নিসর্গ

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৫)

[আগের পর্ব]

এ যেন ক্রোশের পর ক্রোশ দূরত্ব পেরিয়ে আসা তৃষ্ণার্ত পথিকের হাতে জলের গ্লাস তুলে দিয়ে আবার তা কেড়ে নেয়া, এ যেন দর্শনেই শুধু পিপাসা বাড়িয়ে তোলা, তৃষ্ণা আর মেটেনা কিছুতেই। বলছিলাম পেহেলগামের কথা, কেন? বলছি তবে।

আজ সকাল থেকেই কেমন যেন এক বিষণ্ণতা ছেয়ে বসেছে। কারণ, আজ যে কাশ্মীরের শেষ দিন। আমাদের এই হোটেলটাও আজ ছেড়ে দিতে হবে। কারণ, শেষ রাতটা থাকব আমরা হাউজ বোটে। যাই হোক, রুম খালি করে বাক্স, প্যাটরা সব নিচে হোটেল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে রেখে আমরা রওনা হলাম পেহেলগামের উদ্দেশ্য। এই স্থানটিও শ্রীনগর থেকে দুই ঘন্টার ড্রাইভিং দূরত্বে অবস্থিত। এর আগের জায়গাগুলোর মতই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গাড়ি থামিয়ে অন্য আরেকটি দশ সিটের গাড়ি ভাড়া করে আমরা রওনা হলাম অরুভ্যালির দিকে। এরপর চন্দন ওয়ারী, এবং তারপর বেতাব ভ্যালি। পেহেলগাম থেকে এই স্থানগুলি কিন্তু বেশ দূরেই অবস্থিত। তাই এই তিনটি স্থান দেখতেই অনেক সময় লেগে যায়। এই জায়গাগুলির সৌন্দর্য্য নিয়ে যদি লিখতে চাই পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে। ছোট বেলায় পড়েছিলাম পাহাড়ের মাঝের সরু পথগুলিকেই উপত্যকা বা ভ্যালি বলে। ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ায় সাহেব কবিদের এই ভ্যালি, পাহাড়ি খরস্রোতা নদী, বন, পাহাড়, চারণভূমি , মেষপালক এই যাবতীয় শব্দগুলির সাথে পরিচিত।

বেতাব ভ্যালি

ইংরেজী প্রতিশব্দগুলোর সাথে পরিচয় হয়েছিল বেশ, তখন কবিতাগুলি পড়ার সাথে সাথে কল্পনায় সেই দৃশ্যগুলি অংকন করে একাত্মতা ঘোষণা করতাম কবিতার সাথে। কিন্তু পেহেলগামে গিয়ে সেই কল্পনা আর বাস্তবতা যেন একাকার হয়ে গেল আমার কাছে। চারপাশে এত অসহ্য সুন্দর কেন? সব কিছু যেন ছবির মত আঁকা। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা লিডার নদী, আর অসংখ্য দুধ সাদা স্বচ্ছ জলের ঝর্ণা যেন সত্যিই স্বর্গের ছোঁয়া এনে দেয়। এমন দৃশ্য তো এতদিন পোস্টার আর স্ক্রিন সেভারেই দেখেছি। এইতো সেই জায়গা সেখানে ক্রিস্টোফার মার্লোর সেই দূরন্ত মেষপালক তার প্রেয়সীকে তার জীবনে আসার জন্য কতোই না রঙ্গীন স্বপ্ন আর প্রলোভন দেখাচ্ছে, এখানেই বুঝি ওয়ার্ডসওয়ার্থ সেই নাম না জানা, না দেখা নিঃসঙ্গ ফসল কাটতে থাকা বালিকাটির দূর্বোধ্য গানের সুরের মুর্ছনা তার অন্তরে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন পথে। এত সুন্দর, এত সুন্দর সবকিছু চারিদিকে! ভেবেছিলাম এই পর্বে আর কাব্য করবোনা, কিন্তু কি করবো এই স্থানগুলির সৌন্দর্যই এমন যা অগ্রাহ্য করা যায়না কিছুতেই।

আরু ভ্যালি

প্রথমেই বলেছিলাম তৃষ্ণার্ত পথিক আর জলের গ্লাসের কথা, এবার তার শানে নুযুলে আসি। পেহেলগামে একদিন ডে ট্যুর করলে আসলে আপনার তৃষ্ণার এককণাও মিটবেনা বরং আরো বাড়বে। তাই এখানে মিনিমাম দুই রাত থাকা উচিত। সময়ের অভাবে পেহেলগামের সবচেয়ে সুন্দর স্থান বাইসারান যাকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয় সেটাই দেখতে পারলাম না আমরা। এই দুঃখ এই জনমে মিটবে কিনা সন্দেহ।

দুপুরে আবার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ফিরে এসে স্থানীয় হোটেলে লাঞ্চ কাজ সেরে শ্রীনগরের পথে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা আর আমাদের মাথায় হাত। আলো চলে গেলে হাউজ বোটে দেখবটা কি? অবশেষে আবার হোটেলে ফিরে লাগেজ নিয়ে আমরা যখন হাউজ বোটের উদ্দেশ্যে ডাল লেকে পৌছলাম তার অনেক আগেই সূর্যমামা পশ্মিমাকাশে উধাও হয়েছেন। অন্ধকারেই ঘাটে লেগে থাকা শিকারা আমাদের হাউজ বোটে নিয়ে যাবার জন্য রেডি। তিন ফ্যামিলির এত্তগুলো লাগেজ হাউজ বোটে তুলে আবার আগামীকাল ভোরে নিয়ে আসা শুধু শুধু হ্যাসেল তাই আমরা শুধুমাত্র একটি করে ড্রেস বের করে নিয়ে সব লাগেজ মাইক্রোতেই রেখে দিলাম কারণ, কাল ভোরেই ত আবার এই গাড়িতে এই ড্রাইভারই আমাদের নিতে আসবে এয়ারপোর্টে যাবার জন্য। সম্পূর্ণ বিশ্বাসের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে হাত-পা নিয়ে আমরা উঠে বসলাম শিকারায় আর আমাদের সব লাগেজ নিয়ে গাড়ি চলে গেল তার নির্ধারিত জায়গায়।

রয়্যাল ডান্ডো প্যালেস হাউজবোট, ডাল লেক

দশ মিনিটের শিকারা রাইড আমাদের হাউজ বোট পর্যন্ত আর সেখানেই পৌঁছেই কাশ্মীর ট্যুরের শেষ মুগ্ধতার সামনে আমরা। ফোর স্টার বলে দাবী করা ”রয়াল ডান্ডো প্যালেস” হাউজ বোটটি সত্যিই অসাধারণ। ডাল লেকের মাঝখানে একটি বিলাস তরী। বিশাল বিশাল তিনটি ওয়েল ফার্নিশড রুম, সুসজ্জিত লিভিং রুম, ডাইনিং রুম, সামনে রেলিং ঘেরা ছোট্ট বারান্দা সবকিছু মিলে চমৎকার। দেখে আবার আফসোস, কেন আর একরাত এখানে থাকিনি? আসলে আমরা বরাবরই  ঘুরে বেরানোপাবলিক, যেখানেই যাই না কেন, রাত পর্যন্ত ঘুরাঘুরি করা স্বভাব। তাই বারবার শিকারা করে স্থলে এসে ঘুরাঘুরি করাটা সুবিধাজনক না মনে হওয়ায় হাউজ বোটে মাত্র একটি রাতই বরাদ্দ করেছিলাম। যাই হোক, যেটুকু সময় পেলাম সেটাই উসুল করার চেষ্টা করলাম । যেন জোর করে রাতটুকু ধরে রাখা। ঘুমিয়ে পড়লেই হারিয়ে যাবে অনেককিছু। কিন্তু জোর করে কি আর সব ধরে রাখা যায়? আমরাও পারলাম না। শেষ মুগ্ধতার আবেশটুকু নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম হাউজ বোটের সেই রাজকীয় বিছানায়।

এ্যালার্ম দেয়াই ছিল, ভোর পাঁচটায়  উঠে রেডি হতেই দেখি শিকারা হাজির। শেষবারের মত আমাদের হাউজ বোটটিকে বিদায় জানিয়ে উঠে বসলাম শিকারায়। ভোরের মিষ্টি হাওয়া আর ডাল লেকের স্বচ্ছ পানি যেন আমাদের মনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আজ বড্ড বেশি শান্ত। দিগন্ত রেখায় পাহাড়ের পটভূমি। দূর থেকে ভেসে আসা মিষ্টি হাওয়া যেন সেই পাহাড় থেকে বিদায়ের বার্তা এনে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছিল আমাদের। হঠাৎ মনটা কেমন বিষন্ন হয়ে উঠলো। গত চারদিন ধরে যে স্মৃতিগুলো সঞ্চয় করেছি তা যেন এক এক করে ভীড় করছিলো মনে। বুঝতে পারলাম অসম্ভব মায়া জন্মে গেছে দেশ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থিত এই অসম্ভব সুন্দর স্বর্গীয় স্থানটির উপর।

বেতাব ভ্যালি

শিকারা এসে ভিড়ল ঘাটে। আমাদের ব্যাগেজ সমেত গাড়ি আবার এসে দাঁড়ালো আমাদের সামনে। দিনের আলো ফোটার আগেই আমরা রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। অবশেষে যাবতীয় ফর্মালিটি শেষে এয়ারপোর্টে কিছুক্ষন অপেক্ষার পর আমাদের নিয়ে এয়ার এশিয়ার আকাশযানটি শ্রীনগরের মাটি ছেড়ে উড়াল দিল দিল্লীর আকাশে । নীচে পরে রইল সেই বরফের মুকুট পরা পাহাড়, দুধ সাদা ফেনিল ঝরনা, কাক চক্ষু জলের ডাল লেক, সবুজ ভ্যালি , উইলো, পাইনের সারি আর আমার ফেলে আসা অসম্ভব সুন্দর কিছু মুহুর্ত যার স্মৃতি আজীবন লালনের প্রত্যয় নিয়ে সঙ্গে করে যাচ্ছি আমি।

The music in my heart I bore,

Long after it was heard no more..

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top