নাগরিক কথা

“সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন”, আর মাঝের সময়টা ইয়াবা?

অনেক আগে বিটিভিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটা বিজ্ঞাপন দেখতাম প্রায়ই, একজন মা আর ছেলেকে নিয়ে ছিল বিজ্ঞাপনটা। অতি গুণবান এক ছেলেকে বিজ্ঞাপনের প্রথমদিকে সেতার টাইপের কিছু বাজাতে দেখা যায়, মায়ের একমাত্র ছেলে এবং অত্যন্ত ভদ্র আচরণ তার। পরবর্তীতে ছেলে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে সঙ্গদোষে সিগারেট ধরে আর শেষেরদিকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং মৃত্যু হয় মাদকের প্রভাবে। তখন আমাদের দুই ভাইবোনের অভ্যাস ছিল বিজ্ঞাপনের জিংগেলগুলো গেয়ে বেড়ানো, একদিন এই বিজ্ঞাপনের জিংগেল গেয়ে বেড়াচ্ছি “সিগারেট থেকে শুরু, শেষকালে হেরোইন, মাঝখানে মাদকে আসক্ত প্রতিদিন……”

হঠাৎ মা এসে দুই ভাই-বোনকে ঠাস ঠাস করে চড় কষিয়ে দিলেন আর বললেন “আর যদি এই গান শুনি, তাহলে পিটিয়ে তক্তা বানাব”। আমাদের দুই ভাইবোনকে হতভম্ব রেখে মা চলে গেলেন বাবাকে নালিশ দিতে, তার সন্তানরা যে টিভি দেখে এসব আজেবাজে গান শিখছে তা জানাতে। সেই বয়সে সিগারেটের আদ্যোপান্ত না জানলেও সিগারেট যে খারাপ জিনিস সেটা বুঝতে পেরেছিলাম আমরা দুই ভাইবোন।

তখনকার দিনেও সিগারেট খাওয়া ছিল একপ্রকার ট্যাবুর মত এবং ভদ্র শিক্ষিতঘরের ছেলেরা বন্ধুদের সাথে মিলে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেলেও কখনো প্রকাশ্যে মুরব্বীদের সামনে তেমন খেত না, আর এখনতো মনে হয় সিগারেট খাওয়াটাই একধরণের ফ্যাশন কিংবা স্মার্টনেসের ব্যাপার।

নবম-দশম শ্রেণীতে উঠে “মাদকাসক্তি এবং তার কুফল” এমন শিরোনামের রচনা আমরা কমবেশি সবাই পড়েছি, খাতা ভর্তি করে লিখেও এসেছি ভালো নম্বর পাওয়ার আশায়। আজ আমি রচনার সেই গৎবাঁধা কথাগুলো আপনাদের বলবনা, আজকে মাদক নিয়ে আমার আশেপাশের কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলব আপনাদের।

সরকার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে, ২০১৮ এর জানুয়ারি থেকেই নাকি এই বিশাল কর্মযজ্ঞের চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল সরকার এবং অবশেষে মে মাসে এসে “ডাইরেক্ট একশন” আরম্ভ হয়েছে।

এই মাদকবিরোধী “বিশেষ অভিযানে” ক্রসফায়ার কিংবা মিসফায়ার যে ফায়ারই হোক না কেন সম্পূর্ণটাই হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধভাবে, লাশের সারি বেড়েই যাচ্ছে কিন্তু জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই। সরকারদলীয় হর্তাকর্তারা বলে বেড়াচ্ছে মাদকের মূল হোতাদের ধরা হচ্ছে, অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতারা এর বিপরীতে বলে বেড়াচ্ছে, আর পত্রপত্রিকায় আসছে নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়দের বয়ানে ভিন্নরকম কাহিনী। কিন্তু যারা মারা যাচ্ছে বা যাদেরকে ধরা হচ্ছে তারা কি আসলেই রাঘব-বোয়াল কিংবা মাদক সাম্রাজ্যের উচ্চস্থানীয় কেউ?

একজন জননেতা আছেন, যার নাম আমি বলবনা, কারণ উনি খাঁটি গরুর দুধে ধোয়া তুলসীপাতা। হিংসুকেরা উনার জনপ্রিয়তায় হিংসা করে মিথ্যা মামলা করে দেন, নিন্দুকেরা উনার নামে মিথ্যা কথা বলে বেড়ান।

উনার নামে সবচেয়ে প্রচলিত মিথ্যা কথাটা হচ্ছে উনি নিজ এলাকার অলিখিত মাদকসম্রাট, যেহেতু এটা মিথ্যা কথা তাই আদালতে মামলা করলেও কোনো সাক্ষী পাওয়া যায়না। আসলে সাক্ষীরা জননেতার সফেদ নির্মল চরিত্রের কথা ভেবে সাক্ষ্যও দিতে যান না, ফলে জননেতা বেকসুর খালাস পেয়ে যান আর তার নামে মিছিল বের হয়!

ঘটনাক্রমে সেই জননেতার এলাকায় আমার মাতুলালয় এবং আমার বেড়ে উঠাও সেখানেই। সাগরঘেঁষা সেই অঞ্চলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে কিভাবে যে মাদকের কালোছায়া সমানতালে চলছে সে সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে কিছুটা সময় সেখানে থেকে আসতে হবে।

ছোটবেলায় দেখতাম নানাবাড়িতে একজন লোক কাজ করত সারাবছর ধরে, আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলনা। লোকটার বাচ্চাকাচ্চাগুলো কে মামা-খালা বলেই ডাকতাম, আর্থিক দুরবস্থার জন্য তারাও পড়ালেখা না করেই মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করত।

দুইবছর আগ পর্যন্তও তাদের অবস্থা দেখার মত ছিলনা, কিন্তু গত রমজানে গিয়ে তাদের পাকা বাড়ি দেখে এলাম এবং সাথে রমরমা অবস্থা দেখে চোখ দুইটাও কপালে তুলে এলাম।

আমার নানার কাছ থেকে হঠাত এমন আংগুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওদের পরিবার কুটির শিল্পের ব্যবসা শুরু করেছে এবং এই মহান কুটির শিল্পের নাম হচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা।

পারিবারিকভাবে শুরু হওয়া এই কুটির শিল্পে বাড়ির বৃদ্ধ বাবা থেকে শুরু করে হাইস্কুল পড়ুয়া পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটিও জড়িত এবং ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে হাইস্কুল পড়ুয়াটি বাদে প্রত্যেকেই জেলে যাচ্ছে আর জামিনে বের হয়ে এসে আবার ব্যবসায় জড়াচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবখানেই, কিন্তু তারপরেও বন্ধ করা যাচ্ছেনা কোন কিছুই। একদিনে অভিযান করে যতটুকু ইয়াবা বড়ি আটকানো হচ্ছে তার দশগুণ ইয়াবা বড়ির লেনদেন হয়ে যাচ্ছে সেদিনই, এক অভিযানে যতগুলো আসামী ধরা হয় সেদিনই এর থেকে বেশি আসামী জামিন পেয়ে যাচ্ছে অন্য কোথাও।

কোনভাবেই না পাচার হচ্ছে ইয়াবা? মিষ্টিকুমড়ার ফালির মধ্য থেকে শুরু করে কলারের লাইনিং থেকে পাজামার ফিতার মধ্যে দিয়ে পর্যন্ত পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা। অল্প পরিশ্রমে স্বল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার এত সহজ সুযোগ কে হেলায় হারাবে?

যেখানে হাতে কাঁচা টাকা আসছে সেখানে নৈতিকতা অনৈতিকতার ধার ধারে কে?

কিন্তু এত কাঁচা টাকা এসেও লাভ হয়না, ইয়াবা বিক্রি করতে করতে কখন যে ইয়াবার স্বাদ মুখে লেগে গিয়ে জীবনটাই নষ্ট হয়ে যায় তার খবর কেউ রাখেনা।

এতকিছু যে হচ্ছে, সেখানে কিন্তু ঘুরে-ফিরে আসছে আমাদের সেই জননেতার কথাই, তবে সবকিছুই গোপনে ফিসফিসিয়ে বলা। কারণ, তামিল সিনেমার গডফাদারদের মত করে যিনি মটরসাইকেল আর হোন্ডা শোভাযাত্রা করে পুরো এলাকার মানুষকে, এমনকি রাস্তাগুলোকে পর্যন্ত চমকে দিতে পারেন তেমন মহান মানুষের নামে মন্দ কথা বলতে যাবে কোন পাগলে?

আমাদের দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আছে যে কোনো ব্যক্তির কাছে মাদকদ্রব্য সরাসরি পাওয়া না গেলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা যাবেনা !!!।

এখন এই আইনের সদব্যাবহারের মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর মারা পড়ছে শুধু মাদক বহনকারী কিংবা ছোটখাট সরবরাহকারীরা।

আবার যদি এই আইনের সংশোধন করা হয় তবে দেখা যাবে যে শত্রুতা করে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য সবাই হাতে এক অসাধারণ আইন পেয়ে যাবে।

ঠেলা দুই দিক থেকেই সামলাতে হবে তখন!!!

কিছুদিন আগে পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শাখায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। যদিও আমার পেশা মাদক-দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্রস/মিস ফায়ার এসবের থেকে শতহস্ত দূরে তারপরেও কৌতূহল সামলাতে না পেরে অফিসারদের সাথে সদ্য অভিযানে উদ্ধার করা ফেনসিডিল আর ইয়াবার বস্তা দেখতে গেলাম। অফিসার হতাশার সুরে বলেন যে,

“আমরা মুসলিমপ্রধান দেশ হয়েও আমাদের দেশে মাদক একটা বড় সমস্যা, অথচ অনেক অমুসলিমদেশেও মাদকসমস্যাটা আমাদের চেয়ে কম প্রকট। রোজা-রমজানের মাসে প্রতিদিন এতগুলো মাদকদ্রব্যের চালান আমরা আটক করি যে মাঝেমধ্যে সন্দেহ হয় যে আসলেই কি এটা একটা মুসলিমপ্রধান দেশ? আগে আমার স্ত্রী ছেলের পড়ালেখার জন্য নজরদারি করত, আর এখন তার মনে একটাই ভয় সেটা হল ছেলে উঠতি বয়সে কারো পাল্লায় পরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে কিনা”।

চারপাশে আজকাল মাদকদ্রব্য এত সহজলভ্য হয়ে যাচ্ছে যে মনে হয় কয়দিন পরে মুড়ি-মুড়কির মত করে মাদকদ্রব্য বিক্রি হবে। শিক্ষার্থীর বইয়ের ফাঁকে, মানিব্যাগের পকেটে, ছদ্মবেশে মাদক বিক্রেতা ভিখারীর ক্রাচের কাপড়ে সবখানে আজকাল মাদক আর মাদক।

বিদেশ থেকে আসার সময় কোনো তরল বা সলিড নেশাজাতীয় দ্রব্য নিয়ে আসা যাবেনা কিন্তু বারগুলোর আলো-আঁধারিতে বসে ঠিকই চুমুক দেওয়া যাবে আমদানি করা বিদেশী মদে।

সন্ধ্যা হলেই আজকাল হাই সোসাইটি থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেনী কিংবা তার চেয়েও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর কেউ ছিনতাইয়ের টাকা বা বাসা থেকে চুরি করে নিয়ে আসা টাকা দিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে এসে বসে সিসা-বারে। এই সিসা বারের কথা শুনে আমার এক বন্ধু দুঃখ করে কাষ্ঠ হাসি দিয়ে বলেছিল যে

“ভালোই তো, আমাদের দাদা-নানাদের হুক্কা খাওয়ার ঐতিহ্য ধরে রাখতেসে এরা !!!”।

এসব ভন্ডামি কিভাবে চলে আসে দিনের পর দিন? কেন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রধান ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা যায়না?

কেন এতকিছুর পরেও মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলে আসছে দিনের পর দিন ধরে?

এটাতো আর আজকালকের বিষয় নয় যে বিএনপি বলবে আমার সময় এসব ছিলনা কিংবা আওয়ামীলীগ বলবে এসব বিএনপির কারসাজি, কারণ অনেকদিন ধরেই চলে আসছে মাদকের এমন দৌরাত্ম্য। কোন দল কিংবা সরকারই কেন এসবের সমাধান করতে পারেনি? শুধু একজন আরেকজনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিলেই সব শেষ?

নাকি সর্ষের মধ্যেই ভুত আছে?

মাদকের ছোবলে যখন দেশের ভিত তরুণরাই ধ্বংস হয়ে যাবে তখন কিন্তু তার প্রভাব থেকে বাদ যাবেন না উঁচু গদিতে বসা দন্ড-মুন্ডের কর্তারাও।

মাদকাসক্তির কারণে কত কিছু হয়ে যেতে পারে তার ছোট্ট একটা প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম ঐশীর ঘটনাটি নিয়েই।

দুপুরে বস্তা বস্তা জব্দকরা ফেনসিডিল দেখে রাত্রে রুমে এসে ফেসবুক খুলে স্ক্রল করতে যেয়েই দেখলাম কোনো এক পেজে একজন একটা ছবি পোস্ট করে লিখেছেন যে “এমন দিনও দেখতে হলো!”, ছবিটা ছিল রমজান উপলক্ষে এক সীসা বারের বিশেষ ছাড় উপলক্ষে শেয়ার করা ছবি!

বাহ! বাংলাদেশ!, এগিয়ে যাও!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top