নিসর্গ

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৪)

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৪)

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৩)

“উড়াব ঊর্ধ্বে প্রেমের নিশান দুর্গম পথ মাঝে
দুর্দম বেগে দুঃসহতম কাজে।
রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাব…
চাইনা শান্তি, সান্তনা নাহি চাব
পারি দিতে নদী হাল ভাঙ্গে যদি, ছিন্ন পালের কাছি,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছ, আমি আছি।”

কি, ভ্রমণ কাহিনীতে আবার প্রেমের কবিতা কেন? কি করব বলুন, আজ দিনটাই যে এমন। আজ বলতে ১৪ই এপ্রিলের কথা বলছি, আজ দেশে পহেলা বৈশাখ আর সেই সাথে আমাদের জীবনে বসন্তের সূচনা। এগারো বছর আগে এই দিনেই যে আমাদের চার হাত এক হয়ে গিয়েছিল তাই, এই দিনটি আমাদের জন্য কিঞ্চিত (!) স্পেশাল তো বটেই। আর সেই স্পেশাল দিনটি যদি পালন করা হয় ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সাড়ে পনের হাজার উচ্চতায় তবে খুব একটা মন্দ হয়না। তাই আজকের ডেস্টিনেশন গুলমার্গ।

Apharwat Peak, Gulmarg

কাশ্মীরের তৃতীয় দিন। সকাল সকাল সদলবলে পাড়ি জমালাম গুলমার্গের পথে। গুলমার্গ হল জম্মু এবং কাশ্মীরের আরেকটি অন্যতম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। শ্রীনগর থেকে দুই ঘন্টার ড্রাইভ দুরত্বে অবস্থিত এই হিল স্টেশনটি ইন্ডিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় উইন্টার স্পোর্টস এরিয়া। স্কেটিং এর জন্য এটি এশিয়ায় সপ্তম। এছাড়া বিশ্বের সর্বোচ্চ রোপ ওয়ে (কেবল কার) কিন্তু এটিই। ভু-পৃষ্ঠ থেকে অনেক উচু বিধায় চির শুভ্রতায় ছেয়ে থাকে এর সর্বোচ্চ পিক। এমন কি গ্রীষ্মেও এর সেকেন্ড ফেজ এ বরফ দেখা যায়। এখানে গন্ডোলা বা কেবল কার রাইডিং হল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এ্যাক্টিভিটি। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গের পথের এই যাত্রাপথটাও ঠিক একই রকম সুন্দর। একই রকম হয়ে যাবে বলে এবার আর সে বর্ণনায় যাচ্ছি না।

যাওয়ার পথে চোখে পড়ল দুই পাশে স্যাফরনের( জাফরান) ফিল্ড। গুলমার্গের কাছাকাছি এসে গাড়ি থামিয়ে তুষারে হাঁটার উপযোগী শু ভাড়া করলাম প্রতি জোড়া ১০০ রুপি দিয়ে। এখানেও যথারীতি বার্গেইনিং। আর সেই সাথে হ্যান্ড গ্লাভসও কিনলাম দাম ম্যাক্সিমাম ১০০ রুপিতে তবে অবশ্যই কোয়ালিটি নিম্নমানের, ওয়ান টাইম ব্যবহারের উপযোগী। ওরা অনেক জোড়াজুড়ি করল ওয়ার্ম ক্লথ ভাড়া নেয়ার জন্য, খুব ভয়ও দেখালো শীতের, কিন্তু আমরা পাত্তা দিলাম না। আমরা জেনেই এসেছি বরফে খুব বেশি ঠান্ডা অনুভুত হয় না। তাছাড়া গতকালও তো বরফের অভিজ্ঞতা হয়েছে একবার। শীত তেমন অনুভূতই হয়নি। আমরা উপরে পরেছি উইন্ড ব্রেকার , টুপি আর নিচে বডি ওয়ার্মার আর সোয়েটার। ওটাই যথেষ্ট।

গুলমার্গ

আবার যথারীতি গুলমার্গ ট্যাক্সি স্টেশনে পৌঁছাতেই পনি ওয়ালাদের আক্রমণ। এদিকে আমরা জানি যে এখান থেকে গন্ডোলা স্টেশন হল মাত্র দেড় কিলোমিটার কিন্তু পনি ওয়ালারা আমাদের বলছে অনেক দূর, অবশ্যই পনি নিতে হবে। ওদের শাসানিতে আমাদের ড্রাইভারের মুখে কুলুপ। বাধ্য হয়ে আমরা ফোন দিলাম আইয়ুব কে যিনি আমাদের ট্রাভেল এজেন্ট। উনি বলল ওদের কথায় কান না দিয়ে হাটা শুরু করতে। সেই সাথে ওর পরিচিত একজন গাইডও নিতে বলল সে যে আমাদের গন্ডোলার যাবতীয় কাজ করে দিবে। ফেরার সময় তাকে ৫০০ রুপি দিতে হবে। আমরা আর ঝামেলা না বাড়িয়ে গাইড নিলাম আর পনি ওয়ালাদের টাটা বলে বের হয়ে এলাম। একজন গাইড থাকলে অন্যরা আর কাছে ঘেঁষবে না।

এর মধ্যে আমার ভাইয়া এক অদ্ভুত বুদ্ধি বের করে ফেলল। যেই আসে কোন আর্জি নিয়ে(পনি ওয়ালা, ফেরি ওয়ালা, গাইড) তাদের সবার দিকে হাবার মত তাকিয়ে একটা কথাই উচ্চারণ করা “হাম হিন্দি নেহি জানতে” বলে উদাস হয়ে অন্য দিকে তাকানো। বেশ ভাল কাজে দিল এই টেকনিক। হাঁটতে হাঁটতে আমরা দেখছিলাম বেশ কিছু ট্যুরিস্টকে পনিওয়ালারা অল রেডি টুপি পরিয়ে ফেলেছে আর বেচারারা চতুর পনি ওয়ালাদের ফাঁদে পা দিয়ে দেড় কিলোমিটার রাস্তা অযথাই ঘুরে ঘুরে সাত আট কিলোমিটার পারি দিয়ে আসছে। পাজীগুলো তাদের পিচ ঢালা মেইন রোড বাদ দিয়ে খানা খন্দে ভরা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসছে।

যাই হোক প্রায় পনের মিনিট হাঁটার পর আমরা গন্ডোলা স্টেশনে পৌঁছলাম। এখানে গন্ডোলার দুইটি ফেজ আছে আপনি ইচ্ছা করলে দুটোর টিকিট কাটতে পারেন অথবা একটির। দ্বিতীয়টিতে ভাড়া একটু বেশি। তবে প্রথমটিতে যেয়ে কোন লাভ নেই, যদি সত্যিই বরফের রাজ্যে বিচরন করতে চান তবে আফারওয়াত পিক বা সেকেন্ড ফেজ এ যাওয়াই উত্তম। আমাদের গাইড আমাদের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে গন্ডোলায় আমাদের সাথে যাত্রার সঙ্গী হল। আমরা সেকেন্ড ফেজেরই টিকিট কাটলাম।

সেকেন্ড ফেইজ এর ভিউ

এবার সেই ঐতিহাসিক গন্ডোলা রাইড। খুব চেনা চিরসবুজের প্রকৃতি ছেড়ে শ্বেতশুভ্র এক অপার্থিব জগতের পানে আমাদের যাত্রা হল শুরু। প্রথম ফেজ পর্যন্ত নয় মিনিট এবং এর পরেরটা বার মিনিটের মত রাইড। ফার্স্ট ফেজে যেয়ে সেকেন্ড ফেজের জন্য গন্ডোলা চেঞ্জ করতে হবে। তাই ফার্স্ট ফেজ থেকে আমাদের নিয়ে দোদুল্যমান কেবল কারটি যতই সেকেন্ড ফেজের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ততই এই চেনাজানা পৃথিবী কোথায় যেন হারিয়ে ফেললাম আমরা আর তার পরিবর্তে চির শুভ্রতার বারতা নিয়ে আর এক নতুন জগৎ দু হাত বাড়িয়ে বরণ করে নিল আমাদের। এ কোথায় এসে পড়লাম আমরা! চারিদিকে শুধু শুভ্রতার হাতছানি। একেকটি পাহাড় যেন এক একটি আইস্ক্রিমের স্কুপ। আর তার মাঝে গড়াগড়ি করছি আমরা।

আবহাওয়া বেশ ভাল ছিল তাই একদম পিক এ উঠলে এলওসি দেখা যেত কিন্তু পিচ্ছিল বরফে অত উপরে উঠতে যেয়ে ধরাম ধরাম আছাড় খেতে আর কার ভাল লাগে? তাই সেই রিস্ক আর নিলাম না। আবার যথারীতি স্লেজ চালকদের হামলা কিন্তু ন্যাড়া তো আর বারবার বেলতলায় যায়না। এছাড়া এই ক্ষেত্রেও সেই হিন্দী না বুঝতে পারা উদাস থিওরি বেশ কাজে দিল। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখবেন এই স্থানটি কিন্তু অনেক উপর তাই অক্সিজেনের অভাব বোধ করা খুব স্বাভাবিক। দলে খুব বেশি ছোট বাচ্চা কিংবা বয়স্ক ব্যাক্তি থাকলে এখানে না আসাই ভাল। তবে অসুস্থ হলেও সমস্যা নেই, ছোট্ট একটা রুমে ফার্স্ট এইড আর অক্সিজেন নিয়ে একজন মেডিক্যাল অফিসার থাকেন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়া ট্যুরিস্টদের মেডিকেল সেবা প্রদানের জন্য।

গুলমার্গ গন্ডোলা

আগেই বলেছি দিনটা আমাদের বিশেষ দিন, কন্যা আর কন্যার বাবা সহ যথেষ্ট বরফ নিয়ে আদেলখাপনা করা হল। বরফে অনেক আঁকিবুঁকিও চলল, আমার কন্যার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন স্নো ম্যানও বানানো হল। এর মধ্যে আমার বোন অসুস্থ ফিল করায় আর খুব বেশি সময় কাটালাম না আমরা। ফেরার পথে ভেবেছিলাম ফার্স্ট ফেজে কিছুটা সময় কাটাব, কিন্তু সেকেন্ড ফেজে যা দেখেছি সেই আমেজ আর নস্ট করতে চাইলাম না, সরাসরিই চলে এলাম নিচে।

ফেরার পথে আবার সেই দোকানে নেমে জুতা ফেরত দিলাম। রাস্তায় এক রেস্টুরেন্ট এ নেমে সবাইকে এনিভার্সারি ট্রিট দিলাম আমরা। রেস্টুরেন্ট মালিক আমাদের বাংলাদেশি পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ। ইদানিং বাংলাদেশি ট্যুরিস্টরা খুব বেশি যায় বলে সে ননভেজ এই ব্রাঞ্চ টি খুলেছে নইলে আগে ভেজ রেস্টুরেন্ট ছিল তার। আমাদের সে একটি স্যুভেনিয়ার শপ এর ঠিকানা দিল ওর ভাইয়ের, যা রাস্তাতেই পরবে। আমরা ফেরার পথে নামলাম আর নেমেই হল বিপদ। কারণ পকেট থেকে বেশ টাকা খসল যে! এই কয় দিনে এটাই একমাত্র ফিক্সড প্রাইজের দোকান পেলাম যেখানে দাম তুলনামুলকভাবে রিজনেবল। এখানে বেশ শপিং করলাম আমরা। অতঃপর শপিং শেষে ব্যাগ বোচকা নিয়ে শ্রীনগরের পথে। সন্ধ্যার মধ্যে হোটেলে ফিরে ফ্রেস হয়েই আবার বের হলাম। এবার লাল চকে কেনাকাটা। এই এরিয়াটি ট্যুরিস্ট এরিয়া না বলে প্রতিটি জিনিসের দাম অনেক রিজনেবল। এখানে ওখানে একটু ঘুরাঘুরি, একটু কেনাকাটা, একটু খাইদাই এই করেই রাত হয়ে গেল। আবার হোটেলে ডিনার শেষে রুমে প্রত্যাবর্তন। তিনদিন শেষ ,আর একদিনই বাকি কাশ্মীরে। ভেতরে একটু শুণ্যতা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। কিন্তু কি করা? আগামীকাল যাব কাশ্মীরের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম পেহেলগাম এ। আগামি দিনটাকে পরিপুর্ণভাবে উপভোগ করার স্বপ্ন নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম আমরা। আর সেই সাথে অবসান হল আর একটি এ্যাডভেঞ্চারপুর্ণ মধুর দিনের।

(চলবে)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top