বাউন্ডুলে

ভেসে ভেসে জোছনাভিযান…

“ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে…”

একটি কথা নয় অনেক কথা শুধোতে আমরা চাঁদগ্রস্ত আঠারো জন বেরিয়ে পড়েছিলাম ভাসতে ভাসতে কুল নাই কিনার নাই এর দেশে। অনেকে শুনে বলেছিলো পাগল নাকি ! ট্রেনে করে ঢাকা থেকে খুলনা যাবে আবার নদীপথে স্টীমারে করে ঢাকায় ফিরবে! এটা কোনো গন্তব্য হলো? গন্তব্যহীন গন্তব্য নির্ধারিত হলো পাগলের সর্দার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নিদের্শনায়, দায়িত্ব পড়লো সেরা পাগল আমি’র ওপর। অপরাধ আমার পিতৃ-মাতৃ ঠিকানা খুলনা। ভাসাভাসি অভিযানের নাম দেয়া হলো জোছনাভিযান। এবার একটু ভিন্নরকম চাই। হাওরে একজায়গায় শুয়ে শুয়ে কেবল জোছনা দেখা নয়, এবার জেলায় জেলায়, বন্দরে বন্দরে নদীতে নদীতে ভেসে ভেসে চাঁদ গিলবো আমরা। শুভম শীঘ্রম।

স্যারের চেয়ে দুই বছরের বয়সে বড় পিএস অষ্ট্রিচ, ব্রিটিশ আমলে ১৯৪৭ সালে তার জন্ম । পিএস অষ্ট্রিচের সহকর্মী আরও ছিলেন গাজী ষ্টিমার , কিইউ, শহীদ বেলায়েত, শহীদ এমদাদুল হক, পিএস টার্ন , মাসহুদ, শেলা ও টার্ন, লেপচা  ষ্টীমার, এরাও সেইসময় থেকে চলাচল করতো। কয়েকটি স্থানে ভীড়তে ভীড়তে এগুতো। ঢাকা থেকে ছেড়ে চাঁদপুর, বরিশাল , ঝালকাঠি,কাউখালী,হুলারহাট, চরখালী, বড় মাছুয়া, সন্যাসী, মোড়লগঞ্জ, মংলা শেষে এসে খুলনা।

ব্রিটিশ আমলে নৌপথে আরামদায়ক, নিরাপদ ও কম খরচে মালামাল বহনসহ যাত্রীদের চলাচলের জন্য চালু করা হয় খুলনা-মংলা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস। সে সময় সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই চলাচল করতো এই পরিবহনটি। ধীরে ধীরে স্টিমার সার্ভিস জনসাধারণের কাছে চলাচলের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে ওঠে। দেশ স্বাধীনের পর মংলা হয়ে রামপাল-ঘষিখালী চ্যানেল চালু হলে এ পথেই চলাচল করতে শুরু করে স্টিমার।ঢাকা থেকে এখন খুলনার পথে চলে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) পরিচালিত জাহাজ । প্রায় শতবর্ষ ধরে জাহাজগুলো সেবা দিয়ে চলছে নিয়মিত। এগুলো বয়সে বেশ প্রবীণ, ব্রিটিশদের তৈরি। এককালে স্টিমারগুলো চলত কয়লার ইঞ্জিনে, এখন চলছে ডিজেলে।

ঢাকা থেকে সন্ধ্যায় নোঙ্গর তুলে এ স্টিমার মধ্যরাতে ডাকাতিয়ার তীরে ব্যস্ত নৌ বন্দর চাঁদপুর ঘাট ছোঁয় সর্বপ্রথম। আরেক ব্যস্ত নৌ বন্দর বরিশালে কিছুটা সময় থেমে আবার ভেঁপু বাজায় নলছিটির উদ্দেশ্যে।এর পরের স্টেশনটি সুগন্ধার তীরে দক্ষিণাঞ্চলের আরেক প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র ঝালকাঠী। ঝালকাঠীর পরেই গাবখান চ্যানেল। অনেকটা খালের মতো ছোট্ট এ চ্যানেলটি পার হতে ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে। এরপরে কাছাকাছি দূরত্বের দুটি স্টেশন কাউখালি ও পিরোজপুরের নৌ-বন্দর হুলারহাট। হুলারহাট ছেড়ে ঘণ্টাখানেক প্যাডেল মারার পরে স্টিমার এসে ঘাট ধরে চড়খালীতে। এরপরে অনেকটা সময় আর তেমন কোনো ঘাট নেই। সর্বশেষ মাছুয়া এবং মোড়েলগঞ্জ।

তো পিএস অষ্ট্রিচেই চেপে ভাসবো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু তার আগে খুলনা পৌঁছতে হবে। রেল গাড়ী ঝমাঝম মিস কেন করবো, সেই স্বাদ নেবার জন্য আমরা রওনা হলাম রেলে চেপে পিএস অষ্ট্রিচের দিকে। খুলনা পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা ৭.৩০টা বেজে গেলো। অস্ট্রিচ খুলনা ঘাট থেকে ছেড়ে যাবে রাত ১.৩০ টায়। এতোটা সময় থাকার বন্দোবস্ত হলো খুলনা সার্কিটহাউসে। সার্কিটহাউসের ফুলেল অর্ভ্যথনায় মুগ্ধ সবাই (খুলনা যাদের দেখা ও অদেখা)তড়িঘড়ি করে শহর ঘুরতে বেরিয়ে পড়লো। খুলনাবাসী রাখির হাতের রান্না বড় চিংড়ি আর খিচুড়ী দিয়ে সবার পেটপুজা শেষে যাত্রা শুরু হলো পিএস অস্ট্রিচে। সাদা রঙের বিশাল পাখনা ছড়িয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে কোন বলাকা। এমন ভাবনা ভুল হবে না প্রথম দর্শনে। একে একে নোঙর দিয়ে ঢুকে গেলাম অস্ট্রিচের পেটে। কেবিন ও সাধারণ রুম নিয়ে আমাদের আবাস ঠিক হলো মিলেমিশে। বিশাল ভ্যাপুঁ দিয়ে দুলে উঠলো বকের শরীর। বুঝতে পারলাম ভৈরবের শরীর দাপিয়ে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ছে অস্ট্রিচ।

পি এস অস্ট্রিচের ডেকে লেখক

অস্ট্রিচের সামনে দিকটায় বিশাল ডেক যেন কোন উঠোন পাতা। কিছুটা বিশ্রাম শেষে রাত আরও গভীর হলে সব চলে এলো সেই উঠোনে। ।উঠোন জুড়ে জোছনার ছড়াছড়ি । একে একে হারমোনিয়াম , মাউথঅর্গান, গিটার , তবলা সবই বাজতে গেলো। এলোপাথারি গান আর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ এর শব্দ সে অন্য দোত্যনা। স্যারের মিষ্টি রসিকতায় একটু একটু পর পর হাসির রোল যেন তানপুরা। জোছনার আলো পানির ওপর যেন চিকচিক ছড়িয়ে দিয়েছে সোনা। রাতের কোল চিড়ে বেরিয়ে পড়ছে ভোর, কোথায় আছি আমরা এখন? জানি না কেবল সামনে সূর্যের থালা নিয়ে প্রাতঃরাশের আহবান। অর্পূব সেই রুপে অপরুপ আমার বাংলার নদীর কোল ঘেঁষা দুপাড়। কোথাও জেলেদের মাছধরা, কোথাও আবার রঙিন পাল তুলে নৌকার সারি, কোথাও আবার নদীর দুপাশজুড়ে সবুজের গালিচা বিছানো বিস্তৃত ধানক্ষেত। কোথাও নদীর পাড়ের বাড়িগুলো ধার ঘেষা বউদের জল নেয়া ,স্নানে আসা, বেলা বাড়ার সাথে সাথে ছোট ছেলেমেয়েদের ঝুপঝাপ টুপটাপ পানিতে লাফিয়ে পড়া দেখতে দেখতে কেবল রবীন্দ্রনাথের বোটে ঘুরে বেড়ানো সময় মনে পড়ে যাচ্ছিল, নিজেকে ভাবতে লেগেছিলাম মহিলা রবীন্দ্রনাথ নাকি! কবিতা লিখতে পারি নি , তবে যেসব নদী কেটে কেটে এগুচ্ছিলাম  তার হিসাব রাখছিলাম কয়েক জন এ যেন নদীর নাম মনে রাখার ব্রত।

আড়িয়ালখাঁর বুক চিরে এ স্টিমারের সকাল হয় ভৈরব,কীর্তনখোলা,আড়িয়ালখাঁ, পদ্মা,মেঘনা,শীতলক্ষ্যা হয়ে বুড়িগঙ্গায় পড়বে গড়পড়তা এমন হিসেব থাকলেও মাঝখানে কত ছোট বড় নদীর ছোঁয়া পেলাম , যাদের নাম আগে কখনও শুনিনি। অদ্ভুত মজার আর মিষ্টি সব নাম তাদের! ভদ্রা, আঠারোবাঁকী, , রূপসা, বলেশ্বর, পশুর,  ইছামতী, সোনাগাঙ্গ, ভাঙরা, কুঙ্গা, মালঞ্চ, সুতাখালী, রাইমঙ্গল, মারজাত, হরিণভাঙা, মহাভাঙা, গলাঙ্গী, হরিপুর, সোনাই, মানস, কয়ারা, আড়-শিবসা, কালিন্দী, মংলা, সোলা, পায়রা, মুহুরী, মোদলা, গানগুবি, কচা, পাকাশিয়া, মৈয়ার গাং, কাবিপাতা, ঝাঁক, শিয়ালীর খাল, নারায়ণখালী, কদমতলি, মানিকদিয়া, চন্দেশ্বর, পানকুশী, বলেশ্বর, বলমার্জার বা মাঞ্জাল, কাগীবাগ, রামপাল,বিষখালি, স্বরূপকাঠী বা সন্ধ্যা, কীর্তনখোলা,মনকুঠা, মুলতানি, বুড়িশ্বর, কালীগঙ্গা, হরিণঘাটা, পাতুয়া, তেঁতুলিয়া, ধলিয়া, নীলাশী, নবগঙ্গা, ভোলা, পাকাশিয়া, চন্দনা বা পাংশা, ইলিশ বা ইলশা, কবাখালি, মধুমতী, মধুখালি, ঘাট হারানো, ডাকাতিয়া, সোনাই, বুড়ী, ঘুঙ্গট, খেরুনদী, বৈজানী,পাগলী,বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, গাজীখাল, বানার, বালু,টঙ্গীখাল, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা হয়ে বুড়িগঙ্গা।

তিনদিন দু’রাত আমরা স্থলে অর্থাৎ মাটিতে পা রাখিনি। জলে ভেসে ভেসে কখনও চাঁদ কখনও সূর্যে মাখামখি করিয়েছি নিজেরদের ভেতর-বাহির। বাড়তি পাওনা ছিলো নদীর বুকে ডেকে বৃষ্টিতে ভেজা।বলা নেই কওয়া নেই তুমুল বর্ষা । মুখিরত বর্ষা সবাইকে অন্য এক পুলকে আপ্লুত করলো একটি ভেজা দুপুর। রঙ বদলের রঙধনু দেখা আর মাথা তুলে তাকিয়ে থাকা শিশুদের (একধরেন জলজ প্রাণী) অভিবাদন আর নদীর মাছ দিয়ে প্রায় প্রতিবেলার আহার,আমার নদীমাতৃক বাংলাদেশে কত অজানা নদীর  ঠিকানা পেলাম তা ভোলার না। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন প্রায় নাব্যতা হারিয়ে আসা নদীগুলোর কাছ থেকে, তবে বর্ষা মৌসুমে গেলেই ভালো। ভাসতে পারেন চাঁদের জোছনায়।

শুনেছি পিএস অস্ট্রিচ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অন্যরা অনেকেই এখনও আছে।  স্টিমারে ভ্রমণ করতে চাইলে আগে থেকেই টিকেটের বন্দোবস্ত করতে হবে।প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য আগাম টিকেট মিলবে (ঢাকা ০২-৯৫৫৯৭৭৯, চাঁদপুর ০৮৪১-৩১৩৫, বরিশাল ০৪৩১-৫৬৪৩৬, খুলনা ০৪১-৭২৫৯৭৮) । বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়াও নির্ধারিত। বর্তমান ভাড়া হলো—ঢাকা থেকে চাঁদপুর প্রথম শ্রেণী ৪২০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী ২৪০ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণী ১০০ টাকা। ঢাকা-বরিশাল প্রথম শ্রেণী ১০৫০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী ৬৩০ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণী ১৭০ টাকা। ঢাকা-ঝালকাঠি প্রথম শ্রেণী ১২৫০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী ৭৬০ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণী ১৯০ টাকা। ঢাকা-হুলারহাট (পিরোজপুর) প্রথম শ্রেণী ১৪২০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী ৮৫৫ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণী ২৩০ টাকা। ঢাকা-মোড়েলগঞ্জ প্রথম শ্রেণী ১৭০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী ১০৫০ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণী ২৮০ টাকা। ঢাকায় বাদামতলীতে স্টিমারঘাট। তৃতীয় শ্রেণীর টিকেট ছাড়াও আসন খালি থাকা সাপেক্ষে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকেটও মিলে সদরঘাটের স্টিমার ছাড়ার স্থানে।অথবা খুলনা থেকেও ফিরে আসতে পারেন ঢাকার পথে। যদিও এটা একটা বেশি বেশি পাগলামি!

লেখকঃ আঁখি সিদ্দীকা

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top