নাগরিক কথা

ফেসবুকেই চাকরির খোঁজঃ সম্ভাবনা নাকি প্রতারণা?

ফেসবুক জব নিয়ন আলোয় neonaloy

ছোটবেলায় মামা-চাচাদের দেখতাম চাকরির খোঁজে বিভিন্ন পেপারে চোখ রাখতো। সরকারী কিংবা বেসরকারী নানা চাকরির খোঁজই পাওয়া যেত প্রতিদিনের পেপারে। এর পরে এলো শুধুমাত্র চাকরির জন্য আলাদা পেপার। যেই পেপার ভর্তি শুধু থাকতো চাকরির খবর। খবরের কাগজের পাশাপাশি সেই চাকরির পেপারের কাটতিও ছিল বেশ। আগে নিয়মিত ম্যাগাজিন কেনার জন্য প্রায়ই পেপারের দোকানে যাওয়া লাগতো। তখন এসব পেপার দেখতাম। বহুদিন ম্যাগাজিন পড়া ছেড়ে দেওয়ায় আর পেপারের দোকানেও যাওয়া লাগে না আর সেই চাকরির পেপারও দেখা হয় না।

এখনকার সবকিছুই যেন অনলাইন নির্ভর হয়ে গেছে। বন্ধুদের আড্ডাটাও এখন ফেসবুকের চ্যাটেই চলে। শুধু কি আড্ডা? বন্ধুদের কিংবা আত্মীয় স্বজনদের খোজ নেওয়াটাও এখন অনলাইন ভিত্তিক হয়ে গেছে। চাকরিটাও এখন মানুষ LINKEDIN-এ খুঁজে। অনেকেই অনলাইনে কাজও করেন। LINKEDIN এর মতই ফেসবুক গতবছর তাদের প্ল্যাটফর্মে চাকরির খোজার জন্য এবং চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ফেসবুক জব নিয়ন আলোয় neonaloy

ফেসবুকের এক্সপ্লোর ট্যাবে ক্লিক করলেই জবের প্ল্যাটফর্মটি খুজে পাওয়া যাবে। নানা ক্যাটাগরির নানা ধরনের চাকরির বিজ্ঞাপন রয়েছে। যদি আপনি চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে চান তাহলে নিজের ফেসবুক পেজ থেকেই তার বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন কিংবা নিজের আইডি থেকেই তা দিতে পারবেন। বিজ্ঞাপন দেওয়ার সময় সেখানে চাকরির সকল বিবরণ দেওয়া থাকে যেন চাকরিপ্রত্যাশী মানুষদের সেসব চাকরিতে এপ্লাই করতে সুবিধা হয়।

ফেসবুকের চাকরির বিজ্ঞাপনের সুবিধার ফলে সেসব চাকরিতে এপ্লাই করাও এখন সোজা হয়ে গিয়েছে। জব অপশনের বিজ্ঞাপনগুলোতে এপ্লাই করতে চাইলে Apply Now-তে ক্লিক করতে হবে। তখন অটোমেটিকভাবে নিজের পছন্দানুযায়ী চাকরির জন্য সিভি ঐ প্রতিষ্ঠানের কিংবা ঐ ব্যক্তির ম্যাসেঞ্জারে চলে যাবে। এইভাবে এপ্লাই করার ফলে সুবিধা হচ্ছে যে নিজের সিভিটি সরাসরি ম্যাসেঞ্জারে চলে যায় যার কারণে প্রচলিত অন্যান্য পন্থার চেয়ে এই ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সিভিটি নিয়োগকর্তার চোখে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

ফেসবুক জব নিয়ন আলোয় neonaloy

ফেসবুক জব কিরকম কার্যকরী তা জানতে আমরা একটা ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিলাম। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ পর্যন্ত ফেসবুকের জব অপশনের মাধ্যমে ২৫ টা চাকরির বিজ্ঞাপনে পার্টটাইম চাকরির জন্য আবেদন পাঠানো হয়। একই সাথে মেইলের মাধ্যমেই ৪-৫টা পাঠানো হয়। মজার বিষয় এই ২৫টার একটাতেও চাকরির সুযোগ হয়নি।

কিন্তু এমনটা কেন? যদিও বিজ্ঞাপনের অভাব ছিল না, কিন্তু কার্যকরী বিজ্ঞাপনের অভাব অবশ্যই ছিল। চাকরির বিজ্ঞাপনগুলোর প্রধান যেই সমস্যা ছিল তা হচ্ছে অবাস্তব কিছু Requirements কিংবা চাহিদা দেওয়া। এছাড়াও এমন কিছু বিজ্ঞাপন আছে যেখানে শুধু চাকরির নাম আর বেতন দেওয়া। কোন ধরনের যোগ্যতা কিংবা কিছুই দেওয়া নেই। কোন ধরনের যোগ্যতা কিংবা অভিজ্ঞতা ছাড়াও অস্বাভাবিক বেশি বেতন লিখে রাখা কিছু বিজ্ঞাপনও ছিল।

তাও খুঁজে খুঁজে ২৫টা বিজ্ঞাপন বের করা হয় যেগুলোকে দেখে কিছুটা হলেও “আসল” মনে হচ্ছিলো। এই বিজ্ঞাপনগুলো ছিল নানা ধরণের কাজের জন্য মানুষ খুঁজতে- একাডেমিক কনটেন্ট রাইটিং, ফেসবুক পেজের ম্যানেজার, ফ্রিল্যান্স কনটেন্ট রাইটিং, অনলাইন সেলস এক্সিকিউটিভ, আরজে, সোশ্যাল মিডিয়া এম্বাসেডর, মার্কেটিং রিপ্রেজেন্টেটিভ, কাস্টমার কেয়ার রিপ্রেজেন্টিটিভ।

ফেসবুক জব নিয়ন আলোয় neonaloy

যাই হোক, আগে থেকে তৈরী করা সিভি দিয়েই সেগুলোতে এপ্লাই করা হলো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অটো রিপ্লাই আসলো। কিছু জায়গা থেকে বলা হলো ইমেইলে সিভি পাঠাতে, পাঠানোও হল; কিন্তু পরবর্তীতে আর কোন উত্তর আসেনি। কিছু জায়গা থেকে অটো রিপ্লাইয়ের পরে ম্যাসেজ পাঠানো হল। ম্যাসেজে চাকরির কিছু শর্ত দেওয়া ছিল। পেজ ম্যানেজারের পোস্টগুলোর কিছু শর্ত ছিল যেমন নিজের ফেসবুক থেকে নিয়মিত সব পোস্ট শেয়ার দিতে হবে, একই সাথে মানুষদেরকে ইনভাইট করতে হবে পেজের লাইক বাড়ানোর জন্য। পেজ ম্যানেজারের পাশাপাশি পেজের মার্কেটিং কার্যক্রমও করতে হবে। আর সবথেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই কাজের সম্মানী মাত্র শখানেক টাকা।

আরেকটা পেজ ম্যানেজারের জন্য শর্ত দেওয়া হল যে প্রথমে পেজটাকে শেয়ার করতে আর মেম্বার ইনভাইট করতে হবে। সর্বোচ্চ শেয়ার আর ইনভাইটকারীকেই চাকরিটা দেওয়া হবে। প্রায় ৫০টা জায়গায় পেজ শেয়ার আর শখানেক মানুষ ইনভাইট করার পর জানা গেলো প্রতি মাসের সম্মানী ৫০০টাকা, তাও আবার মাসে ৩০ দিন ২৪ ঘন্টাই কাজ করতে হবে।

আরেকটা বেশ ভাল চাকরির বিজ্ঞাপনে দেওয়া ছিল পার্টটাইম চাকরি। কিন্তু এপ্লাই করার পর জানা গেল সপ্তাহে ৫ দিন সকাল ১০- সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত অফিসে গিয়ে কাজ করতে হবে।

একটা জায়গা থেকে ইন্টারভিউয়ের জন্য বলা হলো। ইন্টারভিউ নিবে রাত ১০ টার পরে ম্যাসেঞ্জারে। আর চাকরিটা ছিল ভলান্টিয়ারিং। তবে এই সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায় অন্য আরেকটি ইন্টারভিউ। বেশ ভাল একটা পেজের ইন্টারভিউয়ের জন্য গ্রীণরোডের একটি বাসায় ডাকা হয়। তাও সম্পূর্ণ বাসার ঠিকানা দেওয়া হয়নি। ফোন দেওয়ার পর বলা হয় যে ঐ এলাকায় গেলে তারপর তাদের লোক এসে ইন্টারভিউয়ের জন্য নিয়ে যাবো। বারবার ঠিকানা জানতে চাওয়ার পরেও জানায়নি।

এরকম আজগুবি সব জবপোস্টের সাথে সাথে আরেক ধরণের পোস্ট দেখা যায়। এড ফী দিয়ে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন গ্রুপে কিংবা পেজে ড্রেস কিংবা মেকাপ বিক্রির পোস্ট দিয়ে কমিশনে প্রোডাক্ট সেল করা। ফেসবুক কিছু জব ছিল সেলস এক্সিকিউটিভ কিংবা মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নামে। সেই জবগুলাতে এপ্লাই করার পর তাদের কাজের ধরন জিজ্ঞেস করা হলে তাদের উত্তর ছিল কমিশনের মাধ্যমে মানুষের ইমো, হোয়াটসএপে কিংবা ফেসবুক গ্রুপ পেজগুলাতে পোস্ট করে কমিশনে বিক্রি করা। শুধু শুধু গালভরা নাম দিয়ে এরকম প্রতারণার কি দরকার- সেটা এতগুলো পোস্টে এপ্লাই করে এবং কথাবার্তা বলেও বুঝা সম্ভব হয়নি।

কিছু কিছু জায়গা থেকে চাকরির কিছু শর্ত আসলেও বেশিরভাগ জায়গা থেকে কোন ধরনের রিপ্লাই কিংবা নির্দেশনা আসেনি। বেশিরভাগ বিজ্ঞাপন গুলোকেই দায়সারা গোছে কিংবা আজে বাজে ভাবে দেওয়া।

ফেসবুক জব নিয়ন আলোয় neonaloy

ফেসবুক জবস বাইরের দেশে কতটা জনপ্রিয় কিংবা কতটুকু কার্যকরী তার ব্যাপারে বিস্তারিত কোথাও পাওয়া যায়নি। তবে এটা অবশ্যই বোঝা গেল যে বাঙ্গালীরা হয়ত এর জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ফেসবুকের যে ফিচারটি হতে পারতো নিয়োগকর্তা এবং চাকরিপ্রত্যাশীদের মাঝে সেতুবন্ধনের ভাল একটা প্ল্যাটফর্ম, আমরা নিজেরাই যেনতেন বিজ্ঞাপন কিংবা প্রতারণা করে নষ্ট করছি। এখন হয়ত কিছু মানুষ এতে আগ্রহী হলেও এরা তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে ভবিষ্যতে আর কেউ এদিকে আগ্রহী হবে না।

তবে কেউ যদি ফেসবুক জব অপশন ব্যবহার করে কোন কাজের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তবে তা অবশ্যই জানাবেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top