নাগরিক কথা

মুনাফাগন্ধি নগরে ফ্যান্টাসির বুদবুদ

চকবাজার অগ্নিকান্ড নিয়ন আলোয় neonaloy

এই শহর-তল্লাট, রাস্তাঘাট, কংক্রিট-জঙ্গল নিয়ে আমাদের অপ্রয়োজনীয় রোম্যান্সের শেষ নাই। নি:শ্বাসে ২১ শতাংশ অক্সিজেনের পরিবর্তে ২১ শতাংশ সীসা টেনে মৃত্যুঘেঁষে নীল হয়ে যেতে যেতে আমরা এই শহরকে রোম্যান্টিসাইজ করতে থাকি। দ্য ইকোনমিস্ট যখন বলে, বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা শহর দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার দামেস্ক। আমরা কূয়োর ব্যঙ, হিমালয় দর্শন কপালে জোটেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা শহরের পাশাপাশি কেন আমাদের নাম আসল সেই প্রশ্ন না তুলে শহর নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ফ্যান্টাসি করতে বসি। যেহেতু এই শহরে রিকশায় বসে বৃষ্টিতে ভেজা যায়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া যায় তাই এই শহর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহর।

এই শহরে প্রতিদিন আবাল-বৃদ্ধা ধর্ষণের শিকার হয়, বেওয়ারিশ লাশে ভরে থাকে ডাস্টবিন-মর্গ, ১০কিমি. পথ আসতে ৩ ঘণ্টা লাগে, হর্ণের শব্দে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে থাকে এসব কোন ফ্যাক্টরই নয় যেন। যানজটে আটকে থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর মরে ভূত হয়ে যেতে থাকা মানুষগুলোর অব্যয় জীবনের কোন গুরুত্বই নাই। ট্রাফিকে আটকে না থেকে হাঁটতে চাওয়া মানুষের ফুটপাতে হকার আর উন্নয়নের দেয়াল তুলে পথরোধ করে রেখে জীবন আটকে রাখাটাই এখানকার সবচেয়ে স্বাভাবিকতা।

হোলি, সাকরাইন, পূজার মতো উৎসবে পুরান ঢাকা হোস্ট। মানুষে গিজগিজ করে ঐতিহ্যাকীর্ণ এই পুরান ঢাকা। বাস, রিকশা, মানুষ, ঘোড়াগাড়ি সব একই রাস্তা ধরে চলতে থাকে। সকলেরই প্রায় একই গতিবেগ। কখনো রিকশা থামিয়ে মানুষ পথ করে নেয়, কখনো মানুষকে থেমে বাসকে যাওয়ার পথ করে দিতে হয়।

বিল্ডিং-কোড না মানা আকাশ ছোঁয়া সব দালানকোঠা। কেউ কারো জন্য এতটুকু ছাড়তে রাজি নন। যুগযুগ ধরে চলে আসা এই জনাকীর্ণ অঞ্চলের মানুষের অভ্যস্ততা গড়ে ওঠারই কথা। উঠেছেও তাই। কিন্তু সিঙ্গাপুর, লস অ্যাঞ্জেলেস দাবি করা মহাপতিদের অখণ্ড ব্যস্ততার ফাঁক গলে তদারকির জন্য একফোঁটা সময় হয় না কত মিটার রাস্তা রেখে ভবন বানানোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। সে নির্দেশনার কতটুকু প্রয়োগ হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কি না। মুখস্থ বুলি ‘জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেই খালাস।

রাস্তা সংকীর্ণ বলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারছে না এমন ঘটনা তো এই প্রথম না। এই শহরে মানুষ খেয়ে/না খেয়ে বাড়ি বানায়। রাস্তা বানায় না। ভাবখানা এমন যে, বাড়ি একটা কোনমতে ওঠানো গেলেই হল। রাস্তার দরকার নাই, প্রয়োজনে বাথরুমের পাইপ-ভেন্টিলেটর ধরে ওঠানামা করব।

চকবাজারের অলিতে-গলিতে কেমিকেলের গোডাউন, নকল প্রসাধনীর দাহ্য মেটেরিয়ালস এসব সবার জানা (চোখ-কান বন্ধ করে রাখা না দেখার ভান করে থাকা ব্যক্তি-প্রশাসন ছাড়া)। জানার পরেও কেন সেগুলো সরিয়ে আনা হয়নি, এসব জবাবদিহিতা করার রেসপন্সিবল কোন ব্যক্তি নাই। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি-বসতি থেকে শিশির পর শিশি লুকানো ফেনসিডিল, পুরিয়ার পর পুরিয়া হেরোইন যে প্রশাসন খুঁজে খুঁজে আটক করতে পারে সেই প্রশাসন শুধু কেমিকেলের গুদামের সন্ধান পায় না এটাই আশ্চর্যজনক!

শুনলাম, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু মামলাটা কার বিরুদ্ধে? রাজধানী শহরের একটা মানুষকেও নাগরিক সুবিধা দিতে না পারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কি কোন মামলা হয়? একজন নাগরিককেও সঠিক সময়ে গন্তব্যে না পৌঁছে দিতে পারার ব্যর্থতা, রাস্তায় হাঁটার সুবিধা দিতে না পারার অপারগতা, আগুন লাগলে দৌড়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে প্রাণ বাঁচানোর অধিকারটুকু না রাখার জন্য কি রাষ্ট্রের ওপর কোন মামলা করা যায়? কিসের তদন্ত কমিটি? কী তদন্ত করবেন তারা? খবরে দেখলাম শিল্পমন্ত্রী বলছেন, এখানে কোন কেমিকেলের গোডাউন ছিল না।্আর স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেখলাম বার্ন ইউনিটের সামনে দাঁড়িয়ে কিভাবে লোকজন পুড়ে মরেছে, কতখানি পুড়েছে সে বর্ণনা দিতে। কোনরকম তথ্য-প্রমাণ ছাড়া যেখানে যার যা খুশি বলে দেয়, সেখানের কিউট তদন্ত নিয়ে মানুষের বিস্তর ধারণা আছে।

আচ্ছা, এই তদন্তে কি উঠে আসবে, ঘটনাস্থলের আশপাশ ডিভাইডার দিয়ে আটকে ছিল বলে বেশি সংখ্যক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে? উঠে আসবে, পথচারীদের যানবাহন একটু আগেপিছে নড়ে সরে যেতে পারলে হৃদয়-বিদারক অনেক মৃত্যুগন্ধ টিভি-পত্রিকায় লেগে থাকত না? উঠে আসবে অপরিকল্পিত আবাসন-রাস্তাঘাটই দুর্ঘটনায় মানুষের বাঁচার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়? আসবে না, এসব যে অস্বাভাবিক; অস্বাভাবিকতার ওরিয়েন্টেশনই আমাদের মগজে এক্সিস্ট করে না।

যেকোন দুর্ঘটনা/বিপর্যয়ে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ হচ্ছে কারণ অনুসন্ধান করে তা নির্মূলের ব্যবস্থা নেওয়া। এই ভূখণ্ডে কারো যেহেতু অত ঠেকা নাই। তাই অত অনুসন্ধান-টন্ধান করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন পড়ে না। মরে গেলে এক লাখ টাকা আর আহত হলে ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই খুশিমনে লাশ/আহত মানুষ নিয়ে লোকে ঘরে ফিরে যায়। দুর্ঘটনা, তার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, দুর্ঘটনা পরবর্তী কোন পরিকল্পনা ছাড়াই এই রাষ্ট্র, এই শহর শত শত বছর এভাবেই বেঁচে আছে। আমাদের কিছুরই দরকার নাই। বেঁচে থাকলে কিভাবে কতটাকা ইকাম করব আর মরে গেলে কতটাকা ক্ষতিপূরণ পাব এই দু’টো বিষয় ঠিকঠাক থাকলেই চলে।

সাধারণের ব্যক্তিমালাকানাধীন ব্যবসা আর অসাধারণের জনগণের নামে কেনা বড় বড় রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট, মুনাফা আর ভারী পকেটকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে কবরস্থানে ডাইনিং টেবিল পেতে এই দেশের মানুষ একদিন পোলাও-বিরিয়ানি খাবার স্বপ্ন দেখে। এক একটা কবরের প্যাকেজ ৩৩ লাখ টাকা।

Most Popular

To Top