নাগরিক কথা

যারা টিকটক ব্যবহার করে তারা কি “বুদ্ধি প্রতিবন্ধী”?

টিকটক নিয়ন আলোয় neonaloy

নার্সিসিজম কী জানেন? বাংলা মানে হল আত্মরতি। সোজাভাবে বলতে গেলে নিজের প্রতি মুগ্ধতা৷ আমাদের ভেতর যে অহংবোধ জন্ম হয়, আমার মনে হয় এর চালিকাশক্তি হল নার্সিসিজম৷ সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর এর প্রচলন বেড়েছে কয়েক গুণ। সবাই নিজেকে অন্যের সামনে ইন্টারেস্টিং এবং এক্সাইটিং প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকেন। সবাই আশা করেন যে লোকে দেখবে আমার লাইফস্টাইল খুব “কুল”। সত্যিকারের মহান মানুষ ছাড়া অধিকাংশ স্বাভাবিক মানুষই নার্সিসিস্ট হয়ে থাকেন৷

নার্সিসিজম শব্দটি এসেছে নার্সিসাস নামের এক গ্রীক যুবকের নাম থেকে। গ্রীক পুরাণে নার্সিসাসের গল্পটাও নার্সিসজম এর আদিমতম নিদর্শন। নিজের রুপে বিমোহিত নার্সিসাস পৃথিবীর সকল আকর্ষণ ভুলে নিজের চেহারা দেখতে দেখতেই শেষ হয়।

নার্সিসিজম নার্সিসাস নিয়ন আলোয় neonaloy

নিজের রূপে মোহিত হওয়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল নার্সিসাসের জন্য

কিছুটা সুন্দর চেহারা-সুরত, হাতে কিছু টাকা পয়সা থাকলেই নার্সিসিজম ভালো ভাবে চর্চা করা যায়। তবে সোশ্যাল সাইটগুলোতে নার্সিসিস্ট মানুষ যেমন পাবেন, সত্যিকারের সৃজনশীল মানুষের দেখাও পাবেন তেমনি। দেখবেন অনেকে অনেক ভালো ভালো কাজ করছে। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছে দিকে দিকে।

রক্তদান কর্মসূচি, এক টাকায় আহার, প্রজেক্ট কম্বল ইত্যাদি প্রজেক্টের গিয়ার আপও এই সোস্যাল সাইটগুলো থেকে করা যায়। অনেকে আয় রোজগারের মাধ্যমও বানিয়ে ফেলেছে সোশ্যাল সাইটগুলোকে৷ আমাদের দেশের ফেসবুক কমিউনিটির কথা যদি ধরি দেখবেন দুই ধরনের মানুষ আছে৷ নিজেরা ভালো কিছু করে, নয়তো ভালো কিছু শেয়ার করে সবসময়। আরেক ধরনের মানুষ হল নিজেরা ভালো কিছু কখনও করতে পারে না, কারো ভালো দেখতে পারে না। সবকিছুকে জেনারালাইজড করে ঢালাও ভাবে গালিগালাজ করে। এরা সর্বত্র গালাগালিতে দক্ষতার নিদর্শন রেখে দিতে পটু। এরা সাকিব আল হাসানের বউ কেন পর্দা করল না সেটা নিয়ে গালি দেয়। সাকিব কেন প্রতি ম্যাচ একাই জেতায় না সেটা নিয়ে গালি দেয়। নিজে বাস্তব জীবনে কী করছে এটার উত্তর নিজেই খুঁজে পায় না।

সাকিব আল হাসানের ফেসবুক পেইজের পোস্টে করা কিছু অশালীন মন্তব্য। (ছবিটি ফেসবুকের ট্রল ক্রিকেট বাংলাদেশ গ্রুপ থেকে সংগৃহিত)

সেদিন দেখলাম একজন লোক টিকটক ইউজারদের প্রতিবন্ধী বলে গালি দিচ্ছে। টিকটক ইউজারদেরকে অপমান করার জন্য এখানে প্রতিবন্ধী যে মানুষগুলো আছে তাদের অপমান করা হচ্ছে। টিকটক ইউজারদের প্রতিবন্ধী বলে গালি দেওয়া হচ্ছে কেন? কারণ তারা খেয়েদেয়ে কাজ কাম নাই। হুদাই লিপসিঙ্ক ভিডিও, গালাগালির ভিডিও বা ঠাগলাইফ ভিডিও বানায়৷

এজন্য এরা প্রতিবন্ধী হয়ে গেল?

কিন্তু আপনি ফেসবুকে বসে বসে এদেরকে গালি দিয়ে দেশ এবং জাতিকে বিরাট উদ্ধার করেছেন। হাত তালি আপনার মত মহৎপ্রাণের জন্য। টিকটকে অনেকে মজা করার জন্য ভিডিও বানান। অনেকে তাদের ক্রিয়েটিভিটি প্রদর্শন করেন এর মাধ্যমে। অনেকে মজা করতে গিয়ে উদ্ভট সব কাজ করে ফেলেন। তাই বলে আপনি এদেরকে প্রতিবন্ধি বলছেন। অথচ উদ্ভট কাজকারবারের কারখানা হল ফেসবুক আর ইউটিউব৷ ফেসবুক অ্যাডিক্ট আর র‌্যাবিড ইউটিউবারদেরকে আপনি প্রতিবন্ধী বলে গালি দিচ্ছেন না। কারণ এই সাইটগুলো আপনিও ব্যবহার করেন, গালিটা আপনার উপরও পড়বে৷ কিন্তু টিকটক একটা সেইফ মাধ্যম। একে গালি দিলে সমস্যা হবে না, উল্টো হাহা রিয়েক্ট দুইটা বেশি পাবেন৷ আমাকে একটা কথা বলুন তো, এদের বানানো ভিডিও আপনাদেরকে দেখতে কে বলল? আপনি কেন টিকটক ব্যবহার করেন?

আচ্ছা মানলাম আপনি টিকটক ব্যবহার করেন না৷ টিকটক ইউজাররা তাদের ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করেন। আপনার ভালো না লাগলে যে আপলোড করেছে তাকে আনফলো করে দেন অথবা আনফ্রেন্ড করুন৷ আপনি খুব মহৎ মানুষ হয়ে থাকলে তাকে বুঝিয়ে বলুন যে তার এসব করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু তা না করে গালি দিয়ে নিজের বংশ পরিচয় দিচ্ছেন কেন? গালি যে তাকে দিচ্ছেন তাই না। জেনারালাইজেশন করে সকল টিকটক ইউজারদেরকেই গালি দিচ্ছেন। ভাবছেন নিজেকে খুব মহান কিছু। অথচ ফেসবুকে যেমন নার্সিসিজমের চর্চা হয়, টিকটকেও তেমনি নার্সিসিজমের চর্চা হয়। ফেসবুকে যেমন নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন রুচিহীন মানুষ আছে, টিকটকেও নিম্নবুদ্ধির মানুষের অভাব নেই।

এটা আপনার জানা উচিৎ, বোঝা উচিৎ যে সবাই আপনার মত উচ্চ-বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জন্মায় না। আপনি যদিও প্রচন্ড বুদ্ধিমান, কিন্তু আপনার বুদ্ধিতে এটা ধরে না যে, গালাগালি না করে যে বোঝে না তাকে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিৎ। যারা টিকটক ইউজারদেরকে প্রতিবন্ধী বলে গালি দেন, আজাইরা বলেন, আপনারা যখন মারা যাবেন তখন আপনাদের কবরের এপিটাফে কি লেখা থাকবে- “এখানে একজন মহান দেশ এবং সমাজ সংস্কারক শুয়ে আছেন”? আর আমাদের মত গরীব টিকটক ইউজারদের কবরের এপিটাফে লেখা থাকবে- “হালায় প্রতিবন্ধী ছিল, টিকটক বানাইতো”?

লেখাটা শুরু হয়েছিল নার্সিসিজম নিয়ে চলে গেলাম ব্যক্তিগত অফেন্সিভনেসের ঝাল মেটাতে৷ এই যে টিকটক ইউজারদেরকে গালি দেন এটাও কিন্তু এক প্রকার নার্সিসিজম। আপনাদের ভাবনাটা এমন, “যেহেতু আমি এদের মত টিকটক বানাই না সেহেতু আমার বুদ্ধিশুদ্ধি অনেক বেশি। আমি বুদ্ধিজীবী লেভেলের মানুষ। টিকটক ইউজাররা আমার চেয়ে মানুষ হিসেবে অনেক নিচুজাতের। এরা প্রতিবন্ধী, আমি অত্যাধিক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ।” নার্সিসিজম মানে কী বলেছিলাম মনে আছে? আত্মরতি৷ টিকটক ইউজারদের গালাগালি করেছেন অথচ রতিসুখ লাভ করেননি এমন কেউ আছেন?

অথচ, বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী বলে গালি দিলে দেওয়া উচিৎ তাদের যারা বিচার বুদ্ধি থাকার পরেও কাজে লাগায় না৷ এই যেমন সেন্ট মার্টিনে গিয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো যথাস্থানে না ফেলা লোকগুলো। চট্টগ্রামের জাম্বুরি পার্ক উদ্বোধনের একদিনের ভেতর দূষিত করে ফেলা লোকগুলোক। সাময়িক লাভের জন্য লোক ঠকানোর ব্যবসা করা মানুষগুলোকে। “যুদ্ধ হইছে সাতচল্লিশ বছর আগে এখন এসব ভুলে যাওয়া উচিত” বলা মানুষদেরকে। হর্ণ বাজিয়ে লাভ হবে না জেনেও হর্ণ বাজায় যারা তাদেরকে। এন্ড দ্যা লিস্ট গোজ অন………।

আরও পড়ুনঃ আপনার তথ্য হাতিয়ে নিয়েই আপনাকে বদলে দিচ্ছে গুগল-ফেসবুক!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top