ইতিহাস

১৪ ফেব্রুয়ারী শুধু সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনই মারা যাননি!

সোশাল মিডিয়াতে ঢুকলেই যেন এখন রোজ ডে, প্রপোজ ডে সহ কত ডের যেন দেখা পাওয়া যায়। আর সেগুলোকে কেন্দ্র করেও যেন ব্যবসায়ীদের কত চিন্তা। রোজ ডে তো ফুল দাও তো, টেডি ডে-তে পুতুল। যুবক-যুবতীদের কাছে যেন ট্রেন্ড আর ব্যবসায়ীদের হাতের মোয়ায় চলে এসেছে এই দিনগুলো। আর এতসব ডে’র শেষ হয় ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে এসে। ৫টাকার ফুলের দাম সেদিন পৌছায় ৫০-৫০০ টাকায়। সারা ঢাকা শহর রাস্তা জুড়ে পড়ে থাকে গোলাপের লাল পাপড়ি। নানা-বয়সের যেন ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সেদিন ঘুরতে বের হয়।

বর্তমান সময়ের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে এটাই যেন ঢাকার চিত্র। ভালবাসার অধিকার আদায় করে নিতে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে সম্মান জানাতেই ভালবাসার এ উদযাপন। নিয়মনীতির বেড়াজালে যে ভালবাসাকে আটকে রাখা যায় না – এটাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার স্পর্ধিত আয়োজন।

কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি কি শুধু সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনই আত্মদান করেছিলেন অধিকার আদায়ের জন্য? অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমনটা বলা যায় না। আজকের শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দি, টিএসসি যতটা লাল রঙে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বসন্তের কৃষ্ণচূড়া আর ভালবাসা দিবসের লাল গোলাপের পাপড়িতে, আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগে তার চাইতেও গাঢ় লাল রঙে ভেসে গিয়েছিল কিছু তরুণের তাজা রক্তে। আর সেদিন যদি ঢাকার রাস্তা রক্তের রঙে লাল না হত তাহলে হয়ত আজকে আমরা এভাবে আজকের অবস্থানে থাকতাম না।

দ্রোহের ভালোবাসার ১৪ ফেব্রুয়ারী ২

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভূত্থানের মাধ্যমে দেশে স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা প্রচলন করেন। যদিও তার এই ক্ষমতাদখল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ কখনোই পছন্দ করেনি আর তারই প্রতিবাদে ২৪ তারিখই সরকারের প্রতিবাদে কলাভবনের দেয়ালে পোস্টার লাগাতে গিয়েই সরকারের রোষানলে পড়েন ছাত্রনেতা  শিবলী কাইয়ুম, হাবিব আর আ. আলী। এর পরের কাহিনী আরো সোজা। গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁদেরকে সাত বছরের জেলের জীবনে ছুড়ে দেওয়া হয়।

২৬ তারিখ স্বাধীনতা দিবসে সাভারের স্মৃতিসৌধে ছাত্রনেতারা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুললে সেখানেও তাদের উপর নিপীড়ন চালানো হয়।

সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল ছাত্রসমাজ। তাই এই ছাত্র সমাজকে দমিয়ে রাখতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান কিছু পরিবর্তন আনেন। সেই পরিবর্তনগুলো ছিল যে- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে ছাত্রদের পিতামাতাকে তাদের ব্যয়ভার অর্ধেক বহন করতে হবে। কোন ছাত্র খারাপ রেজাল্ট করলেও অর্ধেক টাকা দিতে পারলে সে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবে। প্রথম শ্রেণী থেকেই আরবি আর ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কর্মমুখী-উৎপাদনমুখী শিক্ষার উপর বিশেষ জোরদার সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের পরিবর্তন অর্থাৎ সরকারের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে।

পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে খাঁচাবন্দী করতে এর চেয়ে বেশি আর কিইবা লাগে। তাই সমগ্র ছাত্র ১৭ সেপ্টেম্বর সকল ছাত্র সংগঠন গুলো একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে যৌথ আন্দোলন করে সকলে মিলে সেই নতুন পদ্ধতি বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালাবেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২১ নভেম্বর সকলে মিলে একসাথে বসে মধুর ক্যান্টিনে একটি ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ বানানো হয়।

মধুর ক্যান্টিন

এই ছাত্র সংগ্রাম তাদের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে সারা বাংলাদেশে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের কাজে নেমে পড়ে। সরকার আবার তার আগের চাল চাললেন। গ্রেফতার করলেন ছাত্রদের যাতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হতে পারে। কিন্তু এই বারের চালটা যেন ভুল হয়ে গেল। ছাত্রদের গ্রেফতারের ফলে আন্দোলন যেন আরো জোরদার হয়। তাদের মুক্তির দাবিতে জানুয়ারি মাসের ২৭ ও ২৮ তারিখ সারাদেশে ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্র সংগ্রাম। এই ধর্মঘট থেকেই ন্যাক্কারজনক শিক্ষানীতি বাতিলের জন্য সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী করার কথা উঠে আসে আর তার জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ঠিক করা হয়।

১৪ তারিখে ঘেরাও কর্মসূচীর উদ্দেশ্য সবাই একসাথে বটতলায় এসে জড়ো হতে থাকে। ছাত্রদের মুক্তির দাবী, ন্যাক্কারজনক শিক্ষানীতি ও ছাত্রদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকলে সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু শান্ত এই মিছিল আটকে দেওয়া হয় হাইকোর্টের সামনে আসলেই। সেখানেই শৃঙ্খলভাবে অবস্থান করতে থাকে ছাত্ররা। বরং তারা নিজেদের বক্তৃতা চালিয়ে যাচ্ছিল শান্তভাবেই। কিন্তু সেই শান্ত অবস্থাকে মুহূর্তেই অশান্ত করে দিতে তাদের উদ্দেশ্য রঙিন গরম পানি ছিটানো হয়। আর ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া সেই মিছিলে এলোপাথারিভাবে গুলি চালাতে থাকে পুলিশ। পুলিশের গুলির আঘাতে নিহত হয় জয়নাল, দিপালী সহ আরো অনেকে।

দ্রোহের ভালোবাসার ১৪ ফেব্রুয়ারী

মোট ১১জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সরকার থেকে মাত্র একজনের মৃত্যুর কথা প্রকাশ করা হয়। সরকার তার এই নির্যাতন ঢাকতে দিপালী সহ আর অনেকের লাশ গুম করে দেয়। জয়নালকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে। তার মৃত্যুতে ছাত্ররা ফুঁসে উঠে। ঐদিন বিকালে জয়নালের জানাযায় ঢল নামে হাজারো মানুষের।

সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ওইদিন গ্রেফতার করা হয় ১৩৩১ জনকে। ঢাকার এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। অনেকে আহতও হয়। এই সময়ে এসে সামরিক সরকারের টনক নড়ে যায়। আন্দোলনের মুখে ১৭ তারিখ ১০২১ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। বাকিদেরকে বিভিন্ন মামলায় আটকে রাখে। ১৮ তারিখে সেই ন্যাক্কারজনক শিক্ষানীতিকে স্থগিত করা হয়। ছাত্রসমাজের কাছে হার মেনে যায় প্রশাসন। বাংলাদেশে তাই ১৪ই ফেব্রুয়ারি  ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’।

একটা দেশকে  ধ্বংস করে দিতে কোন নিউক্লিয়ার বোমা লাগে না। শিক্ষাব্যবস্থাকে পাল্টে দিলেই হয়। সামরিক সরকার চেয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি মুষ্টিমেয় জনগণের হাতের মোয়া করে তুলতে। একই সাথে রাজনীতিতে মিশিয়েছিলেন ধর্ম। কর্মমূখী শিক্ষায় উৎসাহ দিলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে পূঁজিবাদীদের জন্য রেডিমেড পণ্য হিসেবে গড়ে তোলা। সেদিনের সেই ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের ফলেই আজকে আমরা এখনো আছি, পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুল হয়ে যাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চবিত্ত থেকে নিন্মবিত্ত যেকোন মেধাবী ছাত্ররাই পড়ছে। নিজেদের বিষয়ের বাইরেও চর্চা করতে পারছি মুক্তবুদ্ধি ও চেতনার।

সম্প্রতি প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতি, উগ্রবাদসহ আরো অনেক কিছুর মাধ্যমে আমরা নিজেরাই নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। নিজেদেরকে ডুবিয়ে দিয়েছি সস্তা আনন্দে যেখানে ব্যবসায়ীরা আমাদের দিয়ে সহজ মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছে। ১৯৮৩ সালের মতই হয়ত আমাদের একটা ১৪ ফেব্রুয়ারি দরকার জেগে ওঠার জন্য। ভালোবাসা বছর বছর ফিরে আসুক শুধু গোলাপে নয়, দ্রোহের মন্ত্রেও।

আরো পড়ুনঃ
‘এ প্রজন্মকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না… সব নষ্ট হয়ে গেছে…’

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top