বিশেষ

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল, দ্য হিরো উই নিড!

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

নাম তাঁর ক্যাপ্টেন কাঁঠাল। রাতবিরাতে যখন পুরো নগরবাসী ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ ঢাকা শহর ক্রিমিনালদের জন্য হয়ে ওঠে অভয়ারণ্য। চলতে থাকে ছিনতাই, রাহাজানি, ব্যাঙ্ক ডাকাতির মতো অপরাধ। আর সেই সকল অপরাধীকে রুখে দাড়াতে, নগরবাসীকে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দিতেই ক্যাপ্টেন কাঁঠালের আবির্ভাব। সে ঘুষ খায় না, ঘুষা দেয়। জাতীয় ফল কাঁঠালকে সম্মান প্রদর্শনই এই নামের রহস্য।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

Mighty Punch Studio’র হাত ধরে এ বছরের ৩ জানুয়ারি পর্দায় আবির্ভাব ঘটে ‘ক্যাপ্টেন কাঁঠাল’ এর। গভীর রাতে দুর্ধর্ষ তিন ব্যাঙ্ক ডাকাতের মোকাবেলা করতে দেখা যায়। ঢাকা শহরে বিদ্যমান অসহ্য জ্যাম, ভিআইপিদের উলটো রাস্তা ব্যবহার, ফুসকা ব্যবসায়ীদের আধিক্য হাস্যরসের মাধ্যমে খুবই চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে ‘বাপের রাস্তাঃ The Wrong Road’ নামক ৭ মিনিটের এই এনিমেশন ফিল্মে। ক্যাপ্টেন কাঁঠালকে পর্দায় আনার পিছনে সম্পূর্ণ অবদান মাইটি পাঞ্চ টিমের। স্ক্রিপ্ট এবং ডিরেকশনে ছিলেন সামির আসরান রাহমান। ডায়লগ ও সকল নেপথ্য কন্ঠ দিয়েছেন অলিভার সিমন হালদার। মিউজিক এবং কম্পোজিশনের কাজটা করেছেন রাকাত জামি এবং বাইভাব তিতাম। লিড অ্যানিমেটর ছিলেন শাহিন সাজিব সিদ্দিক, ওপেনিং এবং ক্লোজিং ক্রেডিটের কাজটি করেছেন নাবিদুর রাহমান। স্টোরিবোর্ডের দায়িত্বে ছিলেন আসিফুর রাহমান এবং ব্যাকগ্রাউন্ড এ ছিলেন মোশাররফ হুসেইন। অ্যানিমেশন এর দায়িত্বে ছিলেন ফারিদুল ইসলাম, সুদিপ্ত বর্মণ, শাহ আবেশ রাহমান, নাজিয়াত অর্থী, ওয়াহিদ জামান, মৃৎমন্দির কুমার রয় প্রমুখ।

তবে ক্যাপ্টেন কাঁঠালকে এই প্রথম এনিমেশন পর্দায় দেখা গেলেও তার ভক্তদের সামনে এটাই কিন্তু তার প্রথম আবির্ভাব না, এর আগেও তাকে দেখা গেছে তার সহকর্মী সাবাশ এর সাথে কমিক জগতে। ‘সাবাশ’ হল একটি সুপারহিরো কমিক্স সিরিজ, টিভি পর্দায় এখনও তার আবির্ভাব ঘটে নি। কমিক জগতে ‘সাবাশ’ এর আবির্ভাবও মাইটি পাঞ্চের হাত ধরে। ক্যাপ্টেন কাঁঠাল যেখানে জাতীয় ফল কাঁঠালকে প্রতীক হিসাবে ধরে নিয়েছে, সেখানে ‘সাবাশ’ এর প্রতীক সবার প্রিয় ফল আম। এবং আমের মতোই রসে পরিপূর্ণ সুপার হিউম্যান ‘সাবাশ’; সব সময়ই মেতে থাকে হাসিঠাট্টায়, ভক্তদের সামনে নিজেকে ‘কুল’ রাখতে পছন্দ করে, মজার মজার কাণ্ডকারখানা করে বেড়ায়।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

কিন্তু অন্য সব সুপারহিরোদের সাথে তার একটাই পার্থক্য, সেটা হচ্ছে ‘সাবাশ’ প্রচণ্ড রকম কুড়ে এবং অলস, তাকে দায়িত্ব পালনের জন্য তার মা’র সব সময়ই তাগাদা দেয়া লাগে। মাইটি পাঞ্চ স্টুডিও’র হাত ধরে কমিক জগতে ‘সাবাশ’র আগমন ঘটে প্রথম ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এখন পর্যন্ত মোট আটটি কমিক বই বের হয়েছে সাবাশ’কে নিয়ে। এবং এর মধ্যে সপ্তম এবং অষ্টম পর্বে সাবাশের সাথে দেখা গেছে ক্যাপ্টেন কাঁঠালকে।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

সাবাশ কমিক সিরিজের লেখক সামির আসরান রাহমান এবং আর্টিস্টের দায়িত্বে ছিলেন মেহেদি হক, ফাহিম আঞ্জুম রুম্মান, মোশাররফ হুসেইন।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল তার সহযোদ্ধা সাবাশের পুরোই উলটো। কাঁঠালের মতোই গুরুগম্ভীর সে, ভক্তদের প্রয়োজন নেই তার, হাসিঠাট্টাও খুব একটা যায় না তার মাঝে। পোশাক আশাক আর চারিত্রিক দিক দিয়ে সে অনেকটাই সুপারহিরো ‘ব্যাটম্যান’র মতো। যদিও তার নিজের কমিক এখনও বের হয়নি, তবে খুব শীঘ্রই বের হবে। ক্যাপ্টেন কাঁঠালের কমিক রচনার দায়িত্বে আছেন সামির আসরান রাহমান এবং আর্টিস্টের দায়িত্বে আছেন ঐশিক জামান, জুনাইদ ইকবাল, আসিফুর রাহমান এবং মোশাররফ হুসেইন প্রমুখ।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

‘ত্রয়ী/Trio’ বলে একটা শব্দ আছে সুপারহিরো জগতে, যার অর্থ ‘তিন সংখার দল’। সকল সুপারহিরো জগতেই আছে এর ব্যবহার; যেমন মারভেল কমিক জগতে ক্যাপ্টেন আমেরিকা, আয়রন ম্যান এবং ব্লাক উইডো, আবার ডিসি জগতে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান এবং ওয়ান্ডার ওম্যান। এমন সঙ্গী আছে ক্যাপ্টেন কাঁঠাল আর সাবাশেরও। নাম তার মিস সাবাশ। ছদ্মবেশী সাংবাদিক শবনম অশুভ শক্তির হাত থেকে তার শহরবাসীকে রক্ষা করতে মুহূর্তেই হয়ে যান মিস সাবাশ। কিন্তু তার জগতটা ভিন্ন, তার বসবাস সাবাশ, ক্যাপ্টেন কাঁঠালের প্যারালাল জগতে। এখনও তাদের নিজেদের মধ্যে পরিচয় হয়ে ওঠে নি, দেখাও হয় নি। মাইটি পাঞ্চের হাত ধরেই ২০১৫ সালের মার্চে কমিক জগতে পদার্পণ মিস শাবাশের। তার কাহিনীর লেখক ছিলেন সামির আসরান রাহমান আর আর্টিস্টের দায়িত্বে ছিলেন মোশাররফ হুসেইন, শামিম আহমেদ এবং ফাহিম আঞ্জুম রুম্মান।

ক্যাপ্টেন কাঁঠাল নিয়ন আলোয় neonaloy

কিভাবে এই সুপারহিরো জগতের শুরু? পিছনের কাহিনী কি? এই প্রশ্নের উত্তর শোনা যাক মাইটি পাঞ্চ টিমের লিডার সামির আসরান রাহমানের মুখ দিয়েই।

“২০০৩ সাল থেকে আমরা অ্যানিমেশনের কাজ শুরু করি, তখন থেকেই আমাদের চিন্তাভাবনা চলতে থাকে বাংলাদেশী সুপারহিরো নিয়ে কাজ করার। মুলত আমাদের বিজ্ঞাপন নির্মাণের কাজটাও করতে হয়, কিন্তু সুপারহিরো জগতের চিন্তা সবসময়ই মাথায় ছিল। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা ২০১৩ সালে সাবাশ নামের কমিক সিরিজ শুরু করি। আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা চিন্তা করে এবং আন্তর্জাতিক মার্কেটে বাংলা সুপারহিরোদের পৌঁছে দেয়ার জন্য ইংরেজি ভাষাই শুরু করি কমিকের কাজটা। ২০১৫ সালে ‘ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান’ মুভির ট্রেইলারটা দেখেই প্রথম ক্যাপ্টেন কাঁঠালের কথা মাথায় আসে আমাদের। তারপরই সাবাশের কমিক জগতে আগমন ঘটে ক্যাপ্টেন কাঁঠালের।”

সাবাশ, মিস সাবাশ বাদ দিয়ে প্রথমেই কেন ক্যাপ্টেন কাঁঠালের আগমন ঘটলো টিভি পর্দায়? এ প্রশ্নের জবাবে সামির বললেন,

“দেখুন, মানুষ কতটা ধারণা রাখে জানি না, কিন্তু এনিমেশন তৈরিতে প্রচুর সময় আর ধৈর্য্য দরকার। এবং খরচটাও কম নয়। ‘বাপের রাস্তাঃ The Wrong Road’টা অনেকটা আমাদের পরীক্ষার মতো বলা যায়। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম দেশের দর্শকরা কতটা প্রস্তুত তাঁদের সুপারহিরোকে বরণ করে নিতে, কেমন সাড়া পাওয়া যায় শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে। এবং আমরা সফলও হয়েছি, কোন প্রকার প্রচারণা ছাড়াই যে রকম সাড়া পাচ্ছি, তা অবিশ্বাস্য! দর্শকরা শেয়ার দিচ্ছে, আমাদের কাজের প্রশংসা করছে, আমাদের সাথে কাজ করতে চাচ্ছে। আর ক্যাপ্টেন কাঁঠালকে বেঁছে নেয়ার কারণ বলতে গেলে, সাবাশ এবং মিস সাবাশের স্টোরি আমরা অনেকটাই এগিয়ে ফেলেছি, তাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক লম্বা একটা সময় দরকার। যেহেতু, ক্যাপ্টেন কাঁঠালকে নিয়ে আমরা তেমন কিছু জানি না এখনও, তাই তাকে বেছে নেওয়া। তবে খুব শীঘ্রই সাবাশ এবং মিস সাবাশকেও পর্দায় দেখা যাবে। স্রষ্টাকে ধন্যবাদ, আমাকে এমন একটা গ্রেট টিমের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য এবং দর্শকদের ধন্যবাদ, আমাদের কাজে সাড়া দেয়ার জন্য।”

মাইটি পাঞ্চ স্টুডিও’র কাজ দর্শকদের মাঝে সাড়া ফেলেছে। যোগ্যতা এবং দক্ষতার ঘাটতি তাদের নেই, একই সাথে অ্যানিমেশন মুভি’র বাজারটাও এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত। কিন্তু তারপরেও থেকে যায় কিছু শঙ্কা। এর আগেও ১-২টি সম্ভাবনাময় কাজের মুখ আমরা দেখেছিলাম, যেগুলো পরবর্তীতে হারিয়ে গেছে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে। একই পরিণতির দিকে কি হাঁটবে মাইটি পাঞ্চ, ক্যাপ্টেন কাঁঠাল, সাবাশ আর মিস সাবাশ? তরুণেরা তাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে এগিয়ে এসেছেন, দেখিয়ে দিচ্ছেন হলিউডের নামীদামী স্টুডিওকে টেক্কা দেওয়ার মত কাজ এইদেশের তরুণরাও পারে। এবার বুড়োরাও কি এগিয়ে আসা উচিৎ না এই তরুণদের সম্ভাবনাটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top