নাগরিক কথা

ধর্মে মানুষ কেন বিশ্বাস করে?

ধর্ম-বিশ্বাস নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রথমেই একটা বিষয়ে পরিষ্কার হয়ে নেই। ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি, সে অনুযায়ী পৃথিবীতে একটি ব্যতীত সকল ধর্ম ভিত্তিহীন। আর সেই একটি মাত্র ধর্ম হল- আপনার ধর্ম, অর্থাৎ যিনি এই লেখাটি পড়ছেন তার ধর্ম। এখন সমস্যা হল, আপনার ধর্মের ভিত্তি মজবুত, এবং অবশ্যই বিশ্বাস করার সমূহ কারণ আছে, কিন্তু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কেন নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাস করে? আপনার নাহয় বিশ্বাস করার প্রত্যক্ষ কারণ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবীতে যে বাকী প্রায় ৪২০০ টি ধর্ম আছে, তারা টিকে আছে কীসের জোরে?

আলোচনা শুরু আগে জেনে নেই, ধর্ম বলতে সাধারণত আমরা কি বুঝি। ধর্মের মূলকথা হল অলৌকিক সত্তা কিংবা সত্তাগোষ্ঠীর উপর বিশ্বাস এবং সেই সত্তাপ্রদত্ত জীবনব্যবস্থা। বিভিন্ন রিচুয়াল বা আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর চাইতে গভীরে যেতে হলে ধর্ম থেকে ধর্মে অনেক পার্থক্য এসে পড়বে। যেমন, “ঈশ্বরে বিশ্বাস” ব্যাপারটা ইসলাম, সনাতন কিংবা খৃস্টান ধর্মে একধরনের, আবার বৌদ্ধ ধর্মে সম্পূর্ণ আরেক ধরনের। প্রথমোক্ত ধর্মগুলো মূলত ঈশ্বরনির্ভর, শেষোক্তটি জীবনব্যবস্থা নির্ভর। এই ক্লাসিফিকেশনগুলো আলোচনায় অপ্রয়োজনীয় বিধায় এর ভেতরে প্রবেশ করছি না।

সম্প্রতি ইয়োভাল নোয়া হারারির লেখা একটা বই পড়লাম- “Sapiens”। বইয়ে ধর্মকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে Imagined Reality বা কল্পবাস্তবতা হিসেবে। ধর্ম হচ্ছে একটা মিথ, যা একাধিক মানুষ একযোগে বিশ্বাস করে। আর এই “সম্মিলিত বিশ্বাস” এর ফলে গড়ে উঠে একটি গোষ্ঠী, একই বিশ্বাস ধারণ করার ফলে যাদের মধ্যে একটি একতা গড়ে উঠে। ধর্মের মত আরও কিছু কল্পবাস্তবতা যেমন রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে বিশাল আকারের জনগোষ্ঠী, যা প্রাচীন জনপদগুলোতে অনুপস্থিত ছিল। এই জনগোষ্ঠীগুলোর একতার ফলে কল্পবাস্তবতা হিসেবে ধর্ম কীভাবে সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করছে, সে ব্যাপারে একটু ধারণা পাওয়া গেল। কিন্তু ধর্ম কীভাবে কল্পবাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হল, বা সহজ কথায় বলতে গেলে একটা গোষ্ঠীর মানুষ কেন একটা ধর্মকে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়া দৈব বলে বিশ্বাস করল, সে ব্যাপারে খটকা রয়ে গেল।

আসুন একজন প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কথা চিন্তা করি। প্রাকৃতিক দূর্যোগ, হিংস্র প্রাণী কিংবা রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার হাতে কিছুই নেই। বৈশিষ্ট্যগতভাবে মানুষ আকারে বড় প্রাণীগুলোর মধ্যে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দূর্বল। তার ধারালো দাঁত নেই, বড় বড় নখ নেই, জোরে দৌঁড়ানোর ক্ষমতা নেই, প্রখর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি নেই। এককথায়, অত্যন্ত অসহায় একটি প্রাণী। দিনের বেলায় তাও যা একটু নিরাপদ, রাতের আঁধারে মানুষ আরো দূর্বল।

মানুষের এত দূর্বলতা সত্তেও তার একটা ভালো গুণ আছে, মানুষ সবসময়ই আশাবাদী। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে স্বপ্ন দেখে। ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে চিকিৎসার সাধ্যের বাইরে থাকা মানুষটাও ক্ষীণ আশা পোষণ করে তার রোগ সারিয়ে তুলবে কোন অলৌকিক যীশু। বন্দুকের নলে মাথা ঠেকানো অবস্থায়ও মানুষ চিন্তা করে শেষ মূহূর্তে হয়তো লৌকিক বা অলৌকিক কিছু একটা ঘটবে, সে আবার ফিরে যাবে পরিবারের কাছে, বৃষ্টির দিনে কবজি ডুবিয়ে গরুর মাংস দিয়ে ভুনা খিচুড়ি খাবে।

তো, আমাদের সেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষটারও আশা করতে দোষ কোথায়? “কিছু একটা” তাকে প্রাকৃতিক দূর্যোগ আর হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, এই আশা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, সারভাইভাল ইন্সটিঙ্কট। তো, এই আশারও একটা মাধ্যম রয়েছে। সেই মাধ্যমটাই ধর্ম।

মানুষের নির্ভরতা-প্রবৃত্তি দিয়েও ধর্মের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ স্বভাবতই নির্ভরতা খোঁজে। এমনকী, প্রাণীকুলের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরতাপ্রিয় হচ্ছে মানুষ। মানুষ মানুষের উপর নির্ভরশীল, অন্যান্য পশুপাখির উপর নির্ভরশীল, যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল।

তো, প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ যখন তার দূর্বলতম সময়টা কাটাচ্ছে, তখন সে স্বভাবতই তাকে রক্ষা করার জন্য শক্তিশালী কিছুর উপর নির্ভর করতে চাইল। সেই শক্তিশালী কিছু হতে পারে সূর্য, হতে পারে তাদের পূর্বপুরুষের আত্মা, হতে পারে কোন শক্তিশালী প্রাণী।

এই থিওরীকে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা সমর্থন প্রদান করে বলে আমার মনে হয়। মানুষ এখন পূর্বের যেকোন সময় থেকে শক্তিশালী। হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে আর অলৌকিকের উপর নির্ভর করতে হয় না, অসুখ-বিসুখের জন্য রয়েছে উন্নত চিকিৎসা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঠেকানো না গেলেও রয়েছে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। একইসাথে, পূর্বের যেকোন সময়ের চাইতে কমছে ধর্মাচার, বাড়ছে ঈশ্বরে অবিশ্বাসীর সংখ্যা। বর্তমানে বিশ্বে অবিশ্বাসী বা নাস্তিকের সংখ্যা প্রায় ১ বিলিয়ন। (সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ নাস্তিক কোন কটুক্তি নয়)

ধর্মের উৎপত্তির আরেকটি মজার ব্যাখ্যা আছে। ঝড়, বৃষ্টি, ভূমিকম্প, সূর্যের উঠানামা ইত্যাদি প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল মানুষের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার, এগুলোর কোন স্বাভাবিক ব্যাখ্যা তাদের কাছে ছিল না। মানুষ আবার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে ভালোবাসে, তারা এসব ঘটনার ব্যাখা হিসেবে সৃষ্টি করল ঈশ্বরকে।

(ওই যে বলছিলাম, বর্তমান বিশ্বে ধর্মাচার এবং বিশ্বাস কমে যাচ্ছে, তার একটা কারণ কি প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করতে মানুষের আর অলৌকিকের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না?)

সেই যে বিশ্বাস করা শুরু হল, তার ধারাবাহিকতা মানুষ টেনে বেড়াচ্ছে এখনও। সহস্র অযুত বছর ধরে ধীরে ধীরে অতিপ্রাকৃতের উপর বিশ্বাসের ব্যাপারটা মানুষের মাথায় গেঁথে গেল। মানুষ ধরে নিল, বিশ্বাস করাটাই স্বাভাবিক, না করাটাই অস্বাভাবিক। তারা অনেকটা স্রোতের জলে ভেসে বেড়াবার মত বিশ্বাস করা শুরু করল- সবাই করে, তাই আমিও করি। কেন করি, তা না জেনেই করি। এবং সেটাই স্বাভাবিক।

অবিশ্বাস করতে ভয় পায় বলে বিশ্বাসী- এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, বিশ্বাস নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে যে স্পষ্ট সীমারেখা, তা পার হতে ভয় পায়। সুপ্রাচীন আস্তিকতার যে নিরাপদ আশ্রয়, তা ছেড়ে যেতে চাইলে যে মানসিক শক্তির প্রয়োজন তা অনেকের নেই বলে তারা বিশ্বাসী, এমনটাও ঘটে।

আর নির্ভরতার ব্যাপার তো আছেই। প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন, তার সাধ্য একটা পর্যায় পর্যন্ত সীমিত। মানুষকে তাই কল্পনা করে নিতে হয়, তার বিপদে-আপদে কোন এক মহান সত্তা তাকে সাহায্য করবে, তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। উদ্ধার করুক আর না করুক, উদ্ধার করার জন্য কেউ একজন আছে, এই চিন্তাটাই মানুষকে স্বস্তি দেয়। এই স্বস্তি খুব বড় একটা ফ্যাক্টর।

এই স্বস্তিকে অনেকে ধর্মের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে করে। ব্যাপারটা তা না, এই স্বস্তি সম্পূর্ণই সাইকোলজিকাল। আপনার ধর্ম সম্পূর্ণ সত্য ধর্ম, আপনি ধর্মের অলৌকিক শক্তিবলে মানসিক শক্তি পেতে পারেন সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু আপনার ধর্ম বাদে অন্য ধর্মের কেউই কি ধর্মে বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে শান্তিলাভ করে না? এই শান্তির উৎস কী?

ধর্মের উপর আরেকটা কারণে মানুষ অগাধ বিশ্বাস। ধর্মকে অনেকে নৈতিকতার উৎস বলে মন করেন। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ধর্ম মানুষকে একটা নৈতিক শৃংখলার মধ্যে বেঁধে দিয়েছে, ধর্মীয় অনুশাসন ব্যতীত একটি সুস্থ্য ও সুশৃঙ্খল সংঘবদ্ধ কাঠামো (হোক সেটা, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকী অর্থনৈতিক) দাঁড়া করানো কঠিন (ব্যতিক্রম- জাপান রাষ্ট্র, সেখানে অধিকাংশে মানুষ অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাসী নয়), যদিও নৈতিকতা যতটা না ধর্মীয় তার চাইতে বেশি মানবীয় বৈশিষ্ট্য।

ধর্মে বিশ্বাস করার পক্ষে একটা যুক্তি হচ্ছে- “প্রাণের সৃষ্টি কেবল একটি মহাজাগতিক দূর্ঘটনা” এ যুক্তিতে বিশ্বাস না করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই শক্তিশালী একটি যুক্তি বলে মনে করি। জীবনের সূত্রপাত এত জটিল একটা বিষয়, একে কেবল কয়েকটি Mere chance এর সমন্বয় বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকে ধর্মের শরণাপন্ন হন।

শুরুর দিকে একটা কথা বলেছিলাম, প্রাগৈতিহাসিক যুগে ঝড়, ভূমিকম্প, বজ্রপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে মানুষ ধর্মের আশ্রয় নিত। এখন এসব ঘটনার ব্যাখ্যা সহজলভ্য হলেও আরও কিছু ঘটনার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নি। যেমন- মহাবিশ্বের সৃষ্টি। আবার ছোটো ধর্মের কাছে। মজার বিষয় হচ্ছে, মানুষ বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সংঘাত অস্বীকার করলেও বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে ধর্মের ভিত হিসেবে বিবেচনা করতে পছন্দ করে।

সাধারণভাবে, ধর্মে বিশ্বাসের ব্যাপারটাকে এভাবে সাজানো যায়- মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করা শুরু করে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে বলে এবং পরিবেশের কারণে। বিশ্বাস একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়, মানুষ ভাত খাওয়া আর গোসল করাকে যেমন স্বাভাবিক মনে করে, বিশ্বাস করাকেও তেমনটাই স্বাভাবিক মনে করে। কেউ এর মধ্যে শান্তি খুঁজে পায়, কেউ যুক্তি। যারা কিছুই খুঁজে পায় না, তারা আবার কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে যায়। কেউ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকে, সংস্কারের কারণে বেরিয়ে আসতে পারে না। আরেক দল নাম লেখায় অবিশ্বাসীদের দলে। আবার অজ্ঞেয়বাদীরা অজ্ঞানতাকেই ধ্রুব বলে মেনে নেয়।

আরেকবার বলে নেই, এই রচনা আপনার ধর্ম সম্পর্কে নয়। আপনার ধর্মের সত্যতা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সবাই নিজ নিজ বিশ্বাস নিয়ে শান্তিতে থাকুক, এটাই কাম্য।

[এডিটর’স নোটঃ ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আলোচনা বেশ সংবেদনশীল একটি বিষয়। লেখকের নিরাপত্তার স্বার্থে তার পরিচয় গোপন রাখা হলো]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top