টুকিটাকি

এত কৌশলে জেল পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না মাদক সম্রাট এল চাপো গুজম্যানের

আজ বলবো এমন একজন কোকেইন সম্রাটের কথা যিনি ফোর্বস পত্রিকা অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত শীর্ষ ক্ষমতাবান মানুষের তালিকায় ছিলেন যথাক্রমে ৪১তম, ৬০তম এবং ৫৫তম। কার্লোস স্লিম হেলুর পর তিনিই ছিলেন মেক্সিকোর শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ইউএস ফেডারাল অফিস অনুযায়ী, তিনি পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম মানুষ। ডিইএ’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি ইউএসএ’তে পাচার করেছেন ৫০০ টনের (৪৫,০০০০ কেজি) অধিক কোকেইন। এ ভয়ঙ্কর মানুষটাই তার প্রতিপক্ষদের হুমকি দিয়ে থাকেন টুইটারে টুইট করার মাধ্যমে। শেষবার যখন জেলখানা থেকে পালিয়ে বের হলেন, প্রথমেই টুইটারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে একটা টুইট করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন তার ঘরে ফেরার কথা।

এল চাপো

ট্রাম্প কে নিয়ে করা টুইট

এতক্ষণে হয়তো বুঝে ফেলেছেন, বলছিলাম জোকুইন আর্চিভালদো গুজম্যান লোরা ওরফে এল চাপো’র কথা। এল চাপো অর্থ বামুন। ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির জোকুইন আর্চিভালদো গুজম্যান সবার কাছে এল চাপো (বামুন মানুষ) নামেই পরিচিত।

জন্ম মেক্সিকোর সিনেলোয়া শহরের ছোট্ট গ্রাম লা তুনাতে। ঠিক কবে তার জন্ম এ বিষয়ে ধারণা নেই কারোই। কেউ বলে ১৯৫৪র ২৫ ডিসেম্বর, আবার কেউ বলে ১৯৫৭র ৪ জুলাই। আফিম চাষি বাবা এমিলিও গুজম্যান আর মা মারিয়া পেরেজের ১০ সন্তানের মধ্যে এল চাপোর অবস্থান চারে, যদিও কৈশোর পার হওয়ার আগেই তার বড় তিন ভাই মারা যায়। ছোটবেলাটা খুব সুখের ছিল না। সংসারের অভাবের কারণে স্কুল বাদ দিতে হয়েছিলো, বাবার সাথে মাঠে কাজ করতে হতো। বাবা ছিলেন নেশাগ্রস্ত, প্রায়ই মারতেন। ১৫ বছর বয়সে বাবা বের করে দিলেন বাসা থেকে, ঠাই মিললো দাদির কাছে। চাচাতো ভাইদের সাথে নিজেই আফিম চাষ করা শুরু করলেন। কিন্তু মন ভরছিল না, গ্রামের সবাই আফিম চাষ করে, যুগের পর যুগ তাই করে আসছে। বড় কোন স্বপ্ন নেই কারো, নেই কোন উচ্চাশা। ২০ বছর বয়সে ঘর ছাড়লেন, যোগ দিলেন চাচা পেদরো এভলিস পেরেজের সাথে, সে সময়ের শীর্ষ মাদক পাচারকারীদের একজন। অপরাধ জগতের সাথে পরিচয়টা ওখানেই।  

১৯৮০ এর দশকে মেক্সিকোর মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতো গুয়াদালাজারা কার্টেল, যার নেতৃত্ব দিতেন মাগুয়েল আঞ্জেল ফেলিক্স। ৭০র দশকে গুজম্যান প্রথম কাজ শুরু করে হেক্টর ‘এল গুয়েরো’ পালমার অধীনে। তার কাজ ছিল মাদক পরিবাহী জাহাজ গুলোর হিসাব রাখা। উচ্চাভিলাষী গুজম্যান শৃঙ্খলার ব্যাপারে অনেক কড়া ছিলেন। কোন পাচারকারী সরবরাহে দেরি করলে নিজেই তার মাথায় গুলি করতেন। গডফাদার মাগুয়েল আঞ্জেল ফেলিক্সের নেক নজরে পরে গেলেন এ ভাবেই। গডফাদারের সহকারী হয়ে গেলেন, একসময় পুরো মাদক সরবারহ চলতে লাগলো তার নেতৃত্বেই।

আশির দশকে প্রচুর পরিমাণে কোকেইন সরবরাহ হতো ইউএসএতে। এ কারণে ডিইএ সচেষ্ট হয় মাদক সম্রাটদের ধরতে। অনেক ডিইএ এজেন্ট ছদ্মবেশ নিয়ে মাদক ব্যবসার সাথে মিলে যান। এমনই একজন এজেন্ট ইনরিকে কামারেনা সালাজার। ছদ্মবেশে মাদক সম্রাজ্যের বহু ভিতরে প্রবেশ করেন। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গুয়াদালাজারা কার্টেলের মারজুয়ানা উৎপাদনের  প্রধান উৎস ‘রাঞ্চো বুফালো’ সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয় এবং ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেঈমানির দরুন সালাজারের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয় এবং নির্মমভাবে খুন করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে ডিইএ ফুঁসে ওঠে। মাদক সাম্রাজ্য পুরো নিঃশেষ করে দেয়ার লক্ষ্যে নামে তারা। মাদকের সাথে সম্পর্কিত সবাইকে গ্রেফতার কিংবা হত্যা করে। 

এল চাপো

মৃত্যুর পর সালজারকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছেদ

এ সময় গডফাদার মাগুয়েলও ধরা খান পুলিশের কাছে। তার অবর্তমানে সাম্রাজ্য চালাতে শুরু করে গুজম্যান এবং ইসমায়েল ‘এল মায়ো’ জামবাদা, মাগুয়েলের দুই সহকারী। ১৯৮৯র দিকে যখন গুজম্যান নিজস্ব ‘সিনেলোয়া কার্টেল’ চালাছিলেন, এ সময়ই তিনি মাদক টানেলের মাধ্যমে মাদক পাচারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন।

গুয়াদালাজারা ইউনিভার্সিটি থেকে আর্কিটেকচারে সদ্য পাশ করা ফিলিপ ডি জিসুস করোনার সাহায্যে আগুয়া পিতা থেকে ইউএসএর অ্যারিজোনা, ডগলাস পর্যন্ত এক লম্বা টানেল তৈরি করেন গুজম্যান। এই টানেলের সাহায্যে গুজম্যান এতো দ্রুত মারিজুয়ানা পাচার করতে পারতো যে, তার ডাকনাম হয়ে গিয়েছিলো ‘এল রাপিদো’(দ্রুত মানব)।

এল চাপো

মাদক পাচারের জন্য তৈরি টানেল

‘সিনেলোয়া কার্টেল’ চালু করার পর গুজম্যান গুয়াদালাজারা কার্টেল ফেলিক্স ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে দিয়ে দেন। কিছু ভুল বোঝাবুঝির মীমাংসা করতে গুজম্যান ফেলিক্স ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে পাঠান তার খুবই কাছের মানুষ আরমানদো লোপেজকে। রাগের মাথায় আরমানদোকে খুন করে রামোন ফেলিক্স। এর কয়েকদিন পরই, হেক্টর পামলার বৌ এবং দুই সন্তানকে হত্যা করে ফেলিক্স ভ্রাতৃদ্বয়। ফুঁসে উঠেন গুজম্যান। পামলার সাথে জোট বেঁধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ‘সিনেলোয়া কার্টেল’র বিরুদ্ধে। এ ঘটনার কয়েকদিন পরই আরেলানো ফেলিক্স অর্গানাইজেশন(এএফও) গুয়াদালাজারা এয়ারপোর্টে গুজম্যানকে হত্যার চেষ্টা করলো, দু’পক্ষের মাঝখানে ১৪ গুলি খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল জুয়ান জিসুস পোসোডাস।

এল চাপো

হামলায় নিহত কার্ডিনাল

এ ঘটনার পর গুজম্যান গুয়েতামালায় পালিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। মেক্সিকোতে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তাঁকে পুন্তে গ্রানাদে জেলখানায় রাখা হয়। ২০০১ সালে প্রশাসন যখন তাঁকে ইউএসএতে যাবৎ জীবন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এমন সময় জেল কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিয়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকে গুজম্যান দৌড়ের উপর থাকে, ঘন ঘন তাঁকে স্থান পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু সব সময় সিনেলোয়া, দুরাঙ্গ এবং চিহুয়াহুয়ার ভিতরে থাকতেন। এই ত্রিভুজ আকৃতির অঞ্চলটা ‘সিনেলোয়া কার্টেল’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

 এল চাপো

এ সময়ের ভেতর খুন, নির্বাসন, কারাদণ্ডে গুয়াদালাজারা কার্টেল প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। হঠাৎ করেই মিত্র জুয়ারেজ কার্টেলের সাথে দ্বন্দ্ব বাধে সিনেলোয়া কার্টেলের। জুয়ারেজ কার্টেল সম্রাট চুদাদ জুয়ারেজ গুজম্যানের নেতৃত্ব ভাল চোখে দেখেন নি, এর ফলেই দ্বন্দ্বের শুরু। কিন্তু সিনেলোয়া কার্টেলের বিশাল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বেশিদিন টিকতে পারলো না জুয়ারেজ কার্টেল। খুন, পাল্টা খুনে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল।

কয়েক কার্টেলের বিরুদ্ধে জয়ে গুজম্যান অন্ধ হয়ে গেল, মিত্র-শত্রু কাউকেই পাত্তা দিতো না। বেলট্রান লেইভা অর্গানাইজেশন(বিএলও), যারা গুয়াদালাজারা কার্টেল, জুয়ারেজ কার্টেলের সাথে যুদ্ধের সময় গুজম্যানের সাথে ছিল, যাদের মাধ্যমে গুজম্যান পুলিশ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সহায়তা পেত, এক সময় তাদের সাথেই বেইমানি করে। গুজম্যান এই অর্গানাইজেশনও খুনের মাধ্যমে শেষ করে দেয়।

ধারণা করা হয়, প্রতিপক্ষ কার্টেলের তথ্য ফাঁস করে দেয়ার মাধ্যমে নিজেরা ব্যবসা সচল রাখবে এমন চুক্তি আছে ডিইএর সাথে সিনেলোয়া কার্টেলের। যদিও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যদিও গুজম্যান তার গোল্ডেন ট্রায়েঙ্গেলের ভিতর সুরক্ষিত ছিল, তারপরও মিলিটারি সদস্যরা তাঁকে ধরার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। ২০১৪ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি খবর পাওয়া যায়, পারিবারিক পুনর্মিলনীর উদ্দেশ্যে গুজম্যানকে সিনেলোয়াতে দেখা যাবে। গুপ্তচরগণ তার দেহরক্ষীকে অনুসরণ করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালেও সুরক্ষিত দরজার কারণে গুজম্যান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি, বেলা ৬.৪০র দিকে, ইউএস মেরিন এবং ডিইএ এজেন্টরা মাজাতলানের এক হোটেল থেকে গুজম্যানকে গ্রেফতার করে।

এল চাপো

আটকের পর এল চাপো

এবার রাখা হয় আতিপালানো জেলখানার সুরক্ষিত সেলে। ২৪ ঘণ্টা থাকতেন নজরবন্দিতে। বিচারের রায় দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল। সে সময়ের এটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, গুজম্যানকে সকল পাপের শাস্তি দিতে গেলে ৩০০-৪০০ বছরের কারাদণ্ড দিতে হবে। কিন্তু রায় শোনার অপেক্ষায় বসে ছিলেন না গুজম্যান। ২০১৫ এর জুলাইয়ের কোন এক সন্ধ্যায় পালিয়ে গেলেন কারাগারের বাথরুমের মেঝেতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে। এমনই সুড়ঙ্গ, যা কিনা ছিল এক মাইলেরও বেশি লম্বা!

গা ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামলো এবার সবাই , ইউএস মেরিন, ডিইএ, মেক্সিকান পুলিশ, মিলিটারি। তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। গ্রামের পর গ্রাম ঘেরাও করে সার্চ দেয়া হল। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও গুজম্যান তার সাম্রাজ্য চালাতে থাকে। ক্রিসমাসে পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে ছবিও দিলেন।

গুজম্যানের মুক্তিজীবন অবশেষে শেষ হল ৮ই জানুয়ারি। সিনেলোয়ার বাইরে ছোট শহর লস মচিস ঘেরাও করে মেক্সিকান মেরিন। মিনি ট্রাকে করে ঘেরাও এড়াতে পারলেও পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন শেষমেষ। আবার নিয়ে আসা হল আতিপালানোতে। বিচারকাজ শুরু হল। এবার নজরবন্দীতে আছেন ৭৫ জন এজেন্টের দায়িত্বে, কারাগার পাহারা দিচ্ছে ৬০০’র অধিক সৈনিক। আগের দুইবার পালাতে যারা সাহায্য করছে তাদের বিচার হল খুব দ্রুতই এবং কঠোর শাস্তিই দেয়া হল।

গুজম্যানের এই কারাবন্দীর সময়কালে সিনেলোয়া কার্টেল নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে  তার তিন ছেলে এবং ভাই, এরিলিয়ানো গুজম্যান। অন্য কার্টেল থেকেও হুমকি আসছে। বেশি দিন আগের কথা না, জালিস্কো কার্টেল গুজম্যানের দুই ছেলেকে অপহরণ করে এক রেস্টুরেন্ট থেকে, যদিও কদিন পরেই অক্ষত অবস্থায় তাদের ছেঁড়ে দেয়া হয়। সিনেলোয়া এখনও মেক্সিকান ড্রাগ উৎপাদনের কেন্দ্র। নতুন নতুন কার্টেলের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু দখল করতে পারছে না কেউই। সবাই বিশ্বাস করছিলেন কোন না কোন একদিন আবার জেল থেকে পালাবেন গুজম্যান, আবার হাজির হবেন সিনেলোয়াতে, আবার রাজত্ব করবেন নিজের সাম্রাজ্যে।

কিন্তু এবার মনেহয় না আর জেল পালাতে পারবেন এল চাপো গুজম্যান। গতকাল তার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে। মাদক উৎপাদন ও পাচার, ঘুষপ্রদান, খুনসহ তার বিরুদ্ধে আনা ১০টি অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ায় অন্তত যাবজ্জীবন কারাবাস নিশ্চিত হয়ে গেছে এল চাপো’র। আর এই বিচারকার্যে মাদকসম্রাটের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে তার ঘনিষ্ঠ ১৪ সহযোগী সহ মোট ৫৬ জন। এবং বলাই বাহুল্য, অবশিষ্ট জীবন তার কাটবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবিশিষ্ট কারাগারের সবচেয়ে গহীন গারদগুলোতে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top