শিল্প ও সংস্কৃতি

বাংলা সাহিত্যের যে উপন্যাসগুলো না পড়লেই নয়… (পর্ব ৩)

প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব

শেষ হয়ে এলো আমাদের ভালবাসার, ভাল লাগার, প্রাণের অমর একুশে বই মেলা ২০১৯। সেই সাথে শেষ হতে যাচ্ছে আমাদের বাংলার সেরা বিশ উপন্যাসের তালিকা। আজ শেষ পর্বে বলবো এমনই কিছু উপন্যাসের কথা, যাদের নাম উল্লেখ না করলে সেরা উপন্যাসের তালিকা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

সংশপ্তক – শহীদুল্লা কায়সার

সংশপ্তক এ যুগের দর্পণ, সংশপ্তক ভাবীকালের কল্লোল।

সংঘাতে বেদনায় ক্ষুব্ধ যে কাল; সে কালের মানুষ দরবেশ, ফেলু মিঞা, জাহেদ, সেকান্দার মাস্টার, রামদায়াল, আশোক, রমজান আর মোজাদ্দেদী সাহেব। জীবনসংগ্রামে যারা আজও হাল ছাড়ে নি তাদেরই প্ৰতিভূ লেকু-কসির-হুরমতি। আর যারা ধরা পড়েছে যুগের দর্পণে, হার মেনেছে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অথবা ভাস্বর অগ্নিঝলকে, সেই রাবু, আরিফা, রানু, রিহানা কিংবা মালু, এরা সবাই মুখর ক্রান্তিলগ্নের উত্থান-পতনে, জীবনে জিজ্ঞাসার যন্ত্রণায়। যুগধারার ত্রিবেণী-সঙ্গমে এই নায়ক-নায়িকারা কেউ অসাধারণত্বের দাবিদার নয় কিন্তু এরা সবাই অনন্যসাধারণ। এরাই ইতিহাস।

 

বাংলা সাহিত্যে ‘সংশপ্তক’ শহীদুল্লা কায়সারের এক অমর কীর্তিগাথা। সংশপ্তক অর্থ ‘নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যে বীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যায়’। রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত এদেশের হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত জীবন নিয়ে এবং অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধে অনুপ্রাণিত সার্থক সৃষ্টি ‘সংশপ্তক’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নির্মাণে শহীদ সাহিত্যিক যে নৈপুন্য প্রদর্শন করেছেন তা আমাদের দেশে একান্তই দুর্লভ। গ্রন্থখানিতে আছে মহাকাব্যিক ব্যপ্তি, আছে প্রসারতা। ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের দীর্ঘ আয়তনে ধরা পড়েছে বহু চরিত্র, কিন্তু সবার উপরে উঠে এসেছে পুরুষশাসিত মুসলিম সমাজে নারীর বিদ্রোহ। ব্যাভিচারিণী হুরমতির কপালে আগুনে তাঁতানো পয়সাটা দিয়ে ছেঁকা দেবার যে বর্বর নিষ্ঠুর দৃশ্যটিতে উপন্যাসের সূচনা, সেখানেই নারীর বিদ্রোহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

উপন্যাসের নায়ক জাহেদ একজন বিপ্লবী পুরুষ। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন টগবগে যুবক। মানুষ মাত্রই তার ভালবাসার পাত্র। মূলত জাহেদ চরিত্রটি লেখকেরই প্রতিচ্ছায়া। স্কুল মাস্টার সেকান্দর, পতিতা হুরমতি, চাষী লেকু, সকলেই তার স্নেহ ও ভালবাসা পায়। জাহেদ মানুষকে নিয়ে আশাবাদী, আশাবাদী তার জীবনকে নিয়ে। চরম বিপদের সময়েও তার বিপ্লবী সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। তাই তাকে গ্রেপ্তার করার সময় বলতে শোনা যায়-

‘‘চিন্তা করিস নে রাবু, আমি ফিরে আসব, আমি আসব”।

এই উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে রাবু। সে বিবাহিতা, অতীতকে অস্বীকার করে বিপ্লবী জাহেদের সঙ্গে সমাজ সেবায় ব্রতী হয়। জাহেদকে সে ভালবাসে। রাজনৈতিক মুক্তি পথের পথিক রাবু। সেকান্দর মাস্টারও দেশের স্বাধীনতা  সংগ্রামের একজন নিবেদিত কর্মী।

সমগ্র উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে দুটি গ্রাম- বাকুলিয়া ও তালতলি। এখান থেকে ঘটনা কলকাতা, ঢাকা পরিক্রম করেছে। জাহেদ, রাবু, ফেলু, মালু, রমজান, সেকান্দর মাস্টার, হুরমতি, লেকু- এদের চরিত্রচিত্রণে লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। এই চরিত্রগুলোর গল্পের শেষ নেই। তালতলির গল্প, বাকুলিয়ার গল্প, যুদ্ধের গল্প, দুর্ভিক্ষের গল্প, দাঙ্গার গল্প, ইংরেজ চলে যাবার গল্প, রমজানের মতো গিরগিটিদের গল্প, ভিটেহারাদের গল্প, সব মিলিয়ে ওদের নিজেদের গল্প। ওদের এক একটি জীবন অসংখ্য কাহিনী।

আসলে ‘সংশপ্তক’ বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ জীবনের সামন্ত প্রভূদের অত্যাচার আর তার মধ্য থেকে সাধারণ মানুষের বাঁচার লড়াইয়ের এক মনোজ্ঞ পাঁচালি।

পাক সার জমিন সাদ বাদ – হুমায়ুন আজাদ

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করি একটি স্বাধীন দেশ, আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তিরাশি আমাদের সামনের দিকে এগোতে দেয় নি, বরং নিয়ে চলছে মধ্যযুগের দিকে; বাংলাদেশকে পরিণত করছে এক অন্ধ রাষ্ট্রে। মৌলবাদ এখন দিকে দিকে হিংস্ররূপ নিয়ে দেখা দিচ্ছে; ত্রাসে ও সন্ত্রাসে দেশকে আতঙ্কিত ক’রে তুলছে- তারই এক ভয়াবহ ও শিল্পিত চিত্র রচিত্ হয়েছে হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসে।

এমন বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? একজন মুক্তমনা সাহিত্যিকের উপর দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন কতোটা প্রভাব ফেলতে পারে তা ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ পড়লে বোঝে যাবে। তাও যদি হয় আবার হুমায়ুন আজাদের মতো প্রথাবিরোধী লেখক, তাহলে সচেতন পাঠক ক্ষতবিক্ষত হতে বাধ্য।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ- শুধুমাত্র ভুখণ্ডের নাম পরিবর্তন নয়, এই পরিবর্তন ছিল আমাদের স্বকীয়তার পরিচয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধই প্রমাণ করে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ দেশবিভাগের অসারতাকে। কিন্তু ১৯৭৫ এর পরবর্তী ক্ষমতায় পট পরিবর্তন এই সোনার বাংলাকে প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তিরাশি আরেক অপরাষ্ট্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।

ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মাড়িয়ে রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের প্রতিস্থাপনের ফলে উগ্র জঙ্গিবাদসহ আরো অনেক বেপরোয়া ধর্মীয় রাজনীতির যে খেলা শুরু হল, তার বিরুদ্ধে নগ্ন চপেটাঘাত বলা যায় এই বইকে। শুধু তাই নয়, এই উপন্যাসে ফুটে উঠে ঊর্ধ্বতন আমলাদের কুটচাল এবং সাধারণ জনগণের মেরুদন্ডহীনতাও। আরও ফুটে উঠেছে দেশের উগ্রপন্থী সমাজতন্ত্রের কিছু দলের কথা যারা নিজেরাও সহিংসতা বাদে এ দেশের জন্যে কিছু করতে পারেনি।

স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনঃপ্রবেশ, উগ্র মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদের ফলাফল বা কল্পচিত্র স্পষ্ট হবে এই বইয়ের মাধ্যমে।

লালসালু – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

সময়টা ১৯৪৮। ‘লালসালু’ উপন্যাস যখন লেখা হয়, তখন চলছে দেশভাগের প্রস্তুতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ ভাগোত্তর উদ্বাস্তু সমস্যা আর সঙ্গে নতুন রাষ্ট্র গঠনের উদ্দীপনা। নাগরিক জীবনের রাজনৈতিক আর সামাজিক প্রেক্ষাপট ছেড়ে লেখক কলম ধরলেন চিরাচরিত গ্রামীণ বাংলার এক অপশক্তিকে কেন্দ্র করে, যা যুগ যুগ ধরে খুবলে খাচ্ছে অশিক্ষিত, কুসংস্কারাছন্ন মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি আর শ্রদ্ধাকে।

লালসালু ঘটনাবহুল উপন্যাস নয়, ঘটনার চেয়ে ঘটনা বিশ্লেষণের বিস্তারটাই চোখে পড়ে আগাগোড়া। মূল চরিত্র মজিদ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাকে ঘিরেই উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত। একদিন হঠাৎ করে মহব্বতনগরে প্রবেশ হয় তার, দিন না পার হতেই একসময় গ্রামের অধিবাসীদের মাজারকেন্দ্রিক ভয়-ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আকাঙ্ক্ষা, সব নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে মজিদ। তার চক্রান্তেই নিরুদ্দেশ হয় তাহের ও কাদেরের বাপ। আওয়ালপুরের পীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষে সে পীরকেও করে পরাভূত।

খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ানো, যুবক আক্কাস স্কুল প্রতিষ্ঠার আয়োজনকে বিদ্রূপ করা ও তাকে অধার্মিক হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রামছাড়া করা, এসবের মধ্য দিয়েই নিজের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা নিরঙ্কুশ বিস্তার করে, সে দ্বিতীয় বিয়ের পিড়িতে বসে। নতুন বউয়ের নাম জমিলা। চঞ্চল, সহজ-সরলমেয়ে। কিন্তু প্রথম থেকেই মজিদকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারে না সে। মজিদ জমিলাকে শাসন করতে চায়; কিন্তু পারে না।

জমিলার থুথু নিক্ষেপের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয় সে। জমিলাকে মাজার ঘরের অন্ধকারে খুঁটিতে বেঁধে রাখে। শুরু হয় প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, কিন্তু রহীমার হৃদয় ব্যাকুল হয়। মজিদের প্রতি যে রহীমার বিশ্বাস ছিল পর্বতের মতো অটল এবং ধ্রুব তারার মতো অনড়, সে রহীমাই করে বিদ্রোহ। বোঝা যায়, মজিদের প্রতিষ্ঠার ভিতে ফাটল ধরেছে। প্রতীকের মাধ্যমে জমিলার লাশের পা মাজারকে যে আঘাত করে তা সমাজের কপালে কলঙ্ক লেপনেরই সামিল। শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলে গ্রামবাসী মজিদের কাছে প্রতিকার চায়। কিন্তু মজিদের কাছ থেকে ধমক ছাড়া তখন আসে না কিছুই, ‘নাফরমানি করিও না, খোদার ওপর তোয়াক্কেল রাখো।’ এভাবেই বিপর্যস্ত পারিবারিক জীবন, বিধ্বস্ত ফসলের ক্ষেত এবং দরিদ্র গ্রামবাসীর হাহাকারের মধ্য দিয়ে লালসালু উপন্যাসের কাহিনী শেষ হয়।

কবি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

“শুধু দুস্তরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোঁর ডাকাতের বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া উঠিল”।

প্রথম লাইনেই পাঠক ভাবনায় খেই হারাতে বাধ্য, চরিত্রের ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে ভাবতে শুরু করতে হবে এখান থেকেই। সেই ভাবনা, ঘাত-প্রতিঘাত চলতে থাকবে পুরোটা সময়ই, একদম উপন্যাস শেষ হওয়া পর্যন্ত।

হ্যাঁ, বলছিলাম কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘কবি’র কথা। উপন্যাসটিতে নিম্নবর্গের দুধর্ষ ডাকাত বংশীয় নিতাইয়ের কবি হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর ও চিত্তাকর্ষক কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, নিতাইচরণের কবিপ্রতিভা এবং প্রণয়-আবেগ উপন্যাসটিকে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছিয়েছে। বারবার বেদনাময় পরিণতি নিতাইয়ের জীবনে বয়ে এনেছে অতল অনিশ্চয়তা। একইসঙ্গে নিতাইয়ের জীবনে সেই বাঁকগুলো বিচক্ষণ পাঠকের মনে নানান প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।

কবি প্রতিভাকে নিতাই স্রষ্টাপ্রদত্ত অলৌকিক এক জ্ঞান মনে করেছিল। তাই সে সৎভাবে সেই প্রতিভার বিকাশে পিতৃভিটা ছেড়ে স্টেশনে চলে যায়। ওখানে তার বন্ধু রাজা (স্টেশনের পয়েন্টসম্যান) নিতাইকে ‘উস্তাদ’ সম্বোধন করে তার থাকার বন্দোবস্ত করে দেয়। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নিতাই কবিগান করে এসেছে। ফলে ‘কবি’ হিসেবে তার নাম ঈষৎভাবে ছড়াতে থাকে।

এসময় রাজার শ্যালিকা ঠাকুরঝি’র সঙ্গে নিতাইয়ের পরিচয় ঘটে, গ্রামে সে দুধের যোগান দিত। কৃষ্ণবর্ণ, দ্রুতহাসিনী, ছিপছিপে গড়নের মিষ্টি-মেয়ে। নিতাইয়ের গানের নীরব ভক্ত সে। ঠাকুরঝিকে ভালবেসে ফেলে নিতাই। কিন্তু সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। ঠাকুরঝি বিবাহিত এবং স্বামীর সংসারে সে আদরণীয়া। তাই নিতাই নিজ থেকেই ঠাকুরঝিকে ছেড়ে চলে যায়। নিতাইয়ের চলে যাওয়ার মুহূর্তে বন্ধুবর রাজন যখন তার শ্যালিকার বিয়ে নিতাইয়ের সঙ্গে দিতে উদ্যত হয় তখন নিতাই বলে,  একবুক বেদনা ও সহজ সরল ঠাকুরঝিকে মনের গহীনকোণে সঙ্গী করে নিয়েই নিতাই বসন্তের ডাকে ঝুমুর দলে পাড়ি জমায়। কিন্তু ঝুমুর দলে তাঁর মন টিকে না, কারণ অশ্লীলতায় তাঁর কবি সত্ত্বা সাড়া দেয় না। কিন্তু ঝুমুর দলে না থাকলে পেতে ভাত জুটবে না। কিন্তু বসন্তের প্রেমে আটকা পড়ে যায় নিতাই। বসন্তের মধ্যে নিতাই ঠাকুরঝির ছায়া দেখতে পায়। তাইতো বসন্তের পেশা কদাকার হলেও নিতাই সেই দলেই ঝুঁকে পড়ে। নিতাইয়ের কবিতায়-

“বঙ্কিমবিহারী হরি বাঁকা তোমার মন,

কুটিল কৌতুকে তুমি হয়কে কর নয়, অঘটন কর সংঘটন।”

দেহ ব্যবসায় জড়িত থাকার ফলে মরণব্যধিতে আক্রান্ত হয় বসন্ত। ঝুমুরদল তথা দেহোপজীবিনীদের কাছে এটা সাধারণ বিষয়। এ রোগেই পরবর্তীতে মারা যায় বসন্ত। ফলে ঝুমুরদল ছেড়ে দেয় নিতাই। বসন্তের শোক কাটাতে ঠাকুরঝির আশায় গ্রামে ফিরে আসে নিতাই। এসে দেখে তার শোকেই মারা গেছে ঠাকুরঝি। দুই ভালবাসার মৃত্যুতে দুনিয়া তার কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠে। তাইতো সে গেয়ে ওঠে-

“এই খেদ মোর মনে মনে,

ভালবেসে মিটল না আশ-কুলাল না এ জীবনে।

হায়! জীবন এত ছোট কেনে!

এ ভুবনে?”

গাভী বিত্তান্ত – আহমেদ ছফা

উপন্যাসটিতে লেখক তাঁর প্রধান চরিত্র (এ দেশের প্রাচীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), তার পরিবার এবং তার সহকর্মীদের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে (প্রথম প্রকাশ – ১৯৯৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপট হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের শুরুতেই ফুটে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিভাবে নিজেদের ভিতরে কয়েকভাবে বিভক্ত, এবং তাদের ভিতরে কিভাবে নোংরা রাজনীতি মিশে আছে। এবং তাদের পদরেখা অনুসরণ করে কিভাবে শিক্ষার্থীরাও নানান রাজনৈতিক দলে বিভক্ত এবং বিভিন্ন অপকর্ম সম্পাদন করে অন্যদলের উপর চাপানোর যে চেষ্টা সেটাও ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় ঘটনাচক্রে দলাদলির ভেতর পড়ে গোবেচারা রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ সেরা বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদে আসীন হন। পদের সাথে সাথে তার কাছে চলে আসে ক্ষমতা, আর ধীরে ধীরে পালটে যেতে থাকে আবু জুনায়েদ। শিক্ষকদের দলাদলি, উপাচার্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা, নারী সহকর্মীর কাছে অপ্রত্যাশিত ব্যবহার, স্ত্রীর অত্যাচারসহ নানা সংকটে আবু জুনায়েদ বেশ বিড়ম্বনায় পড়লেও দ্রুতই সব সামলিয়ে উঠতে থাকেন। নিজের সমস্ত দুর্বলতা চকচকে স্যুট-টাইয়ের আড়ালে চাপা দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চলতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওয়া কোনদিকে বইছে, এসব বোঝার জন্য শুক্রবার মসজিদে গিয়ে জনসংযোগও করতে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি বিরুদ্ধ এই সম্পর্ক আবু জুনায়েদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে সাহায্য করে, দীর্ঘদিনের স্বপ্নের গাভিও ঘরে আসে। তার ভবনের আঙিনাতেই বিলাসবহুল গোয়ালঘরে ‘সুইডিশ গাভী এবং অস্ট্রেলিয়ান ষাঁড়ের মধ্যে ক্রস ঘটিয়ে’ জন্মানো দুর্লভ গাভী ‘তরণী’কে রাখা হয়। এই গাভীকে কেন্দ্র করে উপাচার্যের নতুন জীবন শুরু হয়। গাভীর প্রতি আবু জুনায়েদের বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা স্ত্রীর কাছে চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই আবু জুনায়েদ তার গোয়ালঘরে ঢুকিয়ে ফেলেন। আহমদ ছফা একটা দারুণ বর্ণনাও দিয়েছেন,

“মোগল সম্রাটেরা যেমন যেখানে যেতেন রাজধানী দিল্লিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন, তেমনি আবু জুনায়েদও দিনে একবেলার জন্য গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে গোয়ালঘরে ঢুকিয়ে ফেলতেন। দিনে দিনে গোয়ালঘরটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃৎপিণ্ড হয়ে উঠল। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে এটাই পৃথিবীর একমাত্র গোয়ালঘর, যেখান থেকে আস্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপদ্ধতি পরিচালিত হয়।”

উপন্যাসের চরিত্রগুলোর নামগুলোর আড়ালে সত্যিকার অনেক চরিত্রই উঠে এসেছে, অনেক পাঠকই তা ধরতে পারবেন। ধরতে পারবেন আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনার নামে কি প্রহসনটাই চলছে!

পথের পাঁচালি – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

পথের পাঁচালী মুখ্যত শিশু অপুর বড় হয়ে ওঠার কাহিনী। যে পথ দিয়ে জীবনে সে অগ্রসর হয়েছে, যেসব মানুষের সংস্পর্শে সে এসেছে, সে বর্ণনাই ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। যেই মা ও দূর্গা অপুর জীবনে উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠিত, পিসীর প্রতি তার রূঢ় ববহার তাদের জীবনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। উপন্যাসের পরবর্তী অংশ অপু-দূর্গা ও অপুর-দুর্গার শৈশব কাহিনী- সে কাহিনী অভিনবত্বে অসাধারণ নয়, কিন্তু মাধুর্যে পরিপূর্ণ।

জীবন ও প্রকৃতিকে অপু অবলোকন করেছে অপরিসীম বিস্ময় ও গভীর মুগ্ধতার সঙ্গে। অপুর দুই পা বাস্তব পৃথিবীতে প্রোথিত, কিন্তু তার দু-চোখে রোমান্সের অঞ্জন। স্বভাবসিদ্ধ কল্পনাপ্রবণতা ও তীক্ষ্ণ সৌন্দর্যনুভূতির গুণে সে মানুষের মধ্যে যে বিজন মহত্ত্ব অনুভব করে এবং প্রকৃতির মধ্যে যে ঐন্দ্রজালিক মোহনীয়তার সন্ধান পায়, অন্যের কাছে তা সহজে ধরা দেয় না। আমরা যে শ্রীহীন গ্রামকে জানি, যে দারিদ্রপীড়িত মানুষকে চিনি, যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, এখানে তার সবই অন্যরকম শ্রী, অন্যরকম শক্তি, অন্যরকম অবয়ব নিয়ে ধরা পড়ে। বস্তুর রূপকে ভেদ করে স্বরূপের উপলব্ধি অপুর দৃষ্টিভঙ্গির বড় কথা। যার কারণে ঔপন্যাসিকের আত্মস্মৃতিমূলক এই উপন্যাস এমন মোহনীয় হয়ে উঠেছে।

সূর্য দীঘল বাড়ি – আবু ইসহাক

উপন্যাসের শুরুতেই ১৩৫০ বঙ্গাব্দ তথা ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় হয়ে যাওয়া দুর্ভিক্ষের একটা বর্ণনা পাওয়া যায়। নিঃস্ব হয়ে শহর থেকে সন্তানদের নিয়ে আবার গ্রামে ফেরত আসে জয়গুন, সন্তানদের বাঁচাতে ভিটেমাটিটাও বিক্রি করে দিতে হয়। তাদের স্থান হয় সূর্য দীঘল বাড়ীতে। জীবন সংগ্রামে যুদ্ধ করতে করতে একসময় জয়গুন বুঝতে পারে, কুসংস্কারের কোন ভিত্তি নেই। বেঁচে থাকার তাগিদেই তাকে আবিষ্কার করতে হয় যে কুসংস্কারে ভয় পাওয়া নিরর্থক।

পুরো উপন্যাসেই বিভিন্ন কুসংস্কারের কথা তীব্র ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ফুটে উঠেছে। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির বর্ণনা, পরিনতি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সুচারু বিদ্রূপের মাধ্যমে। গোটা উপন্যাসে ফুটে উঠেছে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশ নিয়ে মানুষের চিন্তাচেতনা, আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ঘা পূরণ না হওয়ার হতাশা।

মোট কথা, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সমসাময়িক বঙ্গদেশের চলমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি, পরিচয়- সব কিছুই সুচারুভাবে ফুটে উঠেছে এক গ্রামীণ পরিবেশকে কেন্দ্র করে।

বিদেশী সংস্কৃতির গ্যাঁড়াকলে পরে আজ হয়তো আমরা আমাদের নিজেদের ভাষাটাকে বিসর্জন দিচ্ছি। ইংরেজি বলার সময় ভুল হলে যতোটা লজ্জা পাচ্ছি, এতোটা লজ্জা বাংলা বলার সময় ভুল হলে আর পাচ্ছি না। প্রায়ই আধুনিক প্রজন্মের মুখে শোনা যায়, ‘বাংলাটা আসলে ঠিক আমার মুখে আসে না’! আমাদের সাহিত্যের যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে আমাদের সামনে অনেকেই আমরা তা জানি না কিংবা আগ্রহ করে দেখি না। ব্যাতিক্রম ঘটে শুধু প্রাণের বইমেলায়, অমর একুশে বইমেলার শেষ প্রহরে তাই ব্যাক্তিগত সংগ্রহের ভাণ্ডার ভারি করতে অথবা প্রিয়জনকে উপহার দেবার জন্য বেছে নিতে পারেন বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোকে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top