ফ্লাডলাইট

আদর্শ টি-টুয়েন্টি ম্যাচ উপহার দিলো রংপুর-সিলেট [হাইলাইটস]

এই রকম একটা ম্যাচ দেখার জন্য সময় এবং অর্থ দুটোই ব্যয় করা স্বার্থক! টিভির সামনে বসে হোক আর স্টেডিয়ামে বসেই হোক।

দুই দলই রান বন্যা বইয়ে দিবে, টানটান উত্তেজনা গড়াবে শেষ ওভার পর্যন্ত এটাই তো চাই আমরা!

আগের তিন ম্যাচে চেজ করতে যেয়ে পরাজয়, তার ভেতর দুটি ক্লোজ ম্যাচ, তবুও টসে জিতে মাশরাফির ফিল্ডিং নেয়ার সিদ্ধান্ত একই সাথে অবাক করেছে আবার প্রশংসার দাবিদার!

ডেভিড ওয়ার্নারের শেষ ম্যাচ, এবি ডিভিলিয়ার্সের প্রথম ম্যাচ। ম্যাচের আলো তাই এই দুজনের উপরেই ছিলো শুরুতে। কিন্তু সেই আলোটা নিজের দিকে কেড়ে নিলেন কে? সাব্বির রহমান! ক্রমাগত ব্যর্থতার চাদরে ঢেকে ফেলেছিলেন নিজেকে, আজ সেই চাদর বাতাসে উড়িয়ে দিলেন যেন, ৫১ বলে ৮৫ রানের মারভেলাস ইনিংস, রংপুরের বোলাররা খুব বেশি বাজে বল করেননি, বরং সাব্বির ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। প্রতিটা শট ছিলো দেখার মতো, প্রতিটা ছয় ছিলো পারফেক্ট টাইমিং, প্রোপার আর ক্লিন ক্রিকেটিং শট। প্রতি বিপিএলেই সাব্বিরের এমন একটা ইনিংস থাকে, তবে সেই ইনিংসের আগে-পরে সাব্বির যেন ঘুম দেয়! আশাকরি এবার ব্যতিক্রম হবে।

শেষ ম্যাচে ওয়ার্নার আলো ছড়াতে পারেননি, ২১ বলে ১৯ করলেন। তবে অধিনায়কত্ব, মাঠে উপস্থিতি এবং ফিল্ডিং দিয়ে ওয়ার্নার সবার মন জয় করেছেন। আগের চেয়ে অনেক বিনয়ী হয়েছেন, বিপিএলকে অন্য রং দিয়েছেন ওয়ার্নার। স্পেশালি মাঠে তার কমিটমেন্ট দেখার মতো। শুভ কামনা তার জন্য।

আফিফের সুইট টাইমিং আজকেও উপভোগ করছিলাম তবে দূর্ভাগ্যজনক উপায়ে রান আউট হলেন। শেষ দিকে নিকোলাস পুরানের আরেকটি পারফেক্ট টি-টুয়েন্টি ইনিংস সিলেটের রানটাকে ১৯৪ রানের পাহাড়ে নিয়ে যায়। মাত্র ২৭ বলে ৪৭ পুরানের। ক্যারিবিয়ান এই ব্যাটসম্যানের ফিউচার ব্রাইট। মূলত কিপার হলেও তার ফিল্ডিং অনেক ভালো। মাঠে নিজেকে উজাড় করে দেন। এমনকি সাবস্টিটিউট হিসেবে নামা ফ্লেচারকেও তাই দেখি।

রংপুরের সেরা বোলার ওই বুড়ো এমপি সাহেব, আমাদের প্রিয় ম্যাশ। বলের পেসের ভেরিয়েশন আজকেও ছিলো দেখার মতো। লিটনের হাতে দর্শনীয় এক ছয় খাবার পরের বলেই পেস কমিয়ে বোকা বানালেন ছন্দে থাকা লিটনকেই!

সিলেটে অনেক পাহাড়, সিলেটে যেয়ে পাহাড়ে না চড়লে হয়? রংপুর তাই চড়ে বসলো ১৯৫ রানের পাহাড়ে।

সিলেটের পিচ মিরপুরের মতো না, এখানে ক্যালকুলেশন করে খেললে এই রান তাড়া করা যাবে এটা শুরু থেকেই জানতাম।

শুরুতে যথারীতি গেইল ফ্লপ, গতবারের কথা মাথায় রেখে হয়তো গেইলকে খেলিয়ে যাবে রংপুর, গতবার গ্রুপ পর্বে মাত্র এক ফিফটি করা গেইল কোয়ালিফায়ার আর ফাইনালে সেঞ্চুরি করেছিলেন। তবে বোপারাকে বসানো কঠিন সিদ্ধান্ত, রেগুলার পারফর্ম করেন তিনি।

এলেক্স হেলস, আগের তিন ম্যাচে রান পাননি তবে আজকে রান চেজ করার প্রথম হুংকার তিনিই দিয়েছেন, ২৪ বলে ৩৩ রান করে রংপুরকে রাস্তা দেখান তিনিই। সেই রাস্তা ধরেই হেটেছেন রাইলি রুশো এবং এবি ডিভিলিয়ার্স।

কার্টেসী সিলেটের ফিল্ডিং, কমবেশি পাঁচটা সহজ ক্যাচ পড়েছে। এক রুশোর ক্যাচ পড়েছে তিনবার! উইকেট কিপার জাকের আলি আর নিকোলাস পুরান রুশোর যে ক্যাচ ছেড়েছেন সেটা পাড়ার ক্রিকেটেও পড়বেনা!

জাকের আলিকে সুযোগ করে দেয়াটা সিলেটের মহৎ এক উদ্যোগ, অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জাকির হাসানের কারনে বেশিরভাগ সুযোগ হতোনা জাকেরের, তাই লিটন আর পুরান থাকার পরেও জাকের গ্লাভস হাতে সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু তার কিপিং দেখে শেষমেশ লিটনকেই আবার উইকেটের পেছনে পাঠালেন ওয়ার্নার।

তবে জাকের এতো বাজে কিপার না, তাসকিনের বলে প্রথম ক্যাচ ছাড়ার ওই মানসিক ধাক্কাতেই বাকি সময় খারাপ গিয়েছে তার। অল্প বয়সে এটা হয়।

সিলেটের কিছু সমস্যা আছে বোলিং কম্বিনেশন নিয়ে, সন্দ্বীপ লামিচানে আর তাসকিনের ৮ ওভার ফিক্সড, বাকি ১২ ওভার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্নজনকে দিয়ে করাতে হয়, এমনকি অলক কাপালিকে দিয়েও ৪ ওভার করাতে হয়েছে তাদের। সোহেল তানভীর হয়তো ফিট নন, যেটা শুনলাম আজকে, যার কারনে ইরফানকে নেয়া হয়েছে।

তরুন পেসার মেহেদি হাসান রানা ৪ ওভারে ৫৭ রান দিয়েছেন, ১৯৪ রান চেজ হলে কারো না কারো উপর দিয়ে ঝড় যাবেই! রানাকে ধুয়ে দেয়ার দরকার নাই, আমার কাছে তাকে প্রমিজিং লেগেছে, সময় দিতে হবে তাকে। পেসাররা মার খেলেও তাদের পীঠ চাপড়ে দিতে হয় অনেক সময়।

তাসকিনকে নিয়ে আলাদাভাবে লিখতে হবে, অল্পতে হবেনা, অন্যরকম এক তাসকিনকে দেখছি আমরা, বদলে যাওয়া তাসকিন। আলাদাভাবে লিখবো তাকে নিয়ে পরে।

এক ওভারে রুশো আর ডিভিলিয়ার্সকে ফিরিয়ে ম্যাচে ফিরে এসেছিলো সিলেট। ৩৫ বলে ৬১ রান করে ফিরে যান ম্যাচ সেরা রুশো, আর ২১ বলে ৩৪ রান করে তাসকিনের বলে বোল্ড মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রী, আজকের দিনের প্রধান আকর্ষণ এবিডিভি। তবে রংপুরকে সঠিক পথেই রেখেছিলেন তারা দুজন।

রংপুরের টপ ফোর ফিরে গেলে বাকিটা পুরাই লোকাল সার্ভিস নিতে হবে! ৫৮ রান বাকি ছিলো রংপুরের লোকাল প্লেয়ারদের জন্য।

ধরে নিয়েছিলাম (অনেকেই নিয়েছিলো) রংপুর হয়তো আর পারবেনা, কিন্তু দশে মিলে করি কাজের চমৎকার এক উদাহরণ দিয়েছে রংপুর, মাথা ঠাণ্ডা করে রানরেট নাগালে রেখেছেন মিথুন, নাহিদুল। তাদের ৩৭ রানের জুটিটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট আমার কাছে। স্পেশালি নাহিদুলের ১৯ রানের ইনিংস।

কারন, এরা যখন ব্যাট করেছে তখন সিলেটের মেইন বোলারদের ব্যবহার করার সুযোগ ছিলো ওয়ার্নারের হাতে। তাদের সামলেই ৩৭ রানের জুটি।

আর ওয়ার্নারের বিরাট এক ভুলে ফরহাদ রেজা এবং মাশরাফি শেষ দুই ওভারে পেয়ে গেলেন রানা এবং কাপালিকে! এমন টাইট ম্যাচে ডেথ ওভারে মানে লাস্ট দুই ওভারে সিলেটের মেইন কোন বোলার নেই! অবাক আমি!

ফরহাদ রেজা আগে একদিন তিনটা ডট বল দিয়ে ম্যাচ হারিয়েছিলেন, আজ ৬ বলে ১৮* রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে দূর্দান্ত এক ম্যাচ জেতালেন।

অবশ্যই সিলেটের বড় কিছু ভুল ছিলো, ইনফ্যাক্ট ভুল না করলে কখনো কোন দল হারে না কিন্তু রংপুরকে ক্রেডিট দিতেই হবে।

দারুণ এক রান চেজ করায় রংপুরকে অভিনন্দন!

আদর্শ এক ম্যাচ উপহার দেয়ায় দুই দলকেই অভিনন্দন। সাব্বিরের জন্য সমবেদনা, এতো ভালো খেলেও পরাজিত ড্রেসিংরুমে!

আর সবশেষে বলবো, বিদায় ওয়ার্নার, আবার আসবেন সুযোগ আর সময় মিলে গেলে,

সু-স্বাগতম আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডিভিলিয়ার্স, আশাকরি দুর্দান্ত কিছু দেখবো আপনার কাছ থেকে।

Most Popular

To Top