নাগরিক কথা

সবরীমালা মন্দিরঃ বিশ্বাস যখন বিশ্বাসীদের বাধা!

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

নতুন বছর থেকে ভারতের কেরালা রাজ্যে শুরু হয়েছে এক নতুন সংঘাত। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংস্থা আর ভারতীয় নারীদের মধ্যে সংঘাতের এই ঘটনা আবর্তিত হচ্ছে কেরালার পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এক মন্দিরে নারীদের প্রবেশকে নিয়ে।

মন্দিরে প্রবেশকারী নারীদের বাসায় হামলা এবং হত্যার হুমকি, রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে বোমা নিক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মত ভয়াবহ অবস্থায় রূপ নেওয়া এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির নেপথ্যকারণ জানার আগে আমরা জেনে নিই সবরীমালা মন্দির সম্পর্কে।

সবরীমালা মন্দির

সবরীমালা মন্দি্রের প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে, এরমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনীটি হলঃ

পান্ডালামের রাজা এবং রানী ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতি। একদিন রাজা শিকারে গিয়ে নদীর পাশে ক্রন্দনরত এক শিশুকে অগস্ত্য মুনির কথায় নিয়ে আসেন রাজঘরে এবং সন্তান হিসেবে লালনপালন শুরু করেন।

পরে মানিকনন্দন নামের শিশুটির নানা বিভূতিমূলক কাজ দেখে রাজা এবং অন্যান্যরা নিশ্চিত হন যে এই শিশু কোন সাধারণ শিশু নয়, বরং শিশুটি হল “আয়াপ্পা”র মনুষ্য অবতার। পরে পান্ডালামের রাজা “আয়াপ্পা”র প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ এই মন্দিরটি বানিয়ে দেন।

অন্য আরেকটি লোককথা মতে, সবরীমালা মন্দিরের ভগবান “আয়াপ্পা” একজন ব্রহ্মচারী। যখন তিনি অভিশপ্ত অসুর মহেষাশুরীকে যুদ্ধে পরাজিত করেন তখন অভিশাপমুক্ত হয়ে মহেষাশুরী আয়াপ্পাকে বিয়ে করতে চান কিন্তু আয়াপ্পা তাকে বিয়ে করতে রাজি হননা এবং বলেন যে তিনি ব্রহ্মচারী। কিন্তু মহেষাশুরী তারপরেও বারবার অনুরোধ করলে আয়াপ্পা বলেন যে তিনি জংগলে যাচ্ছেন ধ্যান করতে, সেখানে একটা মন্দির হবে যাতে ভক্তরা এসে পুজা দেবে এবং যে বছর নতুন কোন ভক্ত আসবেনা সেবছরই তাদের মধ্যে বিয়ে হবে। কিন্তু বেচারা মহেষাশুরীর কপাল খারাপ, কারণ প্রত্যেক বছরই নতুন নতুন ভক্ত এসে হাজির হয় এবং তাদের আর বিয়ে করা হয়ে উঠেনা। মহেষাশুরীকে পাশের একটি মন্দিরে তার ভক্তরা মলিক্কাপুরাথাম্মা দেবী নামে পূজা করে থাকে।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

সবরীমালা মন্দিরটি দুটি কারণে ভারতের অন্য অনেক মন্দির থেকে আলাদা,একটি কারণ হচ্ছে সবরীমালা শুধুমাত্র প্রতি মাসের প্রথম পাঁচদিন ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং আরেকটি কারণ হচ্ছে এই মন্দির হিন্দু-মুসলিম সবার জন্য উন্মুক্ত।

বলতে গেলে, সবরীমালাতে যেসব ভক্ত দেবদর্শন করতে যান তাদের ধর্মীয় কাজের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাশের “বাবর মসজিদ” দর্শন করে আসা। বলা হয়ে থাকে যে “বাবর মসজিদ” বাবর নামের এক জলদস্যুর স্মরণে নির্মিত যে যুদ্ধে মানিকনন্দন (আয়াপ্পার মানবিক অবতার) এর কাছে পরাজিত হয় এবং পরে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যায়। মন্দিরে আসা মুসলিম ভক্তরা এই মসজিদে নামাজ পড়ে থাকে এবং হিন্দু ভক্তরা মসজিদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে চলে যান।

যেসব ভক্ত মন্দিরে যেতে চায় তাদের যাওয়ার আগে ৪১ দিনব্যাপী “ব্রতম” নামের শুদ্ধিপ্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। শুদ্ধিপ্রক্রিয়ার নিয়ম অনুসারে ভক্তরা এই ৪১ দিন দিনে দুইবেলা গোসল করে, ব্রতচারী ভূমিকা পালন করে, নিরামিষাশী হয়ে যায়, কালো বা নীল রঙের কাপড় পরে, চুল আর নখ না কেটে সেগুলোকে বাড়তে দেয় এবং জাগতিক সব দোষ যেমন রাগ-মায়া-মোহ থেকে নিজেকে দূর রাখে।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

টানা ৪১ দিন ধরে শুদ্ধিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারলেই একজন ব্যক্তি সবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে, তার আগে নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত সবরীমালা মন্দিরে যাওয়ার রাস্তা অত্যন্ত দুর্গম এবং দর্শনার্থীদেরকে অনেক কষ্ট করে সেখানে যেতে হয়।

সবরীমালা মন্দিরের প্রবেশের জন্য রজঃস্বলা মেয়েদের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং নিষেধাজ্ঞা রদঃ

ট্রিভাংকুর আর কোচিন স্টেট এর স্মরণীকা অনুসারে প্রায় দুইশ বছর আগে কেরালার সবরীমালা মন্দিরে ছোট মেয়ে এবং বৃদ্ধমহিলা ব্যতীত অন্য নারীদের (রজঃস্বলা) প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে এই নিয়মটি কে প্রণয়ন করেছে কিংবা কেন এটা মেনে চলা হচ্ছে সে সম্পর্কে কখনোই কিছু জানা যায়নি। এত বছর ধরে এই আইন বজায় থাকলেও মাঝেমাঝে অল্প সংখ্যক বিবাহিত মহিলা তাদের সন্তানদের মুখে ভাত দেওয়ার অনুষ্ঠান “চরুন্নু” পালন করার জন্য মাঝেমাঝে মন্দিরের উঠান পর্যন্ত যেতেন।

তবে ১৯৯১ সালে এসে জাস্টিস কে পারিপুরান আর কে বালানারায়ণ মারার সাহেবের মনে হল যে এই প্রাচীন আইনটাকে আগের চেয়ে আরো শক্ত করা উচিত।

তাই উনারা দুইজনে গিয়ে প্রাচীন নিয়মটাকে মন্দিরের আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করিয়ে আইন পাস করালেন এবং সাথে কেরালা রাজ্যসরকারের উপর এই আদেশ দেওয়ার ব্যবস্থা করালেন যেন রাজ্য সরকার পুলিশবাহিনী ব্যবহার করে এই বিষয়টি তদারকি করেন।

তৎকালীন হাইকোর্ট এর ভাষ্যমতেঃ

“Such restriction (restriction of women entry) imposed by the Devaswom Board is not violative of Articles 15, 25 and 26 of the Constitution of India. Such restriction is also not violative of the provisions of Hindu Place of Public Worship (Authorisation of Entry) Act, 1965 since there is no restriction between one section and another section or between one class and another class among the Hindus in the matter of entry to a temple whereas the prohibition is only in respect of women of a particular age group and not women as a class.”

এরপরে ২০০৬ সালে ভারতীয় যুব আইনজীবী সংস্থার ছয়জন সদস্য ভারতের সুপ্রীম কোর্টে সবরীমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধকারী রায়ের বিরুদ্ধে পিটিশন করেন।তারা পিটিশনে উল্ল্যেখ করেন যে এই নিষেধাজ্ঞা নারীদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং যে “Hindu Places of Public Worship (Authorization of Entry) Rules act of 1965”  এর ভিত্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

পরে ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ার সুপ্রীম কোর্ট এই পিটিশনের রায় হিসেবে সবরীমালা মন্দিরে সব বয়সের নারীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে নিম্নোক্ত রুল জারী করেঃ

“We have no hesitation in saying that such an exclusionary practice violates the right of women to visit and enter a temple to freely practice Hindu religion and to exhibit her devotion towards Lord Ayyappa. The denial of this right to women significantly denudes them of their right to worship.”

এই পিটিশনটি ৪-১ ভোটে রায় পিটিশনকারীদের পক্ষে যায় এবং প্রধান বিচারক দীপক মিশ্র বলেন যে শুধু নারীদের উপরে “সিলেক্টিভ”ভাবে কোন ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দেওয়া “ধর্মীয় পুরুষতান্ত্রিকতা”র উদাহরণ। তবে অবাক হওয়ার এবং দুঃখের বিষয় এই যে এই রায়ের বিপক্ষে বিচারকদের পক্ষ থেকে যে না ভোটটি আসে তা আসে একমাত্র মহিলা সদস্য ইন্দু মালহোত্রার কাছ থেকে। ইন্দু মালহোত্রা তার বয়ানে লেখেন যে, “… what constitutes an essential religious practice is for the religious community to decide, and not a matter that should be decided by the courts”। অর্থাৎ, ধর্মীয় বিষয়াদিতে আদালতের নাক গলানোর এখতিয়ার নেই, এই এখতিয়ার শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষেরই আছে। তিনি আরো বলেন, “notions of rationality cannot be invoked in matters of religion by courts”- ধর্মীয় বিষয়বস্তু যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করা যায় না।

সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পরে সবরীমালায় নারীদের প্রবেশঃ

এমন নয় যে সবরীমালা মন্দিরে ইতিপূর্বে কোন নারী প্রবেশ করেনি, ১৯৯১ সালের পরেও গোপনে কয়েকজন উচ্চবংশীয় মহিলা সেই মন্দিরে প্রবেশ করেন বলে জনশ্রুতি আছে। পরবর্তীতে Nambinar Keduvathillai নামক তামিল ধর্মীয় সিনেমার কয়েকটি নৃত্যের দৃশ্য শুটিং করার জন্য সিনেমার নায়িকা এবং নৃত্যশিল্পী মন্দিরের ১৮তম ধাপের আগ পর্যন্ত প্রবেশ করেন, কিন্তু পরে এটা নিয়ে তুমুল হইচই আরম্ভ হয়ে যায় অনুমতিদানকারী ট্রাস্টি বোর্ড এবং মন্দিরের পুরোহিতদের সাথে।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ করতে দেওয়া নিয়ে আগে বিরোধীরা হাইকোর্টের রায়ের কথা মেনে চলার জন্য মহিলাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না বললেও এখন সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পরেও তারা অনড় অবস্থানে রয়েছেন।

২৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর থেকেই সবরীমালাকে কেন্দ্র করে থমথমে অবস্থা শুরু হয় এবং চারপাশ থেকে রায়ের বিরোধিতাকারীরা এসে আন্দোলন শুরু করে দেয়। ১৯ অক্টোবর দুজন মধ্যবয়স্কা মহিলা মন্দিরে ঢুকতে গিয়ে মন্দিরের ১০০মিটার দূরে বাধাপ্রাপ্ত হন আন্দোলনকারীদের দ্বারা এবং প্রধান পুরোহিতের মন্দির বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিতে পরে মহিলা দু’জন ফেরত আসেন। এরপরে প্রায় ২০ জন মহিলা সবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফেরত যান।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

সুপ্রীম কোর্টের রায়ের পরেও মহিলাদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মহিলা একসাথে দাঁড়িয়ে “ভানিতা মাথিল বা নারীদের দেয়াল” নামে প্রায় ৬২০ কিলোমিটার লম্বা ১৫ মিনিটের এক মৌন প্রতিবাদ করে।

https://www.somewhereinblog.net/blog/shahadatblog/29093779

পরেরদিন ২ জানুয়ারি ২০১৯ সালে ভোর ৩.৪৫ মিনিটে বিন্দু আম্মিনি এবং কানাক দুর্গা নামের মধ্যচল্লিশের দুজন মহিলা মন্দিরের পেছনের স্টাফ প্রবেশের গেট দিয়ে পুলিশি প্রহরায় মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং এর সত্যতা কেরালার মূখ্যমন্ত্রী পিন্যারায়ী বিজয়ন দ্বারা নিশ্চিত করা হয় গণমাধ্যমে। আর এরপরেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত একঘন্টা মন্দির বন্ধ রেখে মহিলাদের আগমনে মন্দিরের যে বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়েছে তার জন্য শুদ্ধিপূজা করেন।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

বিন্দু আম্মিনি এবং কানাক দুর্গা

রাজনৈতিক সংঘর্ষঃ

৩ জানুয়ারি উগ্র হিন্দুবাদী সংগঠন সবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের প্রতিবাদে হরতাল ডাকে এবং সেখান থেকে সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো কেরালা জুড়ে। রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে বোমাহামলা ছাড়াও বিজেপি, আরএসএস বনাম ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার মধ্যেকার কর্মীদের সংঘর্ষে অনেকেই হতাহত হয়েছেন, বিজেপি’র এক কর্মী ক্ষোভে আত্মহত্যা করেছেন, আটক করা হয়েছে অর্ধসহস্র আন্দোলনকারীকে এবং পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে দাঙ্গায় পরিণত হতে পারে।

সবরীমালা মন্দির নিয়ন আলোয় neonaloy

এতকিছুর মধ্যেও সবরীমালাতে মহিলাদের প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে ইতিমধ্যে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রায় ১০ জন মহিলা মন্দিরে প্রবেশ করেছেন। এই অবস্থা বন্ধ করতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এখন মন্দিরের সামনে চেকপোস্ট বসিয়েছে যেখানে জন্মসনদ দেখিয়ে বয়স নিশ্চিত করে তারপরে মহিলাদের ঢুকতে হচ্ছে, মন্দিরে প্রবেশের রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চেক করে দেখা হচ্ছে যে গাড়িতে কোন মহিলা আছে কিনা। কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেরালা রাজ্য ভ্রমণ করবেন বলে সরকারী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু এরপরেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা।

সবরীমালা মন্দির এবং নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিঃ

তিক্ত হলেও সত্য যে শুধু সবরীমালা মন্দির নয়, ভারতের অনেক মন্দিরেই মেয়েদের কিংবা রজঃস্বলা (menstruating) মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। মন্দির ছাড়াও আসামের পটবাসী সত্র, দিল্লীর জামে মসজিদের দরগা, হাজী আলীর দরগা এবং খাজা নিজামউদ্দীনের দরগাসহ হিন্দু-মুসলমানদের অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত নয়।

আমাদের দেশের সিলেটে ২০১৮ সালে শাহী ঈদগাহ নামক জায়গাটিতে “পবিত্রতা রক্ষা”র কারণ দেখিয়ে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, যদিও পরবর্তীতে সেটি তুলে নেওয়া হয়। এছাড়া ছারছিনা মাদ্রাসার সামনের রাস্তাসহ অনেক ধর্মীয়স্থান দিয়ে মহিলাদের চলাচল নিষেধ। এমনকি ২০০৮ সালে কক্সবাজারের বিভিন্ন বিহারে বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম তখন একটি বিহারের ছোট্ট উন্মুক্ত স্থানটিতে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ লেখা ছিল।

এমনটা না যে আমাদের মত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই নিষেধাজ্ঞা জারী করা আছে, বরং অবাক হতে হয় এই ভেবে যে বিশ্বের যেসব দেশ নিজেদের উন্নত এবং প্রগতিশীল দাবী করে, তাদের মধ্যেও নারীদের ধর্মের নামে ট্যাবু করে রাখার প্রবণতা আছে।

জাপানের মাউন্ট অমিনি, গ্রিসের অর্থোডক্সদের উপাসনালয় মাউন্ট এথোসসহ অনেকগুলো উপাসনালয়ে মেয়েদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ভাবতেও অবাক লাগে যে এরা নিজেদের কিভাবে উন্নত এবং অগ্রসর দাবী করে!

আরো পড়ুন- ওকিনোশিমা: শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য যে দ্বীপ

সমাজে পুরুষরা নিজেদের অধিকার ফলিয়ে মনমতো সব নিয়ম করে যাবে আর বলে বেড়াবে যে মেয়েদের অবস্থান পুরুষদের চেয়ে নিচে, রজঃস্বলা মেয়েরা ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা নষ্ট করে দেবে, মেয়েরা সাধকপুরুষদের সাধনার পথে প্রতিবন্ধক। এমন নানা কারণ দেখিয়ে উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই মেয়েদেরকে অচ্ছুত করে রাখা যেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক মহান বিজয়।

আমাদের এই সমাজেই অনেক শিক্ষিত মানুষ আছেন যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে আধুনিক মনমানসিকতার বলে জাহির করে বেড়ালেও যখন মেয়েরা তাদের উপর হয়ে আসা এসব জিনিসের প্রতিবাদ করে তখন আড়ালে মুখ বাঁকিয়ে বলেন যে “মাইয়ামানুষ হইয়া এত তেজের কি আছে? আমাদের মা-বোনেরা মাসিকের সময় ঘর থাইকা বাইর হয়না আর এরা আইছে ধর্মীয়প্রতিষ্ঠানে ঢুকা নিয়া লাফালাফি করতে”। মেয়েদের পক্ষে যৌক্তিক কিছু বললেই মানুষটা হয়ে যাবে হয় নারীবাদী কিংবা ধর্মবিদ্বেষী।

লেখাটা ছাপা হলে কমেন্টবক্সে দেখা যাবে আধুনিক মনমানসিকতার অনেক পুরুষকে যারা মেয়েদের উপর এসব নিষেধাজ্ঞা জারী রাখার জন্য ধর্মের দোহাই, সমাজের দোহাইসহ আরো অনেক দোহাই দিতে বসবে এবং চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়বে লেখক আর পত্রিকার। আর অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে এখানে কমেন্ট করবেন কিছু মহিলাও, যারা বলবেন যে মেয়েদের এসব স্বাধীনতা দেওয়ার কারণেই মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে, দেশ রসাতলে যাচ্ছে, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং কেয়ামত নজদিক হচ্ছে! এসব মহিলারাই হচ্ছেন ইন্দু মালহোত্রার মত মহিলাদের এবং সবরীমালা মন্দিরে যেসব নারী আন্দোলনকারীরা নারী হয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্য রজঃস্বলা নারীদের প্রবেশ করতে দেবেনা বলে পণ করে আছে তাদেরই প্রতিভূ, তাদেরকে আমার করুণা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

https://www.somewhereinblog.net/blog/shahadatblog/29093779

এবং যেসব পুরুষ নিজের পুরুষ হওয়ার অধিকার ফলিয়ে মেয়েদের এমন অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে তুচ্ছ করে তাদেরকে সত্যিই আমার জিজ্ঞেস করতে মন চায়,

“যে নারীদেহ না হলে আপনার জন্ম হতনা, রজঃস্বলা হওয়ার কারণেই আপনার মা আপনাকে জন্ম দিতে পেরেছেন কিংবা আপনার স্ত্রী আপনার সন্তানকে- সেই জিনিসটাকে ঘৃণ্য বলতে কিংবা সেই জিনিসটার জন্য একটা মেয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে আপনার বীরত্বটা কোথায়?”

তথ্যসূত্রঃ

১। Crude Bombs Thrown At Left Leader, BJP Parliamentarian Homes In Kerala

২। No Strike Can Be Called Without A Week’s Notice: Kerala High Court

৩। NDTV Topic: sabarimala

৪। 10 Places in India that Restrict Entry for Women

৫। Women have fundamental right to enter Sabrimala temple, says Apex court

৬। Wikipedia

৭। No women allowed: Tourist destinations where females are forbidden

৮। Pinarayi Vijayan Attacks BJP, RSS Over Sabarimala Violence

৯। Kerala’s Nair Body Accuses State Government Of Imposing Atheism On People

১০। 36-Year-Old Dyes Hair Grey, Claims To Have Entered Sabarimala Temple

১১। “State Should Be Able To Identify Those With Agenda On Sabarimala”: Court

১২। Hindustan Times Topic: Sabarimala

১৩। 36-yr-old Dalit woman dyes hair grey, claims she entered Sabarimala shrine

১৪। What you might want to know about Sabarimala

১৫। Sabarimala violence: Politically sensitive Kannur boils over

১৬। Crude Bombs Thrown At Left Leader, BJP Parliamentarian Homes In Kerala

[লেখিকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক]

Most Popular

To Top