নাগরিক কথা

“ড্যাংক” মিম- হাস্যরস যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়

মিম জেনারেশন নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

এক বাসায় পড়াই, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের পোলাপান দুইটাই। দুইজনই বড় বড় ডিসপ্লের চকচকা অ্যান্ড্রয়েড ফোন চালায়। পড়ার মাঝখানেও নোটিফিকেশন চেক করে। পড়াশুনা বা প্রোডাক্টিভ কিছুর নামগন্ধ নাই। জানেও না সিলেবাসে কি আছে। ওইদিন দেখলাম একজন দামী ফোন একটা হাতে নিয়াই আবার নতুন ফোন কিনার হিসাব করতেছে, অমুক ফোনে ছবি সবচেয়ে ভালো উঠে, ভালো ছবি হইলে লাইক বেশি পড়বে… মানে শখ আহ্লাদের শেষ নাই।

মিম জেনারেশন নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

কাহিনী হচ্ছে এই যে পোলাপানগুলা, ১৬-১৭ বছর বয়সে হাতে ছোট্ট একটা বাক্সের মধ্যে জগৎ পাইয়া যাইতেছে, যে-ই জগতের কোনোকিছুই এদের জন্য নিষিদ্ধ না, বাপ মা জানেও না কি দেখতেছে তারা এখানে, এই ব্যাপারটা ডেঞ্জারাস। বলি, এদের হাতে যে এগুলা আসছে, কীভাবে আসছে? তাদের বাপ মা তাদের জন্য এত খাটাখাটনি করছে যে এই বয়সেই অনায়াসে তার হাতে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার একটা জিনিস চলে যাচ্ছে, অথচ এই ছেলেমেয়েগুলা জীবনে এক পয়সাও কামায়ে দেখে নাই। এরা কখনোই আসলে ব্যাপারটা রিয়েলাইজ করে না, যে এসব কিছুই তারা উপার্জন করে নাই, তারা মূলত আকাইম্মা পরজীবী অথর্ব সব… বরং প্রোফাইল পিকচারে লাইকের সংখ্যা নিয়া তারা অসম্ভব আত্মতুষ্টিতে ভুগে এবং নিজে যে সবার থেকে বেটার সেই ভাবনার প্রতিফলন সে তার সব কাজকর্মে ঘটায়।

কিন্তু এরা এই অ্যান্ড্রয়েডে বসে করেটা কি? রিসেন্টলি আমি ফেসবুকের তথাকথিত ড্যাংক বাংলা মিম গ্রুপ গুলায় অ্যাড হইলাম। ওইখানকার বেশিরভাগ পোস্টই দেখলাম স্কুল কলেজের পোলাপান করছে, নিতান্তই বাচ্চা অনেকগুলা- মানে এইসব এখন স্কুল কলেজের ট্রেন্ড। আর দেখলাম মিমগুলা, বেশিরভাগই, ভয়ংকর রকম হার্টফুল, মোরালিটির মাথা খাওয়া কম্প্যাশনের মাথা খাওয়া সব মিম।

হিউমারের কিছু থিওরি আছে, আমরা কিছু দেইখা ক্যানো হাসি। এর মধ্যে রিলিফ থিওরি একটা। আমাদের সব আগলি ইন্সটিংক্টগুলা নিয়া আমরা খুবই আনকম্ফোর্টেবল আর ইন্সিকিউর থাকি। যখন অন্যদের মাঝেও ওইসব কমন দেখে ফেলি তখন দমকায়ে হাসি পায় আমাদের। এইসব পেজ বা গ্রুপের ম্যাক্সিমাম মিমগুলা ওই থিওরিটা পুঁজি করে বানানো হয়। এর জন্য গাদা গাদা মিম পর্ন নিয়া, মাস্টারবেশন নিয়া, মেয়েজাতিরে ডিগ্রেড কইরা, এবং এইগুলা সাক্সেসফুল।

এখানে সুপিরিয়রিটি থিওরিও আছে। এভ্যুলুশনারিভাবে কাউরে অফেন্ড কইরা নিজের সুপিরিয়রিটির ফিল নিতে পারলে আমরা খুশি হইয়া যাই। খুব কঠিন কিছু না- আমি যদি জীবনের যেসব আজেবাজে আকাম করছি বা করার কথা ভাবছি, তাই নিয়া কয়টা মিম, আর নোয়াখাইল্লারা বরিশাইল্লারা কত ডিজগাস্টিং তাই নিয়া কয়টা মিম পোস্ট দেই, ইজিলি কয়েকটা সাক্সেসফুল হইয়া যাবে। এই জিনিসটাই এরা ধইরা ফেলছে, এদের মাথায় এখন সবসময় ঘুরে এর থেকে কতটা গ্রোস হওয়া যায়, এর থেকে কতটা খারাপ কথা বলা যায়, এর থেকে কতটা নিম্নরুচির কথা বইলা একটা নির্দিষ্ট গ্রুপরে হার্ট করা যায়।

চিন্তা করা যায়, পুরা একটা জেনারেশনের ভাবনার প্যাটার্ন এখন এইরকম! হাজার হাজার পোলাপান একসাথে নেগেটিভিটি আর হেট্রেড সেলেব্রেট করতেছে। যদিও এই অফেন্সিভ মিম বানানোর কালচার কিন্তু আমাদের এখানে শুরু হয় নাই, শুরু হইছে পাশ্চাত্যে। কিন্তু ওইখানে জিনিসটা এমন কলেজ স্কুল পড়ুয়াদের হাতে নাই। আমাদের হাতে এসব প্রযুক্তি পরে আসছে, আমরা এমনেই বছরকয়েক পিছায়ে আছি, আর বাপ-মা আমাদের মনিটরও করতে পারে না, তারা বোঝেও না ড্যাংক জিনিসপাতি।

এছাড়া পাশ্চাত্যে মন্টি পাইথন বা জর্জ কার্লিন থেকে হিউমার তৈরি হয়ে আসতেছে, এরা এইসবের জন্য হয়তো রেডি, কিন্তু আমরা মোটেও রেডি না, ১৩-১৪ বছরের পোলাপানের করা ওইসব পেজের গ্রোস গ্রোস কমেন্ট দেখলেই বুঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের অপরিচিতা গল্পের নায়িকার কি খেয়ে দিবে না কি করবে ওইসব বলতেছে পাবলিক ফোরামে। এরা আসলে ঠিক বেঠিক বোঝে না। কৌতুক করে যেসব কথা বলতেছে, সেগুলা যে তার মনস্তত্ত্ব গড়ে তুলবে না, কৌতুক হিসেবেই থেকে যাবে- সেটা তাই আমরা শিওর হয়ে বলতে পারি না।

এখন আমার এই পোস্ট যদি এই স্টাইলের ড্যাংক কোনো পোলাপান পড়ে, তারা প্রথমে আমারে “normie” বইলা গালি দিবে, তারপর একসময়ের প্রগতির সিম্বল “মীনা”-র মত একটা বাচ্চা ক্যারেক্টারকে ক্যামনে সেক্সুয়ালাইজ করা যায় সেটা ভাবতে বসবে, সেই ভাবনা গিয়া শেষ হবে তাদের পরিবারে। মা-বাবারা ভীষণ কষ্ট করে উপার্জন করেন এবং চেষ্টা করেন তাদের সন্তানকে দুধে ভাতে রাখতে। শুধুমাত্র তাদের পরিশ্রম ও নানান ত্যাগের কারণেই দামী গ্যাজেট গুলো চাহিবা মাত্র হাতে পৌঁছে যায় আজকের শিশু কিশোরদের। আর সেসব ট্যাব, স্মার্টফোন দিয়েই বাচ্চারা তৈরী করছে ইনসেস্ট, হ্যারাসমেন্ট নিয়ে অশ্লীল সব ব্যাঙ্গাত্মক মিম, বেঁচে থাকার জন্য এক অসাধারণ সময় ই বটে!

আরো পড়ুনঃ যারা টিকটক ব্যবহার করে তারা কি “বুদ্ধি প্রতিবন্ধী”?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top