নাগরিক কথা

সন্তানকে মানুষ করছেন ঠিকই, কিন্তু…

সন্তান-অভিভাবক নিয়ন আলোয় neonaloy

মুহিত আহমেদ জামিল
বেশ কয়েকদিন আগে পত্রিকায় একটা গল্প পড়েছিলাম। গল্পটা পুরোপুরি মনে নাই। যেটুকু মনে আছে সেটুকুর সারসংক্ষেপ মোটামুটি এরকম- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম চলছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য এক মা তার ছেলেকে নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে চষে বেড়াচ্ছেন। ছেলের পড়াশোনা, নাওয়াখাওয়া, ঘুম থেকে সে কখন উঠবে, কখন ঘুমোতে যাবে, কোন সময় কোন সাবজেক্ট পড়বে ইত্যাদি প্রায় সকল ব্যাপারেই মা তার ছেলের দেখাশোনা করেন। দেখাশোনাটা মোটেও সাধারণ ধরণের না, সিরিয়াস পর্যায়ের একেবারে। ছেলেটা পুরোপুরি তার মায়ের উপর নির্ভরশীল বলা যায়। ছেলেকে এভাবে মাতৃনির্ভর করার পেছনে ওই ছেলেটার কোন কৃতিত্ব ছিল না; বরঞ্চ সবটুকু কৃতিত্ব তার মায়েরই।

দেখতে দেখতে ডিসেম্বর মাস চলে এলো। কিন্তু ছেলেটার কোথাও চান্স হলো না। মা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। এত কেয়ার করার পরেও ছেলেটার কেন কোথাও চান্স হলো না, দিনরাত এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উনার একজন পরিচিত স্যার আছেন। সম্পর্কে আত্মীয় হোন। ছেলেকে নিয়ে মা এবার সেই স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সব শুনে স্যার পরামর্শ দিলেন- আপনার ছেলেকে একা চলতে দিন। সে যথেষ্ট বড় হয়েছে। দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে সে একা একা ঘুরে বেড়াক, নিজের পড়াশোনা সে নিজের মত করে করুক। আপনি শুধু নিয়ন্ত্রণ করবেন। সার্বক্ষণিক গোয়ান্দাগিরি বা প্রভাবিত করার কোন দরকার নাই। জীবনটা ছেলের নিজের, আপনার না। স্যারের মুখে এরকম পরামর্শ শুনে সেই মা মুখ লাল করে ছেলেকে নিয়ে বাসায় চলে আসলেন। স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে বসে রইলেন। শেষ, গল্পটা এতটুকুই।

আমি যে রাস্তা দিয়ে ভার্সিটি যাই, সে রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটা স্কুল, কলেজ আছে। জ্যামের কারণে ভার্সিটি যাওয়ার পথে প্রায়ই সেই স্কুল, কলেজগুলোর সামনে একবার হলেও থামতে হয়। জ্যামে আটকা পড়ে আমি ওই স্কুল, কলেজগুলোর গেটের দিকে মনোযোগী হয়ে তাকাই। স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাদের সংখ্যার চেয়ে তাদের নিয়ে যেতে আসা গার্ডিয়ানদের সংখ্যাটা মোটেও কম না। একেকজন স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। বাচ্চাটাকে দেখা মাত্রই নাম ধরে ডাক দিয়ে বলেন, এই যে আমি এখানে। স্কুলের সেই বাচ্চাটার ভারী ব্যাগ হাতে নিয়ে তাকে মোটর বাইকে বসিয়ে অথবা গাড়িতে করে বাসায় নিয়ে চলে যান।

যাদের নিজস্ব গাড়ি নাই তারা সারাদিন স্কুলের সামনে বসে থাকেন। বাচ্চারা ক্লাসে এবিসিডি শিখে, আর তাদের গার্ডিয়ানরা গেটের সামনে বসে অন্য গার্ডিয়ানদের সঙ্গে গল্প করতে থাকেন। এইটুকু মোটেও অস্বাভাবিক কিছুনা। কারণ- শহরের ভেতর বাচ্চাকাচ্চারা নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারবে না, হুট করে গাড়ির নিচে পড়ে যেতে পারে, কিংবা বাসা না চিনে কোথাও হারিয়ে যেতে পারে। প্রাইমারি স্কুলে থাকতে আমার মা-বাবা আমাকে স্কুলে আনা-নেওয়া না করলেও, এখানে আমি কোন অস্বাভাবিকতা দেখিনা।

আশ্চর্য তো তখন হই, যখন দেখি ক্লাস নাইন, টেনে পড়া বড় একটা স্টুডেন্টকে তার গার্ডিয়ানরা স্কুলে আনা-নেওয়া করছেন! ক্লাস নাইন-টেনে পড়েও যে বাবা-মা তাদের সন্তানদের স্কুলে আনা নেওয়া-করেন, আমি হলফ করে বলতে পারি সেই বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের মাথায় চেপে আছেন। ওই সন্তান কখন কি করবে, না করবে, কোথায় যাবে, না যাবে, পড়াশোনা কতটুকু করবে, না করবে, নাওয়াখাওয়া সবকিছু তার মা-বাবাই নিয়ন্ত্রণ করেন। জীবনটা নির্দিষ্ট ওই সন্তানের হলেও সে তার মা-বাবার ইচ্ছামতই পরিচালিত হয়।

ক্লাস নাইন-টেন অবধি গার্ডিয়ানরা স্কুলে আনা-নেওয়া করার কারণে সেই ছেলেটা অথবা মেয়েটা নিজে নিজে চলাফেরা করতে শেখে না, সিচুয়েশন সামলাতে শেখে না, সিদ্ধান্ত নিতে শেখেনা, এমনকি অনেকে রাস্তাটা পর্যন্ত পার হতে শেখে না। ফলাফল, কলেজ পর্যন্তও মা-বাবাই তার বাইরে চলাফেরার সম্বল!

কলেজে পড়ার সময় আমার সাথে একটা ছেলে পড়ত। ছেলেটা অস্বাভাবিক রকমের শুকনো ছিল। তার মা তাকে কলেজে এনে দিতেন, আবার এসে নিয়েও যেতেন। মাঝেমাঝে ছেলেটা একা এসে কলেজ থেকে ফিরতে দেরি করলে তার মা পাগলপ্রায় হতে হতে কলেজে চলে আসতেন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই ছেলেটার কর্মকান্ড লক্ষ্য করতাম। সারাক্ষণ মোবাইলে মাথা গুজে রাখত। একটার পর একটা গেমস খেলা আর ইউটিউবে খেলা দেখা ছাড়া ক্লাসের বিরতিতে সে আর কিছুই করত না।

স্কুল লাইফ, কলেজ লাইফ শেষ করলাম, এখন ইউনিভার্সিটি লাইফও প্রায় শেষের পথে। আমার মা-বাবা উনাদের নিজেদের ইচ্ছায় কখনো আমাকে নিয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে যাননি বা নিতে আসেননি। সে যাইহোক, আজকাল তো আর এরকম হয়না। নিরাপত্তা, চলফেরার জটিলতা ইত্যাদি কারণে আজকালকার গার্ডিয়ানরা তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়া করেন। আবারো বলছি, বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছুনা। অস্বাভাবিক ওই বড়দের স্কুল, কলেজে আনা-নেওয়া করার ব্যাপারটাই। ক্লাস সেভেন-এইট থেকে সন্তানদের একা একাই চলতে দেওয়া উচিত। সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কি করছে, কি পড়ছে, এসব জিনিস নিয়ে মাথা ঘামান। সমস্যা না কিন্তু এরজন্য সবসময় যে তার সাথে থাকা লাগবে এরকম তো কোন কথা নেই।

পৃথিবীটা মারাত্মক রকমের প্রতিযোগিতামূলক, একিসাথে বেশ খানিকটা জটিলও। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের সাথে বা জটিলতার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য হলেও সন্তানদের একা একা চলাফেরা করতে দেওয়া উচিত। একা একা চলাফেরা করা মানেই যে তাদের ব্যাপারে একেবারেই মাথা ঘামাবেন না, কন্ট্রোল করবেন না, এমনটা মোটেও বলছি না। বলছি- সারাদিন সন্তানকে ঘরে বন্ধী রেখে গেমস খেলার আর সোশাল মিডিয়া ইউজ করে ইউজলেস হওয়ার সুযোগ দেওয়ার চাইতে তাকে এক-আধটু বাইরে যেতে দিন। পৃথিবীটা দেখুক। সমাজ, রাষ্ট্র কিভাবে চলে সেটা বুঝতে শিখুক। তার থেকেও যে বস পাবলিকরা বাইরে পড়ে আছে সেটা জানুক, নিজের মধ্যে ভালো কিছু করার তাড়না জাগুক, জীবন যে কত কঠিন খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সংগ্রাম দেখে দেখে সেটা শিখুক। এই জিনিসগুলো শেখাটা, জানাটা খুব বেশি জরুরি।

চাইলেও আপনি আপনার সন্তানকে আজীবন নিজের ছায়াতলেই আগলে রাখতে পারবেন না। সে একটা না একটা সময়ে নিজের মত করে চলাফেরা করতে চাইবে। এই যে এখন সারাদিন তাকে বাসায় বন্ধী করে রাখেন। স্মার্টফোন আর ল্যাপটপের ফ্যন্টাসি জগত আর বাইরে আপনাদের সাহায্যে নিয়ে চলাফেরা করার জগত দেখিয়ে দেখিয়ে বড় করছেন, ফ্যান্টাসি জগতের সাথে সে যখন বাস্তব জগতের মিল খুঁজে পাবেনা কিংবা চাইলেও আপনারা যখন তাকে সাহায্য করতে পারবেন না, তখন তো সে খুব বিপদে পড়ে যাবে! কারণ- এখন যে সাধারণ সিদ্ধান্তটা তার নিজের নেওয়ার কথা, তার হয়ে আপনিই সেটা নিয়ে নিচ্ছেন। ফলাফল, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটা ঠিকঠাক মত ডেভেলপ হচ্ছে না। সাধারণ একটা বিপদ-আপদও তার হয়ে আপনিই  সামলে ফেলছেন, বলি আপনি যখন থাকবেন না তখন আপনার এই সন্তানটা কিভাবে এর চেয়ে বড় একটা বিপদ সামাল দেবে?

সবচেয়ে বড় কথা হলো- শুধু শুধু থিওরেটিক্যাল নলেজ দিয়ে আজকাল কিছুই করা যায়না। কিছু করতে হলে আপনার সন্তানের থিওরেটিক্যাল নলেজের পাশাপাশি অবশ্যই প্রাকটিক্যাল নলেজও থাকতে হবে। শুধু শুধু পড়াশোনা করলেই যে ইচ্ছেমত সবকিছু হওয়া যাবে এরকমটাও তো না। এ প্লাস, গোল্ডেন এ প্লাসের চেয়ে কম্পিটিটিভ ওয়ার্ল্ডের কাছে স্কিলস, কম্পিটেন্সি, ইন্টেলিজেন্স, ক্রিয়েটিভি এসবই বেশি ম্যাটার করে।

চাকরির বাজার কিংবা রিয়েল ওয়ার্ল্ডের সাথে বইয়ের পাতার হুবুহু মিল নাই। বেশখানিকটা পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য গুলো বুঝাতে হলে আপনাকে আপনার সন্তানকে বাইরে একা একা চলাফেরা করার সুযোগ দিতে হবে, আশপাশের বিভিন্ন ধরণের মানুষের কাছ থেকে শিখতে দিতে হবে। আর এভাবেই আপনি আপনার সন্তানকে যান্ত্রিক একটা রোবট কিংবা ফার্মের মুরগি না বানিয়ে সম্পূর্ণ একজন বিবেক-বুদ্ধি, নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ বানাতে সক্ষম হবেন।

আরো পড়ুন: কিভাবে বাচ্চাকাচ্চা সাইজ করবেন?

লেখক:
Muhit Ahmed Jamil (মুহিত আহমেদ জামিল)
Department of Business Administration (Major in Marketing)
Shahjalal University of Science & Technology, Sylhet.
E-mail : Muhitahmedjamil@gmail.com
www.facebook.com/muhit. ahmedjamil

[এই আর্টিকেলটির কভার ইমেজ “ইচ্ছে” চলচ্চিত্র হতে সংগৃহীত]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top