বিশেষ

কেন আরো অনেক বেশি আলোচনার দাবীদার ‘দহন’?

দহন নিয়ন আলোয় neonaloy

আমার মতে গত বছরের সবচেয়ে আলোচনার দাবিদার ছবি ছিল জাজ মাল্টিমিডিয়া‘র ব্যানারে মুক্তি পাওয়া ‘দহন’। সে তুলনায় অনলাইনে বা অফলাইনে ‘দহন’ সম্পর্কে তেমন একটা লেখালেখি হয়নি। অথচ এই সিনেমার থাকা উচিত ছিল আরো অনেক বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব। কেন? একটু ভেঙে বলি ব্যাপারটা।

বাংলাদেশের সিনেমার কালচারটা খুবই বাইনারি ধরণের। এখানে মূলধারার অর্থাৎ বাণিজ্যিক ছবির জগতটা একরকম, বিকল্প ধারারটা আরেকরকম। দুইজগতের মানুষগুলোর পথ খুব কমই মিলিত হয়, দর্শকরাও আলাদা। বাণিজ্যিক ছবি তৈরি হয় একটা ফর্মুলা মেইন্টেইন করে, সেই ফর্মুলাকে একটা বেশ সহজ ফ্লোচার্টেও দেখানো যায়। “নায়ক-নায়িকার এনকাউন্টার>প্রেম>নাচ-গান>ভিলেনের বাগড়া>জমজমাট অ্যাকশন>ভালোবাসার জয় এবং সমাপ্তি।” সেখানে বিকল্পধারার ছবি মানেই তাতে মৌলিক গল্প থাকবে, ছবি ফর্মুলানির্ভর না হয়ে হবে গল্পনির্ভর।

এতে সমস্যা যেটা হয়, চলচ্চিত্রের শিল্পমাধ্যম হিসেবে যে একটি উদ্দেশ্য আছে, সমাজে পরিবর্তনের বীজবপন করা, সে ব্যাপারটা হয় না। আর্টফিল্ম দেখা মানুষগুলো আগে থেকেই আর্টের সমঝদার এবং এ দেশের সমাজের ছোট একটা অংশই বলতে হবে; সুতরাং তাদের কাছে শিল্প পৌছানোর সাথে আসলে সমাজ পরিবর্তনের সম্পর্ক কমই। সেদিক থেকে বানিজ্যিক ছবিগুলোর বিশাল দর্শক, সেখানে মননে আঘাত করার মত কিছু তৈরি হলে আসলেই একটা সার্বজনীন প্রভাব পড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই বাইনারি চরিত্রের কারণে সিনেমা এদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিনোদনের উৎস হয়েই রয়ে গেছে, সামাজিক প্রভাব তেমন ফেলতে পারেনি।

দহন নিয়ন আলোয় neonaloy

এখানেই চলে আসে গতবছরের দহনের নাম। দহন ছবিটি একটি ফর্মুলাভিত্তিক বানিজ্যিক ছবি। রায়হান রাফীর পরিচালনা ও আব্দুল আজিজ এর প্রযোজনায় তৈরী এই ছবিতে মূল চরিত্রে ছিলেন হালের সেনসেশন সিয়াম আহমেদ, আনকোরা নতুন নায়িকা পূজা চেরি এবং ‘দারুচিনি দ্বীপ’ খ্যাত জাকিয়া বারি মম। এখানে নাচ-গান-অ্যাকশন আছে, চিরায়ত “মাস্তান” ঘরানার একটা নায়ক আছে, ফর্মুলার সবকিছুই আছে এখানে। তবুও এ ছবির সামাজিক প্রভাব ফেলবার ক্ষমতা বিস্তর। কারণ ফর্মুলার মধ্য দিয়েই এই ছবিতে একটি মৌলিক গল্প ফুটে উঠেছে। এ গল্প আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, উপলব্ধি করতে ইন্ধন দেয়।

গল্পটা অনেক বিস্তৃত। আপাতদৃষ্টিতে গল্পের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্দশা। রাজনৈতিক সহিংসতার রেশ ধরে একটা বাস পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা কত মানুষের জীবনকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেয় সেটা-ই দেখানো হয়েছে পুরো ছবি জুড়ে। কনসেপ্ট হিসেবে এটাই অনেক সাহসী, প্রশংসনীয়।

কিন্তু এই সাধারণ মানুষের জীবন দেখাতে গিয়ে ডিরেক্টর পুরো বাংলাদেশের একটা ছবি এঁকে ফেলেছেন, যেখানে প্রত্যেকটা জীবন প্রত্যেকটা জীবনের সাথে জড়িত, যেখানে একে অপরের উপর নির্ভর করার মাধ্যমে আমরা বেঁচে থাকি। কোনো ছেলে মাকে বাঁচাতে চায়, কোনো মা তার মেয়েকে খুশি করতে চায়, কোনো ছেলে নিম্নবিত্তের শৃঙ্খলগুলো ভেঙে মাকে সঙ্গে নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, কোনো বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে নিজেই নিজের উপর শৃঙ্খল তৈরি করে কোনো ছেলে। এভাবে আমাদের জীবনে সৌন্দর্যকে আমাদেরই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় দহন।

দহন নিয়ন আলোয় neonaloy

এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরেকটি কদর্য অংশও আমরা দেখি, দেখি সমাজের স্তরে স্তরে যে কলুষতা লুকিয়ে আছে- সেই কদর্যতা। দেখি নারীর প্রতি নিপীড়ন, দেখি মানুষে মানুষে প্রবঞ্চনার উৎসব, দেখি প্রত্যেকের চোখে লোভ। দেখি নিম্নবিত্তের নিগ্রহের জীবন, সেখানকার সংগ্রাম, এই সংগ্রামের মাঝেই বেড়ে উঠে আমাদের নায়ক ‘তুলা’- যার কোনো বাবা-মা-স্থায়ী বসতি নেই, নেই কোনো বংশ পরিচয়। এই তুলা হয়ে উঠে আমাদের সমাজের ভেঙে যাওয়া অংশগুলোর একটা সিম্বল। সে রাজনৈতিক মদদে অর্থের লোভে একের পর এক রাহাজানি কর্মকাণ্ড করে গেলেও তাকে দোষ দিতে পারি না আমরা, তার চোখ তো খুলে দেওয়ার কেউ নেই, সমগ্র সমাজ বরং তার সরলতার সুযোগ নিতে ব্যস্ত। একসময় তুলার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক পরিবারের অনেক মানুষকে হারাতে হয়, তখন আমরা তুলার চোখ খুলে যেতে দেখি, সাথে সাথে আমাদের চোখও খুলে যায়। তুলার চোখ দিয়ে আমরা বুঝতে পারি প্রতিটি সহিংসতার ফল আসলে কতটা বিস্তৃত, কতটা ভয়ংকর।

বিকল্পধারার ছবির দর্শক যারা আছেন তারা এ ছবির মাঝে বাংলাদেশ দেখবে্ন, রাজনীতি দেখবেন, জীবন দেখবেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এ ছবি মূলধারার দর্শকদেরকেও টানতে সক্ষম। সেইসব মনে এই ছবিটি কেমন প্রভাব ফেলতে পারে ভেবে দেখেছেন কী? যাদের গল্প এই ছবিতে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, নিম্নবিত্ত সমাজ, তাদের ভাবনার জগতে নাড়া দেবার ক্ষমতাও কিন্তু এই ছবি রাখে। তুলার মত মানুষেরা আমাদের সমাজে বেশ ভালোভাবেই আছে, তুলার চিন্তার জগত যেভাবে নড়ে গিয়েছিল, সেভাবে যদি দহনের দর্শকসারিতে বসে থাকা তুলাদের ভাবনায়ও একটু অনুরণন হয়, তবে তার প্রভাব কত বিস্তর হতে পারে তা কী ভেবে দেখেছেন?

কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে, দহন দু’টো ধারার মাঝখানে থাকলেও খুব বেশি সফলভাবে তা ছিল না। কোনো এক অদ্ভুত কারণে খুব বেশিদিন সিনেমা হলে থাকেওনি এই ছবি। দেবী ছবিটি এই ছবির অনেক আগে মুক্তি পেয়েও এখনো হলে হলে চলছে। দহন বেশিদিন না টিকে থাকলেও দহনের যে-ই এসেন্স, “সামাজিক প্রভাব ফেলবার ক্ষমতাযুক্ত মূলধারার ছবি” এর রেশ টিকে থাকা উচিত অনেক বেশি। দহনের উচিত সিনেমা জগতের একটি ট্রেন্ডে পরিণত হওয়া, যা এর মত আরো অনেক সামাজিক ছবি তৈরির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। এরকম একের পর মূলধারার বার্তাবাহী সিনেমা যদি আমাদের দেশে নিয়মিত তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব কী হতে পারে সেটা আমাদের কল্পনারও অতীত।

অথচ দহন এখনই দেশের কথোপকথন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যদি ছবিটি সত্যিকার অর্থেই সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যায়, এই ছবিতে কাজ করা সবগুলো মানুষ, যারা তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন ছবিটি তৈরি করতে গিয়ে, সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম তৈরি করতে যাদের একটু একটু করে আতঙ্ককে জয় করতে হয়েছে, গল্পের প্রতিটি অংশকে পর্দায় আনতে গিয়ে যারা একের পর এক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন- তাদের প্রতি অবিচার করা হবে।

দহন নিয়ন আলোয় neonaloy

আবারও বলি, দহন শুধু একটি সাধারণ থ্রিলার গল্প বলে না, বলে না নিছক প্রেমের গল্প, বা রাজনীতির গল্প। সেসব কিছুকে ছাপিয়ে দহন হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের গল্প, যেটা কথা বলে আমাদের কাজগুলোর কারণ ও ফলাফল নিয়ে, আমাদের সম্পর্কগুলোর সৌন্দর্য নিয়ে এবং সিনেমার শেষে এসে আমাদের মানবিক সত্ত্বাকে একটু করে হলেও বের করে আনতে বাধ্য করে। তখন আমরা আমাদের প্রতিদিনের পড়া সংবাদগুলোকে নিয়ে একটু নতুন করে ভাবতে শিখি, হেডলাইনের নিহত-আহতের সংখ্যাগুলো শুধু নিরেট অর্থহীন পরিসংখ্যান না হয়ে আমাদের কাছে ব্যক্তিমানুষ হয়ে উঠে, আমাদের চিন্তার জগতে আমরা একটু অনুরণন অনুভব করি।

এই যে অনুরণন, এর পুনরাবৃত্তি আমাদের দেশে খুব দরকার। ঠিক এ জন্যই বলছিলাম, ‘দহন’ নিয়ে আরো অনেক কথা হওয়া উচিত ছিল!

আরো পড়ুনঃ “পোস্ত”- শুধুই কি একটি সিনেমা?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top