্চাগুলোকে। খাদ্য বলতে সস্তার ভুট্টা সেদ্ধ আর কলা। রাতে জানোয়ারের মত জানলা দরজাহীন কাঠের আস্তাবলে ফেলে রাখা হয়, কখনো শিকল দিয়ে বেঁধে। পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম। বিশাল বিশাল কোকো ক্ষেত ঠাহর করতে পারে না এই শিশুরা, আর ক্ষেতের চারদিকে পাহারাদার, দালালরা তো থাকেই। যারা পালানোর চেষ্টা করে তাদের ভাগ্যে থাকে বেধড়ক মার। মার খেয়ে বা ধর্ষণে মরে গেলেও নিস্তার নেই। কারণ এমন পরিশ্রমে মারা যায় অনেক শিশুই, কিন্তু তাদের মৃতদেহ বের হয়ে গেলে তো মালিকেরই সমস্যা। তাই মারা যাওয়ার পর এই শিশুদের আস্তানা হয় নদী কিংবা ছুঁড়ে দেওয়া হয় কুকুরের মুখের সামনে।

শুনতে খারাপ লাগছে? আপনার শিশুটির মুখে লেগে থাকা চকলেটের খয়েরী দাগের দিকে তাকাচ্ছেন? ভাবছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিশুশ্রমের শাস্তি নিয়ে? ভেবে খুব লাভ হবে না। কারণ ইন্টারন্যাশনাল লেবার ল এখানে অকেজো।

সেই ২০০১ সালেই আইএলও (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) এর সাথে চকলেট তৈরির বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি স্বাক্ষর হয়, যা হারকিন এঞ্জেল প্রোটোকল (কোকো প্রোটোকল) নামে পরিচিত। এই প্রোটোকলে বলা আছে চকলেটের প্রধান উপাদান তথা কোকো উৎপাদন এবং প্রস্তুতকরণে শিশুশ্রমের ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর রাখতে হবে এবং কোন উৎপাদনকারী বা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শিশুশ্রমিক ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শিশুশ্রম বন্ধ করলে যে কম দামে কোকো পাওয়া যাবে না! তাই শিশুশ্রমের ব্যাপারটা এখানে ওপেন সিক্রেটের মতো। সবাই জেনেও বলবে “জানি না”।

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

হারকিন-এঞ্জেল প্রোটোকল, যেখানে সাক্ষর আছে বড় বড় সব চকলেট কোম্পানির কর্তাদেরও

না, কোন মায়া, ভালোবাসা নেই এখানে। আছে নৃশংসতা, আছে রক্ত। যা শুকিয়ে কালো হয়ে আছে আপনার আমার ফ্রিজে রাখা চকলেটে! বিশ্ববিখ্যাত চকলেট কোম্পানিগুলো- যেমন নেসলে, হার্শিজ এখান থেকে কোকো কেনে। প্রতিযোগিতার বাজারে কোকোর দাম কম রাখার জন্যই শিশু শ্রমিক দরকার। কারণ ৫-১২ বছর বয়সী শ্রমিকদের কিনে নেয়া হয়েছে পশুর মতো, বর্বরযুগের ক্রীতদাসের মত; তাদের মাসশেষে মজুরি দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তার ওপরে তারা কোকো ফিল্ডের দুর্গম জায়গায় যেতে পারে, যেখানে একটু বড়রা ঢুকতে পারবে না। হ্যাঁ, পোকা, সাপ আর বিছের কামড়ে বেশ কিছু বাচ্চা মারা যায়, কিন্তু তাতে মালিকদের কিছু যায় আসে না।

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলে এই কাজ

মালি, নাইজার, নাইজেরিয়া, টোগোর মতো দেশগুলোতে দারিদ্র্য থাকবেই, আর বাচ্চার যোগানও থাকবে। বড় কোম্পানিগুলো চুপ করে থাকবে সস্তায় কোকো পাওয়ার জন্য। আমরাও মজে থাকবো বিদেশী চকলেটের স্বাদে!

কি কাজ করতে হয় এই শিশুদের শুনবেন? ম্যাশেটে তুলে দেয়া হয় এই সব শিশুদের হাতে। ম্যাশেটে হল রামদা’র মত এমন একটি ধারালো অস্ত্র যা চালালে একটা শিশুকে কিমা বানিয়ে দেওয়া যায় কয়েক মিনিটে। এই বাচ্চাগুলোর হাতে ম্যাশেটে ধরিয়ে দেওয়া হয় কোকো বিন গাছ থেকে পেরে সেটাকে বস্তায় পুরে, ঝাড়াই-বাছাই করার জন্য। কোপ দিয়ে কোকো বিন কাটতে গিয়ে কারোর আঙুল কাটা যায়, কারোর গায়ে হয় গভীর ক্ষত। ১০ বছরের বাচ্চাকে পিঠে ১০০ কেজি’র বস্তা নিয়ে চলতে হয়। একটু বিশ্রাম নিতে গেলেই পিঠে চাবুক আছড়ে পড়ে।

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

নিজের চেয়ে বেশি ওজনের বস্তা বহন করা তো এদের প্রতিদিনকার কাজেরই অংশ!

কোকো ফার্মের শিশু শ্রমিকদের ৪০% মেয়ে। তাদের বয়সন্ধি আসে, যৌবন আসে এই কোকো বাগানেই। এদের অধিকাংশই সারা জীবনে তাদের পরিবারের সাথে দেখা করতে পারে না। কারণ এখানে আসা সহজ; কিন্তু বের হওয়া শুধু কঠিন না, অসম্ভব। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে রাতে আবার মালিক, ঠিকাদার, সুপারভাইজার, পুলিশ এমনকি মজুরদের যৌনতৃপ্তি মেটাতে হয় মেয়েদের। ১১-১২ বছরে গর্ভবতী হয়ে পড়ে তাদের অনেকে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে যৌনরোগ। পচে, গলে যায় শৈশব। স্বপ্নে পোকা আসে, বিষাক্ত ভয়ংকর সব পোকা। খুবলে খায় হৃদয়… চকলেটি হৃদয়!

কি ভাবছেন? মধ্যযুগ? মোটেই না। যখন আমরা মানবসভ্যতার চরম শিখরে পা রাখতে যাচ্ছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই সবার সামনে এইভাবে ক্রীতদাস প্রথা চলছে এবং এই অন্ধকার থেকেই বেরোচ্ছে আমার আপনার প্রিয় ডার্ক চকলেট! এবং এতো বৃহৎ এদের কালো হাত যে কারোই প্রতিবাদ করার সাহস হয় না। আন্দ্রে কিফার নামক এক ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান সাংবাদিক, যিনি কিনা কোকো ইন্ডাস্ট্রির দুর্নীতিগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন, তাকে তার রিসার্চে সহায়তার কথা বলে ২০০৪ সালের ১৬ই এপ্রিল অপহরণ করা হয় এবং এখন পর্যন্ত তার কোন হদিস মেলেনি।

চকলেট দাসত্ব নিয়ন আলোয় neonaloy

অনুসন্ধান করতে এসে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাংবাদিক আন্দ্রে-কীফারের খোঁজে বিলবোর্ড লাগানো হয়েছিল মালি’র রাস্তাঘাটে

মালি, বুরকিনা ফাসো’র মতো হতদরিদ্র দেশগুলোর কাছে এর সমাধান নেই। একদিকে অভাবের তাড়নায় শিশুরা সহজেই ফাঁদে পড়ে, অন্যদিকে সরকারি বড় বড় হর্তাকর্তারাও এই ব্যবসায় হয় সরাসরি জড়িত, নাহয় চোখ-মুখ বন্ধ রাখতে মাসে মাসে তাদের পকেটে ঢুকে পেটমোটা ঘুষের খাম। মালি, বুরকিনা ফাসো’র প্রতিটি গ্রামেই একই চিত্র। প্রায়ই পাচার হয়ে যায় ছোট ছোট শিশুরা। হিসেব করলে দেখা যায়, প্রায় গ্রামেই এক-দেড়শ শিশু-কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ যাদের বয়স সাত থেকে পনেরোর মধ্যে।

অনেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি চেষ্টা করেন এই শিশুপাচার থামাতে। মালির সিকাসো শহরের এমনই একজন এদ্রিসা কান্তে, পেশায় বাস ড্রাইভার। তার দেয়া লিস্ট অনুযায়ী তিনি প্রায় দেড়শ শিশুকে সীমান্ত থেকে উদ্ধার করেছেন যাদের কোকো ফার্মে পাচার করে দেয়া হচ্ছিলো। মাঝে মাঝে স্থানীয় শান্তিরক্ষা বাহিনী, ইন্টারপোলও হানা দেয় এইসব আস্তানায়। কিছু শিশুকে উদ্ধার করা গেলেও বৃহৎ একটি অংশকে ঠিকই লুকিয়ে ফেলে মালিকরা।

জানি না এই অমানবিকতা কখনও থামবে কিনা। এও জানিনা, এই লেখা কিভাবে শেষ করব! আফ্রিকান এই হতো দরিদ্র শিশুদের কথা ভেবে চকলেট খাওয়া বন্ধ করে দিব? তা কি হয়? চকলেটতো আমরা খাবোই, আর সেই সাথে চলতে থাকবে এই শিশুপাচার, চলতে থাকবে তাদের উপরে মালিকদের অমানুষিক অত্যাচার।

ও, একটা কথা দিয়ে শেষ করি। অত্যাচারিত, মৃতপ্রায়, ধর্ষিত যে শিশুগুলো আপনার-আমার মুখে হরেক রকমের বাহারি চকলেট তুলে দিচ্ছে, সেই নিপীড়িত মুখ কিন্তু কোনদিন এক টুকরো চকলেট চেখে দেখে না, জানেও না কেমন স্বাদ। হয়তো তাদের চোখে চকলেট খাওয়ার স্বপ্ন আসেও না। তাদের চোখে শুধু ভাসে একটা স্বাধীন জীবন, অত্যাচারবিহীন জীবন, মুক্ত একটা পরিবেশে দুই বেলা পেট পুরে খাওয়ার স্বপ্ন। কিংবা কে জানে, হয়তো তারা সে স্বপ্ন দেখতেও ভুলে গিয়েছে!

Most Popular

To Top