শিল্প ও সংস্কৃতি

ফাগুন হাওয়ায়, এবং ইতিহাস ফিরে দেখা আত্মজিজ্ঞাসা…

ফাগুন হাওয়ায় নিয়ন আলোয় neonaloy

ফারিয়া ফাইরুজ প্রভা:
বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে টিটো রহমানের ছোট গল্প ‘বউ কথা কও’ অবলম্বনে তৌকির আহমেদ নির্মিত ষষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে বেশ কিছু সিনেমা নির্মিত হলেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা তুলনামূলকভাবে কম সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে।

২ ঘন্টা ১৭ মিনিট ব্যাপী এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন সিয়াম, তিশা, যশপাল শর্মা, আবুল হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, সাজু খাদেম, রওনক হাসান, ফারুক আহমেদ প্রমুখ।

গল্পের নায়ক নাসির (সিয়াম) এবং দীপ্তি (তিশা) যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেলের ছাত্র। দীপ্তির ঠাকুর্দা আবুল হায়াত এলাকার স্বনামধন্য ডাক্তার। প্রথমদিকে মনে হতে পারে এটি নাসির এবং দীপ্তির সিনেমা। কিন্তু দুর্দান্ত মেথড অ্যাক্টিং দিয়ে পাকিস্তানি অফিসার চরিত্রে যশপাল শর্মা সিনেমার আলো কেড়ে নিয়েছেন।

সামনে আসা ফাগুন দিনের জন্য নাটকের রিহার্সেল করতে থাকা নাসির আর দীপ্তি যখন নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছিলো, তখন থানায় আসা অফিসার একে একে নতুন আইন জারি করছিলো। সবাইকে বাধ্যতামূলক উর্দুতে কথা বলানো, পুরো থানা নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া, ফলশ্রুতিতে থানার কর্মচারীদের কে উর্দু শেখানোর জন্য মাওলানা (ফারুক আহমেদ) রাখা, দোকানের নাম পরিবর্তন করা ইত্যাদি। এ সিনেমায় অন্যতম শক্তিশালী মেটাফোরিক সংলাপ হচ্ছে বউ কথা কও পাখি কেন উর্দুতে ডাকে না, কেন বলে না ‘বিবি, বাত কারিয়ে’? এমনকি পাকিস্তানি অফিসারের দুঃস্বপ্নে বউ কথা কও বাংলায় ডেকে যায়। যে দেশের মানুষ, গাছ, পাখি বাংলায় কথা বলে, সে দেশের ভাষা কেন উর্দু হবে?

সিনেমায় জমাদার চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবুর স্বল্প সময়ের উপস্থিতি বাবুর অভিনয়ের জাত চিনিয়ে দিয়েছে।

ফাগুন হাওয়ায় নিয়ন আলোয় neonaloy

হালদায় যেমন নদীর চমৎকার দৃশ্য ছিলো, এ সিনেমাতেও নদীর পাড়ের চমৎকার চমৎকার দৃশ্য ছিলো। সিনেমার কস্টিউম ডিজাইন প্রশংসাযোগ্য।। পুরো সিনেমা জুড়ে দীপ্তির স্নিগ্ধতা এবং নিষ্পাপ চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে হালকা রঙের শাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে।

সিনেমায় যথেষ্ট পরিমান কমিক রিলিফ ছিলো- মাওলানার উর্দু শেখানো, ভূত সেজে মাওলানা এবং অফিসারকে ভয় দেখানো, মোরগের নামকরণ এবং তা পুড়িয়ে খাওয়া।

যশপাল শর্মার অভিনয়ের পাশে সিয়াম-তিশার অভিনয় ম্লান হয়ে গিয়েছে। দুজনের সংলাপ যান্ত্রিক, প্রাণহীন লেগেছে। তাছাড়া সিয়াম এবং তিশার ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট ঠিকমতো হয় নি। সিয়াম-তিশার কাহিনী এবং পাকিস্তানি পুলিশ অফিসারের কার্যকলাপ প্রায় সমান্তরালভাবেই চলেছে, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সিয়াম এবং তিশার যতটুকু সংযোগ দরকার ছিলো, তা আমরা পাই নি। শুধুমাত্র সুদর্শন হওয়ার জন্য নায়ক হয়ে যাওয়ার ট্রেন্ড থেকে আমরা কবে বের হতে পারবো, কে জানে!

মানুষের চিন্তার পুলিশিং এর ভালো দৃষ্টান্ত দেখা যায় যখন পুলিশ অফিসার ‘শ্লীল’ এবং ‘অশ্লীল’ নির্ধারন করতে বসে এবং দীপ্তির ঠাকুর্দা এবং নাসিরের মা কে থানায় তলব করা হয়।

কিছু কিছু জায়গায় বেশ অসামঞ্জস্য লেগেছে। যেমন- নাসির যখন বাবার ছবি ‘রিস্টোর’ করতে বলে, তখন মনে হচ্ছিলো এটা বর্তমান সময়ের কাহিনী। তাছাড়া দীপ্তির বাড়ির অন্দরমহলের ঠাঁটবাট মনে হয়েছে সমসাময়িক এবং আরোপিত উচ্চারনে দীপ্তির ‘ঠাকুর্দা’ ডাক শ্রুতিকটু লেগেছে।

ইতিহাসের বয়ানের মাধ্যমে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে যে একটি ভিন্ন মেজাজ তৈরি হচ্ছে, তার রেশ পাওয়া যায় ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এর মাধ্যমে। বায়ান্নতে যে ভাষার প্রশ্নে আমরা জাতপাত এবং ধর্ম বিভেদ ভুলে একইসাথে মুসলিম এবং বাঙালি হতে পেরেছিলাম, বর্তমান সামাজিক এবং সৃংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের যে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান, সিনেমাটি তার একটি আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি করে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top