বিশেষ

ছয় তারের হিপনোটাইজার- অরুণেন্দু দাস!

অরুণেন্দু দাস

ছয় তারের সম্মোহনী যাদু দিয়ে বাংলা গানকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন এক অন্য মাত্রায়, লিখেছেন অজস্র জীবনমূখী গান, যিনি প্রথম বাংলা গানের সাথে একীভূত করেছিলেন হাওয়াইন গীটারকে, তিনি হলেন অরুণেন্দু দাস; একজন নিভৃতচারী কিংবদন্তী ,যার গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে বাংলার অনেক ব্যান্ড।

অরুণেন্দু দাস

অরুণেন্দু দাস, সবার কাছে “অরুণদা” নামেই বেশি পরিচিত। বর্তমান জেনারেশনের অনেকেই হয়ত অরুণদাকে চিনবে না অথবা চিনে থাকলেও ভালো করে জানে না অরুণদা সম্পর্কে। অথচ দুই বাংলার প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীদের কাছেই তিনি ছিলেন সঙ্গীতের এক মহান পুরুষ ,এই অরুণদার করা গান গেয়ে এখনো অনেক জনপ্রিয় শিল্পী মঞ্চ মাতিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা যারা নব্বই দশকে জন্মেছি তারা জানি বাংলা গানে কিভাবে বসন্ত এসেছিল। সত্তর দশকেই গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও তার বন্ধুদের হাতে বাংলা গানে এসেছিল নতুন মোড়, কিন্তু সে সময় স্বীকৃতি পায়নি। নব্বই-এর দশকে এলেন সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন দত্তের মতো শিল্পীরা। তাঁদের হাত ধরে বাংলা গান নতুন মোড় নেওয়া শুরু করলো। কিন্তু বাংলার নতুন ধারার গান, যাকে জীবনমুখী গান বলা হয়, এই ধরণের গান সুমন, নচিকেতা, গৌতম এবং অঞ্জনদের অনেক আগেই অরুণদা সৃষ্টি করেছিলেন নতুন দিনের গান হিসেবে।

অরুণেন্দু দাস ১৯৩৮ সালের ৭ জুলাই মায়ানমারের রেঙ্গুনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন ডাক্তার, মা গৃহিণী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সপরিবারে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে চলে আসেন ডাক্তার বাবা। ছয় ভাই বোনের মাঝে একজন ছিলেন অরুণেন্দু দাস। জীবনের শুরুর দিকের অনেকটা সময় বাংলাদেশে কাটিয়েছেন অরুণদা।

কলকাতায় যাওয়ার পর সেখানের ভবানীপুর মিত্র ইন্সটিটিউশন এর স্কাউট গ্রুপের সদস্য হন অরুণেন্দু। এই স্কাউট গ্রুপের সদস্য থাকাকালীন সময়ে ১৯৫৫ সালে ক্যাম্পিং ট্রিপে ‘পুরি’ গিয়ে প্রথম নিজের লেখা “চঞ্চল একদল স্কাউট ভাই” গানটি করেন।

পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন স্থাপত্যকে। কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে আর্কিটেকচারে নিজের স্নাতক শেষ করেন। পঞ্চাশ শতকের মাঝামাঝি সময় বিই কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময় গিটারের ছয় তার দিয়ে টুং টাং করে নতুন নতুন গান বেধে গাইতেন এবং সুকন্ঠ বন্ধুদের দিয়ে গাওয়াতেন। তখন ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। হেমন্ত, ধনঞ্জয়, মানবেন্দ্র, শ্যামল- এদের মতো প্রভাবশালী শিল্পীদের পদচারণায় এতোই মুখর ছিল বাংলা গান যে অরুণদা তাঁর গানকে নিজের ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। অরুণদা একবার বলেছিলেন,

“গানগুলো রচিত হয়েছিল গীটারের ওপর আঙুল চালানোয় পারদর্শিতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তখনো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের কোনো ধারারই তেমন অনুপ্রবেশ ঘটেনি। অথচ ছয়তারের সন্মোহিনীর প্রভাবে মজেছি কেউ কেউ। নতুন কোনও কর্ড সিকোয়েন্স, স্ট্রামিং বা পিকিং-এর কায়দা কোথাও দেখলে বা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে লেগে যেতাম, কানে লাগা কোন গানের সুর ও ভাবের অনুকরণে নয় অনুসরণে বাংলায় কথা গুছিয়ে তুলতে, যাতে করে ছয়তারের সঙ্গতে নিজেরা নিজেদের মত করে সহজ ভাবে গাইতে পারি।”

নতুন কোনো গান শুনলে, সেটাকেই গীটার দিয়ে বাজাতে চেষ্টা করতেন অরুনদা। যে কোনো বাংলা গানের ভাষা নিজের মতো করে বুঝে এগুলোকে রূপ দিতেন গীটারে। এজন্য তাঁর সৃষ্টিগুলোকে ‘ছয় তারের গান’ বলতে ভালবাসতেন সবসময়।

কিন্তু অরুনদা’র সেই গানগুলো মানুষকে এতই অনুপ্রানিত করেছিল যে, এতোদিন পরেও মানুষের মুখে এই গানগুলি শুনে আসছে। এসব মানুষের দলে ছিলেন বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য গৌতম চট্টোপাধ্যায়। ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গান হিসেবে জনপ্রিয় এমন অনেক গুলো ট্র্যাক অরুণদারই সুর এবং কথা! ব্যান্ডটির ৪ টি এ্যালবাম – “আবার বছর কুড়ি পরে”, ” ঝরা সময়ের গান”, “ক্ষ্যাপার গান” “মায়া”- প্রত্যেকটির মধ্যেই অরুণদার গান রয়েছে, ভাই প্রদীপ চট্টোপধ্যায় এর সহপাঠী ও বন্ধু অরুণের ‘ছয় তারের গান’ এতটাই ভালবেসেছিলেন গৌতম। তাঁর মাধ্যমেই অরুণদার স্টিলের তারের গীটার বাজানো শুরু হয়।

অরুণেন্দু দাস
বিই কলেজে থাকাকালীন সময়ে অরুনেন্দু জনপ্রিয় ছিলেন হাওয়াইন গীটার বাজানোর জন্য। গানের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মান্না দে, শ্যামল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গান শুনে। পেশায় যদিও স্থপতি ছিলেন তবুও নিজের ক্যারিয়ারকে কখনোই গানের বাইরে নিয়ে যেতে চাননি, পারেনও নি। তাঁর নিজের সব গানই ছিল মূলত তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে লিখা এবং এসব গানের প্রাথমিক কম্পোজিশন করতেন বন্ধুদের আড্ডায় নিজের গীটার বাজিয়ে। তখনকার সময় অরুণেন্দু স্প্যানিশ গীটার বাজানো শুরু করেছিলেন, যেটি সেসময় কলকাতায় খুব একটা প্রচলিত ছিল না।

অরুণেন্দু দাস

১৯৫৬ সালে প্রথম নিজের লেখা নিজের সুরে গান করেন। নিজেই গীটার বাজিয়েছেন। ষাট দশকের শেষের দিকে অরুনেন্দু ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে গিয়ে আমেরিকান এবং জনপ্রিয় ইংলিশ পপুলার গানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান। অক্সফোর্ড শেয়ারের মার্কেট টাউনের একটা ফোক ক্লাবের সদস্য হয়ে গিটার বাজানোর কিছু নতুন কৌশল আয়ত্ত করেন।

তবে বিদেশ চলে গেলেও তিনি বাংলা গানকে ভুলে যাননি । বরং এরপর থেকে বাংলা গানে নতুনত্ব আনতে আরো গভীরভাবে মনযোগ দিলেন। এরপর থেকে তিনি এতোই জীবনমুখী বাংলা গান রচনা করেছেন যে আজও আবহমান বাংলা গানে লেগে রয়েছে তাঁর ছোয়া। স্বভাবলাজুক মানুষটি কখনোই মঞ্চে গান করতে চাননি, ক্যামেরার সামনে এসে কখনোই নিজের প্রচারণা করেননি। পর্দার আড়ালে থেকেই বাংলা গানকে দুহাত ভরে দিয়ে গেছেন।

অরুণেন্দু দাস

এই কিংবদন্তী মানুষকে নিয়ে বানানো হয়েছে ‘অরুণদার গান’ নামে একটি তথ্যচিত্র, যা শীঘ্রই মুক্তি পেতে যাচ্ছে। পরিচালনায় ছিলেন ঋতম সরকার।

এই মহান শিল্পী পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন গত ২ ফেব্রুয়ারি। কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন দুই বাংলার এই মহান শিল্পী। সঙ্গীতের জগতে সোনা ফলিয়ে গেছেন অরুনদা। তাঁর সৃষ্টিগুলো চিরন্তন হয়ে থেকে যাবে এই বাংলা সঙ্গীতে। হয়ত তাঁর নাম তেমনভাবে মানুষের মুখে উচ্চারিত হবে না কিন্তু নাম না জানা এই মহান ব্যাক্তির গান মানুষের মুখে শোনা যাবে যুগের পর যুগ।

তথ্যসূত্রঃ

১। https://natungaanerbhore.blogspot.com/p/blog-page_34.html?fbclid=IwAR3p9Jy1XtAceAegzmaSCuww8UPZePN45pBcucRU8flPdSF_omxxZKfNzAY

২। https://ebela.in/entertainment/a-documentary-about-singer-arunendu-das-is-yet-to-be-released-dgtl-1.923406?fbclid=IwAR2AiCiM1wJjmfVUr2U93qItqJ0OmGAmsZWzLz4MZnKd1d88xUiwi_tSdmY

৩। https://gitikar.wordpress.com/category/অরুণেন্দু-দাস

Most Popular

To Top