ইতিহাস

কিভাবে মারা গিয়েছিল দায়াতলভ পাসের অভিযাত্রীরা?

দায়াতলভ পাস নিয়ন_আলোয়_neon_aloy

বিশ্বের রহস্যপূর্ণ অমীমাংসিত কেসগুলোর মাঝে খুবই জনপ্রিয় একটি কেস হলো দায়াতলভ পাস কেসটি। রাশিয়ার এই কেসটিতে দেখা যায় ৯ জন অভিজ্ঞ স্কি হাইকারের অস্বাভাবিক মৃত্যু। ১৯৫৯ সালে ঘটে যাওয়া এই কেসের এখনো পর্যন্ত কোন সমাধান পাওয়া যায়নি। স্বভাবতই তখনকার সময়ে এটি বেশ আলোচিত কেস ছিলো কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কয়েক মাস পরেই এই কেসটি বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রশাসন থেকে। কি ঘটেছিল সেই কেসে?

হাইকার দলের অভিযান

দায়াতলভ পাস নিয়ন_আলোয়_neon_aloy

১৯৫৯ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সভার্দলোভস্ক ওব্লাস্ট অঞ্চলে উত্তরাঞ্চলীয় ইউরাল পর্বতমালা জুড়ে স্কিইং অভিযানের জন্য একটি দল গঠন করা হয়েছিল। সেই দলের নেতা হিসেবে ছিলেন ২৩ বছর বয়সী ইউরাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এর রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ইগর দায়াতলভ। দলে ছিলেন আরো ৯জন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী। এই ১০ জনের দলে আরো ছিলেন ২ জন মেয়ে শিক্ষার্থী। তারা প্রত্যেকই ছিলেন গ্রেড-২ এর হাইকার।

স্কি হাইকারদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদেরকে গ্রেডে ভাগ করা হয়। এই অভিযান থেকে ফিরে আসলে তারা গ্রেড-৩ এর হাইকারে উত্তীর্ণ হতেন। ২৫ শে জানুয়ারি ট্রেনে করে তারা ইভাদেল এসে পৌছায়। সেখান থেকে ট্রাকে করে ভিঝাই চলে আসে। ২৭ জানুয়ারি ভিঝাই থেকে অরটনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ২৮শে জানুয়ারি ইউরি ইউদিন নামের একজন মেম্বার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রেখেই বাকি সদস্যরা এগিয়ে যায়। ৩১ শে জানুয়ারি সবাই হাইল্যান্ড এরিয়াতে পৌছে যায় ও পাহাড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এসব কিছুই জানা যায় স্কি হাইকারদের ডায়রির লেখা দেখে।

১ ফেব্রুয়ারি হাইকাররা পাস অতিক্রম করে আর বিপরীত পাশে ক্যাম্প করার সিধান্ত নেয় কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে পথ ভুল করে তারা পশ্চিমদিকে খোলাত স্যাখল এর দিকে চলে যায়। নিজেদের ভুল বুঝতে পারার পর সবাই মিলে পাহাড়ের ঢালে ক্যাম্প করার সিধান্ত নেয়। চাইলেই তারা দেড় কিলোমিটার দূরে বনভূমিতে ক্যাম্প করতে পারত কিন্তু ইউরি এর মতে দায়াতলভ খুব সম্ভবত এত দূর যেতে রাজি ছিল না কিংবা পাহাড়ের ঢালে ক্যাম্প করার প্র্যাকটিস করতে চাইছিলো।

দায়াতলভ পাস নিয়ন_আলোয়_neon_aloy

ইগর দায়াতলভ

অভিযানে যাওয়ার শুরুতে দায়াতলভ তাদের স্পোর্টস ক্লাবকে বলেছিলো যে ফিরে আসার সময় ভিঝাই গ্রাম থেকে টেলিগ্রাম করে তাদেরকে খবর জানাবে। আর তাদের ফিরে আসার প্রত্যাশিত তারিখ ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি ভিঝাই গ্রাম থেকে কোন টেলিগ্রাম এসে পৌঁছায়নি। এধরনের অভিযানে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশ কিছু সময় দেরি হতে পারে ভেবে কেউ তেমনভাবে পাত্তা দেয়নি।

উদ্ধার অভিযান

ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত কোন খবর না আসায় অভিযানের সদস্যদের আত্মীয়স্বজনরা তাদের খোঁজে রেসকিউ টিমের আবেদন জানায়। তখন সেখানে প্রথম রেসকিউ টিম পাঠানো হয়। পরবর্তীতে রেসকিউ টিমের সাথে আর্মি আর মিলিশিয়ারাও যোগ দেয়। প্লেন ও হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের খোঁজ চালানো হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ খোলাত স্যাখল এ রেসকিউ টিম তাদের তাঁবু খুঁজে পায়। রেসকিউ টিমের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মতে তাঁবুটি অর্ধেক ভাঙা পরে ছিল এবং তুষারে ঢাকা ছিল। তাঁবুটা পুরাই ফাঁকা ছিল আর অভিযাত্রীদের জিনিসপত্র সেভাবেই রাখা ছিল যেভাবে তারা রেখে গিয়েছিল। তদন্তকারীরা আরো জানান যে তাঁবুটি ভেতর থেকে কাটা ছিল।

দায়াতলভ পাস নিয়ন_আলোয়_neon_aloy

তাঁবুর চারপাশে প্রায় ৮-৯ জোড়া পায়ের ছাপ ছিল যারা শুধু খালি পায়ে ছিল নয়ত শুধু মোজা পরা ছিল। কারো এক পায়ে জুতা ছিল। প্রত্যেকটি পায়ের ছাপই ছিল দেড় কিলোমিটার দূরের বনভূমির দিকে। যদিও ৫০০ মিটার পরে গিয়ে বরফের নিচে পায়ের ছাপ ঢাকা পড়ে যায়।

বনের এক প্রান্তে বিশাল এক পাইন গাছের নিচে একটি ছোট আগুন জ্বালানোর চিহ্ন পাওয়া যায়। আর সেখানেই অভিযানকারী ক্রিভনিশ্চেঙ্কো আর দরোশেঙ্কো, দুজনের মৃতদেহ পাওয়া। তাদের পরনে অন্তর্বাস ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ৫ মিটার উপরে একটি পাইন গাছের ভাঙা ডাল পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় যে গাছের উপরে উঠে কোন একজন হাইকার দূরে দেখার চেষ্টা করেছিলেন।

পাইন গাছ ও ক্যাম্পের মাঝে দায়াতলভ, কল্মোগোরোভা আর স্লোবোদিন- এই ৩জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় যে তাঁবুর দিকে ফিরে আসার সময় তারা মারা যান। গাছ থেকে যথাক্রমে ৩০০, ৪৮০ আর ৬০০ মিটার দূরে তাদেরকে পাওয়া যায়।

বাকি ৪জন হাইকারের খোঁজ পেতে ২ মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। মে মাসের ৪তারিখ পাইন গাছের চেয়ে ৭৫ মিটার দূরে ৪মিটার তুষারের নিচে তাদের খোঁজ পাওয়া যায়। তাদের ৪ জনের মাঝে ৩ জনের পোশাক ছিল অন্যান্য সবার চেয়ে ভাল। আরো অবাকের বিষয় হচ্ছে প্রথম যারা মারা যান তাদের পোশাক পরে ছিলেন পরে খুঁজে পাওয়া হাইকাররা। এই ৪ জনের  মাঝে ৩ জন স্কি হাইকার মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন। থিবোঁ-ব্রিনিয়োলেস এর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। ডিউবিনিনা এবং জোলোতারিয়োভ দুজনেরই বুকের হাড় প্রচন্ডে চাপে ভাঙা ছিলো। যদিও তাদের দেহে কোন বাহির থেকে আসা আঘাতের চিহ্ন ছিল না, কিন্তু তাদের দেহে প্রচন্ড আঘাতের কারণে হাঁড় ভেঙে গিয়েছিল। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা ছিল ডিউবিনিনা’র। তার চোখ, জিহবা, ঠোটের একটি অংশ, মুখের কিছু টিস্যু এবং মাথার খুলির কিছু অংশ ছিল না।

দায়াতলভ পাস নিয়ন_আলোয়_neon_aloy

প্রথম ৫ জনের মরদেহ পাওয়ার সাথে সাথেই মেডিক্যাল এক্সামিনেশন করে জানা যায় ৬জন হাইকার হাইপোথার্মিয়াতে মারা গেছে। বাকিরা মারা গেছে তীব্র আঘাতের ফলে। ওই তাঁবুর আশে পাশে ৯ জন স্কি হাইকার ছাড়া আর কোন মানুষের খোঁজ পাওয়া যায়নি। হাইকাররা তাদের খাবার খাওয়ার ৬-৮ ঘন্টা পরে মারা গেছে। তাঁবুটি ভেতর থেকে কাটা ছিল আর প্রত্যেকেই তাদের নিজের ইচ্ছাতেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। অনেকেরই দেহ কিংবা পোষাক ছিল রেডিওএক্টিভ।

কিভাবে মারা গেলো দায়াতলভ পাসের হাইকাররা?

জ্বলজ্যান্ত ৯ জন মানুষ অস্বাভাবিক ভাবে মারা গেলো? এর পেছনের আসল কারণ এখনো কেউ জানে না। তবে বেশ কিছু কারণ হতে পারে।

হাইপোথার্মিয়া

অনেকের মতেই হাইকারদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে তুষারধ্বস। যেহেতু তারা পাহাড়ের নিচে ছিল তাই তুষার যখন গড়িয়ে পড়ে তখন তাদের তাঁবু থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পথ আটকা পড়ে যায় সেকারণে ভেতর থেকে তাঁবু কেটে সবাই বেড়িয়ে পড়ে। যেহেতু সবাই ঘুমিয়ে ছিল তাই সবাই যেই অবস্থায় সেই অবস্থাতেই বেড়িয়ে এসেছে। আর যেহেতু বাইরে তীব্র ঠান্ডা ছিল তাই হাইপোথার্মিয়াতে তারা মারা যায়। আর চাপা পড়ে যায়।

কিন্তু এই ধারণা খুব বেশি টেকে নি। কারণ তাদের ক্যাম্পের আশে পাশে তুষারধ্বসের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এরপরে সেখানে অনেক স্কি হাইকাররা গিয়েছিলেন কিন্তু কারো কাছেই এরকম কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। শুধু তাই নয় ইগর আর অ্যালেক্সান্ডার যোলোতারিয়ভ দুজনেই এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। তুষারধ্বসের কোন আভাস পেলে তারা কখনোই সেখানে ক্যাম্প করতেন না।

ইনফ্রাসাউন্ড

আরেকটি তত্ত্ব হলো ইনফ্রাসাউন্ড। ইনফ্রাসাউন্ডের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে পাহাড়ের উপরে চলা বাতাসের কারণে ইনফ্রাসাউন্ডের তৈরী হয় যা হাইকারদের মানসিক ও শারীরিকভাবে অস্বস্তি ও সমস্যার তৈরী করে। যার কারণে হাইকাররা তাদের তাঁবু থেকে বের হতে চায়। বের হয়ে পাহাড়ের নিচে চলে গেলেই তারা এ থেকে মুক্তি পেত কিন্তু রাতের অন্ধকারে পথ খুঁজে না পাওয়ার ফলে পথ হারিয়ে ফেলে।

গোপন সামরিক পরীক্ষা

আরো বেশ কিছু কারণ বের করা হয়েছে এই দুর্ঘটনার পিছনে। গোপন সামরিক পরীক্ষা তাদের মাঝে একটি। ওই এলাকাগুলোতে প্রায় সময়ই প্যারাসুট মাইনের পরীক্ষা চালানো হয়। প্যারাসুট মাইনগুলো মাটিতে পড়ার আগেই ফেটে যায়, হাইকাররা সেই বিস্ফোরনের শব্দে জেগে উঠে ও পালিয়ে যায়। বিস্ফোরনের ফলে তাদের পোষাক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একই সাথে বাতাসের অতিরিক্ত চাপের ফলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আবার এটাও ধারনা করা হয় যে কোন এক্সপেরিমেন্ট চালানোর সময় তারা দেখে ফেলে যার ফলে তাদেরকে মেরে ফেলে। আর হাইকার রা রেডিওএক্টিভিটির সংস্পর্শে এসে পড়েন  কোন রাসায়নিক পরীক্ষার তেজস্ক্রিয়তার ফলে।

প্যারাডক্সিক্যাল আনড্রেসিং

প্যারাডক্সিক্যাল আনড্রেসিংকেও একটা কারণ হিসেবে দেখা হয়। প্যারাডক্সিক্যাল আনড্রেসিং এর কারণে হাইকাররা তাদের গায়ের পোষাক খুলে ফেলে যার কারণে তারা হাইপোথেরমিয়ায় মারা যায়। হয়ত কিছু হাইকাররা তখনো স্বাভাবিক ছিল তাই তারা সব পোষাক না খুলে বরং আরো বেশি করে পোষাক পড়ে থাকার চেষ্টা করেছিলো।

রাশিয়ান ইয়েতি

হাইকারদের মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে রাশিয়ান ইয়েতিদেরকেও সন্দেহ করা হয়। রেসকিউ টিমের দুজন সদস্যদের মতে তারা সেখানে মানুষের চেয়ে বড় কিছুর পায়ের ছাপ দেখেছিল যা ইয়েতি হতে পারে কিন্তু অফিসিয়ালভাবে তা কখনো রেকর্ড করা হয়নি। এছাড়াও সেখানকার আদিবাসী মানসি জনগোষ্ঠীকেও দায়ী করা হয়। মানসীদের কাছে তাদের পাহাড় অনেক পবিত্র তাই যখন হাইকাররা সেখানে প্রবেশ করার চেষ্টা করে তাদেরকে প্রতিহিংসাবশত মেরে ফেলে।

তবে এত জল্পনাকল্পনার মাঝেও আজ পর্যন্ত নিশ্চিত কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি এই অদ্ভুত ঘটনার পিছনে। তাই অবাস্তব একটি ধারনাও করা হয় যে এলিয়ানরা এসে হাইকারদের মেরে গিয়েছে।

Dyatlov pass-নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

পরবর্তীতে দায়াতলভ পাস এর হাইকারদের নিয়ে “Devil’s pass” নামে একটি সিনেমাও বানানো হয়েছে। প্রচুর ডকুমেন্ট লেখালেখিও হয়েছে তাদের নিয়ে। কিন্তু এই অদ্ভুত মৃত্যু উপত্যকার রহস্য আজো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

আরো পড়ুনঃ অ্যালকাট্রাজ পালানো কয়েদীরা!

Most Popular

To Top