নাগরিক কথা

একজন প্রফেসর মাহবুব আলম, এবং এ প্রজন্মের আশা-দুরাশা

প্রফেসর মাহবুব আলম নিয়ন আলোয় neonaloy

ছোটবেলা থেকেই আমার এই দেশে বড় হওয়া এবং একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া। বর্তমান সময়ে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ঢাকায় বসবাস করে দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ এবং অন্যন্যা মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে সংসার চালানো মোটামুটি ভালোই ব্যয়বহুল একটি কাজ। 
বিশেষ করে দুই সন্তানের একজন যখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, তখন সেটি ঠিক চাট্টিখানি কথা হয় না।

শৈশব থেকেই আমি আমার বাবার ইনকাম করা খুব কাছ থেকে দেখে বড় হয়েছি এবং এটুকু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি যে আমার বাবার ইনকাম একদম বৈধ বা হালাল। 
যেহেতু ছোটবেলা থেকেই বাবাকে খুব কাছ থেকে সব করতে দেখেছি, তাই কখনো কোন ঝামেলা হলে, সেটাও নিজের চোখে দেখেই বড় হয়েছি এবং কিভাবে সেটা প্রতিকার করেছে সেটাও দেখেছি। 
এসব দেখে আমি ছোটবেলাতেই ঠিক করেছি আর যাই হোক, দেশে সেটেল্ড হবো। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গেলেও পড়ালেখা শেষ করে আবার দেশে ফেরত এসে এখানে সারাজীবন কাটাবো এবং দেশের মানুষের জন্য, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য কিছু একটা করতে চেষ্টা করবো।

এই মধ্যবিত্ত পরিবারে একটা বিশাল সমস্যা হচ্ছে বিপদে পড়লে না পারে কারো থেকে চাইতে, না পারে সইতে। এসব থেকেই আসলে এরকম মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কিছু করার ইচ্ছে জাগে। 
আরেকটি কারণ হচ্ছে আমার একটা ভাল কিংবা বদভ্যাস হচ্ছে আমি মোটামুটিভাবে রাস্তাঘাটে যে কারো সাথে ভাব জমিয়ে ফেলতে পারি। হোক সে কোন রিক্সাওয়ালা বা কোন চা-ওয়ালা। 
আমার এলাকায় বাসার আশেপাশের মুদির দোকানদার, ফার্মাসীর দোকানদারদার সহ বেশ কিছু দোকানদার থেকে শুরু করে মুচি, নাপিত, টং এর চা-বিক্রেতা সহ বেশকিছু নানা শ্রেনীর মানুষের সাথে বেশ ভালো খাতির আছে আমার। তাদের কাছে গেলে কেমন আছি না আছি এসব ভাব বিনিময় করাটা সবসময় প্রথম প্রায়োরিটিটা পায় আমাদের দুই পক্ষেই এবং তারপর আসে দরকারের কথাটা। তাই কখনো বেশি সময় দাঁড়িয়ে/বসে থাকা লাগে না ওনাদের কাছে গেলে। 
শুধু এলাকা না, স্কুল/কলেজ/ভার্সিটি যখন যেখানে গিয়েছি সেখানের এবং সেখানের মানুষজনের সাথেও মিশে গেছি।

ব্র‍্যাকের বটতলাতে “দুলাল মামা” নামক একজন চা-বিক্রেতা আছেন যার সাথে আমার বেশ ভাব সেই প্রথম সেমিস্টার থেকেই। দুলাল ভাইয়ের টং-এ আমার বইখাতা, ব্যাগ থেকে শুরু করে অনেকসময় নিজের ফোন, ল্যাপটপ মানিব্যাগ এবং সাইকেলও তার চাবি-হেলমেট সবসহ রেখে চলে গিয়েছি বিভিন্ন জায়গায় বহুবার। ঝামেলায় পড়লে দুই-তিনশো টাকা ধার নিয়েছি, পরে আবার শোধও করে দিয়েছি। এমন খাতির উনার সাথে। যেটা রেখে গিয়েছি, খুবই যত্নের সাথে তিনি রেখেছেন সেসব এবং সেভাবেই আবার ফেরত দিয়েছেন। আমার এসব কাজের সব সাক্ষী হচ্ছে ব্র‍্যাকের ভার্সিটি লাইফের সবচেয়ে কাছের বন্ধু পলাশ।

ছবিঃ- বটতলা

যাই হোক, যেহেতু এই মানুষগুলোর সাথে খুব ভালো ভাব জমিয়ে ফেলতে পারি, এরা সহজেই নিজের থেকেই মাঝে মাঝে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা আমার সাথে শেয়ার করে। মাঝে মাঝে খুবই খারাপ লাগে কারো কারো কিছু ঘটনা শুনলে, যতোটুকু পারি নিজের জায়গার থেকে সাহায্য করি। হোক তা আর্থিক বা মানসিক বা যেকোনভাবে। 
এসব মানুষের দু:খ-কষ্ট-সুখও খুব কাছ থেকে দেখে দেখে বড় হয়েছি। এটাই ছিল অন্যতম কারণ এই দেশে থেকে দেশের মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে পোষন করার ছোটবেলার থেকে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি, জীবনের কোন একসময়ে বলিউডের স্বদেশ সিনেমাটি দেখা আমার। সিনেমাটি দেখার পরে আমি অবাক যে ঠিক আমার চিন্তাধারাইটিই কি সুন্দর করে ফুটিয়ে তুললো! আমি নিজেও এমনটাই করতে চাই। নিজের জায়গার থেকে হলেও নিজের মেধা এবং সামর্থ্য দিয়ে হলেও দেশের এবং দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই৷ হোক তা তৃণমূল পর্যায়ের কিছু।

খুব খারাপ লাগে যখন দেখি দেশের নামী-দামী সব প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে জনগনের টাকায় পড়ালেখা শেষ করে কেউ বিদেশে গিয়ে সেখানে নিজের মেধা বিনিয়োগ করে সেখানেই স্থায়ী হয়। দেশের দিকে ফিরেও তাকায় না। অথচ জনগনের দেওয়া কর থেকেই সরকার নিয়ে সেই মেধাবীকে গড়ে তোলে।

আমি জানি অনেকেই বলবে এই দেশের জন্য কেও চাইলেও কিছু করতে পারবে না, সেই অবস্থাটা এখানে নেই। যারা এসব বলে, তাদের ঠিক আমি দোষারোপও করবো না কারন আমার নিজেরই সেটা মনে হয়েছে দেশের সম্প্রতি কিছু ঘটনা দেখে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে সবাই যদি এভাবে চলে যায় তাইলে দেশে সাধারন কৃষক, জেলে, মুচি, বা দুলাল ভাইয়ের মতো ভালো যেসব মানুষ আটকে যাচ্ছে, তাদের কি হবে? তাদের কে দেখবে?
 অনেকটা তাদেরই টাকা/ শ্রমের উপর খেয়ে-দেয়ে বড় হয়ে তাদেরই পেটে লাত্থি কিভাবে মারি আমি, আমরা?

এমন কি ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের সময়ও এই শ্রেণীর মানুষই বেশি গিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে। যারা শহীদ হয়েছেন বা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে ফেরত এসেছেন, খোজ নিলে দেখবেন এদের মধ্য ছাত্র, শিক্ষক, বিভিন্ন শ্রেণীর চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকলেও সিংহভাগই মানুষই কৃষক, কামার, কুমোর, মুচি ,জেলে সহ একদম সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ছিলো।

আমার ব্র‍্যাকের একজন শিক্ষক আছেন, নাম “মাহবুব আলম মজুমদার”। আমি উনার কাছে CSE230 বা “Discrete Mathematics” কোর্সটা করেছিলাম এবং নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয় এবং খুব গর্ব হয় যে আমি এমন একটা মানুষের ক্লাস এটেন্ড করতে পেরেছি এবং তার সরাসরি ছাত্র হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে পারি।

আমার জীবনে দেখা বর্তমান সময়ের অন্যতম মেধাবীদের একজন এবং একজন বুদ্ধিজীবী। 
উনি শৈশব থেকেই বড় হয়েছেন আমেরিকায়। এমআইটি থেকে গণিতে বিএসসি, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত অনুষদের ‘ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড থিওরিটিক্যাল ফিজিকস’-এ পিএইচডি করে আর আমেরিকা থাকেননি, চলে আসেন বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশে এসে এই দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নিজের অবস্থান থেকে।

বর্তমানে তিনি ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটিতে সিএসই ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন। 
আমার জানামতে সিএসই’র “Discrete Mathematics” এবং “Machine Learning” কোর্স দুটো তিনি নেন।

প্রফেসর মাহবুব আলম (ছবি: মেহেদি হাসান)

 

বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এর আত্মজীবনী নিয়ে “Stephen Hawking: An Unfettered Mind” নামক যে বইটি আছে, সেখানে স্টিফেন হকিং এর প্রিয় ছাত্রদের নামের তালিকায় আমাদের এই মাহবুব স্যারের নামও আছে।

বাংলাদেশের জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড দলের অবৈতনিক কোচ হিসেবেও তিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করেছেন। 
বাংলাদেশ সম্প্রতি যে স্বর্ণপদক জিতলো আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে, সেই টিমের কোচ হিসেবেও তিনি নিযুক্ত ছিলেন।

এই মানুষটাকে দেখে আমি অবাক হই যে এই যোগ্যতা নিয়ে উনি চাইলেই দুনিয়ার যেকোন জায়গায় যেকোন কিছু করতে পারতেন। সেটা বাদ দিয়ে তিনি এই দেশে এখানে পড়ে আছেন এবং এখানে দেশের জন্য এবং একটি শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য তিনি এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। 
কারণ একটাই, তিনি এই দেশকে অসম্ভব পরিমাণে ভালোবাসেন। 
এছাড়া উনি ক্লাসেও প্রায় দেশের অনেক ভালো জিনিস নিয়েই গল্প করতেন। দেশের মানুষদের সব অর্জন নিয়ে কথা বলতেন মাঝে মাঝে এবং তার অভিব্যাক্তিতেই বোঝা যেত তিনি কতটা খুশি এই ব্যাপারটায়। হোক তা বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট টিমের জয়, বা হোক তা দেশের প্রথম স্যাটেলাইট, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ।

 

“When they are cut, they bleed red and green

 

উপরের এই কথাটা উনার জন্য অক্ষরে অক্ষরে খাটে একদম। উনার এই দেশে থেকে দেশের জন্য কাজ করা দেখে আমার সেই স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে যে এই দেশের ভাল কিছু সম্ভব।

সবাই না হোক, প্রতি বছর দেশে সব ইউনিভার্সিটির/মেডিকেল থেকে যে ক’জন আন্ডারগ্র‍্যাড/এমবিবিএস বের হয়, তারা যে সাব্জেক্টেই পড়ুক না কেন হোক তা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা লোক প্রশাসন, হোক তা মেডিকেল বা একাউন্টিং, মিউজিক কিংবা চারুকলা; তাদের একশো জনও যদি আজ মাহবুব স্যারের মতো এরকম চেতনা রাখে, স্যারের মতো এভাবে দেশকে নি:স্বার্থভাবে ভালোবাসে, দেশের জন্য নিজের জায়গার থেকে শ্রম দেয় তাহলে দেশের চেহারাই আজ বদলে যেতো অনেকটাই ভালোর দিকে।
 এমন আরো বেশকিছু মাহবুব স্যার যদি দেশে জন্ম নিতো, দেশটার অবস্থা আজ যেমন আছে, তেমনটা থাকতো না হয়তো। 
আরো সুন্দর একটা বাংলাদেশ আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারতাম।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top