টাকা-কড়ি

যে ৩টি প্রশ্নের উপর গড়ে উঠেছে অ্যামাজন ডটকমের ঈর্ষণীয় সাফল্য

যতই দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তি এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার আমাদের জীবনকে ততই সহজ করে দিচ্ছে, একসময় যে কেনাকাটা ছিল মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে ধৈর্য্যসাপেক্ষ কাজ এখন তা অনেকাংশেই করা যায় অনলাইনেই। যদিও আমাদের দেশে অনলাইন শপিং এখনো খুব বেশি প্রসার পায়নি (পাওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার), বিশ্বব্যাপী এখন অনলাইন শপিং-এর জয়জয়কার।

‘অ্যামাজন’- এর কথাই ধরা যাক, এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কোম্পানি এই টেক-জায়ান্ট। অনলাইন রিটেইলারদের মধ্যে আয়ের দিক এরাই সবচেয়ে এগিয়ে। এই যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কেনাকাটার আইডিয়াটাই বদলে দিয়েছে। কিন্তু একসময় এই প্রতিষ্ঠানটিই ছিল প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের গ্যারেজে শুরু হওয়া ছোট্ট একটি স্টার্ট-আপ। তাই প্রশ্ন আসে, এই সাফল্য আসলে অ্যামাজন কীভাবে অর্জন করলো? কি ছিল তাদের এই বিশ্বজয়ের নেপথ্যে?

অ্যামাজন

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস

এর উত্তর দেয়াটা কঠিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মতে কোম্পানিতে লোক নিয়োগ দেবার সময় তাদের খুবই ব্যতিক্রমী একটি স্ট্রাটেজি ছিল, এটাই তাদের জন্য অনেক বড়সড় পার্থক্য করে দিয়েছে। কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের কাছে ১৯৯৮ সালে অর্থাৎ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মাথায় লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন,

“অসাধারণ কিছু মানুষ না পেলে ইন্টারনেটের মত ক্রমাগত পরিবর্তনশীল একটা পরিবেশে ঠিকঠাক ফলাফল পাওয়া আসলে সম্ভব নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে উঁচু একটি মানদণ্ড মেনে চলাই আমাদের ‘অ্যামাজন.কম’ এর সাফল্যের অন্যতম নেপথ্য, পরবর্তীতেও তাই থাকবে।”

তো সেই উঁচু মানদণ্ড সেট করা নিয়োগ স্ট্রাটেজিটি আসলে কি ছিল? এটি আসলে মাত্র তিনটি প্রশ্ন যা কোম্পানির শুরুর দিকে জেফ বেজোস নিজেকে করতেন যেকোনো নিয়োগের আগে, আর এখন করে থাকেন তাঁর হায়ারিং ম্যানেজারদেরকে। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেয় প্রার্থী আসলে অ্যামাজনে নিয়োগপ্রাপ্ত হবার যোগ্য কীনা। তো চলুন পাঠক জেনে নেই কী সেই তিনটি প্রশ্ন-

১। আপনি কি এই মানুষটির তারিফ করবেন?

এখানে “আপনি” হচ্ছে হায়ারিং ম্যানেজাররা, আর “মানুষটি” বলতে বোঝানো হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীকে। বাকি দু’টো প্রশ্নও এভাবেই সাজানো। তো এখানে দেখা গেল, জেফ বেজোসের প্রথম প্রশ্নটিই ব্যতিক্রমধর্মী।

সাধারণত যেকোনো কোম্পানীতেই চাওয়া হয় যে নতুন কোনো কর্মকর্তা ঢুকলে সে তার সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রশংসা করবে, সম্মান করবে। কিন্তু জেফ বেজোস চেয়েছিলেন উল্টোটা। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর হায়ারিং ম্যানেজাররাই যেন উপযুক্ত প্রার্থীটির প্রশংসা করে, তাকে প্রার্থী হিসেবে সম্মান করে। কারণ জেফের মতামত ছিল, যে মানুষটিকে হায়ারিং ম্যানেজাররাই শ্রদ্ধার চোখে দেখবে, সে মানুষটির থেকে অবশ্যই কোম্পানির অন্যরাও কিছু শিখতে পারবে, অন্যদের জন্য উদাহরণ হবে সেই মানুষটি। প্রথম প্রশ্নটিই আসলে নিয়োগপ্রাপ্তদের মানদণ্ডটা অনেক উপরে তুলে দেয়।

২। এই মানুষটি কি যে দলেই ঢুকবে সেই দলেরই কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিতে সক্ষম?

জেফ বেজোসের মতে, নতুন নিয়োগের মূল লক্ষ্যই হলো কোম্পানিটিকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তিনি জানতেন, একটি কোম্পানি যত বড় হয়, তাদের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসহনশীলতাও তত বাড়তে থাকে। তাই তিনি প্রতিটি নতুন অ্যামাজোনিয়ানকেই কল্পনা করতে চাইতেন “টিম প্লেয়ার” হিসেবে।

কিন্তু বেজোস কীভাবে বুঝতেন একজন ব্যক্তি “টিম প্লেয়ার” কীনা? উপরের প্রশ্নটির মাধ্যমে। একজন ব্যক্তি যদি যে দলেই ঢুকে সে দলেরই কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, অবশ্যই তার থেকে পরবর্তীতে অসহনশীলতার আসার সুযোগ কম, বরং উৎকর্ষতা আসার সম্ভাবনাই বেশি। জেফ বেজোসের মতে, এই মানদণ্ডটি বজায় রাখার মাধ্যমে কোম্পানির গুণগত মান শুধু উপরেই উঠতে থাকবে।

৩। এই মানুষটির কোনদিক থেকে সুপারস্টার হবার ক্ষমতা আছে?

শেষ প্রশ্নটিও বেশ ব্যতিক্রমধর্মী-ই বটে। জেফ মূলত নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট গুণ বা আগ্রহ খুঁজতেন যা কোম্পানির সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সবাই সাধারণত নতুন নিয়োগের সময় সবদিক দিয়ে ভারসাম্য রাখা কাউকে পছন্দ করেন, কিন্তু জেফ বলতেন, শুধু এতটুকুতেই হবে না, নিয়োগপ্রাপ্তের অবশ্যই নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে প্যাশন থাকতে হবে। অবশ্য এটা তার চাকরির সাথে প্রাসঙ্গিক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তিনি শুধু এই দিক দিয়ে বুঝতেন একটি মানুষের লেগে থাকার ক্ষমতা। তিনি এ প্রশ্নটির কথা বলতে গিয়ে উদাহরণ দিয়ে থাকেন তার একজন কর্মকর্তার যে কীনা ন্যাশনাল স্পেলিং বি চ্যাম্পিয়ন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো আপনার জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে? প্রথমত, আপনি যদি নতুন কোনো কোম্পানির প্রধান হয়ে থাকেন, তবে এই প্রশ্নগুলো ব্যবহার করতে পারেন নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে। তবে সেটি হবে খুবই স্থুল প্রয়োগ এবং পাঠকদের মধ্যে খুব কম মানুষেরই সুযোগ আছে তা করার।

কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আপনি করে দেখতে পারেন আপনার নিজের সম্পর্কে, বুঝতে পারেন একজন অ্যামাজন এমপ্লয়ি না হলেও অন্তত যেখানে আপনার কর্মস্থলে সফল হবার যোগ্যতা আসলে আপনার আছে কীনা। তারপর আস্তে আস্তে আপনার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যাতে আরো সুন্দর হয়, সে উদ্দেশ্যে নিজেকে ঝালাই করে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্নটি আপনাকে সাহায্য করবে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, দ্বিতীয় প্রশ্নটি আপনাকে করবে সহনশীল, বুঝদার এবং পরিশ্রমী, তৃতীয়টি খুঁজে দেবে আপনার প্যাশন।

আমাজনের সাফল্যই বলে, প্রশ্নগুলো কার্যকর। তাই নিজেকেই নিজেরে কাছে নিয়োগের যোগ্য করে তুলুন, নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান এই প্রতিযোগিতার দুনিয়ায়।

আরো পড়ুনঃ বিল গেটসের সাফল্যের মূলমন্ত্র

Most Popular

To Top