শিল্প ও সংস্কৃতি

ফলোয়িং: লো বাজেট পরিচালনায় নোলান

ফলোয়িং নিয়ন আলোয় neonaloy

সিনেমা জগৎ কে যে একটু প্রান খুলে দেখে, অথচ ক্রিস্টোফার নোলানকে চেনে না- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর বটে।

নোলান সিনেমা নির্মাণ করছেন প্রায় ২০ বছর। এই ক্যারিয়ারে তিনি নির্মান করেছেন মাত্র ১০টি সিনেমা। তার জীবনের প্রথম সিনেমার শ্যুটিং শেষ হয়ে ওঠেনি। নাম ছিল “ডুডলবাগ”। মাত্র ১ হাজার ডলারে ৩ মিনিটের মত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা তৈরি হয়েছিল। কাজ যেহেতু শেষ হয়নি, সেহেতু বলা যাচ্ছে না আর কতটুকু এগুতো গল্পটা। হাজার ডলারের সীমায় আড়ালেই থেকে গিয়েছে সিনেমাটি। “টারান্টিলা” এবং “লার্সেনি” নামে দুইটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা  বানিয়েছিলেন “ডুডলবাগ” এর আগে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বাদ দিয়ে নোলানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা “Following

নোলানের সিনেমার প্রতিদ্বন্দ্বী নোলান নিজেই। তার ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ভাল-খারাপ বিবেচনা করার অবকাশ নেই। প্রতিটা সিনেমা একটার থেকে একটা ভালো। তবুও যদি বিবেচনা করা হলে, “Following” থাকবে নিচের দিকে। কিন্তু নোলানের তুচ্ছ ক্রিয়েশনও সেরাদের কাতারে জায়গা পায়।

একজন মানুষের প্যাশন আর ট্যালেন্ট থাকলে কি সম্ভব সেটা তিনি দেখিয়েছেন এই সিনেমায়। স্বল্প বাজেটের নির্মাতাদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি আদর্শ। নোলানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজেটের সিনেমা “The Dark Knight Rises”, যার বাজেট ছিল ২৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু “Following” মাত্র ৬ হাজার ডলার বাজেটের চলচ্চিত্র। মাত্র ৬ হাজার ডলারে একজন প্যাশনেট ট্যালেন্টেড মানুষ তৈরী করেছেন অনবদ্য ফলাফল।

তখন নোলানের কোন খ্যাতি নেই। কোন প্রযোজক জোটাতে পারছেন না। হাতখরচ, তার সাথে কিছু টাকা ধার করেন। স্ত্রী এমা থমাসের কাছ থেকে কিছু টাকা নেন। সিনেমার প্রধান চরিত্র বন্ধু জেরেমির থেকেও কিছু টাকা নিয়ে শুরু হয় চলচ্চিত্রটির নির্মাণ।

প্রযোজক ক্রিস্টোফার নোলান নিজেই

পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, এডিটর, সিনেম্যাটোগ্রাফার, স্ক্রিনরাইটার সবই নোলান। সব মিলিয়ে মাত্র ৭০ মিনিটের সিনেমা। প্রত্যেক শ্যুটের আগে প্রচুর রিহার্সাল করাতেন। যাতে ১ বা ২ টেকের মধ্যেই শট শেষ করা যায়। কোনোভাবেই খরচ হিসেবের বাইরে যাওয়া যাবে না যে। সিনেমাটির বেশিরভাগ শটই একবারে নেওয়া। কোন স্টুডিও লাইটিংও ব্যবহার হয়নি। খরচ কমাতে সিনেমার সব শ্যুট দিনে করা। লাইটিং সমস্যা তাও খুব ভালো সমাধান হয়নি। পুরো সিনেমাটা সাদাকালো রিলিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সাধারণত সিনেমা ১৫ থেকে ১ রেশিও তে শ্যুট করা হয়ে থাকে। নোলান সিনেমা ২ থেকে আধা বা ১ রেশিও তে শ্যুট করার উপায় বের করেন। ক্যামেরা ছিল ১৬ মি.মি. এর Arri 16BL। এই ক্যামেরা প্রথম রিলিজ হয় ১৯৬৫ সালে। কিছু অংশ নোলানের বাবার বাড়িতে শ্যুট করা। বাকিটা রাস্তায়। একটা পুলিশ স্টেশন এর শ্যুট বাদে পুরো চলচ্চিত্রটি হাতে ক্যামেরা ধরে শ্যুট করা।

পুরো একবছর ধরে ছুটির দিন গুলোতে সিনেমার শ্যুটিং চলে। মাত্র ৭০ মিনিটের সিনেমা শ্যুট করতে লেগে যায় পুরো বছর। সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই পুরো সপ্তাহ ব্যস্ত থাকেন নিজ নিজ পেশায়। শুধু ছুটির দিনে একত্রিত হন সিনেমার কাজে। এমনকি সবাই নিজের লাঞ্চ নিজেই আনতেন।

কাস্ট

সিনেমার বাজেট কম। অভিনেতাদের ব্যয় ভারও বহন করা মুশকিল। তাই নোলান তার বন্ধু জেরেমি থিওব্যাল্ডকে দিয়ে প্রধান চরিত্রটি করান। থিওব্যাল্ড কলেজ এ থিয়েটার করতেন। থিও’র মাধ্যমে থিয়েটার থেকে পাওয়া যায় আরেক চরিত্র লুসি রাসেলকে।

নিয়ো-নয়ার ঘরানার আধুনিক রুপের সিনেমা হল “Following”। নিয়ো-নয়ার বলতে বোঝানো হয় সে সকল সিনেমাকে যা শৈলনীষ্ঠ নাট্য। অন্য ভাষায় থ্রিল চলচ্চিত্রগুলো। হতে পারে হতাশাবাদী মনোভাবে পূর্ন, নান্দনিক, অপরাধ জগৎ। সোজা কথা ব্যতিক্রম। যার জন্য নোলানকে খুব একটা নাটকীয়তা দেখাতে হয়নি।

সিনেমায় মূল চরিত্র মাত্র চার জন। বিল নামে এক তরুন লেখক, জেরেমি থিওব্যাল্ড অভিনয় করেন এই চরিত্রে। কালো স্যুট পরা চোর, নাম কব। স্বর্নকেশী এক সুন্দরী আর একজন পুলিশ অফিসার। পুলিশ অফিসার এর চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে খুব বেশি সময়ের জন্য না। এছাড়া প্রয়োজনে আরও বেশ কিছু ছোট চরিত্রে আছে অনেকেই। নোলান এমন ভাবে চিত্রনাট্য এবং গল্প সাজিয়েছিলেন যাতে অভিনয় শিল্পীদের সংখ্যা কম থাকে। অনেক চিত্রনাট্য, সংলাপ অনেক বার কেটে ছেটে আবার নতুন করে লিখেছিলেন যাতে সময় অপচয় না হয়।

“Following” সিনেমার গল্পটা ব্যতিক্রম, তবে সাধারণ

সেই সাধারণের মাঝেই আছে অসাধারণ কিছুও। গল্পটা এমন, একজন লেখক হতে আগ্রহী যুবক। যে তার প্রথম উপন্যাস দিয়ে সবাইকে চমকে দেখিয়ে দিতে চায়। আর তাই সেই গল্পের চরিত্রের খোঁজে মানুষের পিছু নিয়ে থাকে।‌ একটাই শর্ত, এক ব্যক্তির দ্বিতীয়বার পিছু নেওয়া নেবে না সে। তবে সে নিজেই এই শর্ত ভাঙে। এক সুদর্শন কালো স্যুট পড়া ভদ্রলোকের পিছু ছুটতে থাকে সে‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌। একবার, দুইবার, তিনবার এরপর অনবরত।

হঠাৎ একদিন, সেই ভদ্রলোকই তাকে ধরে ফেলে। জানা যায়, কালোস্যুটধারী একজন চোর। মানুষের ঘরে না জানিয়ে প্রবেশ করে। কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যায়। জিনিসগুলো খুব গুরুত্বপূর্ন কিছু না। লেখাতে সাহায্য হবে এমন আশায় দুজনে দল বেঁধে লেগে ‌‌পড়ে চুরি‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ করতে। কিন্তু ঝামেলায় জড়িয়ে যায় লেখক হতে চাওয়া যুবকটি। কি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, নাকি ফেঁসে গিয়ে অন্যের পুতুল হয়েছে সেটা সিনেমা দেখেই উদঘাটন করা উচিৎ।

এ-ই ছিল নোলানের “Following” এর অল্প স্বল্প পেছনের গল্প
আমার কথাটি ফুড়োলো নটে গাছটি মুড়োলো।

আরো পড়ুন
ইনসেপশনঃ কিভাবে কি হলো? [স্পয়লার অ্যালার্ট]

Most Popular

To Top