ইতিহাস

এবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদযাপনেও হানা দিলো #MeToo!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের সারাসোটা শহরে ঢুকলেই দেখা হবে এক মূর্তিযুগলের সাথে, জনৈক মার্কিন নাবিক সাদা পোশাক পরা এক ভদ্রমহিলাকে চুম্বনরত অবস্থায় ধরে আছেন, ভদ্রমহিলা হেলে আছেন নাবিকের হাতের উপর। এই চুম্বনরত মূর্তিযুগলের নাম ‘আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার’।

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

শুধু সারাসোটা শহরই না, এই মূর্তিযুগলের দেখা মিলবে নিউইয়র্ক শহরের টাইমস স্কয়ারে, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগোতে, হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে এবং ফ্রান্সের নরম্যান্ডি শহরে। সারাসোটা শহরেই প্রথম মূর্তিটি বসানো হয়, পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শহরে বসানো হয় বাকি মূর্তিগুলো।

‘দা কিসিং সোলজার’ বইয়ের লেখক লরেন্স ভেরিয়া এবং জর্জ গ্লাডোরিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই যুগলের নাম জর্জ মেন্ডনসা এবং গ্রেটা জিম্মার ফ্রেইডম্যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সাধারণ মানুষের বিজয়োল্লাসকে ঘিরে যে ছবিগুলো তোলা হয়, সেখানেই প্রথম দেখা যায় এই যুগলকে। সত্যি করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এই আলোকচিত্রটি একটি আইকনিক ফটোগ্রাফ হিসেবে অমর হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

গ্রেটা জিম্মার ফ্রেইডম্যান এবং জর্জ মেন্ডনসা

তবে হঠাৎ করেই আবার উত্তেজনা শুরু হয় এই ‘আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার’ নিয়ে। গত রবিবার ৯৫ বছর বয়সী জর্জ মেন্ডনসা বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করলে তার দুইদিন পর সারাসোটা শহরের মূর্তিতে দেখা যায় লাল কালির স্প্রে দিয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে করে লেখা ‘মি টু’!

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, প্রায় ১০০০ মার্কিন ডলার(প্রায় ৮৫,০০০ টাকা) খরচ হয় মূর্তিযুগলকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। গ্রাফিতি মুছেও ফেলা হয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষ বিভক্ত হয়ে গেছে গ্রাফিতির পক্ষে-বিপক্ষে।

কেন এই গ্রাফিতি তা বুঝতে হলে জানতে হবে এই যুগলের পুরো কাহিনী। জাপানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর, সাধারণ মানুষের উল্লাসকে ক্যামেরাবন্দি করতে অন্যান্য ফটোগ্রাফারদের মতো রাস্তায় নামেন আলফ্রেড এইসেন্সটেডও। হাঁটতে হাঁটতে তুলতে থাকেন উল্লাসের ছবি। ১৯৪৫ সালের ১৪ই আগস্ট বিকাল ৬টার দিকে, টাইমস স্কয়ারে এক মার্কিন নাবিক এবং সাদা ড্রেস পরা মহিলাকে চুম্বনরত অবস্থায় দেখে চটপট তাঁদের ক্যামেরাবন্দি করে নেন এইসেন্সটেড। কিন্তু সময়সল্পতার কারণে আর পরিচয় নেয়া সম্ভব হয়নি আর এই যুগলের।

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

এক সপ্তাহ পরে ‘লাইফ’ নামক ম্যাগাজিনে ‘বিজয় উল্লাস’ নামক সিরিজে ছবিটি বের হয় ‘ভি-জে ডে(ভিক্টরি ওভার জাপান ডে) ইন টাইমস স্কয়ার’ শিরোনামে। এবং বের হওয়ার পরপরই সাড়া ফেলে দেয় এই যুগল। সকল মানুষ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আনন্দ বহিঃপ্রকাশকে খুঁজে পায় এই ছবির মাধ্যমে। কিন্তু ছবিতে চুম্বনরত দুজনের কারোই চেহারা সঠিকভাবে ফুটে না ওঠায় অনেকেই নিজেকে ওই দুইজনের একজন বলে দাবি করতে শুরু করে। অনেক গবেষণা, মামলা-আদালত হওয়ার পরে শেষ পর্যন্ত বের হয় চুম্বনরত নাবিকের নাম জর্জ মেন্ডনসা এবং সাদা পোশাক পরিহিত ভদ্রমহিলার নাম গ্রেটা জিম্মার ফ্রেইডম্যান। নানান ভাবে সম্মানিত করা হয় তাঁদেরকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাঁদের অতিথি হিসেবেও ডাকা হয়।

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

বিজয়োৎসবের বর্ষপূর্তি উদযাপনে আমন্ত্রিত জর্জ এবং গ্রেটা

কিন্তু বিতর্কের শুরু হয় ২০০৫ সালে ‘লাইব্রেরী অব কংগ্রেস’কে দেয়া গ্রেটা জিম্মার ফ্রেইডম্যানের এক সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। সাক্ষাৎকারে ফ্রেইডম্যান জানান যে চুম্বনটি হঠাৎ ঘটেছিল, তার সম্মতি না নিয়েই। তিনি বলেন, “সে(জর্জ) হঠাৎ করে আমার সামনে এসে আমাকে জাপটে ধরল এবং আমাকে চুম্বন করলো। ব্যাপারটা আচমকা ঘটেছিল এবং আমার কোন হাত ছিল না এখানে। সে ছিল অনেক শক্তিশালী এবং সে-ই মূলত আমাকে চুম্বন করেছিল, আমি না”।

পরবর্তীতে জর্জ মেন্ডনসা তার দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “সে দিন আমি এবং আমার তৎকালীন হবু বউ রিতা রেডিও সিটি মিউজিক হলে সিনেমা দেখছিলাম। সিনেমার মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ দরজা খুলে গেলো এবং একজন চিৎকার করে বলল যে জাপান আত্মসমর্পণ করেছে। খুশিতে আমরা ছুটতে ছুটতে বাইরে বের হয়ে এলাম এবং বারে গেলাম সবার সাথে উল্লাস করতে। বারে যেয়ে আমি কিছুটা নেশাগ্রস্ত হয়ে যাই। তারপর রাস্তায় এসে আমি তাঁকে(গ্রেটা) দেখি। সাদা পোশাক দেখে আমি ভেবেছিলাম যে সে নার্স, তখন আমি তাঁকে চুম্বন করি। এটা ছিল আনন্দের একরকম বহিঃপ্রকাশ। আমার ধারণা সবাই এটাকে সেভাবেই দেখবে। আমার স্ত্রী রিতা, সেও তো আছে ছবিতে(চুম্বনরত দম্পতির বামে সাদা পোশাকের মহিলা), সেও তো বিষয়টা সাধারণভাবেই নিয়েছে”।

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

ছবিটি তোলার সময় সেখানেই উপস্থিত ছিলেন জর্জের স্ত্রী

পরবর্তীতে গ্রেটা ফ্রেইডম্যানেরের ছেলে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে তার মা এই চুম্বনটিকে কখনও খারাপভাবে নেন নি।

কিন্তু বিতর্ক চলতেই থাকে। যেমন ‘মি টু’ গ্রাফিতির পক্ষে বিপক্ষেও চলছে। জনৈক ফ্লোরিডাবাসী টুইট করেন ‘আমি অবশ্যই যৌন হয়রানির বিপক্ষে। কিন্তু এই চুম্বন ছিল বীভৎস এক যুদ্ধসমাপ্তির আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, একে তো আমি অপরাধ বলতে পারি না’।

আরেকজন টুইট করেন, “এখানে মি টু-এর ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি ভয়াবহ ছিল, তা যারা দেখেছে তারাই ভাল জানে। এবং এই যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার ঘোষণা পাওয়ার পর এই ভদ্রলোকের অবশ্যই যৌন হয়রানি করার ইচ্ছা মাথায় আসেনি”।

কিন্তু বিপক্ষে বলার মানুষও কম নয়। একজন ফেসবুকে দাবি করেন, “মূর্তিটির নাম ‘আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার’, কিন্তু নাম হওয়া উচিত ‘আনভলেন্টিয়ারি সারেন্ডার’। ভদ্রমহিলা চিনতেন না চুম্বন দিতে আসা মানুষটিকে। সে এসে মহিলা জাপটে ধরে চুমো দিলো, অনুমতি নেয়ার প্রয়োজনও মনে করে নি”!

আরেকজন টুইট করেন, “নারীদের পণ্য হিসেবে না দেখা, ছেলে হলেই যা খুশি তা করা যাবে এইটা না ভাবাই ‘মি টু’ আন্দোলনের অন্যতম একটি শিক্ষা। কিন্তু এইখানে তো সেটাই প্রতিফলিত হচ্ছে, একজনের ইচ্ছা হল আর একজনকে চুমো দিয়ে দিলো। সম্মতি না নিয়ে একজন মহিলাকে চুমো দেয়া কিভাবে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে?”

আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার metoo neonaloy নিয়ন আলোয়

যুক্তরাষ্ট্রের আইকোনিক একটি উদযাপনের মুহুর্ত এখন হুমকির মুখে!

পক্ষে বিপক্ষে চলছেই কথা কাটাকাটি। এরই মধ্যে সারাসোটা শহরের একদল নাগরিক জড়ো হয়েছে , এই মূর্তিকে স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ দাবি করে সরিয়ে ফেলানোর দাবিও চলছে।

এখন কোথায় গিয়ে শেষ হয় এই বিতর্ক তা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েকদিন।

Most Popular

To Top