শিল্প ও সংস্কৃতি

জয় গোস্বামী: কষ্ট আর ভালোবাসা মিলেমিশেই জন্ম নেয় যে কবিতাগুলি

জয় গোস্বামী নিয়ন আলোয় neonaloy

সাহিত্যের যে ধারার মধ্যে মানুষের সর্বপ্রথম পরিচয়, তা হল কবিতা তাই সম্ভবত কবিতার সাথে আমাদের খুব গভীরে একটা অদৃশ্য একটা সূতোর টান রয়ে গেছে, যে টান আমাদের একেবারে ভেতরের বস্তুটাকে নাড়া দেয়, চিন্তাভাবনা উলোটপালট দেয় কিংবা করে দেয় সুস্থির আর সেই কবিতার কারিগর যদি তেমনভাবে সূতো খেলাতে জানেন, তবে আর কথাই নেই, কারিগর, জন-মানুষ আর কবিতা মিলেমিশে একাকার হওয়া মূহূর্তের ব্যাপার মাত্র।

তেমন একজন কারিগর এর কথা বলি।অতল তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে/হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে’’ এত আক্ষেপ করে বলেছিলেন সেই কারিগর, কবিতা পড়তে পড়তে না চেনার আক্ষেপ সমানে পুড়িয়েছে পাঠককেও, কারিগর এতটাই কাছে পৌঁছে গেছেন মানুষের। বলছি জয় গোস্বামীর কথা।

জয় গোস্বামী নিয়ন আলোয় neonaloy

“মেঘবালিকাদের জন্য রুপকথা” পড়েননি, দুই বাংলায় এমন কাব্যপ্রেমী নেই বললেই চলে। তেমনি তার “মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়” কবিতার বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?” মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার সম্পর্কে বলা হয়, ‘কবিতাকে জনারণ্যে মিলিয়েছেন জয় গোস্বামী’

জয় গোস্বামীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর, কলকাতায়। তার পাঁচ বছর বয়সে তার পরিবার চলে যায় রানাঘাটে এবং সেখানেই স্থায়ী নিবাস গড়ে। আট বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। স্কুলমাস্টার মা বড় করে তোলেন দুই সন্তানকে। নানা কারণে একাদশ শ্রেণীতেই তার প্রথাগত শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

১৩-১৪ বছর থেকে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ডাকযোগে তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় তিনটি লিটল ম্যাগাজিনে – “সীমান্তে সাহিত্য”, “পদক্ষেপএবং হোম শিখা ১৯৭৬ সালে দেশ পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে ধীরে ধীরে কবি হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে

কবি জয় গোস্বামীর বই প্রকাশের শুরু দিকের কাহিনী কিছুটা ভিন্ন। ১৯৭৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয়মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি নিজেই বই প্রকাশ করেন। এই সংকলনে ছিল তার লেখা মাত্র আটটি কবিতা। ১৯৭৮ সালে একইভাবে প্রকাশ করেন তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “প্রত্নজীব”। এরপর বিখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষের উদ্যোগে তার সাথে প্রকাশকের যোগাযোগ হয়, ১৯৮১ সালে প্রকাশনা থেকে তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “আলেয়া হ্রদ” প্রকাশিত হয়। এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে চলা।

জয় গোস্বামী নিয়ন আলোয় neonaloy

“আলেয়া হ্রদ এর ইংরেজি সংকলন

জয় গোস্বামীকে জীবনানন্দ-উত্তর পর্বের অন্যতম পাঠকনন্দিত কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। কেবল পাঠকনন্দিত বললে অবিচার করা হবে, তার কবিতায় মানুষের সরল ও অকৃত্তিম কন্ঠ যেভাবে উঠে এসেছে, সাহিত্যিক উৎকর্ষ বজায় রেখে তা তুলে ধরা রীতিমত দুরূহ, এবং দুরূহ বলেই আকর্ষণীয়। “প্রাক্তন” যখন জিজ্ঞানা করেন- “কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়?/কে ডেকে দেয় সকাল সকাল?”, পাঠক অবিরাম মিশে যায় কবিতার সাথে, জিজ্ঞাসা সঞ্চারিত হয় তার মধ্যেও, তারপর “কার গায়ে হাত তোলে এখন/কার গায়ে হাত তোলে এখন?” শুনতে শুনতে হয়ে উঠে জমাট বাঁধা অভিমানের একান্ত অংশীদার। এইখানেই কবির শক্তিমত্তার প্রকাশ, এইখানেই কবি সফল। সরল অভিব্যক্তি, অথচ দুনির্বার আকর্ষণ। কবির এই ঘরোয়া রোমান্টিসিজমের সাথে নিজেকে এক করতে বিন্দুমাত্র দেরী হয় না পাঠকের। অথবা তার কবিতা পড়ে বিমুগ্ধ পাঠকের নিজস্ব পাগলীর সাথে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটানোর চরম আকাঙ্ক্ষা, সে-ও কবি নিদারুণ সক্ষমতার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।

মানুষের জটিল চিন্তাধারা সরল করে তুলে আনতে জুটি নেই কবির। “একটি দুর্বোধ্য কবিতা”য় যেমন তুলে এনেছেন এক সাধারণ গৃহিণীর আক্ষেপ-

সে কবে কলেজবেলা ছিল

ছিল কত সাইকেল-যুবক

তাদের ফিরিয়ে দেওয়া ছিল

সুন্দর ফিরিয়ে-দেওয়াগুলি”!

জয় গোস্বামী ১৯৮৯ সালে “ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা?” কাব্য সংকলনের জন্য আনন্দ পুরষ্কার, ১৯৯৭ সালে “বজ্র বিদ্যুৎ ভর্তি খাতা” সংকলনের জন্য বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, ২০০০ সালে “পাগলী, তোমার সঙ্গে” সংকলনের জন্য সাহিত্য আকাদেমী পুরষ্কার লাভ করেন। বিশেষত, “ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা?” সংকলনের নামটিই মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়, সেই সময়ে কবিতার বই হিসেবে এ ধরনের নাম ছিল অভূতপূর্ব।

সাহিত্য কেবল নন্দনতত্ত্বের ধারক নয়, সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্রও বটে। বস্তুত, যে সাহিত্যিক সময় সচেতন নন, যিনি তার সময়ের অসঙ্গতিকে তুলে আনতে ব্যর্থ তার লেখায়, তিনি সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ নন। কেবল সৌন্দর্যের জন্য শিল্প নয়, জয় গোস্বামী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন শোষণের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে। জয় গোস্বামী কেবল  ভয়াবহ গুজরাট দাঙ্গার প্রতি ধিক্কার জানিয়েছেন তিনি তার কবিতায়, নন্দীগ্রামের গণমানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ভৎসর্না করেছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে। নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেছেন,

“অস্ত্র প্রয়োগের অধিকারী

তুমি আর তোমার ক্যাডার

আমরা শুধু খুন হতে পারি

মুখ বুজে খুন হতে পারি

এই একমাত্র অধিকার

এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “শাসকের প্রতি” সংকলন। নন্দীগ্রামের জমি-বাঁচাও আন্দোলনের ঘটনায় প্রকাশ্য সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে তাকে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে ইস্তফা দিয়ে আসতে হয়েছে।

জয় গোস্বামীর ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে আসি। ১৯৮৪ সালে মারা যান তার মা। একসময় প্রচণ্ড অভাবের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ১৯৯৪ সালে বিয়ে। এক কন্যাসন্তানের জনক। তিনি নিজের জীবনকে সার্থক বলে স্বীকার করেন না, কারণ তার ধারণা তিনি তার কাছের মানুষদের সুখী করতে পারেননি। তিনি বলেন, তিনি যাদের প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তারা তার কবিতা পড়েন না, তাকে কবিতা লিখতে উৎসাহ দেন না। একসময় প্রচণ্ড অভাবের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।

বাংলাদেশের আল মাহমুদ তার অত্যন্ত প্রিয় একজন কবি, তাকে ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত শ্রদ্ধাও করেন। অনুপ্রেরণা নিয়েছেন নির্মলেন্দু গুণের নিকট থেকেও। বাংলাদেশের কবিদের লেখা তিনি নিয়মিত পড়ে থাকেন।

ব্রাত্য রাইসুকে দেয়া জয় গোস্বামীর সাক্ষাৎকার থেকে কবির একটি উক্তি তুলে ধরছি-

“আমি বোকার মত ভালোবেসে ফেলি। সেটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে। তারপর সেখান থেকে বেরুতে আমার কষ্ট হয়।”

এই কষ্ট আর ভালোবাসা মিলেমিশেই হয়তো জন্ম নেয় অসাধারণ কবিতাগুলি!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top