লাইফস্টাইল

ঢাকাইয়া গলির প্রাণের উৎসব সাকরাইন

হিম শীতল আবছায়ার কুয়াশা ভরা দিন,আকাশ জুড়ে বর্ণিলসব ঘুড়ি উড়ছে। মনে হচ্ছে যেনো পাখির দল মনের সুখে উড়ছে এদিক-ওদিক। দিনভর্তি সব পিঠাপুলি আর মুখরোচক খাবারের ছড়াছড়ি  আর সন্ধ্যায় আতশবাজি, ফানুস আর শহরজুড়ে আলোকসজ্জিত গানবাজনা; সত্যিই খুব চমৎকার এক আয়োজন।

জ্বী, বলছিলাম পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব সাকরাইনের কথা। এদিনে পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজার, রায়সাহেব বাজার, বংশাল, সূত্রাপুর, বাংলাবাজার, সদরঘাট এলাকার মানুষ সারাদিনব্যাপী ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করেন। জাত-বর্ণ নির্বিশেষে এ এলাকার আপামর জনতা যার অপেক্ষায় থাকে পুরো একটি বছর।

সাধারণত পৌষমাসের শেষ দিনে এই উৎসবটি উদযাপন করা হয়ে থাকে। তাই ইংরেজি পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৪ই জানুয়ারি এ দিনটি পালন করা হয়ে থাকে। পৌষের শেষ এবং মাঘের শুরুর ক্ষণে খাজনা আদায় শেষে নবাবরা ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব করতেন। উৎসবটি মূলত উত্তর ভারতের। মোঘল আমলে বাংলাদেশ সহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খন্ড এবং উড়িষ্যার অর্থাৎ সুবাহ্ বাংলার রাজধানী ছিল এই ঢাকা। সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্তি’ ঢাকাইয়া অপভ্রংশে সাকরাইন রূপ নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরদ্বীপে প্রতি বছরই মকর সংক্রান্তিতে স্নানে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাবেশ হয়। ঢাকায় চলে পূজা ও প্রার্থনা। চলে পিঠে উৎসব ও পিঠে বানিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। সাথে মিষ্টি, লাড্ডু তো আছেই। আরেকপাশে চলে ঘুড়ি উৎসব। ঘুড়িতে করে দেবতার কাছে বার্তা পাঠানো যাবে, ঘুড়ি উৎসবটা এসেছে মূলত এই চিন্তা থেকেই। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভিন্ন নামে এ উৎসব পালন করা হয়ে থাকে।থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান, নেপালে মাঘী ইত্যাদি নামে এ উৎসব পরিচিত।

সাকারাইন উৎসবের প্রস্তুতি চলে অনেক দিন ধরে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাজারীবাগ লেদার টেকনোলজি কলেজ মাঠে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মধ্য পুরান ঢাকা’র প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে ঘুড়ি উড়ানো হয়।

নাটাই কেনা, সুতায় মাঞ্জা দেয়া ইত্যাদি আরো কতো কি প্রস্তুতি। সুতায় মাঞ্জা দেয়া হচ্ছে এ খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ যার মাঞ্জা যত ভালো হবে সে তত বেশি ঘুড়ি কাটতে পারবে। এদিন আকাশে উড়তে দেখা যায় পঙ্খীরাজ, চাপালিশ, চোখদ্বার, মালাদ্বার, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চানদ্বার, ইত্যাদি নামের ঘুড়ি। ঘুড়ির মতো বিভিন্ন নাম আছে নাটাইয়ের। বাটিওয়ালা, মুখবান্ধা, মুখছাড়া কত কত নাম! ‘ঢাউস লেঞ্জা’ বা বড় লেজ এর ঘুড়ির চাহিদা এবং দাম প্রতিবছর ই বেশি থাকে বলে জানান কারিগররা।

শুধু ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগীতাই সাকরাইনের আকর্ষণ নয়। এ দিনে পরিবারের ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই একসাথে উৎসবটি উদ্যাপন করে থাকে।সাকরাইনে শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইকে নতুন ঘুড়ি, নাটাই, পাঞ্জাবি, মাঞ্জা দেয়া সুতো এবং আরো নানা তত্ত্ব পাঠানোর রীতি ছিল বলে জানা যায়, যা কালের আবর্তে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলায় শত শত আতশবাজির ঝলকানি আর ফানুসে আলোকিত হয়ে যায় আকাশ। চলে ফায়ার ব্রিদিং এবং হালের ‘ট্রেন্ড’ অনুযায়ী ‘ডিজে পার্টি’।

ঘুড়ি কাটাকাটির মত এসব আয়োজনেও এলাকাবাসীদের মধ্যে থাকে প্রবল প্রতিদ্বন্দীতা। এ দিনে পিঠা পুলির বেশ আয়োজন চলে। পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে চলে মুড়ির মোয়া, ভেজা বাকরখানি আর পিঠা বানানোর ধুম। খাবার দাবারের আয়োজনের মধ্যে ঢাকাইয়া ঐতিহ্যবাহী খাবার ছাড়াও আলাদাভাবে সুনাম অর্জন করেছে গেন্ডারিয়ার ভেজা বাকরখানি।

যুগ যুগে ধরে চলতে আসা ঐক্য এবং বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে  এই উৎসবকে আগলে ধরে সামনে এগোতে চায় নতুন প্রজন্ম।

পাখির চোখে ২০১৯ এর সাকরাইন

তথ্যসূত্রঃ
১। https://bn.wikipedia.org/wiki
২। https://www.somewhereinblog.net/blog/sayeedahamed/29077294
৩। ভিডিওসূত্রঃ আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ দোলন এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে।
৪। ফিচার ইমেজঃ এম এ আলিম মুকুল এর Flickr প্রোফাইল থেকে।

Most Popular

To Top