বিশেষ

প্রসঙ্গঃ কিডনী রোগ, ডায়লাইসিস, স্টেমসেল

কিডনী নিয়ন আলোয় neonaloy

গতকাল আমার দীর্ঘ দিনের পুরাতন এক রোগী মারা গেলেন। মৃত মানুষের উপর বিরক্ত হওয়া যায় না। এজন্য তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত আমি তার উপর প্রচন্ড বিরক্ত ছিলাম। শুধু আমি না, তার দুই মেয়েও বিরক্ত ছিলেন। বহু বছর ধরে তার ডায়াবেটিস। চিকিৎসায় অবহেলা করতেন। তারপর সেখান থেকে কিডনী ফেল হল। কিডনী রোগ পাত্তাই দিলেন না। গত মাসে ডায়লাইসিস এর পর্যায়ে চলে গেল বিষয়টা। কিন্তু তিনি ডায়লাইসিস করবেন না। কারণ এগুলো নাকি ভুয়া চিকিৎসা। গতরাতে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তার মৃত্য হল।

তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা শেয়ার করি না, আলোচনা করি না। সব ভূয়া খবর, বাজে খবর শেয়ারে আমরা ওস্তাদ। কিডনী রোগ হওয়া এবং সেটি হলে কি করণীয় সে সম্পর্কে কয়জন ঠিকমত জানে? বিরক্তি নিয়ে তাই দুই কলম লিখতে বসলাম। কারণ কিডনী রোগী এখন প্রায় ঘরে ঘরে। বাঁচাতে হলে জানাতে হবে। একটু পড়েন। প্লিজ।

কিডনী সম্পর্কে জ্ঞান

আপনার শরীরে দুইটা ছাঁকনী আছে, এদেরই নাম কিডনী। এদের বড় কাজ হল ২টি।

  • প্রতিনিয়ত আপনার রক্ত ছেঁকে ছেঁকে পরিষ্কার রাখা। সে রক্তের দূষিত পদার্থ বের করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রক্তে রেখে দেয়।
  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরী করা। অর্থাৎ সে একটা বড় ছাঁকনির কাজ করার সাথে সাথে হরমোন তৈরীর ফ্যাক্টরী হিসেবেও কাজ করে। এই ফ্যাক্টরীতে যেসব হরমোন তৈরী হয়। হরমোনের বড় কাজগুলো হল- রক্ত তৈরী করা, ক্যালসিয়াম সাপ্লাই করা এবং ব্লাড-প্রেশার নিয়ন্ত্রণ করা।

নষ্ট হলে কি হবে?

কাজ যেহেতু বলে দিলাম, এবার আপনারাই ধারণা করেন আপনার কিডনী কাজ কমিয়ে দিলে আপনার কি কি হবে?

  • রক্তে দূষিত পদার্থ জমবে দেখে তার প্রভাব পড়বে। অরুচি হবে, শরীর খারাপ লাগবে।
  • রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদান ছাকনী দিয়ে বের হয়ে যাবে। ফলে প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাবে শরীরে নানা ধরনের প্রভাব পড়বে। যার মাঝে অন্যতম হল প্রোটিনের অভাবে পানি জমে শরীর ফুলে যাওয়া।
  • রক্ত তৈরী হবে না। অর্থাৎ হিমোগ্লোবিন কমে যাবে, রক্তশূন্যতা দেখা দেবে।
  • ক্যালসিয়াম এর ঘাটতি হবে যার ফলে হাড়ের বিভিন্ন রোগ হবে।
  • ব্লাড প্রেশার বাড়বে।

কিডনীতে কি কি রোগ হতে পারে?

কিডনীর হাজারো রোগ আছে। সব রোগ মানেই যে আপনার কিডনী শেষ তা না। কিডনীতে পাথর হয়, সিস্ট, ইনফেকশন, ফোঁড়া টাইপ রোগ, AKI, CKD, ইত্যাদি অনেক কিছুই হয়। এর মাঝে অন্যতম বিপজ্জনক হল CKD নামক পরিস্থিতি। CKD এর লাস্ট স্টেজে রোগী গেলে সেখান থেকে রোগীর কিডনীকে সচল করার আর উপায় নেই।

চিকিৎসা?

খুবই খারাপ খবর হচ্ছে যে CKD হয়ে বা অন্য কিছু হয়ে আমাদের কিডনীর কোষ যদি একবার পুরোপুরি নষ্ট হয়, তবে সেটা আর কোনদিন ঠিক হয় না। নতুন করে কিডনীর কোষও গজায় না। সুতরাং একবার যদি মেশিন নষ্ট হয় তাহলে রিপেয়ারিং এর সুযোগ নেই।

তাহলে চিকিৎসা কি হবে? আমার মনে হয় আপনারাই একটু চিন্তা করলে বলতে পারবেন।

  • ছাঁকনী পুরোপুরি নষ্ট?- বাইরে থেকে রক্ত ফিল্টারের কাজ করে দিতে হবে। (ডায়লাইসিস)
  • হরমোন তৈরী হয় না? – বাইরে থেকে হরমোন দিতে হবে। হরমোন যেসব উপাদান তৈরী করত, সেগুলো দিতে হবে। (আয়রন ট্যাবলেট, ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট, হরমোন ইনজেকশন)
  • শরীরের প্রয়োজনীয় জিনিস বের হয়ে যাচ্ছে? – বাইরে থেকে পুশ করতে হবে। (রক্ত পুশ, প্রোটিন পুশ)। এই হল চিকিৎসা।

বুদ্ধিমান মানুষ এসব চিকিৎসা নিয়ে কিডনী রোগী হয়েও ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আর বোকারা- হারবাল খাবে? নাকি সিঙ্গাপুর যাবে? ডায়লাইসিস করাবে? নাকি কবিরাজ দেখাবে? কোনটা ভূয়া চিকিৎসা? কোনটা আসল চিকিৎসা এসব ভেবে তর্ক-বিতর্ক করতে করতে ফট করে মরে যায়।

কেন নষ্ট হয় কিডনী?

কিডনী নষ্টের কথা উঠলেই লেকচার চলে আসে আমাদের মুখে। খাবারে ভেজাল, মাছে ফর্মালিন, ফলে কার্বাইড থেকে লেকচার শুরু করে এক্কেবারে সরকারকে মা-বাপ তুলে গালি দিয়ে আওয়ামীলীগ-বিএনপি পর্যন্ত চলে যাই।

আরে রাখেন মিয়া। আসল দিকে নজর দেন। আমি মনে করি ঘরে ঘরে সবাই যদি ডায়বেটিস, প্রেশার এবং আরও কিছু ক্রনিক রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে, ৫০ ভাগ কিডনী রোগী কমে যাবে। আগে ওটায় নজর দেন ঘরে ঘরে। পরে আমিলিগ-বিম্পি দেখে নিয়েন।

কিছু পরিচিত শব্দের ব্যাখ্যা…

ডায়ালাইসিস

এই শব্দটা নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক। আশা করি আপনারা এখন বুঝেছেন এটা কি জিনিস। আমি আরেকটু বলি, কিডনী রোগ হলেই ডায়ালাইসিস লাগবে- এমন কোন কথা নেই। যে সব কিডনী রোগীর কিডনী একেবারে সম্পূর্ণরুপে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাদের জন্য বাইরে থেকে রক্ত ছেঁকে দেওয়ার উপায়ের নামই হল ডায়লাইসিস।

ধরুন আপনার কিডনী কোন রোগের কারণে (যেমন AKI) ১-২ মাস কাজ করছে না। সেই কয়েক মাস আপনাকে ডায়লাইসিস সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হল। কিডনী ঠিক হলে আর লাগবে না। আবার ধরুন CKD এর শেষ স্টেজ়ে গিয়ে আপনার কিডনী পুরোপুরি শেষ। তখন তো আর উপায় নেই। বাকি জীবন ডায়লাইসিস করে কাটিয়ে দিতে হবে।

সবচাইতে বিরক্তিকর প্রশ্ন, “ভাই, একবার ডায়লাইসিস শুরু করলে নাকি সারাজীবন করা লাগে?”

এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিব না। উপরের লেখাগুলো বুঝলে আপনারাই জানবেন যে এই প্রশ্নটাই ভূল।

কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট

সব সমস্যার আরেকটা সরাসরি সমাধান হল আরেকজন থেকে একটা কিডনী নিয়ে নিজের ভিতর ফিট করা। এটাও করে ফেলে অনেকে। বহু আগের আবিষ্কার। বাংলাদেশেও হচ্ছে। তবে রাস্তা থেকে ধরে একজনের কিডনী ফিট করলেই হবে না। রক্তের গ্রুপ সহ আরও কিছু পরীক্ষায় ডোনারকে পাশ করতে হবে। তাহলে সম্ভব। পরিবারের মাঝে কেউ দিলে সবচাইতে ভাল ম্যাচ হয়।

নেক্সট জেনারেশন কিডনী চিকিৎসা

স্টেম সেল থেরাপী

ঐ যে উপরে বললাম, কিডনী কোষ একবার নষ্ট হলে আর ঠিক হয় না। তাই যেহেতু ঠিক করা যাবেই না, সেহেতু অন্য কোন শিশু কোষকে ট্রেনিং দিয়ে দিয়ে কিডনী কোষ হিসেবে কাজ করানো গেলে তো একটা সমাধান হয়। হয় না?

বর্তমানে এই টাইপ পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে। এটার নামই স্টেম সেল থেরাপী।

যাদের এই থেরাপী সাকসেসফুল হয়, তারা ধীরে ধীরে আবার ডায়লাইসিস ছাড়া এবং কম ঔষধ খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বাংলাদেশেও হচ্ছে এখন। সাকসেস রেট শুনেছি খারাপ না। যদিও সব বড় বড় স্যারেরা এখনো পুরোপুরি সহমত পোষন করেননি কারন এটার রিসার্চ এখনো কমপ্লিট রিসার্চ না।

কৃত্রিম কিডনী আবিষ্কার

জ্বী, কৃত্রিম কিডনী তৈরী করা সম্ভব হয়েছে। এবং সেটা এ বছর থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে গবেষনা পর্যায়ে আছে। পরীক্ষায় সে যদি পাশ করে সেটা হবে খুশির খবর। কিডনী নষ্ট রোগীরা বাজারে গিয়ে দরদাম করে আর্টিফিশিয়াল কিডনী লাগিয়ে গট গট করে হেঁটে বাড়ি চলে আসতে পারবেন।

আপনারা জানেন কিনা জানি না, প্রথম কৃত্রিম কিডনীর আবিষ্কারক কিন্তু একজন বাংলাদেশী! ড.শুভ রায়।

কৃত্তিম কিডনী নিয়ন আলোয় neonaloy

কৃত্তিম কিডনী হাতে ড.শুভ রায়

জোরে বলেন “জিন্দাবাদ”।  স্যারের বয়স হয়েছে তো কি হয়েছে? এখনও দেখতে আপুদের ক্রাশ খাবার মত। তাই না??

আরও পড়ুনঃ হাজার ওষুধ খেয়েও জীবন বাঁচাতে পারবেন না আর ক’দিন পর!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top