নাগরিক কথা

‘এ প্রজন্মকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না… সব নষ্ট হয়ে গেছে…’

‘এ প্রজন্মকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। সব নষ্ট হয়ে গেছে।’ বাবা, চাচা বা মুরব্বিদের মুখে বর্তমান প্রজন্ম সম্পর্কে এমন মন্তব্য অহরহ শোনা যায়। তাছাড়া তরুণ বয়সে তাঁরা কী কী অসাধ্য সাধন করেছেন, একনিষ্ঠতা ও সফলতার ফিরিস্তিও তুলে ধরেন। এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে ছুঁড়ে ফেলেন ডাস্টবিনে।

তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তি আসক্তি নিয়ে ঘোরতর আপত্তি মুরব্বিদের। কিন্তু মুদ্রার দুটি পিঠ উল্টে-পাল্টে দেখতে তাঁরা নারাজ।

বাংলাদেশে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬-এ। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য প্রযুক্তি আমাদের নিকট সহজলভ্য হতে শুরু করে তারও প্রায় বছর দশেক পরে। সুতরাং আমাদের অধিকাংশ মুরব্বিরা তাঁদের তরুণ বয়সে এই বিষয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেননি। বর্তমানেও তাঁরা এর সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। ফলে এই উটকো ঝামেলাতে তাঁরা কিছুটা বিরক্তও।

ষাট, সত্তর বা আশির দশকের তরুণরা যতটুকু জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন, বর্তমান তরুণরা তার চেয়েও বেশি জ্ঞান রাখেন। কারণ জ্ঞানের পরিধি বা ক্ষেত্র এবং জ্ঞানের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ এখন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি। স্বভাবত তুলনামূলক পরিপক্বতায় (ম্যাচুরিটি) বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এগিয়ে। সুতরাং তরুণদের মাঝে কিছু আচরণগত পরিবর্তন (তৎকালীন তরুণদের তুলনায়) আসবে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু গোলটা বাঁধছে এখানেই। আজকের তরুণরা হয়তো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কোনকিছু বোঝাতে চেষ্টা করছে, গোঁড়ামিগুলো দূর করার উপায় খুঁজছে, ট্যাবুগুলো ভাঙতে চাচ্ছে- কিন্তু মুরব্বিরা কখনো কখনো এর মধ্যেই খুঁজে পাচ্ছেন ঔদ্ধত্য, অবাধ্যতা বা বেয়াদবি।

আমাদের অভিজ্ঞ মুরব্বিরা তাঁদের তরুণ বয়সে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদেরকে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে প্রমাণের ক্ষেত্রও বেড়েছে। ফলে তরুণরা তাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছে বিভিন্ন স্তরে। এখানেও সমস্যা। মুরব্বিরা তাঁদের সফলতার ক্ষেত্রগুলোতেই সফল হওয়া বর্তমান তরুণদের বাহবা দিচ্ছেন। বাকিদেরকে গণনাতেই আনছেন না। যেমন, একজন তরুণ ইউটিউবারের সকল কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অপচয়ের দৃষ্টিতে দেখছেন।

তবে বর্তমান তারুণ্য যে শতভাগ সঠিক পথে হাঁটছে এমনও নয়। একটা অংশ প্রযুক্তির অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়েছে। যার ক্ষতিকর প্রভাব বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে।

তাহলে উত্তরণের পথ কোথায়? প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। একটা বড় ধরণের বিপ্লব ঘটানোর জন্য দরকার মানবিকতা, নৈতিকতা, অনুভূতি। তবে মানসিকতার পরিবর্তন অল্পদিনে সম্ভব নয়। অপেক্ষা করতে হবে। আশাবাদী হতে হবে।

একটা বাচ্চাকে জন্মের পর থেকে অন্ধকার গুহায় আটকে রাখা হল। বিশ বছর বয়সে তাকে হঠাৎ একদিন দিনের আলোতে ছেড়ে দিলে তার অবস্থা কী হতে পারে? নিশ্চয় অপ্রত্যাশিত আলোর ঝলকানিতে সে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পাগলপ্রায় হয়ে উঠবে। কিন্তু সময়ের সাথে অবশ্যই সে সবকিছু মানিয়ে নেবে।

ঠিক তেমনি প্রযুক্তির সান্নিধ্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে গুহা থেকে হঠাৎ পৃথিবীর আলোতে আগমন। সঠিক জ্ঞান ও চিন্তাধারার অভাবেই কিছু তরুণ আজ পথভ্রষ্ট। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের সঠিক বোধ উপলব্ধি হবেই।

তবে এই সময়টা দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু আশাহত হওয়াটা বোকামি হবে। কারণ পৃথিবীতে অনেক অনুকরণীয় উদাহরণ আছে যা স্বল্প সময়ে অর্জিত হয় নি।

তাহলে মুরব্বিরা কি মুখে কুলুপ আটবেন?

মোটেই তেমন নয়। তাঁদের প্রতিটি সমালোচনা তরুণ প্রজন্মের জন্য একেকটা ধাক্কা। আর এই ধাক্কাই তাদেরকে পৌচ্ছে দেবে সঠিক গন্তব্যে। অভিজ্ঞ মুরব্বিরা নেতিবাচকতা তুলে ধরার সাথে সাথে একটা ইতিবাচক পথও বাতলে দেবেন। এতে তরুণদের হাঁটতে সুবিধা হবে।

আমাদের তরুণরা কোন ক্ষেত্রেই যে তেজ হারায়নি- কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন তার জোরালো প্রমাণ।

বর্তমান তারুণ্যে আস্থা রাখা সময়ের দাবি।

জি. এম. জাহাঙ্গীর আলম
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

Most Popular

To Top