নাগরিক কথা

ধর্ষক হত্যা, এবং আপনার জন্য একটি সৃজনশীল পরীক্ষা

ধর্ষক হত্যা নিয়ন আলোয় neonaloy

উদ্দীপক ১ঃ

সময়টা ২০০১-০২ সাল, বিএনপি তখন মাত্র ক্ষমতায় এসেছে। দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র, প্রচুর সন্ত্রাসী। জায়গায় জায়গায় অরগানাইজড গ্যাং, তাদের গডফাদাররা সব পলিটিশিয়ান। এবং এই পলিটিশিয়ানরা বিএনপি’র পক্ষে-বিপক্ষে দুইদিকেই আছে। সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত।

সরকার মরিয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। তো তারা মাঠে নামালো অপারেশন ক্লিনহার্ট, পুলিশ-সেনাবাহিনী-বিডিআরের সম্মিলিত যৌথবাহিনী। প্রতিদিন ৫-১০ জনের মারা যাওয়ার খবর আসে পত্রিকায়- জিজ্ঞাসাবাদের সময় “হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে”। জনগণ খুশি, সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য তো কমছে!

ধর্ষক হত্যা নিয়ন আলোয় neonaloy

অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতারকৃতদের মাঝে একজন (ছবিসূত্রঃ এনটিভি)

ফলাফলঃ সরকারী আয়োজনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে জনসমর্থন, র‍্যাব-এর জন্ম, “ক্রসফায়ার” শব্দটার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিলাভ। এখনো চলছে ক্রসফায়ার, কিন্তু সন্ত্রাস বন্ধ হয় নাই।

উদ্দীপক ২ঃ

এইটাও বিএনপি আমলের ঘটনা, ২০০৪ সালের দিকে। আগের আমলে আওয়ামী লীগ সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টিকে অস্ত্রসমর্পণের বিনিময়ে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেও সবাই অস্ত্র জমা দেয়নাই, অথবা অনেকে অস্ত্র জমা দিলেও পরে আবার অপরাধের জীবনে ফেরত গিয়েছে। সর্বহারা অধ্যুষিত অঞ্চলে পুলিশের টহল দলও ভয় পায় সন্ধ্যার পর সশস্ত্র টহল দিতে। কারণ পেট্রল টিমের উপর হামলা করে পুলিশ মেরে অস্ত্র ডাকাতি করা সর্বহারাদের জন্য ডালভাত। আর সাধারণ মানুষদের মেরে, ধর্ষণ করে, ডাকাতি করে তাদের সব কেড়ে নেওয়া তো সর্বহারা পার্টির জীবন-জীবিকা!

আচমকা দৃশ্যপটে “ভিজিলান্টে” সিদ্দিকুল ইসলামের আগমন। এই লোক দলবল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প বসালো, চিহ্নিত সর্বহারাদের গাছের সাথে বেঁধে দিনের আলোতে সবার সামনে পিটিয়ে মেরে ফেলতে লাগলো, এমনকি যারা “সন্দেহভাজন” সর্বহারা, তাদেরও নিস্তার মিলল না। এই সুযোগে এমনও হল যে রহিম ব্যাপারীর সাথে আক্কাস মোল্লার জমিজমা নিয়ে বিরোধ। পথের কাঁটা সরাতে রহিম ব্যাপারী তাই আক্কাস মোল্লার সাথে সর্বহারাদের সাথে যোগাযোগের মিথ্যা অভিযোগ আনলো, সপ্তাহ না ঘুরতেই দেখা গেল লাশের সাথে বাঁধা আক্কাস মোল্লার মৃতদেহ।

ধর্ষক হত্যা নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রশাসন এসব দেখেও কিছু বলে না। “তোমার শত্রু=আমার শত্রু, তুমি আমার হয়ে শত্রুনিধন করলে তো আমারই সুবিধা” ভেবে বরং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অ্যাসিস্ট করা শুরু করলো এই ভিজিলান্টে’র দলকে।

সে সময় সিদ্দিকুর রহমানের একটা সাক্ষাতকার নিয়েছিল প্রথম আলো। সেখান থেকে কিছুটা এখানে তুলে দিলামঃ

প্রথম আলো: সর্বহারা উচ্ছেদের যে কাজ আপনি করছেন, সে দায়িত্ব আপনাকে কে দিয়েছে?
বাংলা ভাই : এই দায়িত্ব আমাকে কেউ দেয়নি। আমি নিজেই দায়িত্ব নিয়েছি।

প্রথম আলো : দেশে আইন-প্রশাসন থাকতে আপনি কেন সর্বহারা উচ্ছেদের দায়িত্ব নিলেন? আপনার এসব কর্মকাণ্ড আইন পরিপন্থী নয় কি?
বাংলা ভাই : এখানে সর্বহারারা দিনের বেলায় মানুষ জবাই করেছে। স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে। এই অবস্থায় কেউ যদি সর্বহারা নামধারী ডাকাত-সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করে, সেটা কি আইনবিরোধী কাজ হতে পারে? আমরা তো আইনের পক্ষেই কাজ করছি।

প্রথম আলো: জাগ্রত মুসলিম জনতার ব্যানারে আপনি বহু হত্যা মামলা এবং বড় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের আত্মসমর্পণ করাচ্ছেন। এই অঞ্চলের একজন পুলিশ সুপার বলেছেন, এ ধরনের কোনো কাজ করার আইনগত কোনো অধিকার আপনার বা জাগ্রত জনতার নেই। আপনি কী মনে করেন?
বাংলা ভাই: এটা ওনারা হয়তো আপনাদের কাছে বলেছেন কিন্ত আমাদের তারা বলেননি। বরং পুলিশ তো আমাদের কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। আর আমরা তো ভালো কাজ করছি।

সম্পূর্ণ সাক্ষাতকারটি পড়ে নিতে পারেন প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে

জনগণ এবারও খুশি, সর্বহারা তো কমছে!

ফলাফলঃ ব্যাটম্যান হিসাবে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইয়ের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে, ভিজিলান্টে দলের ব্যাপক বিস্তৃতি এবং এক-দেড়বছরের মধ্যেই জেএমবি’র বাম্পার ফলন। ২০০৫ সালের ১৭ অগাস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা করে তারা জানিয়ে দিল এক বাগমারা থেকে শুরু করে পুরো দেশে ছড়িয়ে যেতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। নাও, এইবার জঙ্গি সামলাও।

উপরোক্ত উদ্দীপকের আলোকে আসেন এইবার সৃজনশীল কিছু প্রশ্ন করিঃ

ক। বিচারহীনতা কি?
খ। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন ধর্ষককে মেরে ফেললেই কি দেশে ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন সহিংসতা কমে যাবে?
গ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কিভাবে মানুষকে আরো বেশি বিচারহীনতার দিকে ধাবিত করে সংক্ষেপে আলোচনা করুন।
ঘ। বিনা বিচারে ধর্ষকহত্যার মাধ্যমে এইবার আমরা কোন ধরণের নতুন বিপদ ডেকে নিয়ে আসছি বলে আপনার মনে হয়?

প্রশ্নের উত্তর ভাবা শেষ? কমন পড়েছে আপনার সিলেবাসের সাথে? নাকি ভাবছেন আমি ধর্ষকদের পক্ষে ওকালতি করছি?

আসুন, এইবার আপনাকে কয়েকটা বিলুপ্তপ্রায় সমস্যার নাম এবং কিভাবে সেগুলো মোকাবেলা করা হচ্ছে/হয়েছে মনে করিয়ে দেই।

১। এসিড সন্ত্রাস- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারী হস্তক্ষেপ, এবং কঠোর আইন প্রণয়ন ও শাস্তি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
২। ফতোয়াবাজি- ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গোড়ে তোলা এবং ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন।
৩। বাল্যবিবাহ/বহুবিবাহ- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রণয়ন ও শাস্তি নিশ্চিতকরণ।
৪। যুদ্ধাপরাধীদের উল্লম্ফন- ইতিহাস চর্চা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং গণদাবীর মুখে আইন সংস্কার করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরণ।

৪ নাম্বার সমস্যাটাকে বিলুপ্তপ্রায় বলা যায় না অবশ্যই, তবে বাকি ৩টার সাথে এটাকে একই তালিকায় রাখার কারণ হচ্ছে এই চারটা সমস্যারই সমাধানের পথ একদিনে আসেনাই। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দাজে কয়েকটা তক্তা ধইরা পেরেক মেরে এগুলোকে লাইনে আনা হয় নাই।

আপনি কোন একটা সামাজিক সমস্যাকে অ্যাড্রেস করতে হলে আপনাকে লম্বা এবং কঠিন রাস্তায় ধৈর্য ধরে হাঁটতে হবে সুষ্ঠ পরিকল্পনামাফিক, এইখানে শর্টকাট বলে আসলেই কোন অপশন আছে মনে হয় না। তাইলে লম্বা রাস্তাটা কি? একটু ইতিহাস ঘাঁটেন, নিজেই বুঝবেন। কোন চারটা চ্যাপ্টার পড়লে প্রশ্ন কমন পড়বে সেইটাও বলে দিলাম উপরে। আমাদের ইতিহাস এত পুরানো না যে আপনার পিএইচডি করা লাগবে এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে।

আপনি বিচার চান ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন নিপীড়নের, আমিও চাই। পার্থক্য হচ্ছে, আপনি ১-২টা মশা মেরে পৃথিবীটাকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে চান, আর আমি আপনারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছি যে ঘরের আশেপাশে নোংরা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পানি জমতে দিলে ওইখান থেকে এডিস মশা জন্ম নিবে, কিউলেক্স মশা জন্ম নিবে, অ্যানোফিলিস মশা জন্ম নিবে। শুধু যে ডেঙ্গু ছড়াবে তা না, সাথে ম্যালারিয়া, গোঁদরোগও ছড়াতে পারে।

তো এখন আপনি মশা মেরে নিজের সময় নষ্ট করবেন, নাকি ঘর পরিষ্কারে সেই সময় কাজে লাগাবেন- আপনার বিবেচনা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top