ফ্লাডলাইট

ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আফসোসের নাম কি হ্যান্সি ক্রোনিয়ে?

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

জন্মগতভাবে প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড়। যার খেলাকে সঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ৷ বালকসুলভ হ্যান্ডসাম চেহারার অধিকারী, যাকে কারও কারও মতে বিবেচনা করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বকালের সেরা অধিনায়ক হিসেবে৷ কিন্তু, স্পোর্টসম্যানসুলভ আচরণের জন্য যাকে অনেকেই বলতেন “ক্রিকেটের বিবেক”, তার কারণেই যদি পুরো খেলাটি কলুষিত হয়, তখন কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিষয়টিকে?

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

পুরো নাম ওয়েলস জোহান্স হ্যান্সি ক্রোনিয়ে৷ জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেইন শহরে ১৯৬৯ সালেের ২৫ শে সেপ্টেম্বর। তার বাবা ইউয়ি ক্রোনিয়ে ছিলেন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার এবং কমেন্টেটর। তাই হয়ত বলা যায় ক্রিকেটের নেশা তার রক্তেই ছিল। বাবা-মা’র তিন সন্তানের মধ্যে ক্রোনিয়ে দ্বিতীয়। তিনি ছিলেন তার কলেজ ক্রিকেট এবং রাগবী দলের অধিনায়ক এবং দলের সেরা খেলোয়াড়ও বটে। এইজন্য ১৯৮৭ সালে তিনি গৌরবময় ডিসটিংকশন পান।

হয়ত ক্রিকেটের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা বাবা থেকেই প্রাপ্ত। তাই ঠিক করেছিলেন ক্রিকেট নিয়েই কিছু একটা করবেন৷ ১৯৮৮ সাল অরেন্জ ফ্রি স্টেটের হয়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় ক্রোনিয়ে’র৷ পরের বছরই দলকে কুরি কাপ জেতান, যেখানে ফাইনালে তার ৭৩ রানের এক ঝকঝকে ইনিংস ছিল ৷ ১৯৮৯-৯০ মৌসুম তার জন্য মোটেও ভালো ছিল না। হুট করেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছিলেন। টেস্টে রান কি জিনিস মনে হয় ভুলেই গিয়েছিলেন৷ তবে একদিনের ক্রিকেটে উজ্জ্বল ছিলেন৷ টেস্টে যেখানে গড় মাত্র ১৯, ওয়ানডে’তে ৬০.১২।

১৯৯০-৯১ সিজন তার জন্য অনন্য ছিল। তাকে অরেন্জ ফ্রি স্টেটের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভাবা যায়? বয়স তখন তার মাত্র ২১! সামলাবেন প্রথম শ্রেনীর একটি দলকে! হতাশ করেননি তিনি। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে শতকের দেখা পান সেই বছরই৷ অসাধারণ বছর যায় তার। বছর শেষে তার রান দাঁড়ায় ৭১৫-তে। এরপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি তাকে।

১৯৯১-৯২ মৌসুমে তার অনবদ্য পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসাবে জাতীয় দলে ডাক পান। তাও আবার ১৯৯২ এর বিশ্বকাপ দলে! সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার অভিষেক ঘটে।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

সেই অভিষেক বিশ্বকাপে ৩৪ গড়ে করেন ২৭২ রান৷ তবে উইকেটের দেখা পাননি ক্রোনিয়ে৷ বিশ্বকাপ শেষ হয় উল্লেখযোগ্য বড় কোন সাফল্য ছাড়াই।

এরপর আফ্রিকা দল যায় উইন্ডিজ সফরে৷ যেটি ছিল তাদের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর প্রথম টেস্ট। প্রথম টেস্টেই অঘটন৷ ২০০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। স্কোর ছিল ১২২-২৷ এরপরেই যেন এক ঝড়ে সব শেষ। ১৪৮ রানে অলআউট তারা৷

এরপরের সফর ছিল ভারত সফর৷ প্রথম ওয়ানডেতে যেন একাই দলকে জিতান হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। শেষ বলে ছয় মেরে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি। সেই সফরে ব্যাট হাতে তেমন উজ্জ্বল না থাকলেও বল  হাতে ছিলেন অনবদ্য। তার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ বোলিং ফিগার (৫/৩২) পেয়ে যান। যা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কোন বোলারের প্রথম ৫ উইকেট শিকার ৷

সেই সফরের প্রথম টেস্টে তুলে নেন নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরী। ৪১১ বল এবং প্রায় ৯ ঘন্টা উইকেটে কাটিয়ে খেলা সেই ইনিংসটি এখনো অনেকের চোখে সর্বকালের অন্যতম সেরা টেস্ট ইনিংস। উইকেটে এসেছিলেন যখন দলের রান ১ উইকেটে ০। আউট হয়েছিলেন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। এই ইনিংসেই ভর করে প্রত্যাবর্তন যুগে প্রথম টেস্টে জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই বছরের শেষদিকে আবার পাকিস্তানে ত্রিদেশীয় সিরিজে তার অলরাউন্ড নৈপুণ্যে চমক দেখায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

১৯৯২-৯৩ মৌসুম। সেই বছর শ্রীলঙ্কায় পেয়ে যান দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরী যার উপর ভিত্তি করে দক্ষিণ আফ্রিকা পায় ইনিংস ও ২০৮ রানের এক বিশাল জয়। ১৯৯৩ সালে হয়ে যান সহ-অধিনায়ক। ছিলেন কিন্তু দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য! নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেন অপরাজিত ৯১ রানের এক ম্যাচজয়ী এক ইনিংস। সেই সফরের দ্বিতীয় টেস্টের শেষদিনের কথা। নিয়মিত অধিনায়ক কেপলার ওয়েলসের মাঠে অসুস্থতা তার কাঁধে এনে দেয় অধিনায়কের দায়িত্ব।

হতাশ করেননি তিনি। সেই টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা জয় পায় ৫ রানে। তৃতীয় টেস্টেও তাকে নিতে হয় দায়িত্ব, হয়ে যান দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক। ফিরতি সফরের অস্ট্রেলিয়া যখন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আসে, তখন বলতে গেলে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে একাই শাসন করেন অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের। ১৯৯৪ সালের সেই সিরিজে টেস্ট ওয়ানডে মিলিয়ে রান করেন ৭২১। রানের দেখা পান এরপরের ইংল্যান্ড সফরেও। তুলে নেন ২টি সেঞ্চুরী।

পরে পাকিস্তান আর অস্ট্রেলিয়া ত্রিদেশীয় সিরিজে ৮৮.০৫ গড়ে করেন ৩৫৪ রান। যদিও সবগুলো ম্যাচ হারতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। এরপরেই তার কাধে আসে দীর্ঘমেয়াদী অধিনায়কত্বের দায়িত্ব। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্ট হারলেও নিউজিল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে শুরু হওয়া ম্যান্ডেলা কাপ ঠিকই জিতে নেন।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

ত্রিদেশীয় ম্যান্ডেলা কাপ জয়ী অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে

সালটি ১৯৯৬। আবার আরেকটি বিশ্বকাপ। নিজেকে প্রমাণের সুযোগ আসে তার। প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ড সফলতার সাথেই পার করেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বসেন ব্রায়ান লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে। সে ম্যাচে অবশ্য লারা শতকের দেখা পান। বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয় দক্ষিণ আফ্রিকানদের।

অধিনায়ক হিসেবে তার সফলতা আরও অনেক৷  ১৯৯৭-৯৮ সিজনে পাকিস্তানে প্রথম সিরিজ জয় করে দঃ আফ্রিকা৷

১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে উইন্ডিজ আসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। সেখানে ৫-০ তে সফরকারীদের হোয়াইটওয়াশ করে ক্রোনিয়ে’র দল। ওয়ানডে সিরিজে জয়লাভ করে ৬-১ এর বিশাল ব্যবধানে। সেই বছরই নিউজিল্যান্ডের সাথে অ্যাওয়ে সিরিজ জিতে প্রোটিয়াসরা৷ দলকে নিয়ে যান ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপে, যা ছিল তার তৃতীয় বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপে তার ব্যক্তিগত ফর্ম মোটেও ভাল ছিল না৷  গোটা টুর্নামেন্টে করেন মাত্র ৯৮ রান। কিন্তু কোচ বব উলমারের সাথে জোট বেঁধে স্মার্ট ট্যাকটিকস কাজে লাগিয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবগুলো দলকে। সবগুলো দলকে বলতে গেলে হেসে-খেলে হারিয়ে দিচ্ছিল উলমার-ক্রোনিয়ে জুটির অপ্রতিরোধ্য কৌশল। সবাই ধরে নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাই হবে চ্যাম্পিয়ন, প্রশ্ন শুধু কোন দল রানার্স-আপ হয়! কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সাথে সুপার-সিক্সের শেষ ম্যাচে ওয়াহ’র অতিমানবীয় ইনিংসের কাছে হেরে গিয়ে এবং সেমিফাইনালে সেই একই অস্ট্রেলিয়ার সাথে জেতা ম্যাচ ল্যান্স ক্লুজনারের পাগুলে দৌড়ে ড্র করে বাদ পড়ে যায় তারা। ক্লুজনার সেই টুর্নামেন্টে এতটাই অবিশ্বাস্য খেলেছিলেন যে সেমিফাইনালে বাদ পড়ার পরেও টুর্নামেন্ট-সেরা’র ট্রফি তার হাতেই উঠেছিল। তবে তার চাইতেও বড় “অর্জন” ছিল পাকাপাকিভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার কপালে “চোকার” খেতাব জুতে যাওয়া।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ-অধিনায়ক জুটি বব উলমার-হ্যান্সি ক্রোনিয়ে

বিশ্বকাপের বিপর্যয় কাটিয়ে ক্রোনিয়ে’র দক্ষিণ আফ্রিকা যায় প্রতিবেশী জিম্বাবুয়ে সফরে। সে সফরেই হ্যান্সি ক্রোনিয়ে বনে যান দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

১৯৯৯-২০০০ মৌসুম। চলছিল ইংল্যান্ড সাথে টেস্ট সিরিজ৷ বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারছিল না কোন দল৷ শেষদিনে মাত্র ৪৫ ওভার খেলা হবার সম্ভাবনা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ছিল ৬ উইকেটে ১৫৫। গুজব রটে যে আগের রাতেই দুই অধিনায়ক কথা বলে ঠিক করে ফেলেছিলেন যে তারা প্রত্যেকেই এক ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেবেন এবং ৭০ ওভারে ২৫০ রানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২৪৮ রানে পৌঁছালে ডিক্লেয়ার করে দেন ক্রোনিয়ে।

চুক্তিমত পরের দুই ইনিংসও ঘোষণা করে দিয়েছিল দুই দল। ফলে শেষ ইনিংসে ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৪৯ যা তারা ৫ বল ও ২ উইকেট হাতে রেখে পৌঁছে যায়। যা অনেক বিতর্ক ও সন্দেহের জন্ম দেয়৷

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই টেস্টের টস করছেন ক্রোনিয়ে এবং ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন, এখান থেকেই সূত্রপাত সব সন্দেহের।

৩১ মার্চ ২০০০, পাকিস্তানের সাথে খেলা চলছিল দক্ষিণ আফ্রিকার।  এটি ছিল তার শেষ একদিনের ম্যাচ। শেষ একদিনের ম্যাচে ৭৩ বলে করেন  অনবদ্য ৭৯ রান।

দক্ষিণ আফ্রিকাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। তার অধীনে ২৭ টেস্টে জয় পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ছাড়া সিরিজ জিতেছে সব দলের বিপক্ষে। ১৩৮ ওয়ানডেতে জয় পেয়েছে ৯৯ টিতে। বল হাতে নিয়েছেন ৪৩টি উইকেট, গড় ২৯.৯৫।  ৬৮ টেস্টে ৩৬.৪১ গড়ে রান করেছেন ৩৭১৪। রয়েছে ৬টি সেঞ্চুরী, ২৩টি হাফ সেঞ্চুরী। আর ১৮৮ ওয়ানডেতে রান ৫৫৬৫, গড় ৩৮.৬৪। উইকেট নিয়েছেন ১১৪টি, গড় ৩৪.৭৮।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy
৭ এপ্রিল ২০০০ সাল। দিনটি হয়ত ক্রিকেট বিশ্বের জন্য কালোদিন। ফাঁস হয়ে যায় হ্যান্সি ক্রোনিয়ে ও সঞ্জয় চাওলা নামের এক ভারতীয় বাজিকরের গোপন কথোপকথন। তদন্তে বেরিয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তে বলা হয়, ১৯৯৭-২০০০ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ম্যাচে টাকার বিনিময়ে ইচ্ছে করে ম্যাচ হেরেছে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে’র দল। এরপর তিনি স্বীকার করে নেন যে তাকে ১০,০০০-১৫,০০০ ডলার অফার করে লন্ডনের একজন বুককিপার। এরপরের তথ্য আরও অবাক করা। তিনি নাকি হার্শেল গিবসকে ১৫,০০০ ডলার অফার করেন কানপুরের ৫ম টেস্টে ২০ রানের কম স্কোর করার জন্য। একই পরিমান অর্থ হেনরি উইলিয়ামসনকেও অফার করতে বলা হয় যদি সে সেই ম্যাচে বোলিং-এ ৫০ এর উপরে রান হজম করে।

গিবস সেই ম্যাচে ৭৪ রান করেছিলেন এবং হেনরি ইন্জুরির কারণে ২য় ওভার বল করতে পারে নাই। তাই কেউ টাকা পাননি৷ এরপরে এক সাক্ষাতকারে ক্রোনিয়ে বলেন,

“আমার টাকা পয়সার প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা আছে।  আমি নিকোটিন কিংবা অ্যালকোহলে আসক্ত নই, কিন্তু ব্যাপারটা ওই সমস্যাগুলোর মতনই৷”

নিকি বোয়ের মত খেলোয়াড়দেরও নাম চলে আসে এসব তদন্তে। এমনকি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিষ্ময়কর সিদ্ধান্তটি কেন নেওয়া হয়েছিল তাও পরিষ্কার হয়। ১৯৯৮ সালের ভারত সফরের বেশ কয়েকটি ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকানরা ইচ্ছে করে হেরেছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে ।

গোটা ক্রিকেট বিশ্ব এক প্রকান্ড ঝড় বয়ে যায়৷ হ্যান্সি ক্রোনিয়ে সব দোষ স্বীকার করে নেন। তাকে ক্রিকেট থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। গোটা ক্রিকেট বিশ্বের কাছে যিনি ছিলেন অবিসংবাদিত এক নেতা, তীক্ষ্ণ ক্রিকেট মস্তিষ্কের অধিকারী, মাঠের ভিতরে এবং বাইরে আদর্শ একজন ক্রিকেটার, নেলসন ম্যান্ডেলার পরেই সে সময়কার দক্ষিণ আফ্রিকার বড় এক পোস্টার বয়; তিনিই বনে গেলেন ক্রিকেটের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

সেদিনের সেই প্রেস কনফারেন্সে ক্রোনিয়ে নিজে তো কেঁদেছিলেনই, কেঁদেছিল কোটি ক্রিকেট ভক্ত। তার মত এমন এক ক্রিকেট কিংবদন্তিকে যে এ পরিণতি ভোগ করতে হবে, তা মানতে পারা অসম্ভব ছিলো। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম শ্রদ্ধার ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তার এমন বিদায় ছিলো ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ট্র্যাজেডি।

২০০১ সালে অবশ্য নিজের আজীবন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আপিল করেন। কিন্তু তাতে তেমন কোন লাভ হয়নি। তার শাস্তির মেয়াদ কমায়নি ট্রাইবুনাল।

১ জুন ২০০২ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। যদিও অনেকে মনে করেন, ম্যাচ পাতানো কেলেংকারির ব্যাপারে তার মুখ বন্ধ করতেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সেই ধারণার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। যে বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান, তার সেদিন সেই বিমানেই থাকার কথা ছিল না। নির্ধারিত বিমান মিস করায় তিনি সেই বিমানে ওঠেন।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্রোনিয়েকে নিয়ে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ

তবে আরও অবাক করা বিষয় বিমানটি ছিল মালবাহী বিমান এবং তিনি ও পাইলট ছাড়া আর কেউ সেই বিমানে ছিল না। তার ওঠা হকার এইচএস ৭৪৮ টার্বোটপ বিমানটি আউটেনিকোয়া পর্বতে ক্রাশ করে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু রহস্যের কিনারা এখনো করা সম্ভব হয়নি যদিও এখনো ব্যাপারটি তদন্তাধীন। তবে এ রহস্যের সমাধান করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

২০০৪ সালে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে’কে ১১তম “সেরা দক্ষিণ আফ্রিকান” ঘোষণা করা হয়। জ্যাক ক্যালিস, মার্ক বাউচার, শন পোলক এর মত কিংবদন্তি ক্রিকেটার তিনি তৈরি করে রেখে গিয়েছিলেন। তার বিপক্ষে সাক্ষী দেবার সময়েও সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস বলেছিলেন,

”তবু আজও আমাদের কাছে ক্রনিয়েই একমাত্র অধিনায়ক। তার জায়গা কেউ নিতে পারেনি, কেউ কখনো পারবেও না।“

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে ক্রিকেটে কালিমা লেপনকারী ব্যক্তি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের কাছে তিনি এখনও এক মহান ব্যক্তি, যিনি জীবনে কিছু ভুল করেছিলেন৷ এখনও তার ক্রিকেটকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে আফ্রিকানরা। এখনও তার কিছু অন্ধভক্ত এটি মানতে নারাজ যে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে’র মত একজন মানুষ ম্যাচ পাতানোর সাথে জড়িত থাকতে পারে, কোথাও নিশ্চয়ই কিছু একটা গড়বড় আছে। আর দিনশেষে কেউ তাকে স্মরন করে শত শ্রদ্ধায়, কেউ আবার প্রবল ঘৃণায়।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্রোনিয়ে’র অপকর্মে ক্ষুব্ধ ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের বিক্ষোভ

আরো পড়ুনঃ এবি ডি ভিলিয়ার্স, ক্রিকেটের দুঃখী রাজপুত্রকে কে নিয়ে যত গুজব!

Most Popular

To Top