বিশেষ

কীভাবে স্টেজ ভীতিকে জয় করবেন?

হাত ঘামছে, বুক কাঁপছে, পেটের মধ্যে যেন কেউ দৌড়ে বেড়াচ্ছে। অথচ কারো কাছে সাহায্য চাইবার কোনো সুযোগ বা ক্ষমতা আপনার নেই। গলাটাকে কেউ জাপটে ধরে রেখেছে যেন, আর যদি সেখান থেকে কোনো সাহায্যের আকুতি বের হয়েই যায় তবে সেটাও আপনার জন্য বিপদজনক। নাহ, কোনো দৈত্যদানো আপনাকে তাড়া করছে না, কোনো সিরিয়াল কিলারের পাল্লায়ও পড়েননি আপনি। আপনাকে শুধু জনসম্মুখে কথা বলতে দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ, এই “পাবলিক স্পিকিং” অনেকের জন্য মৃত্যুস্বরূপ ভয়াবহ। মৃত্যু হলে তো তাও কোনো অনুভূতি থাকে না, কিন্তু মঞ্চে দাঁড়ালে থাকে “স্টেজ ভীতি”- আরো ভয়ংকর বিষয়। পোডিয়ামের পিছনে দাঁড়িয়ে সাবলীলভাবে কিছু বলার ক্ষমতা এখনো আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষেরই নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত বা পেশাদারী জীবনে এসে যখন এই “পাবলিক স্পিকিং” করার প্রয়োজন পড়ে মুহূর্তে মুহূর্তে, তখন যদি এই স্টেজ ভীতির জন্য আমরা ব্যর্থ প্রতিপন্ন হই, নিজেদের ছাড়া আর কাকেই বা দুষব আমরা?

চলুন প্রথমেই আমরা এই স্টেজ ভীতির স্বরূপটা বুঝবার চেষ্টা করি। ছোটবেলা থেকেই পড়ছি, “মানুষ সামাজিক জীব।” এই সামাজিক জীব নামের সাথে সাথে কিছু কিছু সহজাত বৈশিষ্ট্যও প্রকৃতি আমাদের দিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে একটা হলো নিজেদের সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে অনিরাপত্তায় ভোগা। প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেবার আগেই অনেকটা স্বভাবতভাবেই আমাদের ছটফটানি শুরু হয়ে যায়, “মানুষ যদি আমাকে নির্বোধ ভাবে, আমার কথাবার্তা যদি হাস্যকর লাগে তাদের কাছে?” মানুষের কাছে এই নির্বোধ প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়টি আসলে এক ধরণের শারীরিক প্রতিরক্ষার প্রক্রিয়া। এর উৎস মস্তিষ্কের অনেক আদিম একটি অংশে, এর ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণ করাটা অনেকটা অসম্ভবই আমাদের জন্য। এই প্রতিরক্ষা পদ্ধতিটির নাম “ফাইট অর ফ্লাইট রেস্পন্স”।

 

ফাইট অর ফ্লাইট রেস্পন্স

প্রাণিরা যখন তাদের উপর হুমকিস্বরূপ কোনো আক্রমণ আঁচ করতে পারে তখনই তাদের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম থেকে একগাদা হরমোন নিঃসৃত হয়ে যায়, যা প্রাণিটিকে বাধ্য করে পালাতে অথবা লড়াই করতে। এই আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়াটি মোটামুটি বেশিরভাগ প্রাণিদের মধ্যেই দেখা যায়, যাদের সিংহভাগেরই কিন্তু তেমন একটা বক্তব্য পেশ করার প্রয়োজন পড়ে না! এই হুমকি দেখলে ভয় পেয়ে যাবার ব্যাপারটার উপর প্রচুর গবেষণা করেছিলেন চার্লস ডারউইন। লন্ডন চিড়িয়াখানায় সাপের খাঁচায় ঢুকে বুঝতে চেয়েছিলেন তার দেহের প্রতিক্রিয়াকে। এরপর তিনি তার ডায়েরীতে লিখেছিলেন, “সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আমার মাথায় চলা কল্পনার কাছে আমার ইচ্ছা কিংবা যুক্তি ছিল সম্পূর্ণ অসহায়।” তিনি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন তার এই প্রতিক্রিয়াটি আদিম, আধুনিক সভ্যতার উৎকর্ষতা সেখানে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এটা সত্য যে আপনার সচেতন আধুনিক মন অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল করটেক্সের কাছে বক্তব্য শুধুই একটা বক্তব্য। কিন্তু ব্রেইনের বাকি অংশ, যে-ই অংশ জঙ্গলে টিকে থাকতে থাকতে তৈরি, যার যুদ্ধ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে কিংবা পালাতে হয়েছে হিংস্র জন্তুর থাবা থেকে- তার কাছে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেবার ব্যাপারটা অন্যরকম। তার ধারণা আপনার সামাজিক অবস্থান হারিয়ে ফেলাটা আপনার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই যখনই সে আঁচ করতে পারে বক্তব্য দিতে গিয়ে আপনার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, চালু হয়ে যায় আপনার “ফাইট অর ফ্লাইট রেস্পন্স।” আপনার দেহ ভাবে, এখন জীবন বাঁচাতে আপনার পালাতে হবে, কিংবা যুদ্ধ করতে হবে জীবন বাজি রেখে।

হাইপোথ্যালামাস আর পিটুইটারি গ্ল্যান্ড

আপনার হাইপোথ্যালামাস তখন আপনার পিটুইটারি গ্ল্যান্ডকে সিগন্যাল দেয় ‘এ সি টি এইচ’ হরমোন  নিঃসৃত করতে, ফলে এড্রেনালিন গ্ল্যান্ড থেকে রক্তে চলে যায় এড্রেনালিনসহ আরো ৩০ টি আলাদা আলাদা হরমোন। এদের মিলিত কার্যকারীতার ফলে আপনার ঘাড় এবং পিঠ হঠাৎ টানটান হয়ে পড়ে, আপনি জবুথবু হয়ে যান। আপনার হাত এবং পা কেঁপে উঠে আপনার পেশিগুলোকে প্রতিপক্ষ আক্রমণে প্রস্তুত করার জন্য। কিন্তু আপনি ঘামতে শুরু করেন। রক্তচাপ বেড়ে যায় আপনার। যুদ্ধ বা পালাবার জন্য পেশিতে পেশিতে যথেষ্ট অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করার সুবিধার্থে হজম প্রক্রিয়া থেমে যায়, কিন্তু আপনি দাঁড়িয়েই থাকেন। মুখ শুকিয়ে যায় তাই আপনার, পেটে মনে হয় ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। এড্রেনালিন রাশ হলে পিউপিলও ডাইলেটেড হয়ে যায়, সামনে রাখা আপনার বক্তব্যের স্ক্রিপ্টটাও হয়তো ঠিকঠাক পড়তে পারেন না তখন। অথচ সামনে তাকিয়ে সব মানুষকে স্পষ্টই দেখতে পান। হ্যাঁ, এটাই স্টেজ ভীতি। কি ভয়ংকর, তাই না?

এখন এর থেকে পরিত্রাণ আমরা কিভাবে পাবো? প্রথমত, দৃষ্টিভঙ্গি। স্টেজ ভীতি সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলাতে হবে। আমরা ব্যাপারটাকে নিজস্ব দুর্বলতা মনে করি, মনে করি আমার মাথাতেই বোধহয় এত সব ভীতি। ব্যাপারটা কিন্তু তা না, এটা একটা প্রাকৃতিক হরমোনাল প্রক্রিয়া, আমাদের অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম থেকেই এর উৎপত্তি। আবার এই “এংজাইটি”-র তীব্রতাটা মাঝে মাঝে বংশ পরম্পরায়ও পাই আমরা।কিছু মানুষের এই সহজাত ভয়টা প্রাকৃতিকভাবেই একটু বেশি তীব্র।

অ্যাডেল আর লর্ডে (বাম দিক থেকে)- দু’জনেরই আছে স্টেজ ভীতি

জন লেনন, কিংবদন্তী ব্যান্ড বিটলসের গায়ক- হাজারবার স্টেজে পারফর্ম করেছেন এই শিল্পী। বিস্ময়কর হলোও সত্য, প্রতিবারই স্টেজে ওঠার আগে বমি করেছেন তিনি। একই কাহিনী সদ্য বিখ্যাত হওয়া নিউজিল্যান্ডের পপশিল্পী লর্ডেরও। স্টেজে ওঠার আগে তিনি অসুস্থ হয়ে যান। বিলবোর্ডের নিয়মিত টপচার্টে থাকা অ্যাডেলের স্টেজেই প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে বেশ কয়েকবার। জেনিফার লরেন্স রীতিমত প্রেস্ক্রিপশন্ড ড্রাগস নেন সোশ্যাল “এংজাইটি”র জন্য।

যেহেতু স্টেজ ভীতিটা প্রাকৃতিক এবং অনিবার্য, তার উপর তো আর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। যেটার উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে সেটাকেই আমাদের ব্যবহার করতে হবে। মূল বক্তব্যটা যেখানে দিব সেই পরিবেশের মত একটি পরিবেশ তৈরি করে সেখানে অনেক আগে থেকে অনুশীলন শুরু করতে হবে আমাদের । যেকোনো কাজ বেশি অনুশীলন করলেই কাজটি একসময় আমাদের আছে পরিচিত হয়ে যায়, সেই কাজটির প্রতি ভীতিটাও তখন আমাদের চেনা হয়ে যায়- সেটা আর আমাদের ততটা বিচলিত করতে পারে না। তাই পাবলিক স্পিকিং-এর সময়ও আগে থেকে অনুশীলন করে রাখলে, নিজের উপর আত্মবিশ্বাস থাকে বেশি। স্টিভ জবস তাঁর বক্তব্যগুলোর জন্য কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে অনুশীলন শুরু করতেন, ঘন্টার পর ঘন্টার অনুশীলন করতেন তিনি।

আপনি যদি নিজের এবং নিজের বক্তব্য সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা রাখেন, আপনি জনতার উচ্ছ্বাস থেকে উৎসাহ নিতে পারবেন। হাইপোথ্যালামাস তখন আর ভাববে না যে আপনার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, আপনাকে রক্ষা করতে তার কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে এই হাইপোথ্যালামাসের অনুশীলন কিন্তু লক্ষ বছরের, আপনার অনুশীলন আর কয়দিনের? বড়জোর কয়েক সপ্তাহ! তাই স্টেজে উঠবার আগে নিজের মস্তিষ্কের সাথেই একটু চালাকি করে নিতে হবে। হাত-পা একটু স্ট্রেচ করে লম্বা দম নিতে হবে। তখন হাইপোথ্যালামাস নিজ থেকেই দেহকে শিথিল করার সিগন্যাল দিবে। স্টেজভীতিটা সবচেয়ে তীব্রভাবে আঘাত হানে একদম শেষ মুহূর্তে, বক্তব্য শুরু হবার ঠিক আগে। এই শেষ সময়টা শ্বাস নিয়ে হাত-পা প্রসারিত করে একটু শিথিল হবার জন্য ব্যবহার করতে হবে।

যেকোনো বক্তব্য দেবার আগে স্টিভ জবস কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুশীলন করতেন

এই সবকিছুর পর, আপনি জনতার সামনে গেলেন, স্পষ্ট কন্ঠে, শিথিল দেহে, ধীরে ধীরে অনুশীলন করা বক্তব্যটি দিতে থাকলেন। সবাই মুগ্ধ হলো। কিন্তু আপনি কি স্টেজ ভীতি থেকে মুক্ত হয়েছেন? তা কিন্তু নয়। সেই আদিম ভয় কিন্তু আপনার মাঝে এখনো রয়েছে, আপনি শুধু খাপ খাইয়ে নিয়েছেন তার সাথে, যেমনটা করেছিলেন ইতিহাসের বাঘা বাঘা সব বাগ্মীরা।

তথ্যসূত্রঃ

১। টেড-এড
২। উইকিপিডিয়া
৩। রিফাইনারি২৯

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top