বিশেষ

বাংলা সাহিত্যের যে উপন্যাসগুলো না পড়লেই নয়… (পর্ব ১)

বাংলা সাহিত্যের সেরা বিশ উপন্যাস_neon_aloy_নিয়ন_আলোয়

আমরা বাঙ্গালীরা, কখনও নিজেদের ভাষা জোর করে অন্য কোন গোত্রের মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি নি। অথচ, পৃথিবীর এমন কোন স্থান নেই যেখানে বাংলায় কথা বলে, বাংলা বুঝে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের ভাষায় লেখা সাহিত্যের সংখ্যা অগণিত। বাংলা সাহিত্যের মত বৈচিত্রপূর্ণ ও সুবিদিত সাহিত্য খুব একটা বিশেষ নেই। কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, যাত্রাপালা, কবিগান, আরও কত বিচিত্র পসরাই না সাজিয়েই রেখেছে এই বাংলা সাহিত্য! সবদিক দিয়েই অনন্য সমস্ত রচনা আছে বাংলা সাহিত্যে। আমাদের সাহিত্যের যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে আমাদের সামনে অনেকেই আমরা তা জানি না কিংবা আগ্রহ করে দেখি না। আজ বলবো এমনই পাঁচটি উপন্যাসের কথা, যে উপন্যাসগুলো এক একটি নক্ষত্র, যারা যুগ যুগ ধরে জ্বলতে থাকবে বাংলা সাহিত্যের আকাশে।

হাজার বছর ধরে – জহির রায়হান

বাংলা সাহিত্য সেরা উপন্যাস নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

পরীর দীঘির পাড়ের গ্রামের শিকদার বাড়ির কর্তা বৃদ্ধ মকবুল, তার তিন স্ত্রী আমেনা, ফাতেমা, টুনিসহ আবুল, রশিদ, আম্বিয়া ও মন্তুকে নিয়ে গড়ে উঠছে কাহিনী। বৃদ্ধ মকবুলের চতুর্দশবর্ষী বউ টুনির মনটা মকবুলের শাসন মানতে চায় না। সে চায় খোলা আকাশের নিচে বেড়াতে, হাসতে, খেলতে। তাই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় অল্প বয়সী সুঠামদেহী মন্তুকে। টুনি আর মন্তু সকলের অগোচরে রাতের বেলায় বেরিয়ে পড়ে মাছ ধরতে, বর্ষায় যায় শাপলা তুলতে। এমনি করে দুজন দুজনার কাছে এসে যায়। অব্যক্ত ভালবাসার জোয়ারে ভাসে ওরা দু’জন। কিন্ত কেউ মুখ ফুঁটে বলতে পারেনা মনের কথা, লোক লজ্জার ভয়ে। সমাজের রক্ত চক্ষু ওদের দূরে রাখে।

গ্রাম-বাংলায় যা হয়, কলেরা বসন্তের বাতাস লাগলে উজাড় হয়ে যায় কয়েক ঘর মানুষ। ডাক্তার না দেখিয়ে তারা টুকটাক তাবিজ করে, এভাবেই দিন চলে। মকবুলের আকস্মিক মৃত্যুর পর মন্তু যখন মনের কথা টুনিকে খুলে বলে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। টুনি হারিয়ে যায়, শুধু তার স্মৃতিগুলো পড়ে রয় মন্তুর কাছে। রাতের বেলা পুঁথি চলতে থাকে,

“শোন শোন বন্ধুগনে শোন দিয়া মন, ভেলুয়ার কথা কিছু শোন সর্বজন।”

সময়ের চাকায় সুরত আলীর ছেলে তার বাপের জায়গা করে নেয়, মকবুলের জায়গায় আসে মন্তু। ভেলুয়া সুন্দরীর কথা সবাই শোনে। একই তালে, একই সুরে হাজার বছরের এক ইতিহাস নিয়ে এগিয়ে চলে সবাই। কালের আবর্তে সময় গড়ায়, প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে। শুধু পরিবর্তন আসেনা কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রাম বাংলার সমাজে।

জোছনা ও জননীর গল্প – হুমায়ুন আহমেদ

বাংলা সাহিত্য সেরা উপন্যাস নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

‘জোছনা ও জননীর গল্প’ ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অসংখ্য ঘটনা এ উপন্যাসে এসেছে, এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিংবদন্তীর কথা। সেই সাথে এইসব ঘটনা, ঐতিহাসিক চরিত্র কীভাবে প্রভাবিত করেছে, উদ্বেলিত করেছে, উজ্জীবিত করেছে সাধারণ মানুষকে, বদলে দিয়েছে এই ভূখন্ডের সাতকোটি মানুষের জীবন তাও এসেছে গভীরভাবেই। উপন্যাসটি তাই শুধু ইতিহাসের চাপে ঢাকা পড়েনি, বরং হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক এক ঘটনায় বদলে যাওয়া মানুষের আখ্যান। মনুষ্যসৃষ্ট এক তান্ডবে কতগুলো কাছাকাছি থাকা মানুষের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর অচেনা-অজানা কিছু মানুষের কাছে চলে আসার গল্পই ‘জোছনা ও জননী’।

এত সব ঘটনা, চরিত্র আর ইতিহাস নিয়ে লেখা নিয়ে লেখা হলেও ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এর গল্প বলায় এক আশ্চর্য এক ধারাবাহিকতা আছে- যদিও খুব ব্যতিক্রমি ভঙ্গিতে। বিশালাকায় এই বইটিতে গল্প বলার ধারাবাহিকতায় কোথাও এতটুকু ছেদ পড়েনি। গল্প বলার ছলে ঔপন্যাসিক আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন- স্মৃতি-কথন, চিঠি, স্বপ্নদৃশ্য, ভাষণ/বক্তৃতা, খবরের কাগজের কাটিং, মুক্তিযুদ্ধের দলিল। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ নামের যে সাহসী উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, সে উপন্যাসটি যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে এ দেশের পাঠক সমাজের কাছে।

পুতুল নাচের ইতিকথা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্য সেরা উপন্যাস নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

“খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন। হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু কিছুই টের পাইল না।”

– এভাবেই শুরু হয় ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রেম, বিরহ, দ্বেষ ও পারস্পরিক সহমর্মিতাকে উপজীব্য করে লেখা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’।

গ্রামীণ জীবনের পটভূমি নিয়েই লেখা ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। কিন্তু গ্রামীণ জীবন থেকে মানব জীবনের সামাজিক, অর্থনৈতিক আর জৈবিক তাড়নাগুলোই মুখ্য হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। শশীর ভিন্ন জীবনলাভের ইচ্ছা, কুমুদের অবনতি দেখে তৃপ্তি পাওয়া কিংবা কুসুমকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা- এসবই উপন্যাসটিকে গল্পের সীমা পেরিয়ে জীবনের দর্পণে নিয়ে এসেছে।

পরিণতির পরেই শেষ আসে। কিন্তু আমরা জানি না শশী কি পৌঁছাতে পারে কিনা তার লক্ষ্যে। জানি না কুমুদ কি ভালবাসতে পারে মতিকে, নাকি খানিক মোহ শেষে আবার ছুটে যাবে তাঁর দুরন্ত পথে। জানি না কুসুম, বিন্দু কিংবা গোপাল দাসই বা কোথায় গিয়ে ঠেকবে। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তরই জানি। পুতুলনাচ থেমে থাকে না, থামবেও না। পুরানো পুতুল ভেঙ্গে গেলে নতুন চকচকে পুতুল তার জায়গা করে নেয়। তবু, পুতুল নাচ চলতেই থাকে…চলতেই থাকে।

ক্রাচের কর্নেল – শাহাদুজ্জামান

বাংলা সাহিত্য সেরা উপন্যাস নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

ক্রাচের কর্নেল এক ঘোর লাগা সময়ের গল্প। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট প্রধানত ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫, এই পাঁচ বছরের মাতাল সময়ের গল্প বলা সহজ নয় এই কারণে যে, যদিও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপেটে সময়টা খুব বেশি আগের নয়, ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়, স্বার্থে হোক আর অবহেলায়, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর ঘোলাটে করে রাখা হয়েছিলো দীর্ঘদিন যাবত। এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অচেনা, প্রায় অন্ধকার গলিতে হোঁচট খেয়ে বারবার ফেরত আসতে হতো। কর্নেল তাহেরকে কেন্দ্র করে তাঁর চারদিকের পরিবেশটা দেখাতে গিয়ে “ক্রাচের কর্নেল” বইটিতে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাঠকদের সামনে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত কিন্তু স্বাপ্নিক, অস্পষ্ট কিন্তু বর্ণাঢ্য এক নাম কর্নেল তাহের। শাহাদুজ্জামান ‘ক্রাচের কর্নেল’ বইয়ের কেবল লেখকই নন, বরং তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির একজন কৌতূহলী পর্যবেক্ষকও বটে। রাজনৈতিক চাদরে ঢেকে রাখা একটি চরিত্রকে লেখক পাঠকের দ্বারে টেনে তুলে এনেছেন অপার সাহসিকতা আর সামগ্রিকতায়। বাংলাদেশের ইতিহাসকে পতিত করে অবিরাম জন্ম দেয়া হয়েছে ধোঁয়াচ্ছন্নতা আর মিথ্যার বেশাতি। লেখক প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্মোহ থেকে তুলে ধরেছেন সিনেম্যাটিক অভিযানের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যোগদান করা মুক্তিযোদ্ধা, দুর্ধর্ষ কামালপুর অপারেশনে পা হারানো সেক্টর কমান্ডার, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ক্রাচে ভর দেয়া এক স্বাপ্নিক নাগরিক, বিরল আর আপাত ব্যর্থ এক সেপাই অভ্যুথানের নায়ক এবং সর্বোপরি ক্ষুদিরামের পথের অভিযাত্রী কর্নেল তাহের ও সেই ঘোর লাগা সময়ের কুশীলবদের।

তিতাস একটি নদীর নাম – অদ্বৈত মল্লবর্মণ

বাংলা সাহিত্য সেরা উপন্যাস নিয়ন_আলোয়_Neon_Aloy

“তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।”

এ কথাগুলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের শুরুতে লিখেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসের মধ্যে নিম্নবর্গীয় মানুষের আখ্যানসমৃদ্ধ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অমরকীর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নদী অববাহিকায় বসবাসরত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে। ‘ধীবর’ বা ‘মালো’ সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে অদ্বৈত মল্লবর্মণ গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে দেখেছেন এ সমাজের জীবনসংগ্রামের নিষ্ঠুর চিত্র। বলা যায়, প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমে মুছে আসা ‘মালো’ জীবনের সারাৎসার তিনি আঁকতে সক্ষম হয়েছেন এ উপন্যাসে।

বাংলা সাহিত্য কত অমূল্য বলে শেষ করা যাবে না। আজ এখানেই শেষ করছি, আবার পরের পর্বে হাজির হবো আরও পাঁচটি অনবদ্য উপন্যাসের সিনোপ্সিস নিয়ে।

পর্ব ২

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top