ক্ষমতা

“রাজারা কিন্তু চায় না প্রজারা কোনদিন রাজা হোক…”

হিরো আলম neon aloy নিয়ন আলোয়

“রাজারা কিন্তু চায় না প্রজারা কোনদিন রাজা হোক। ওরা চায় প্রজারা প্রজাই থাক।”
– হিরো আলম।

বিনোদন জগত থেকে রাজনীতিতে প্রবেশের উদাহরণ আমাদের দেশে নতুন নয়। আলমগীর, কবরী, মমতাজ, তারানা হালিম থেকে মাশরাফী- অনেকেই যোগ দিয়েছেন রাজনীতিতে। তাদের মানুষ গ্রহণও করেছে এবং করছেন। কিন্তু, বাদ সাধলো হিরো আলমের বেলায়। তার নির্বাচনে দাঁড়ানো নিয়ে তুমুল বাদ-প্রতিবাদ শুরু হল। এটা ঠিক, পরিচ্ছন্ন বিনোদন বলতে যা বোঝায় হিরো আলম তার ধারক ও বাহক নন, তবে প্রশ্নটা যখন জনপ্রতিনিধিত্বের, তখন দুর্নীতিবাজ মাদক ব্যবসায়ী, হত্যা মামলার আসামীদের ছেড়ে হিরো আলমকে ধাওয়া করা হলে, সেটা আমাদেরই মানসিক সংকীর্ণতা কি না সে প্রশ্নটাও কিন্তু আসতে পারে।

হিরো আলম neon aloy নিয়ন আলোয়

হিরো আলম নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন শুনে আমাদের যতই নাক কুঁচকে যাক না কেন, তার রাজনৈতিক বোঝাপড়া নিঃসন্দেহে আমাদের অনেকের চাইতেই বেশি স্বচ্ছ। উপরন্তু, আমরা “অভিজাত” শ্রেণীর মানুষেরা যখন ঘরে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিরো আলমের অনুপযুক্ততা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন তিনি ঠিকই তার নাগরিক অধিকার কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিচ্ছেন, এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নপূরণের পথে। শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নপূরণ না হলেও, রাজনীতি যে কোন বিশেষ শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়, সে ধারণাটি তিনি ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন।

আশরাফুল হোসেন আলম বা হিরো আলমকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। যা অপেক্ষাকৃত নতুন, তা হল হিরো আলমের রাজনীতি সম্পর্কিত ভাবনা।

হিরো আলমের মত একজন ব্যক্তি কেন ভোটে দাঁড়াবে- আমাদের এরুপ আক্রোশের বিপক্ষে হিরো আলমের জবাবটি সোজা-সাপ্টা কিন্তু বার্তাবহ- “ভোটে দাঁড়ানো আমার গণতান্ত্রিক অধিকার।” একটু ভাবুন। নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার যে কেবল কোন তথাকথিত “এলিট” শ্রেণীর নয়, এই সত্যটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন হিরো আলম।

হিরো আলম neon aloy নিয়ন আলোয়

জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও শেষতক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়ান হিরো আলম। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিদ্রুপের শিকার হওয়ার পর এখানেও ঘটে বিপত্তি। প্রথমে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এরপর উচ্চ আদালতে রিট করলে উচ্চ আদালত হিরো আলমের মনোনয়ন গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। ভেবে দেখবেন, নানা অযুহাতে মনোনয়ন অনেকেরই বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু আদালত পর্যন্ত যাওয়ার সৎসাহস কজনের ছিল?

নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু হলে হিরো আলমকে নিয়ে শুরু হয় গুঞ্জন। সরব হয়ে উঠে ফেইসবুক ও মিডিয়া। নির্বাচনের মত একটা পবিত্র অনুষ্ঠানে কেন অংশ নেবেন হিরো আলম? রাজনীতির ব্রাক্ষণ সমাজে শূদ্র হিরো আলমের অনুপ্রবেশের চেষ্টা কেন? সম্ভবত, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রত্যেকের “স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল” ভাবমূর্তির পাশে হিরো আলমকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না কেউই। উন্নত ও মার্জিত আমাদের প্রতিনিধি হতে চাওয়ার স্পর্ধা করেছেন হিরো আলম, এটা মেনে নিতে পারছিলাম না কেউই। একসময় হিরো আলমই আমাদের বাধ্য করলেন তাকে শ্রদ্ধা করতে।

হিরো আলম neon aloy নিয়ন আলোয়

যেখানে ঝানু ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেখানে হিরো আলম নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের অপমান হবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “সংসদ সদস্যরা যদি এত কিছু বোঝে তাহলে দেশের অবস্থা আজ এরকম হল কেন?” টু দ্য পয়েন্ট কথা বলা একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার, আমাদের রাজনীতিবিদেরা এটা হিরো আলমের কাছ থেকে শিখে নিতে পারেন।

সরকারী হর্তাকর্তারা যে মূলত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, তারা যে জনগণের সেবক, এই কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। স্যার স্যার বলতে বলতে অভ্যস্ত আমাদের নাড়া দেন হিরো আলম। ইসি সচিবের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ইসি জনগণের জন্য চাকরী করছেন।

নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে হিরো আলম বলেন, আওয়ামী লীগ এখন স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও ভয় পায়। কখন “অনিয়ম” এর আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়, খুব সরল কিন্তু দৃপ্তভাবেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন হিরো আলম।

আমাদের অনেকেই “আই হেইট পলিটিক্স” বলে একধরনের নাকউঁচু ভাব ধরেন। রাজনীতির মত “নোংরা”, “নীচু” ব্যাপার থেকে দূরে থেকে নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে চান। যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত হয় রাজনীতির মাধ্যমে, সেখানে রাজনীতি থেকে সুচিন্তিতভাবে দূরে থাকা এবং তা নিয়ে গর্ব করা আদৌ বিবেচক ব্যক্তির কাজ নয়। বরং এক্ষেত্রে হিরো আলমই আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন। রাজনীতি যে কোন নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পরিমণ্ডলের ব্যক্তিবিশেষের একচ্ছত্র অধিকার নয়, সকলের যে এখানে অবাধ বিচরণের সুযোগ থাকা উচিৎ, সেটা হিরো আলম ভালোভাবেই অনুধাবন করেছেন।

Most Popular

To Top