টেক

এবার “গুজব” এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলো ফেসবুক!

গুজব ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়, এরিক টাকার নামের টেক্সাসের একটি মার্কেটিং কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা একটি টুইট করেন, যেখানে বলা হয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে বিক্ষোভকারীদের দিয়ে কয়েকটি বাস ভর্তি করে রাখা হয়েছে, তাদের পরবর্তীতে ব্যবহার করা হতে পারে। টুইটারে এরিক টাকার একজন অখ্যাত ব্যক্তি হলেও, এই টুইটটি ১৬,০০০ বার টুইটারে এবং ৩৫০,০০০ বার ফেসবুকে শেয়ার করা হয়। পরে দেখা যায়, তথ্যটি ভুয়া, এর বিন্দুমাত্রও ভিত্তি নেই।

গুজব ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

তথ্য প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের দিনে, ভুল/মিথ্যা/গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম নিঃসন্দেহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ফেসবুক। সারা পৃথিবীতে এই মূহূর্তে ২.২৭ মিলিয়ন জন ব্যক্তি মাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করছেন। ফেসবুক এক দিক থেকে খুব ভয়াবহ একটা জায়গা, এখানে তথ্যের সত্যতা যাচাই করার আগেই মূহূর্তে্র মধ্যে লাখো মানুষের কাছে ছড়িয়ে যেতে পারে, এবং তা ব্যাপক আকারে গণবিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

অসত্য তথ্য প্রচার অনেকসময়ই উদ্দেশ্যপ্রাণিত হয়ে থাকে। বেশিরভাগ সময়ই তা হয় রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে। বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন গণআন্দোলনের সময় পক্ষে-বিপক্ষে ভুয়া তথ্য ভাইরাল করার পাশাপাশি সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কিংবা নির্দেশে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, এমন নজিরও পাওয়া গেছে। অল্প কিছুদিন আগে ফেসবুক বাংলাদেশ থেকে চালিত ৯টি ফেসবুক পেইজ এবং ৬টি আইডি চিহ্নিত করে, যারা নির্বাচন সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছিল, এবং এদের পেছনে সরকারী নির্দেশনা ছিল বলেও ফেসবুক প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবী করে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অপরাধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ফেসবুক পেইজ বন্ধ করে দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

গুজব ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

তবে, ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর দিন সামনে আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি দাতব্য ফ্যাক্টচেক সংস্থা Full Fact এর সাথে কোলাবরেশনে ফেসবুক পোস্টগুলোর সত্যতা যাচাই করার উদ্যোগ নিয়েছে ফেসবুক, যা প্রথমে যুক্তরাজ্যে চালু হতে যাচ্ছে। এ উদ্যোগ সফল হলে, উদ্যোগটি বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ফেসবুকের। তবে ফ্যাক্টচেকিং এর উদ্যোগের শুরুটা হয়েছে আরও আগেই। ফেসবুক ইতোমধ্যে ২৪টি দেশের ৪৯টি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার সাথে কাজ করেছে। ফুল ফ্যাক্টের সাথে কোলাবরেশন এরই একটা অংশ।

ফুল ফ্যাক্ট একটি দাতব্য ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা, তারা অনলাইনে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য/সংবাদের সত্যতা যাচাই-বাছাই করার কাজ করে থাকে। এর আগে ২০১৭ সালে ফেসবুক তাদের সাথে ফ্যাক্ট চেকিং এর একটি প্রজেক্টে অংশ নিয়েছিল, যেখানে তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় ভুয়া তথ্য যাচাই করার কিছু পদ্ধতি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। বর্তমান কার্যক্রমে ফুল ফ্যাক্টের ৬টি দল ফেসবুক পোস্টগুলো যাচাইয়ের কাজে অংশ নেবে।

গুজব ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

কিন্তু, এই যাচাই বাছাইয়ের কাজটি হবে কিভাবে? ফেসবুকের সব পোস্টই কি যাচাই করা হবে। কোন পোস্টে মিথ্যার উপস্থিতি পাওয়া গেলে কী করা হবে?

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের রিপোর্ট এবং পোস্টের কমেন্টের ভিত্তিতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কিছু পোস্ট বাছাই করে পাঠাবে ফুল ফ্যাক্টের কাছে। ফুল ফ্যাক্ট আবার এসব পোস্টের মধ্যে কিছু পোস্ট বেছে নেবে তথ্য যাচাইয়ের জন্য। কোন পোস্টগুলো ফুল ফ্যাক্ট বেছে নেবে, সে ব্যাপারে ফুল ফ্যাক্টকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

গুজব ফেসবুক নিয়ন আলোয় neonaloy

ফুল ফ্যাক্টের মুখপত্র কেটি ব্যাম্বার

 

ফুল ফ্যাক্ট কর্তৃপক্ষের মতে, পোস্টগুলো ফুল ফ্যাক্ট সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বেছে নেবে, তা নির্ধারণ করা হবে কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যাপারে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। যে পোস্টগুলো মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরুপ, সেগুলোকে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রাধান্য দেয়া হবে। ফুল ফ্যাক্ট চাইলে ফেসবুক প্রদত্ত তালিকার বাইরেও পোস্ট যাচাই করতে পারে। সত্যতা যাচাই ধাপটি সম্পন্ন করার জন্য ফুল ফ্যাক্টের দলগুলি ছাড়াও তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে ফেসবুক।

ফুল ফ্যাক্টের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান কেটি ব্যাম্বার জানিয়েছেন, ফুল ফ্যাক্টকে “সম্ভাব্য মিথ্যা” তথ্যের একটি তালিকা সরবরাহ করবে ফেসবুক। তারপর কন্টেন্টগুলোতে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হবে- সত্য, মিথ্যা এবং সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ।

মিথ্যা বা অর্ধসত্য পোস্টগুলোর সাথে কী করা হবে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের বার্তা অনুযায়ী, পোস্টগুলোকে মুছে দেয়া হবে না। তবে ফেসবুকের এলগরিদম অনুযায়ী পোস্টগুলো নামিয়ে দেয়া হবে সবার নিচে, অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা দেখতে পাবেন সবার পরে। এর ফলে এমনিতেই পোস্টগুলোর ভিউ কমে যাবে। ফলে ভুয়া তথ্য মানুষের মধ্যে জোরালো প্রভাব ফেলতে পারবে না।

তবে মজার ব্যাপার হল, “গুজব” রোধ করার ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ব্যাপারে অতীতে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল, তুলেছিল ফেসবুকের সাথে কাজ করা খোদ ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোই। তাদের অভিযোগ, ফেসবুক কখনই ভুয়া তথ্যের পরিমাণ, সংশোধন ইত্যাদি সম্পর্কে কোন রিপোর্ট প্রকাশ করেনি, যা তাদের উদ্যোগের ফলাফল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে। তবে ফুল ফ্যাক্ট তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।

সময়ের সাথে এই কার্যক্রম আরও কার্যকারিতার সাথে ছড়িয়ে পরবে বলে আশা করা যায়। এর মাধ্যমে আমরাও চিন্তা-ভাবনা ও মতামত প্রকাশের জন্য একটি সুস্থ প্লাটফর্ম পাব, অবাধ তথ্য আদান প্রদানের আজকের এই যুগে এই নিশ্চয়তা শুধু সময়ের দাবি ই নয়, প্রয়োজন ও বটে!

তথ্যসূত্রঃ

১। https://universe.byu.edu/2018/12/26/fake-news-influence-spreads-quickly-on-social-media/

২। https://www.todayheadings.com/tech/facebook-closed-the-myanmar-army-chief-account-involved-in-the-genocide-of-muslims/

৩। https://fullfact.org/toolkit/

Most Popular

To Top