নাগরিক কথা

চকবাজারে লাশের মিছিল… কাকে রেখে কাকে দোষ দিবেন?

চকবাজার অগ্নিকান্ড নিয়ন আলোয় neonaloy

গতকাল সকালে যখন একের পর এক পোড়া ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখছিলাম তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ভাষার মাসে সেই ২১ তারিখেই ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এটা কি বাংলাদেশ? নাকি সিরিয়ার কোন ফুটেজ? যেখানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে?

মাথায় চলে আসে ২০১০ সালের নিমতলী ট্রাজেডির কথা, ১২৮ জনের প্রাণ পুড়ে কয়লা হয়েছিলো এই পুরান ঢাকাতেই। ১৯৯৬ সালে আরেক অগ্নিকান্ডে ঝরে যায় ১৮ জনের প্রাণ। নিমতলী গিয়েছিলাম ঘটনার চারদিন পর, ৯৬ ঘন্টা পরেও আগুনের তাপ টের পাওয়া যাচ্ছিলো।

এতো বড় দূর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে আমরা কারণ খুঁজতে থাকি, কেন বা কিভাবে হয়েছে?

কারণ তদন্ত কমিটি বের করবে। আমি কিছু কথা বলতে চাই।

আমি বর্তমান সরকারকে অবশ্যই দায় দিবো শুরুতে। নিমতলী ঘটনার পর তারা বলেছিলেন পুরান ঢাকা থেকে সব রকমের রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নিবেন। তারা সেটা পারেননি, কেন পারেননি সেটা পরের ব্যাপার কিন্তু যেহেতু তারা পারেননি দায় তাদের নিতে হবে। তাদের উচিৎ ছিলো বাড়ির মালিক, কারখানার মালিক, দোকান ব্যবসায়ী সমিতিকে যেভাবে হোক রাজি করানো, দরকারে বল প্রয়োগ করে হলেও।

বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ভয়াবহরকম ব্যর্থতা দেখায়, সব দিক থেকেই। ঘটনা ঘটে যায় প্রতিশ্রুতি ফাইলেই পড়ে থাকে, মানুষ একসময় ভুলে যায়। তারপর নতুন কোন ঘটনা হয় আবার কয়েকদিন মিডিয়া, সরকার সরব থাকে তারপর আবার ভুলে যাই আমরা সবাই।

সরকারকে দায় দেই আমরা, বিরোধী দল, সেটার অবশ্যই কারণ আছে।

কিন্তু একটা কথা পুরান ঢাকার মানুষ কেন ভুলে যায় যে প্রাণ যায় তাদের, নিঃস্ব হয় তারা, স্বজন হারায় তারা। জানমাল তাদের আগুনে পুড়ে যায়; অথচ তারা নিজেরা কেন সচেতন হননা?

পুরান ঢাকার ভবন মালিক যারা আছে তারা কথা দিয়েছিলেন রাসায়নিক কোন কারখানাকে বাড়ি ভাড়া দিবেনা। তারা কথা রাখেননি। কারণ কারখানাকে ভাড়া দিলে বেশি টাকা পাওয়া যায়।

দোকান মালিক সমিতি, ব্যবসায়ী সমিতি বলেছিলেন কারখানা সরানোর ব্যবস্থা নিবেন, তারাও নেননি।

কেন? মরেন তো আপনারাই!

মৃত্যুকূপের মাঝে বাস করেন কেন আপনারা? আপনারা ভাড়া না দিলে এসব কারখানা চালু হয় কিভাবে?

সরকার অলস, ব্যর্থ, মনিটরিং করেনা; কিন্তু নিজেরা কি সচেতন হওয়া যায়না?

সরকার লাইসেন্স বন্ধ করে দিবে বলেছে, সেটা যদি করেও তবু আপনারা চুরি করে ভাড়া দিবেন, সামনে না দিয়ে ভবনের পেছনে দিবেন! সিটি কর্পোরেশনের করাপটেড পরিদর্শক আসলে টাকা গুঁজে দিবেন…..

সরকার গড়িমসি করে? সরকার কথা রাখেনা? নিমতলীর পর আপনারা কেন সরকারকে চাপের ভেতর রাখেননি?

পুরান ঢাকায় এখনো “পঞ্চায়েত কমিটি” লেখা সাইনবোর্ড দেখি, পঞ্চায়েত কমিটি, এলাকার মানুষ, দোকান মালিক সমিতি আপনারা কেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ঘেরাও দেননা? মিডিয়া তো লুফে নিবে আপনারা শুরু করলে? রাস্তায় নামেন, সব কারখানা সরানোর দাবিতে?

সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেছেন সরকারের যেমন ব্যর্থতা আছে তেমনি পুরান ঢাকাবাসীদের পক্ষ থেকেও কোন চাপ বা দাবি আসেনি। কেন আসবে? সবার বাড়িতেই প্রায় রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার হয় এমন কারখানা আছে।

সময় থাকতে সচেতন হন, এখনই সরকারকে চেপে ধরেন।

আর সরকারকে বলবো, দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর হন, লাগে পশ্চাৎ প্রদেশে লাঠির বারি দেন যদি কেউ এসব কারখানাকে ভাড়া দেয় নিজের ভবনে। কারণ শেষ পর্যন্ত দায়ভার আপনাদেরই। আপনারাই পারেননি এসব সমস্যা দূর করতে।

কিছু সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে জানিনা, এই চিপা রাস্তা, সরু সরু গলি, এগুলা সম্প্রসারণ করতে হলে কয়েকশ ভাবন ভাঙতে হবে। মালিকেরাই তো বাধা দিবে! অথচ এখানে একটা এম্বুলেন্স ঢুকেনা, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকেনা। বুধবার রাতে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন এই চিপাগলিতে জ্যামে আটকা পড়েই। বের হতে পারেননি।

বড় একটা প্রশ্ন ব্যবসায়ীরা করেন, এসব কারখানা কোথায় যাবে? এর সাথে জড়িত মানুষেরা কি করবে?

উত্তর, ট্যানারি শিল্পের জন্য আলাদাভাবে জায়গা দেয়া হয়েছে তাহলে এই কারখানা বা এই ধরনের শিল্পের জন্য বুড়িগঙ্গার ওপারে জায়গা দেয়া হোক?

সরকার চিন্তা করুক একটা ব্যাপারে, এই যে শ্যাম্পু কারখানা, জুতার সোলের কারখানা, প্লাস্টিক কারখানা, পারফিউম কারখানা এগুলা ছোট হলেও এদের একটা বাজার কিন্তু আছে, না হলে এই শ্যাম্পু, পারফিউম কোথায় যায়?

সরকার এদের প্রণোদনা দিক? বিদেশি শ্যাম্পু বা পারফিউম নকল করার অনুমতি দেয়া অসম্ভব, আইনসংগত নয়, কিন্তু তাদের সাথে বসুক যেন তারা নিজস্ব ব্র‍্যান্ড চালু করে এই ব্যবসা সম্প্রসারিত করতে পারে।

নতুন একটা শিল্প গড়ে উঠলে ক্ষতি কি?

এটা অবশ্য রাতারাতি হবেনা। কোথায় সরাবে সেটার নিশ্চয় বিজ্ঞান এবং পরিবেশগত ব্যাপার স্যাপার আছে। জনবসতি থেকে দূরে সরাতে হবে, সময় লাগবে। নিমতলীর পর উদ্যোগ নিলে এতদিনে হয়ে যেতো।

আপাতত করনীয় কি তাহলে?

– নতুন লাইসেন্স না দেয়া

– যাদের লাইসেন্স আছে তাদের কারখানা ভিজিট করতে হবে, সেটা শ্রম মন্ত্রণালয় করুক, শিল্প মন্ত্রণালয় করুক যে ইচ্ছা সে করুক কিন্তু করতে হবে, এবং দেখতে হবে রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহারের যে নিয়ম আছে তা মানছে কিনা, না মানলে লাইসেন্স বাতিল করে দিক। তাতেই মনেহয় ৫০% কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

– যারা অবৈধভাবে কেমিক্যাল মজুদ করে তাদের গ্রেপ্তার করুক র‍্যাব, পুলিশ।

– ভবন মালিকেরা এসব কারখানাকে নোটিশ দিক বাড়ি ছাড়ার। সরকার নোটিশ দিলে অজুহাত দিবে কোথায় যাবো জায়গা দেন? বাড়ির মালিক দিলে কিছু বলার থাকেনা।

– নিয়মিত সিটি কর্পোরেশন, শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পরিদর্শক পাঠাতে হবে মনিটরিং করার জন্য।

একটা কথা অবশ্য সত্যি, বছরের পর ধরে চলতে থাকা এই শিল্প হুট করে সরালে আবার অন্যরকম সমস্যা হতে পারে। এরা অসংখ্য সংখ্যায়, আর এদের জায়গা দেয় পুরান ঢাকাবাসী, এদের বিপক্ষে হুট করে যাওয়া যাবেনা। হ-য-ব-র-ল অবস্থা করে দিবে।

মৃত্যু কখনো দল দেখে আসেনা, আওয়ামী-বিএনপি সবাই পুড়ে কয়লা হয়েছে চকবাজার, নিমতলী সব জায়গায়। সুতরাং এই মুহুর্তে দলবাজি, কাঁদা ছিটানোর কোন দরকার নাই। মানুষ মরেছে, পারলে সমবেদনা জানান, না হলে চুপ থাকেন।

একটা দলের মহাসচিব বলেছেন অনেক কথা, আমি শুধু বলবো এই আগুন আপনারা সরকারে থাকতে লাগেনি বলে আজ এতো কথা বলছেন, কিন্তু আপনারাও কিন্তু এই রাসায়নিক কারখানা গুলো সরানোর ব্যবস্থা নেননি, লাইসেন্স বন্ধ করেননি। বরং খুঁজলে আপনাদের আমলে লাইসেন্স নিয়েছে এমন অনেক ব্যবসায়ী পাওয়া যাবে। সুতরাং এই যে আঙুল তুলছেন সেটা অভিযোগ আকারে না করে অনুরোধ হিসেবে করেন যে এই এই ব্যপারে অতিদ্রুত ব্যবস্থা নেন সরকার, আমরা দেখতে চাই সেটাই।

সবশেষে বলি, মানুষ মরেছে, একটা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়া মানেই অনেক কিছু, সেখানে এতো গুলো তাজা প্রাণ চলে গিয়েছে। আর কোন নিমতলী, চকবাজার চাইনা।

মাননীয় সরকার, পুরান ঢাকাবাসী কিছু করেন প্লিজ, না হয় লাশের মিছিল বাড়তেই থাকবে শুধু…

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top