বিশেষ

স্বল্পমূল্যে বিদেশী ভাষা কোথায় শিখবেন?

বিদেশী-ভাষা-শিক্ষা নিয়ন আলোয় neonaloy

চীনা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে, বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থটা এমন দাঁড়ায়: নতুন একটা ভাষা শেখার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীটাকে নতুন আর এক জানালা দিয়ে দেখা। সত্যিই তো! গোটা বিশ্বে প্রায় ছয় হাজারের অধিক ভাষা আছে; অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ভিন্ন সাহিত্য, ছয় হাজার ভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতি! বিপুল এই সমাহারের বেশ অনেকটাই অগোচরে রয়ে যায় আমাদের। কিন্তু চেষ্টা করলে খুব সহজেই শিখে ফেলা যায় কিছু ভাষা। অল্প খরচেই নতুন জানালা দিয়ে পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। এবং সেই নতুন জানালার দিকে এক পথ প্রদর্শকের নাম ‘আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’

বিদেশী ভাষা শিক্ষা নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

কেন শিখবো আমরা বিদেশী ভাষা? শোনা যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ডঃ শিশির ভট্টাচার্যের মুখ থেকে। তিনি বলেন,

“মানুষ সামাজিক জীব, সে চায় সকল মানুষের সাথে মিশতে, কথা বলতে, তাকে জানতে। আর ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বিভিন্ন ভাষা শেখার মাধ্যমেই গোটা বিশ্বকে চেনা সম্ভব”।

মূলত, ভাষাই পারে মানুষকে একতাবদ্ধ করতে। কিন্তু ভাষা শেখা কি শুধুই সামাজিকতার খাতিরে? আধুনিক ভাষা ইনস্টিউটের করিডরেই দেখা হল অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মনীষা সাহা এবং রেজওয়ানা রাইসা’র সাথে। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে স্প্যানিশ শিখছেন। কেন? রাইসার পরিষ্কার উত্তর,

“আজকাল সিভিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বাড়তি কিছু খুঁজেন চাকরিদাতারা। এবং অতিরিক্ত ভাষা জানালে অন্য যে কোন প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে থাকা সম্ভব”।

মনীষার উত্তরও সোজাসাপ্টা,

“কোন বিদেশী ভাষা শিখলে সে দেশের বৃত্তিগুলো পেতে সুবিধা হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরের দেশে যেতে সুবিধা হয়”।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ইরতিজা শিখছেন ফ্রেঞ্চ; তিনি বলেন,

“উদ্যোক্তা হতে চাই। বিদেশী ভাষা শিখলে তাদের সাথে যোগাযোগটা সহজ হয়ে যাবে হয়তো, তাদের অর্থনীতির হালচাল বোঝাও হয়তো সহজ হবে”।

বিবিএ শিক্ষার্থী মেহেরাজুল ইসলাম শিখছেন আরবি। তার ভাষ্য,

‘‘দেশে ভিন্ন ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা কম, কিন্তু অনুবাদকের চাহিদা অনেক। ফলে, ভিন্ন ভাষা শেখার মাধ্যমে বাড়তি আয়ের উৎসও সৃষ্টি হয়”।

শিক্ষার্থীদের কথাবার্তায় বোঝা গেলো বিভিন্ন ভাষা শেখার উপকারিতা। কিন্তু ঢাকা শহরে ভাষা কেন্দ্রের অভাব নেই। ফ্রেঞ্চ ভাষার জন্য আছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, রুশ ভাষা শেখার জন্য আছে রুশ বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি কেন্দ্র, জার্মান ভাষা শেখার জন্য আছে গ্যেটে ইন্সটিটিউট। এছাড়া বিদেশী স্কলারশিপ প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোতেও বিভিন্ন ভাষা শিখানো হয়।

তবে কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট? সে প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে জাপানিজ ভাষা শেখা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নিশান হোসেন কথার মুখে। তিনি বলেন,

“এখানে শিক্ষার্থীরা খুব কম খরচে ভাষা শেখতে পারে। এবং সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস করে প্রায় এক বছর সময় নিয়ে প্রতি কোর্সে শেষ করা হয়, ফলে পড়াশুনা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে তেমন চাপ সৃষ্টি হয় না। এবং ক্লাস করার প্রায় এক ডজন সময়সূচী আছে, তাই সকলেই নিজেদের সুযোগ-সুবিধা মতো ক্লাস করতে পারে। এবং আধুনিক ক্লাসরুম, যথেষ্ট প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং যোগ্য শিক্ষকদের সাহায্যে সুন্দর একটি শিক্ষার পরিবেশ পাওয়া যায়”।

১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন’ নামক বিভাগের সুচনার মাধ্যমেই দেশে প্রথম বিদেশী ভাষা শিক্ষা চালু হয়। সে সময় শুধু ফ্রেঞ্চ এবং চাইনিজ ভাষার কোর্স থাকলেও ভাষা আন্দোলনের পর যুক্ত হয় জার্মান ভাষা। ১৯৬৪ সালে যুক্ত হয় তুর্কি, রাশিয়ান এবং জাপানিজ ভাষা, আর সেই সাথে সূচনা হয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ফরেইন ল্যাঙ্গুয়েজ’র।

১৯৭৪ সালে স্প্যানিশ ভাষা যুক্ত হওয়ার পর ডিপার্টমেন্ট থেকে ইনস্টিটিউটে রূপান্তর হয়ে নাম হয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ফরেইন ল্যাঙ্গুয়েজ’। সেই পথচলা শুরু, আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। আরও কিছু বিদেশী ভাষার কোর্স যুক্ত হওয়ার পর এবং আধুনিকায়নের পর আজকের এই ‘আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট’।

বর্তমানে প্রায় পনেরটি মতো বিদেশী ভাষা শিখানো হয় এখানে; ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, রুশ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, আরবি, পার্সিয়ান, তুর্কি, চাইনিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান, উর্দু, হিন্দি এবং বাংলা (শুধু বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ফরাসি, চীনা ও জাপানি ভাষায় স্নাতক করা যায়। এ ছাড়া ভাষার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ১ বছর মেয়াদি চারটি ভিন্ন কোর্স আছে—জুনিয়র, সিনিয়র, ডিপ্লোমা ও উচ্চতর ডিপ্লোমা। ১ বছর মেয়াদি এই কোর্সগুলোর জন্য খরচ হবে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা)। এ ছাড়া ৩ মাসের স্বল্পমেয়াদি কিছু কোর্সও আছে।

 

উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ যে কোন ব্যক্তি বিদেশী ভাষায় জুনিয়র সার্টিফিকেট কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে এসএসসি বা এইচ এস সি পরীক্ষায় যে কোন একটিতে বা সমমানের পরীক্ষায় কমপক্ষে দ্বিতীয়  বিভাগ/ বি গ্রেড/ জিপিএ ২.৩০ থাকতে হবে। ইংরেজী জুনিয়র কোর্সে ভর্তির জন্য শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীরাই আবেদন করতে পারবে। কোন ভাষার আসন সংখ্যার তুলনায় প্রার্থী বেশি হলে ভর্তি পরীক্ষা হবে।

বিদেশী ভাষা শিক্ষা নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

সাধারণত প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল মাসে সার্কুলেশন দেওয়া হয় এবং মে-জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রার্থী বাছাই শেষে জুলাই মাস নাগাদ পুরোদমে ক্লাস শুরু হয়। জনতা ব্যাংক টিএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে ৫০০ (পাঁচশত) টাকার বিনিময়ে জুনিয়র কোর্সে ভর্তির আবেদন পত্র সংগ্রহ করা যায়। বাংলা ভাষা শিখতে বিদেশী শিক্ষার্থীরা নিজস্ব দূতাবাসের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি জ্ঞাপনপত্র (NOC) পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে।

সবার থেকে অধিক কিছু জানা বা সাধারণের চেয়ে ভিন্ন কিছু পারা যে কোন ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয়। আর অতিরিক্ত একটা ভাষা বলতে, লিখতে কিংবা বুঝতে পারা আমাদের নিয়ে যেতে পারে অন্য এক উচ্চতায়। তবে দেরি কেন? প্রস্তুতি নিতে থাকি, সময় মতো আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে শিখে ফেলি বিদেশী ভাষাগুলো এবং আবিষ্কার করতে থাকি না জানা, না দেখা বিপুল এক অজানা পৃথিবীকে।

আরো পড়ুনঃ বিদেশে উচ্চশিক্ষাঃ কোন দেশে পড়াশোনার জন্য কোন পরীক্ষা দিবেন?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top