বিশেষ

আমৃত্যু যুদ্ধ করে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল…

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল নিয়ন আলোয় neonaloy

বাংলাদেশে সঙ্গীত জগতে কয়েকজন চতুর্মুখী সঙ্গীতব্যক্তিত্বের নাম বলতে গেলে সবার শুরুর দিকেই যাদের নাম চলে আসবে তাদের মধ্যে একজন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গীতজগতের একজন জাদুকরও বলা চলে। তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার। দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ এসবকিছুর এক অসম্ভব সুন্দর মেলবন্ধন ছিল তার লেখা গানগুলোতে। আসলে এগুলোই ছিল আমাদের তখনকার সময়ের জীবন থেকে নেওয়া সব গান, নতুন দিনের সূচনার এবং ভালো দিনের প্রত্যাশার গান। এরকম শত শত গানের কথার-সুরের জাদুকর এক কিংবদন্তীর নাম আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০ দশকের শেষলগ্ন থেকে ২০১০ এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসহ সঙ্গীতের সাথে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৮ সালে “মেঘ বিজলী বাদল” ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। এরপর তার ঝুলিতে জমা হয় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার সম্মান। শুধু তা-ই নয়, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন বুলবুল। সৈয়দ আব্দুল হাদী, অ্যান্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, খালিদ হাসান মিলু, কনক চাঁপা সহ সে সময়কার প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পীদের মাঝে এমন কেউ নেই, যিনি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সাথে কাজ করেননি।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবলের সঙ্গীত পরিচালনায় কিছু উল্লেখযোগ্য বাংলা চলচ্চিত্রঃ

  • নয়নের আলো
  • মরনের পরে
  • মায়ের অধিকার
  • চাওয়া থেকে পাওয়া
  • বিয়ের ফুল
  • তেজী
  • আম্মাজান
  • মুক্তি চাই
  • প্রেমের তাজমহল
  • মায়ের সম্মান
  • কষ্ট
  • রাঙ্গা বউ
  • পড়েনা চোখের পলক
  • দেশপ্রেমিক (বিখ্যাত সুরকার আজাদ রহমানের সাথে যৌথ)

তার নিজের রচিত অনেক গানের মধ্যে অনেক বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গানও ছিল। অনেক জনপ্রিয় একটি গান “ও মাঝি নাও ছাইড়া দে, ও মাঝি পাল উড়ায়া দে” সাবিনা ইয়াসমিনের কন্ঠে গাওয়া এবং আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের রচিত। এছাড়াও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া এবং বুলবুলের রচিত আরো অনেক দেশাত্নবোধক গান রয়েছে। “সব কটা জানালা খুলে দাও না”, “সেই রেল লাইনের ধারে”, “ও আমার আট কোটি ফুল দেখ ” উল্লেখ যোগ্য এরকম আরো অনেক দেশাত্নবোধক গানের রচয়িতা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

দেশাত্মবোধক গানগুলো ছাড়াও জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে “আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন”, ”আমি তোমারি প্রেম ভিখারী”, ”আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে”, “তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়”, “আম্মাজান, আম্মাজান” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল নিয়ন আলোয় neonaloy

তবে সঙ্গীতাঙ্গনের এই পরিচয়টিই কি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সবচেয়ে বড় পরিচয়? খুব সম্ভবত না। তাঁর সবচাইতে গর্বের পরিচয়- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বুলবুল পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যার পরিচয় পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়া যায় যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লেখা তাঁর গানগুলোতে।

মুক্তিকামী জনতার সশস্ত্র সংগ্রামে বিজয় এসেছে সেই ১৯৭১-এই। কিন্তু ব্যক্তি বুলবুলের যুদ্ধটা চলেছে মৃত্যুর আগমুহুর্ত পর্যন্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সাক্ষী দিয়েছিলেন বুলবুল। এর প্রতিশোধে তাঁর ছোট ভাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। স্বাধীন দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পুলিশ প্রহরায় থাকতে হয়েছে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। তিনি নিজেই তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন…

“২০১২ তে আমাকে যুদ্ধ অপরাধীর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সাক্ষী হিসাবে দাঁড়াতে হয়েছিল। সাহসিকতার সাথে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭১ এ ঘটে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলখানার গণহত্যার সম্পুর্ন ইতিহাস। আর, ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ৫ জনের মধ্যে আমিও একজন। হত্যা করা হয়েছিল একসাথে ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে।

কিন্তু, এই সাক্ষীর কারণে আমার নিরপরাধ ছোটো ভাই “মিরাজ” হত্যা হয়ে যাবে এ আমি কখনওই বিশ্বাস করতে পারিনি। সরকারের কাছে বিচার চেয়েছি, বিচার পাইনি।
আমি এখন ২৪ ঘন্টা পুলিশ পাহারায় গৃহবন্দী থাকি, একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। এ এক অভূতপূর্ব করুণ অধ্যায়।

একটি ঘরে ৬ বছর গৃহবন্দি থাকতে থাকতে আমি আজ উল্লেখযোগ্য ভাবে অসুস্থ।”

প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। এবং পেয়েছেন অনেক সম্মাননা এবং লাখো মানুষের ভালোবাসা। তিনি পেয়েছেন দুইবার চলচ্চিত্র পুরষ্কার, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, রাষ্ট্রপতি সম্মাননা সহ অসংখ্য পুরস্কার। মানুষের হৃদয়ের আরো গভীরে স্থান করে নিয়েছেন “ক্লোজআপ ওয়ান তোমকেই খুজছে বাংলাদেশ” রিয়্যালিটি শো’র সাবলীল বিচারক হিসাবে, নিজস্ব স্বকীয়তা দিয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গত বছরের মাঝামাঝি বুলবুলের হার্টে আটটি ব্লক ধরা পড়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা এই শিল্পীর শারিরীক অবস্থার কথা জেনে তাঁর চিকিতসার দায়িত্ব নেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুলবুলকে ভর্তি করানো হয় হৃদরোগে ইন্সটিটিউটে। শারিরীক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হার্টে রিং পরানোর ফলে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন বুলবুল। এরপর থেকেই ডাক্তারের পরামর্শে গান গাওয়া কিছুটা কমিয়ে বিশ্রামে থাকতেন। খুব কমই তাঁকে দেখা যেত গণমাধ্যমে। তারপর আজ ২২ জানুয়ারি একেবারেই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন এই মহান কিঙ্গবদন্তী। নিজ বাসায় ঢাকার বাড্ডার আফতাবনগরে ভোর ৪ টার দিকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বুলবুল।

মৃত্যুর আগে ২ জানুয়ারি সকালে ইমতিয়াজ বুলবুল নিজের ফেসবুক একাউন্টে বাংলাদেশের পতাকার সাথে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন,

“আমাকে যেন ভুলে না যাও…তাই এই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম”

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল কে চাইলেও এই বাংলাদেশ কখনোই ভুলতে পারবে না। এই বাংলাদেশের মানুষ, মানুষের স্বাধীনতা, দেশের সম্মান, দেশের সঙ্গীত তাঁর কাছে আজীবন ঋণী ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেলেও তাঁর লাখো ভক্তের হৃদয়ে বুলবুল বেঁচে থাকবেন আজীবন।

Most Popular

To Top