বিশেষ

কুয়াশার ঘোর কাটাবে এবারের হিম উৎসব

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

“সু আশায় কেটে যাক কু আশার ঘোর”– এই স্লোগানে আগামী ১৭ জানুয়ারী থেকে শুরু হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হিম উৎসব। ৩ দিন ব্যাপী চলা এই হিম উৎসবে র‍্যালী থেকে শুরু করে থাকছে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী লোকজ বাংলা গান, বানরের নাচ, লাঠি খেলা সহ সারাদিন ব্যাপী কনসার্ট।

৭০০ একরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখতে সবচেয়ে সুন্দর কখন? এই প্রশ্নের উত্তর সবাই একবাক্যে দিবে। আর তা হচ্ছে বর্ষায় ও শীতে। সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসের বৃষ্টি দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে। আর শীতে লেক ভর্তি গোলাপী শাপলা আর দূর দেশ থেকে আশা অতিথি পাখি যে কারো মনই ভরিয়ে দিবে। আর এই শীতকে উপলক্ষ্য করেই জাহাঙ্গীরনগরে আয়োজন করা হয় হিম উৎসবের।

সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে সারা বছরই কোন না কোন ধরনের উৎসব চলতে থাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন উৎসব নেই যা অন্য সকল উৎসব থেকে আলাদা, যাকে শুধু মাত্র জাহাঙ্গীরনগরের উৎসব হিসেবে সকলে জানবে। সেই ইচ্ছা আর মনোভাব থেকেই হিম উৎসবের সূচনা। হিম উৎসব কোন নির্দিষ্ট সংগঠন কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নয়। হিম উৎসব জাহাঙ্গীরনগরের সবার। প্রথমবার হিম উৎসবের আয়োজন করা হয় ২০১৬ সালে। আড্ডার ছলেই হিম উৎসবের প্রস্তাবনা শুরু হয়। হিম উৎসবের পেছনে কাজ করছে “পরম্পরায় আমরা” নামের একটি ছোট দল। অন্য কোন সংগঠনের মত তাদের নেই কোন আহবায়ক কিংবা কোষাধ্যক্ষ। “পরম্পরায় আমরা” কোন নির্দিষ্ট ব্যাচ কিংবা দল মেনে গঠিত হয় না। যেকোন বয়সের, যে কোন ব্যাচের যে কোন ছাত্র-ছাত্রীই সেখানে হিম উৎসবের জন্য কাজ করতে পারবে। শুধু মনে থাকতে হবে কাজ করার আগ্রহ।

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

কেন হিম উৎসব অন্য যেকোন উৎসবের চেয়ে আলাদা? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে।

আমাদের গ্রামবাংলার একসময়ের ঐতিহ্য ছিল বিভিন্ন ধরনের পালা গান, গাজীর গান, পটচিত্র, পটের গান, পুতুল নাচ সহ আরো অনেক কিছু। কালের বিবর্তনের আর আধুনিকতার আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে এর অনেক কিছুই। শুধু তাই নয়, আস্তে আস্তে আমরা এসব ভুলতেও বসেছি। সেই ঐতিহ্যকে আবার সকলের কাছে তুলে ধরছে হিম উৎসব। হিম উৎসবে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া নানা ধরনের ঐতিহ্য যা বর্তমানের প্রজন্মের কাছে আমরা তুলে ধরা হয় এই উৎসবের মাধ্যমে।

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

যেকোন অনুষ্ঠান সফলভাবে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে স্পন্সরশীপ এখন অহরহভাবে ব্যবহার হচ্ছে। বরং স্পন্সরশীপ ছাড়া কোন ধরনের প্রোগ্রাম করা এখনো অনেকের কাছে কল্পনাতীত। কিন্তু হিম উৎসব এই বাধা পেরিয়ে এসেছে। ২০১৫ সাল থেকে চলে আসা হিম উৎসবে এখনো পর্যন্ত কোন স্পন্সরের প্রয়োজন পড়েনি। ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই নানাভাবে এই উৎসবের ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন রকমের স্ট্রিট শো করে কিংবা ব্যাজ আর বুকমার্ক বিক্রি করেই হিম উৎসবের ফান্ডিং করা হয়েছে।

শুধু তাই নয় এই হিম উৎসবকে বাস্তবে রূপান্তর করতে শুধু স্টুডেন্টরাই নয় বরং ক্যাম্পাসের প্রতিটি মানুষ সাহায্য করেছে। ক্যাম্পাসের “রিকশাওয়ালা মামা” থেকে শুরু করে ভ্রাম্যমান পণ্য বিক্রি করা মানুষগুলোও। হিম উৎসবকে সফল করতে এগিয়ে এসেছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। সাথে আরো ছিলেন মাননীয় উপাচার্য সহ সকল শিক্ষকরাও।

শুধু গ্রাম বাংলার পুরোনো হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যই একমাত্র আকর্ষণীয় জিনিস নয়। হিম উৎসবের অন্যতম একটি আকর্ষণ হচ্ছে বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডদের নিজস্ব গানের একটি কনসার্ট। কনসার্ট বলতে আমরা সাধারণত বুঝি যে কোন বিখ্যাত ব্যান্ড বা গানের দল এসে পারফর্ম করা; কিন্তু হিম উৎসবের কনসার্ট কিন্তু তা নয়। হিম উৎসবের কনসার্টে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলো এসে জাহাঙ্গীরনগরে পারফর্ম করে যাচ্ছে।

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

২০১৫ সালের যখন প্রথম হিম উৎসব আয়োজন করা হয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মানুষের উপস্থিতি একটু কম ছিল। কিন্তু তবুও বেশ জাঁকজমকের সাথেই পালন করা হয়। ৩ ব্যাপী চলা উৎসবের জন্য ফান্ড সংগ্রহ বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই শুরু হয়। প্রথমবার ৫ রকমের ব্যাজ বিক্রি করে ফান্ডিং তৈরী হয় হিম উৎসবের। র‍্যালী দিয়ে শুরু হওয়া হিম উৎসবের শেষ দিনে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। সারাদেশ থেকে ১৭টি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড সেখানে পারফর্ম করে। এছাড়াও আয়োজন করা হয় ফটোগ্রাফি এক্সিবিশনের। শুধু তাই নয়, ছিল আরো নানা ধরনের আয়োজন। প্রথম হিম উৎসবের কনসার্ট উৎসর্গ করা হয়েছিল মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

“কুয়াশার রঙ মাখি হিমদেশ উঠানে”– স্লোগানের দ্বিতীয় হিম উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল ২০১৭ সালে। দ্বিতীয় কনসার্ট উৎসর্গ করা হয়েছিল প্রয়াত পপ গুরু আজম খানকে উদ্দেশ্য করে। “হিম দেশে উষ্ণ হোক প্রাণ”- এই স্লোগানে তৃতীয় হিম উৎসবের আয়োজন করা হয় ২০১৮ সালে। তৃতীয় হিম উৎসবের কনসার্ট উৎসর্গ করা হয় লাকি আখান্দকে

২০১৯ সালে চতুর্থবারের মত আবার “পরম্পরায় আমরা”-এর হাত ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুত হচ্ছে হিম উৎসবের আয়োজনে। হিম উৎসবের এবারের পোস্টার ও অন্যান্য প্রচারণামূলক আয়োজনে জাহাঙ্গীরনগরের  প্রাণীবৈচিত্র্য উঠে এসেছে। নাগরিকতার ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে তা কমে আসলেও একসময় তো আমাদের অংশ হিসেবেই ছিল।

হিম উৎসব নিয়ন আলোয় neonaloy

অন্যান্যবারের মত এবারো থাকছে ৩ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান। গাজী গান, বানর নাচ, লাঠি খেলাসহ আরো নানা ধরনের আয়োজন থাকছে এইবারের অনুষ্ঠানে। এছাড়াও থাকছে আর্ট ক্যাম্প আর এক্সিবিশন। সারা দেশ থেকে শিল্পীরা এসে রঙ তুলিতে সাজাবে তাদের ক্যানভাস। ফটো এক্সিবিশনে থাকছে নানা ধরনের ছবি। আরো থাকছে গ্রাম বাংলার মেলা। এই বারের কনসার্ট উৎসর্গ করা হয়েছে আইয়ুব বাচ্চুকে।

জাহাঙ্গীরনগরের এই হিম উৎসবে সবার নিমন্ত্রন রইলো। আশা রইলো এই হিম উৎসবের সু আশায় কেটে যাবে আমাদের সকল কু আশার ঘোর, আর আমরা ফিরে পাবো আমাদের তারুণ্যে ভরপুর প্রাঞ্জল দিনগুলো। সেই শুভকামনাই করি।

Most Popular

To Top