ইতিহাস

ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া নারীরা… (পর্ব-বাংলাদেশ)

উপমহাদেশের ইতিহাস নারী নিয়ন আলোয় neonaloy

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস জুড়ে আছে অস্থিরতা; গ্রীক, আর্য, মোঘল, বৃটিশ রাজের ক্রমান্বিত শাসনের পর নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার সংমিশ্রণ এই উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, রাজনীতিকে করেছে ততটাই অস্থিতিশীল। যুগ যুগ ধরে এই অস্থিতিশীলতা এই উপমহাদেশে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব, সামাজিক সক্রিয়তাবাদী এবং সচেতন বিদ্রোহীদের। আজকে আপনাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিব এমন কিছু নারীর সাথে, যাঁরা এসকল কাজের মাধ্যমে ইতিহাসে শুধু ঠাঁই-ই করে নেন নি, বরং বলা চলে ইতিহাস রচনা করে গেছেন।

‘নাচোলের রানী’ ইলা মিত্র

ইলা মিত্র বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের সময়ে সাঁওতাল ও চাষীদের নেতা ছিলেন। পত্তনী প্রথা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং জোতদারীর বিরুদ্ধে বৃটিশ শাসনামলে গঠিত ‘সর্বভারতীয় কৃষক সমিতি’ এর আন্দোলনে যোগদানের মাধ্যমে তিনি সক্রিয় হন চল্লিশ এর দশকে।

১৯৫০ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্দেশে নবাবগঞ্জ উপজেলার নাচোল উপজেলায় কৃষক-সামন্তবাদী বিদ্রোহ সংগঠিত হয় কিন্তু পুলিশের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ইলা মিত্র পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাকে আটক করে এবং ৪দিন তাকে নাচোলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং একাধিকবার গণধর্ষন করে। এরপর ২১ জানুয়ারি তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় ও যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। নির্যাতনের ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থতার জন্য ১৯৫৪ সালে তাকে কলকাতা পাঠানো হয়। তিনি এরপরে আর কখনো কলকাতা থেকে ফিরে আসেননি।

উপমহাদেশ-এর-ঐতিহাসিক-নারী

ইলা মিত্র-১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতার এক সাধারন মধ্যবিত্ত সরকারী চাকুরীজীবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ বাগোটিয়া থেকে এসেছিলেন, যা বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত। তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং পরবর্তীতে প্রাইভেটে কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ পাশ করেন। তিনি কলেজ জীবন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে ইলা মিত্র চাপাই নবাবগঞ্জের রামেন্দ্র মিত্রকে বিয়ে করেন, যিনি নিজেও একজন সক্রিয় কমিউনিস্ট কর্মী ছিলেন।

১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় জনমত ও সমর্থন জোরদারে অংশগ্রহণ করেন। কলকাতায় ১৩ অক্টোবর ২০০২ সালে ইলা মিত্র মারা যান।

‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ বেগম রোকেয়া

পায়রাবন্দের এক ধনী পরিবারে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, লেখক, সামাজিক কর্মী এবং সহজভাবে বলা যায় , প্রথম সক্রিয় বাঙালী মুসলিম নারীবাদী।

উপমহাদেশ-এর-ঐতিহাসিক-নারী

খুব অল্প বয়স থেকেই বেগম রোকেয়া লক্ষ্য করেছিলেন যে সমাজে নারী-পুরুষের অধিকারে এক সুবিশাল অসমতা রয়েছে। শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায় নয় বরং তিনি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও এই অসমতা লক্ষ্য করেছেন। বেগম রোকেয়া বেশ পর্দানশীল পরিবার থেকে এসেছিলেন যেখানে তিনি শুধু আরবি ভাষা শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ভাইদের সহযোগীতায় তিনি বাংলা আর ইংরেজীও পড়ার সুযোগ আর বুঝতে পারেন যে নারীদেরকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার কোন বিকল্প নাই।

নারীদেরকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে তার স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাগলপুরে রোকেয়া সাখাওয়াত গার্লস মেমোরিয়াল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র ৫জন শিক্ষার্থী নিয়ে তিনি স্কুলটি চালু করেন ও ১৯১১ সালে তা কলকাতায় স্থানান্তর করেন। এটি কলকাতার মেয়েদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় স্কুলগুলির মধ্যে একটি এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এটি পরিচালনা করে। ১৯১৬ সালে তিনি আঞ্জুমান-ই-খায়তেেন-ই-ইসলাম (ইসলামী নারী সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাঙালি মুসলিম নারীদের জন্য কাজ করত। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিপীড়িত মুসলমান নারীদের আর্থিক ও শিক্ষাগত সহায়তা প্রদান করেন।

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় মারা যান।

আধুনিক বাংলাদেশ এর প্রথম নারীবাদী- সুফিয়া কামাল

১৯৬৯ সালে সুফিয়া কামাল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম নারী সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

উপমহাদেশ এর ঐতিহাসিক নারী

১৯১১ সালের ২০ জানুয়ারি বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। বাড়িতে উর্দুতে কথা বললেও মায়ের সহায়তায় তিনি বাংলা পড়তে শিখেছিলেন। ১২ বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়।  বিয়ের পরে তিনি নিজেকে সামাজিক কাজে ব্যস্ত রাখেন।

বেগম সুফিয়া কামাল মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও অংশ নেন। তিনি তৎকালীন স্বনামধন্য পত্রিকা ‘সওগাত‘ এর জন্যও লেখালেখি করতেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি কলকাতাতে চলে গেলেও ১৯৪৭ সালে পার্টিশনের পরপরই ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় একটি এতিমখানায় থাকার সময় তার সাথে বিপ্লবী লীলা রায়ের সাথে পরিচয় হয় ও তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য এবং হিন্দু-মুসলিম সাদৃশ্য বজায় রাখার জন্য শান্তি কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছিল বেগম সুফিয়া কামালের সক্রিয় ভূমিকা। এসময় ‘সওগাত’ এর কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ও তিনি ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়াও ‘বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলন’ আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন যা পঞ্চাশ দশকে উদারপন্থীদের একত্রিত হওয়ার জন্য একটি প্রধান প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করেছিল। শিশুদের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কচি-কাঁচার আসর’। শুধু তাই নয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

তিনি কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেননি, শুধুমাত্র মানবতাবাদ এবং সুষ্ঠু সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় তিনি মারা যান।

‘শহীদ জননী’ জাহানারা ইমাম

১৯২৯ সালের মে মাসের ৩ তারিখ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তাকে ব্যাপকভাবে স্মরণ করা হয়। ১৯৪৭ সালের কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে ব্যাচেলরস ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
উপমহাদেশ-এর-ঐতিহাসিক-নারী

১৯৪৮ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শরীফুল আলম ইমাম আহমেদকে বিয়ে করে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তিনি “খাউয়াতীন” নামক মাসিক মহিলা পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫২ সালে এটি প্রকাশিত হয় এবং বহু বছর ধরে এটি সফলভাবে চলে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরে তাঁর বড় ছেলে শফি ইমাম রুমি যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধের সময়কার অনুভূতিগুলো তিনি ডায়রি আকারে লিখে রেখেছিলেন যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেব মর্যাদা পায়। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা অর্জনের পরে তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তার ডায়রিটি “একাত্তরের দিনগুলি” নামে প্রকাশ পায় যেখানে তাঁর যুদ্ধ সময়কার নানা অব্যক্ত কথা ফুটে উঠেছে।

১৯৭৮ সালের জামায়াতে ইসলামীর উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে গোলাম আযমকে দেশে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে গোলাম আজম জামায়াতে ইসলামী’র আমির নির্বাচিত হন। এরই প্রেক্ষিতে জাহানারা ইমাম ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আহবান জানায়, আয়োজন করে গণআদালত। অথচ জনগণের দাবীর বিপরীতে গিয়ে তৎকালীন সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার জামিন-অযোগ্য মামলা দায়ের করে।

১৯৯১-এর গণআদালতের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই ২০১৩ সালে গড়ে উঠে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’, নিশ্চিত হয় যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা।

১৯৯৪ সালের ২৬শে জুন মিশিগানে মারা যান জাহানারা ইমাম।

বাঙালী জাতি হিসেবে এইসকল নারী ব্যাক্তিত্বের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে যুগ যুগ ধরে, তাঁরাও আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবেন প্রথাগত অনাচার ভেঙ্গেচুরে ইতিহাস নতুন করে লেখার।

আরো পড়ুনঃ কারদাশিয়ানদের ভীড়ে শুনে নিন একজন নাঙ্গেলি’র গল্প

Most Popular

To Top