শিল্প ও সংস্কৃতি

কারণ, “অপসংস্কৃতি” আটকে রাখা যায় না!

ট্রেইনরেক ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

আমরা তো সবাই কম-বেশী মেটাল শুনি, নাহ? এখনকার স্পটিফাই বা ইউটিউবের যুগে এমন মানুষ পাওয়া একদমই দায় যে কোনদিন আইরন মেইডেন, কুইন, প্যান্টেরা, মেটালিকা, এলভেইটি বা ব্ল্যাক স্যাবাথের কোন গান কখনো শুনেনি।

কিন্তু কখনো কি এভাবে ভেবে দেখেছেন এসব যেই ব্যান্ডগুলো এখন দেশ-বিদেশ কাঁপাচ্ছে, বিশেষ করে হেভী মেটাল বা থ্র্যাশ মেটাল বা যেকোন মেটাল ব্যান্ড বলি না কেন এদের কিন্তু এই অবস্থায় আসতে একটা সময় লেগেছে। মানে, এরা বেশিরভাগই হয় ইউরোপ না হয় আমেরিকান ব্যান্ড আর সেসব দেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভালোই বয়স আছে। সেই দেশের আর্টিস্টদের তাদের করা সেই মেটাল মিউজিকটা সেই দেশের মানুষদেরকে মানিয়ে নিতে বেশ সময় লেগেছে এবং সেই দেশের বর্তমান সেই মেটাল মিউজিক সিনারিওটা কিন্তু এক-দুইদিনে গড়ে উঠেনি।

সেইভাবে বললে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কিন্তু বয়স খুব বেশি একটা না, আর এই দেশের মানুষ এখনো মেটাল মিউজিকটাকে সেভাবে মেনে নিতে পারেনি। সেই ৮০’র দশকে বাংলাদেশের প্রথম হেভী মেটাল ব্যান্ড ওয়েভসকে তৎকালীন সমাজ মেনে নেয়নি, শো করতে পারতো না বলে তাদের বিদায় নিতে হয়েছে বাধ্য হয়ে, রকস্ট্রাটাও শুরুর দিকে কোথাও প্র্যাকটিস করতে পারতো না মানুষ তাদের মিউজিককে “চিল্লাচিল্লি” হিসবে আখ্যায়িত করায়। বর্তমান সময়ে আমরা যারা ক্রিপটিক ফেইট শুনি, তারা খুব ভালো করে বুঝি ব্যান্ডটা এখনো কতোটা আন্ডাররেটেড। এমনকি যারা ব্যান্ড মিউজিকও শুনি, তারাও অনেকেই এখনো ক্রিপটিক ফেইটের  সঠিক মর্যাদাটা দিতে পারিনি। যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ক্রিপটিক ফেইট যতো গান করেছে আজ পর্যন্ত, এই দেশের আর কোন ব্যান্ড করেনি। তাদের “নয় মাস” অ্যালবাম পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে।

এর মধ্য বিভিন্ন কারণে এই দেশে শো করতে আসা অনেক বড় বড় ব্যান্ড যেমন “মিস মে আই”, “ক্রিসিয়ুন”, “নারভো-ক্যাওস” এমনকি “এলভেইটি” এর শো-ও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে, এমনকি নিরাপত্তার অজুহাতে বিমানবন্দরে আটকে রাখার নজিরও আছে!

মিস মে আই নিয়ন আলোয় neonaloy

“মিস মে আই” এর কনসার্ট পোষ্টার।

বছরকয়েক আগে এমনও হয়েছে যে একটি আন্তর্জাতিক মেটাল ব্যান্ডের শো যেই ভেন্যুতে নিরাপত্তার অজুহাতে বাতিল করা হয়েছে, সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেই একই ভেন্যুতে প্রতিবেশী একটি দেশের পপ-সঙ্গীতশিল্পীরা কনসার্ট করে গিয়েছে! ব্যাপারটা যেন অনেকটা এমন যে আর যারা-ই শো করুক না কেন, কোন হেভীমেটাল ব্যান্ড এদেশে শো করলেই যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে!

সত্যি বললে, আমাদের দেশের ব্যান্ডগুলো তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছে না। এসবের কারন একটাই, বিশ্বের অনেক দেশের মতই আমাদের দেশের মানুষও এখনো মেটাল মিউজিক পুরোপুরিভাবে মেনে নিতে পারেনি। এত বছর পরেও মেটাল মিউজিককে “অপসংস্কৃতি” বলে আখ্যায়িত করা হয় এই দেশে।

তারপরেও এতো কিছুর পরেও এই দেশে মেটাল মিউজিসিয়ানরা হাজার সমস্যার মুখোমুখি হয়েও তাদের মিউজিক চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডগুলো এদেশে এখনো সেভাবে প্রবেশ করতে না পারলেও এদেশের ব্যান্ডগুলো নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে।

হ্যাঁ, “ট্রেইনরেক” এর কথাই বলছি। পৃথিবীর একটা ছোট দেশের, একটা থ্র্যাশ মেটাল এবং হার্ডকোর আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড এই ট্রেইনরেক। ট্রেইনরেক এমন একটা ব্যান্ড যারা ল্যাম্ব অফ গডের মতো গান কভার দেয়ার সাহস রাখে এবং শুধু সাহসই না, অসাধারণ সব লাইভ কভারও দেয়। সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে বাংলাদেশে এমন একজন ভোকাল, এমন শ্রেডিং এবং রিফ প্লেয়িং গিটারিস্ট, এমন ব্লাড পাম্পিং ড্রামার আর এমন গ্রুভি বেজিস্টের একটা কমপ্যাক্ট সেটআপ আছে।

যাই হোক, এটা মোটামুটি পুরনো খবর যে এই ট্রেইনরেকই এবছরের আগষ্টে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত “ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট” এ প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী ব্যান্ড হিসেবে পারফর্ম করবে যেখানে তারা স্টেজ শেয়ার করবে “স্লেয়ার”, “টেষ্টামেন্ট”, “ক্রেডল অফ ফিলথ”, “বুলেট ফর মাই ভ্যালেন্টাইন” আর “কিস” এর মতো আরো বড় বড় ব্যান্ডের সাথে- যা এর আগে বাংলাদেশের মিউজিকের ইতিহাসে আগে কখনোই ঘটেনি।

তার আগে, যাদের ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ে তেমন ধারণা নেই, তাদের জন্য একটু বলে নেই যে এই “ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট” হচ্ছে জার্মানির শিলসউইগ-হোলস্টেইনে ওয়াকেন গ্রামে অনুষ্ঠিত একটি বার্ষিক ওপেন এয়ার হেভীমেটাল মিউজিক ফেস্টিভাল। এটিকে পৃথিবীর বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় হেভীমেটাল মিউজিক ফেস্টিভাল বলা হয়। এটা সাধারণত প্রতিবছর আগস্টের দিকে হয়। ১৯৯০ সালে এই ফেস্টিভালটি প্রথম শুরু হয় মাত্র ৬টি লোকাল জার্মানি ব্যান্ড নিয়ে ছোট পরিসরে মাত্র ৮০০ মানুষের সমাবেত নিয়ে। যেখানে বর্তমানে সেই সংখ্যাটা অনেক বেশি পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে যেহেতু এটি পৃথিবীর বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় হেভীমেটাল মিউজিক ফেস্টিভাল। শুধু ২০১১ সালেই সবমিলিয়ে ৮৬,০০০ মানুষ জমা হয়েছিলো এই ফেস্টিভালে।

এক কথায় বলতে গেলে- ওয়াকেন হচ্ছে সেই শো, যেখানে পারফর্ম করা যেকোন ব্যান্ডের জন্য স্বপ্নের ব্যাপার; এবং জীবনে অন্তত একবার যেই শো না দেখলে একজন মেটালহেডের জীবন অপূর্ণ থেকে যাবে!

ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্টিভাল নিয়ন আলোয় neonaloy

ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট এর লোগো

এরকম একটি মঞ্চে পুরো বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি’র প্রতিনিধিত্ব করবে ট্রেইনরেক সারাবিশ্বের মেটালহেডদের সামনে, জানান দিবে- দক্ষিণ এশিয়ার এই ছোট্ট দেশটিতেও আছে দুনিয়া কাঁপানোর মত কিছু মেটালহেড!

এই জায়গায় অবশ্যই তারা খুব সহজে যায়নি, একটা কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের ওয়াকেনের টিকেট হাতে পাওয়ার জন্য। প্রথমে দেশী ব্যান্ডগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে জয়ী হতে হয়েছে, তারপর দক্ষিণ এশিয়ার কিছু ব্যান্ডের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে জয়ী হয়ে তারপর সেই সম্মান এবং যোগ্যতা তারা অর্জন করে নিয়েছেন।

গত বছর ২০১৮ সালের ১ম ডিসেম্বরে ঢাকার রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হওয়া “ওয়াকেন মেটাল ব্যাটল” এ ট্রেইনরেকের অংশগ্রহণ থেকেই এই যাত্রার শুরু।

সেখানে তাদের প্রতিযোগী ছিলো আরো ৭৭টি ব্যান্ড এবং সেখানে আরো ছিলো কারমা, ইনফিডেল, টরচার গোরগ্রাইন্ডার, আইয়নিক বন্ডের মতো বড় নামধারী কিছু ব্যান্ডও। সেখানে তারা জয়ী হয়ে ভারতের “ব্যাঙ্গালোর ওপেন এয়ার” এ বাংলাদেশকে তুলে ধরার যোগ্যতা অর্জন করে।

ওয়াকেন মেটাল ব্যাটলে জয়ী হবার পর ট্রেইনরেক বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো একটি ক্রাউডফান্ডিং মুভমেন্ট শুরু করে। ক্রাউডফান্ডিং বলতে সহজ কথায় যা বোঝায় তা হচ্ছে একটা ব্যান্ড নিজেদের কোন ট্যুরে রিপ্রেজেন্ট করতে গেলে যেই খরচটা দরকার হয়, সেটা তারা তাদের ফ্যানবেজ থেকে তুলে আনে। যেটা এর আগে বাংলাদেশে কখনো হয়নি, ট্রেইনরেকই প্রথমরের মতো ক্রাউডফান্ডিং মুভমেন্ট শুরু করে এবং সেখানের থেকে তারা ৬০,০০০ টাকা জমা করে তাদের ফ্যানবেজ এবং অফিসিয়াল পার্টনারদের থেকে।

গত ৯ই ফেব্রুয়ারী ভারতের ব্যাঙ্গালোরে “ব্যাঙ্গালোর ওপেন এয়ার” কনসার্টটি হয়। সেখানে নেপাল, শ্রীলংকা, ভারতের থেকে আসা বিভিন্ন ব্যান্ডের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে শেষে ট্রেইনরেক সেখানেও জয়ী হয়ে জার্মানির ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্টে পারফর্ম করার যোগ্যতা অর্জন করে নেয়।

এতোগুলো মানুষের সামনে, এতো বড় বড় ব্যান্ডের সাথে একই স্টেজে শুধু বাজানোই না, বাংলাদেশকে আর বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে পুরো বিশ্বের মেটালহেডদের কাছে তুলে ধরছে ট্রেইনরেক।

ট্রেইনরেকের জয়ের পর থেকে পুরো দেশে মিউজিক ইন্ডাস্টি আর ব্যান্ড মিউজিক ফ্যানবেজে একটা উৎসবের উচ্ছ্বাস বয়ে যাচ্ছে। ফ্যানরা তো আছেই, এমনকি অনেক ব্যান্ড এবং অনেক বড় বড় মিউজিসিয়ানরাও ট্রেইনরেকের এই সাফল্যে খুশী হয়ে ফেসবুকে তা প্রকাশ করছেন।

ট্রেইনরেক ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

ট্রেইনরেক ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

ট্রেইনরেক ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

ট্রেইনরেক ওয়াকেন ওপেন এয়ার ফেস্ট নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশ মিউজিক সিনে বর্তমানে আমরা ভালো করে তাকালে দেখতে পারবো একটা বিপ্লব ঘটছে। যেমন নতুন সব অসাধারণ ব্যান্ড, নতুন কনসেপ্টের মিউজিক ভিডিও, নতুন অ্যালবাম এবং নতুন সাউন্ড আসছে। সেই সাথে অর্জিত হচ্ছে অসাধারণ সব এচিভমেন্ট।

এভাবে যদি বাংলাদেশ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এগোতে থাকে, তাহলেই কি আমরা খুব সহজেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়ে যাব? সবাই যেখানে ইংরেজিতে গান করে খ্যাতি কামাচ্ছে, আমরা বাংলা নিয়ে সেখানে কতদূর আগাবো?

এরকম ভাবনা অনেকটা অমূলকই বলা যায়। কেননা সঙ্গীতকে কখনো ভাষার লাগামে আটকানো যায় না। যদি যেত, তাহলে জার্মান ব্যান্ড রামস্টেইন এর গানে পুরো পৃথিবীর মেটালহেডরা একই তালে হেডব্যাং করতো না।

ট্রেইনরেক তাদের কাজ করেছে, তাদের সামর্থ্যকে তারা কাজে লাগাচ্ছে। এখানে তাহলে আমার-আপনার কি করণীয়?

ফ্যানবেজ হিসাবে যে কাজটা আমরা না করলেই নয়, তা হলো ব্যান্ড এবং মিউজিসিয়ানদের সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া যেন তারা নিজেদের ভালোবাসার কাজটা একনিষ্ঠভাবে করতে পারে, আরো ভালো মিউজিক বানাতে পারে। কেননা বাস্তবতা এটাই যে বলিউডি একজন পপতারকার পিছনে দেশী-বিদেশী স্পন্সররা কোটি-কোটি টাকার চেক নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেও আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড ইন্ডাস্ট্রিটা এখনো দেশের সৎ ছেলের মতই অবহেলিত, ক্ষেত্রবিশেষে ঘৃণিতও বটে। আর এই অবহেলিত শিল্পটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদেরই- নিয়মিত শো’য়ের আয়োজন করে, পাইরেটেড মিউজিক বর্জন করে, ব্যান্ডগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা করে।

হাজার হলেও, আমরা ফ্যানবেজই এই ব্যান্ড এবং মিউজিসিয়ানদের সামনে চলার অন্যতম কারণ এবং জ্বালানী।

Most Popular

To Top